📄 আধুনিক ব্যাংকিং ও মুদ্রা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা চমৎকারভাবে ইসলামি পরিভাষায় সব ধরনের রিবা চিনে নিয়েছি। এবার আমরা ফাঁদ চিনব। আধুনিক প্রেক্ষাপটে সুদকে ভালোভাবে বুঝতে হলে অবশ্যই টাকাকে বুঝতে হবে। আর টাকাকে বুঝতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে ব্যাংক ব্যবস্থার সাথে টাকার নিবিড় সম্পর্ককে।
📄 ব্যাংকের সাথে টাকার সম্পর্ক
ব্যাংকের সাথে টাকার সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে, খুব সহজ বাংলায় আমি বলে থাকি, “টাকা ব্যাংকের সন্তান।”Parenthesis পিতামাতা ছাড়া সন্তান কল্পনা করা যেমন অসম্ভব, ঠিক তেমনি বর্তমান অর্থব্যবস্থায় ব্যাংক ছাড়া টাকা নিয়ে আলোচনা করাটা প্রায় অসম্ভব। বিষয়টি বোঝার জন্য মনে করি, গৃহবধূ সাবানা ৩ লক্ষ টাকা সঞ্চয় করেছেন। আলমগীর সাহেব সততা ব্যাংকের শাখায় সাবানার নামে একটি অ্যাকাউন্ট খুললেন। সাবানা তার ৩ লক্ষ টাকা অ্যাকাউন্টে জমা (ঋণ) দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরল।
পরদিনই ধনাঢ্য ব্যবসায়ী রাজিব সাহেব সততা ব্যাংকে এসে ২.৫ লক্ষ টাকা ঋণ চাইলেন। ব্যাংক রাজিব সাহেবের অ্যাকাউন্টে ২.৫ লক্ষ টাকা লিখে দিল। এখন সাবানার ৩ লক্ষ আর রাজিবের ঋণের ২.৫ লক্ষ মিলে ৫.৫ লক্ষ টাকা তৈরি হলো। টাকা তো ডিম পাড়ে না। তাহলে ৩ লক্ষ টাকা থেকে ৫.৫ লক্ষ টাকা তৈরি কীভাবে হলো? এটাই ব্যাংকের জাদু।
ব্যাংক ব্যালেন্স হচ্ছে টাকার বিকল্প। তাই অর্থনীতির পরিভাষায় কাগুজে মুদ্রাকে অর্থাৎ এম০ (M0) বা চিকন টাকা (Narrow Money) বলে এবং ব্যাংক ব্যালান্সসহ কাগুজে মুদ্রাকে এম ১ বা এম ২ (M1/M2) বা মোটা টাকা (Broad Money) বলা হয়ে থাকে।
বাস্তবে উন্নত বিশ্বে ৩ লক্ষ টাকার কাগুজে মুদ্রা ১ কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স তৈরি করে! গড়পড়তা একটি রাষ্ট্রের মোট টাকার কমপক্ষে ৯০ শতাংশই সৃষ্টি হয় ব্যাংক ব্যবস্থা দ্বারা। অর্থাৎ, মোট টাকার ৯০ শতাংশের অধিক অংশই হচ্ছে ব্যাংক ঋণ। অক্টোবর ২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রাথমিক টাকা M০ এর তুলনায় M১ হলো ১.৭৮ গুণ বেশি এবং M০ এর তুলনায় M২ হলো ৭.৭৪ গুণ বেশি।
টিকাঃ
১৯. ব্যাংক আমানত বীমা আইন ২০০০ এর লিংক দেয়া হলো। এই আইন অনুসারে, যেকোনো পরিমাণ আমানতের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা ফেরত পাবেন। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-840.html
২০. ব্যাংক ক্রাইসিস (প্রায় ৫০টা ঘটনার উইকিপিডিয়ার লিস্ট) - : .ly/Hqs6
২১. ব্যাংক রান (টাকা দিতে পারায় আর লোকজন জড়ো হয়ে যাওয়ায় ব্যাংক বন্ধ হওয়ার ঘটনাগুলো) - :.ly/vyA4
২২. https://www.bb.org.bd/econdata/moneysupply.php
📄 আধুনিক ব্যাংকের চেরাগ-বাতি
আধুনিক ব্যাংকিং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী হাতিয়ার হলো 'টাকা তৈরি' করা। সেই ভয়ানক সমস্যাটার নাম হচ্ছে, 'ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং' (Fractional Reserve Banking)। আধুনিক ব্যাংকিং এখন চলছেই এই নীতিতে। কোনো কোনো দেশ ১৫% কিংবা ১০% 'Required Reserve Ratio' সেট করে রেখেছে। বাংলাদেশের এই হার হচ্ছে মাত্র ৫%, অর্থাৎ কোনো ব্যাংকে কেউ ১০০ টাকা জমা রাখলে, সেই ব্যাংক ২০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে।
গবেষণা জগতে যারাই ইসলামি অর্থনীতি, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং নিয়ে পড়াশোনা করে, তারাই বলেন যে এটা মোটেই শরিয়া সম্মত পদ্ধতি না। টাকা তৈরির কোনো ক্ষমতা কোনো বেসরকারি ব্যাংক, যেটা ইসলামি হোক বা বাণিজ্যিক সাধারণ ব্যাংক, কারো কাছেই থাকা উচিত না। এর যেমন ভয়ানক অর্থনৈতিক কুফল আছে, তেমনি তাদের এরকম টাকা তৈরি ও ঋণ দেয়ার কোনো শরিয়া ভিত্তি নেই।
টিকাঃ
২৩. এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে লেখকের অপর বই পড়ার অমন্ত্রণ জানানো যাচ্ছে।
২৪. সেন্ট্রাল ব্যাংক নিউজ লিংক : .ly/VRLt
২৫. 'ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং' কীভাবে ইসলামি শরিয়ার আইনের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ না সেটা বিস্তারিত জানার জন্য প্রফেসর আহমেদ কামিল মাইদিন মিরা ও আরো ৩ জন গবেষকের যৌথভাবে লেখা গবেষণাপত্র 'Fractional Reserve Banking and Maqasid Al-Shariah: An Incompatible Practice?" পড়ে দেখতে পারেন। গবেষণাপত্রের লিংক দেয়া হলো- :.ly/dUgT
২৬. বাংলাদেশ ইসলামি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে 'ইসলামি ব্যাংকিং এর সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা' সেকশন লিংক - https://www.islamibankbd.com/abtIBBL/cis_issues_and_problems_of_islamicbanking.php
📄 প্রাথমিক টাকা বা গ০ এর জন্য
১৯৭১ সালের ১৫ আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় বলে দেন যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে কোনো সোনা মজুত থাকবে না। এই ঘোষণার সাথে সাথে পৃথিবীর সকল মুদ্রা ফিয়াট কারেন্সিতে (মূল্যহীন কাগুজে মুদ্রায়) পরিণত হয়। বর্তমানে বিশ্বের কোনো মুদ্রার বিপরীতে মূল্যবান সম্পদ জমা নেই। তাই টাকা এখন শুধুই বিনিময়ের মাধ্যম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপায় আর সেটা তারা সরকারকে ঋণ হিসেবে দেয়। এভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকও মানেটারি পলিসি অনুসারে সরকারের চাহিদা ও অর্থনীতির অবস্থা বুঝে টাকা ছাপায়। এই ঋণের উপর যেহেতু সুদ যুক্ত আছে, বছর বছর নতুন ঋণ নিয়ে পুরাতন ঋণের সুদ পূরণ করতে হবে। এভাবে মোট ঋণের পরিমাণ চক্রাকারে বাড়তে থাকবে। ২০১৯ সালে প্রতিটা নাগরিকের উপর জাতীয় ঋণ (Per Capita National Debt) ছিল ৬৬২ ডলার বা প্রায় ৫৭ হাজার ১২৭ টাকার মতো।
টীকা আঙুল ফুলে কলাগাছ
২০১৯ সালে বাংলাদেশের সব ধরনের সকল ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৬,২৯,৮৪০ কোটি টাকা! মাত্র ১৩ বছরে ব্যাংকের সম্পদ (ঋণ + পুঁজি) বেড়ে গিয়েছে ৫ গুণ! ১৯৭০ এর দশকে যেখানে জিডিপির ৮.২৫ শতাংশ ছিল ব্যাংকের সম্পত্তি বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭.৩৭ শতাংশে। অর্থাৎ সুদের জালে ফেলে ব্যাংক সাধারণ মানুষের সম্পদ আস্তে আস্তে নিজের করে নিচ্ছে।
টিকাঃ
২৭. কান্ট্রি ইকোনোমি এর পরিসংখ্যান তথ্য লিংক - :.ly/K5la
২৮. বিডিনিউজ২৪ এর খবরের লিংক- t.ly/GaF3
২৯. এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে লেখকের অপর বই পড়ার আমন্ত্রণ জানানো যাচ্ছে।