📄 পণ্যের বিনিময়ে পণ্য, দিনশেষে হতে পারেন ধন্য
পণ্য দিয়ে পণ্য ফেরত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমত সম্পদের মূল্য নগদ টাকার চেয়ে কম হারায় ও ক্ষেত্রবিশেষে মূল্য যোগ হয়। স্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থ বা টাকা মূল্য হারায়, কিন্তু পণ্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতির সেই প্রভাব নাকচ করে দেয়। ফলে, এই বছর ১ মণ চাল কর্জ দিয়ে পরের বছর ১ মণ চাল ফেরত নিলেও, দেখা যাবে সেই ফেরত পাওয়া চাল বাজারের বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করা যাচ্ছে। সুতরাং সেই ফেরত পাওয়া চাল যে ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের সে তার কেনামূল্যের চেয়ে বিক্রয়মূল্য বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সুতরাং প্রতিষ্ঠান যদি নিজের সম্পদ ব্যবহার করে ১০০ মণ চাল কিনে রাখে এবং কর্জ দেয়, পরের বছর ফেরত পাওয়া ১০০ মণ চাল বিক্রি করে দিলে ছোট একটা ভালো লাভ আশা করা যায়।
সকল ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে ব্যাপারটা আবার এমন ভাবা যাবে না। একটা নির্দিষ্ট পণ্য যেমন সোনা বা চালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের লেনদেন আটকে থাকলে সেই পণ্যের বাজারদরের উঠানামা যেটা চাহিদা-জোগানের কারণে হচ্ছে, কিংবা দুর্যোগ ও মহামারির কারণে প্রভাবিত হচ্ছে, সেটার প্রভাব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে পড়বে। একদিকে লাভ যেমন সম্ভব, তেমনি লোকসানও খুবই সম্ভব। স্বাভাবিক অবস্থায়, শুধু মূল্যস্ফীতির কারণে প্রতিষ্ঠান লাভে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
বিনিয়োগ জগতে একটা কথা আছে, 'ডাইভারসিফাইড পোর্টফলিও' (Diversified Portfolio), এর মানে হচ্ছে, এই যে একক পণ্যে বা বস্তুতে যে ঝুঁকির কথা বললাম, এটাকে রোধ করার অব্যর্থ ঔষধ হচ্ছে বিভিন্ন প্রকারের পণ্য নিয়ে কাজ করা। আপনার প্রতিষ্ঠান চাল-ডাল সহ যদি ৫০টা শস্য নিয়ে কাজ করে এবং সোনা-রুপা-মুক্তা-হীরা সহ এমন আরো ৫০ পদের রত্ন নিয়ে কাজ করতে পারে, তবে আপনার লোকসান নিয়ে তেমন একটা না ভাবলেও হবে। এই পণ্যের কোনটার দর কমবে, আর কোনটার বাড়বে বাজারের স্বাভাবিক নীতিতে, কিন্তু আপনার ১০০ পদের পণ্য নিয়ে কারবার গড়পড়তা লাভই দিবে ইনশাল্লাহ।
📄 ব্যাংকের চেয়ে লাভ যখন বেশি
কিছু কিছু সময় দেখা যায়, কোনো বছরের ব্যাংকের সুদের বার্ষিক হার সেই বছরের ঐ দেশের মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়ে থাকে। যেই সময়টাতে খাদ্যশস্য, জমি, সোনা ইত্যাদির মূল্য সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়ে যায়। আপনার প্রতিষ্ঠান যদি সেই বছর চাল বা চিনি ক্রয় করে ১ লাখ টাকার, দেখা যেতে পারে যে এর পরের বছর সেই পণ্যের দাম বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ২০% লাভ! সেখানে ব্যাংকে যারা ১ লাখ টাকা রেখেছে, তারা হয়তো ১ লাখের বিপরীতে পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার টাকা। মনে রাখতে হবে, এটা নিয়মিত ঘটনা না, এটা ব্যতিক্রম। এত লাভ প্রতি বছর নাও হতে পারে, কোনো বছর লোকসানও হতে পারে। ব্যবসায় লাভ-লোকসান আছেই। তবে এটা খুবই সম্ভব যে, কর্জে হাসানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্জ দিয়ে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশি লাভবান হবেন।
📄 পণ্য থেকে টাকায় ঝাঁপ দেয়া
ধরুন, আপনার কর্জে হাসানা প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ টাকার চাল কেনা আছে এবং এটা কর্জ আকারে মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। আপনি খেয়াল করলেন যে, গত বছরের মতো এই বছরও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গড়পড়তা মূল্যহ্রাস চলছে। মানে চালের দাম ক্রমেই কমছে। তাহলে এটা বলা যাচ্ছে খুব সহজেই যে গত বছরের তুলনায় এই বছর চাল বিক্রি করে আপনি কম টাকা পাবেন। অর্থাৎ আপনার প্রতিষ্ঠানের লোকসান হবে। ঠিক এই সময়ে আপনার প্রতিষ্ঠানের উচিত হবে টাকা দিয়ে কর্জ দেয়ার পন্থায় চলে যাওয়া। অর্থাৎ, যে চালগুলো কর্জ আছে, সেগুলো সময়মত আদায় করার পর বিক্রি করে দিয়ে আর চাল না কেনা এবং লোকসান হওয়ার পরেও যে টাকাটা হাতে আছে সেটা টাকা হিসেবেই কর্জ দেয়া। যতদিন আপনার অর্থনীতিতে মুদ্রাহ্রাস বা গড়ে সব জিনিসের দাম কমার দিকে থাকবে, ততদিন আপনি টাকায় কর্জ দিতে থাকবেন। কারণ, এতে করে এই বিপরীত সময়ে টাকার মূল্য হারাচ্ছে না, বরং বাড়ছে।
📄 যখন টাকাই যথেষ্ট
আধুনিক অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি ছাড়া কিছু চিন্তা করতে পারে না। এর মূলে রয়েছে ব্যাংকের দুষ্ট সেই ঋণের চক্র। এজন্য এই পর্যন্ত এত আলোচনা করা হয়েছে মূলত মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব থেকে কর্জকে কিছুটা বাঁচানোর জন্য। এবার মনটা ভালো করার জন্য ধরে নেই, আজকে স-ব ব্যাংক বন্ধ এবং অর্থনীতি সুদি ঋণের টাকায় চলছে না। তাই, মূল্যস্ফীতি গায়েব হয়ে গিয়েছে। এই অর্থনীতি, যেটাতে মূল্যস্ফীতি নেই, সেখানে এত কষ্ট করে পণ্য কর্জ দেয়ার দরকার নেই, আরামসে টাকা ব্যবহার করুন। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতিই যদি না থাকে, হাজারো কৌশল করার প্রয়োজন নেই। টাকায় কর্জ লেনদেন করলেই যথেষ্ট।