📄 রিবাল ফযলের কিছু উদাহরণ
সমজাতীয় মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে
মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে উভয় মুদ্রা যদি একই জাতীয় ও শ্রেণিভুক্ত হয়, তাহলে লেনদেন সমানে সমান হতে হবে এবং উভয়পক্ষের হস্তগত হতে হবে। এজন্য পুরানো নোট বা ভাংতি টাকার অসম লেনদেন হারাম। ঈদের মৌসুমে মানুষজন 'সালামি' দেয়ার জন্য নতুন নোট কেনে, যেখানে পুরানো ১০৫/১১০ টাকার বিনিময়ে নতুন ১০০ টাকার নোট কেনাবেচা হয়। এই ব্যবসা হারাম। কিন্তু দুইটি ভিন্ন নোট যেমন ডলারের বিনিময়ে টাকা বা রুপির বিনিময়ে ইউরো ইত্যাদির লেনদেন করা যাবে।
ধানের বিনিময়ে ধান
আমাদের সমাজে শীতের সময় হরেক রকমের পিঠা তৈরি হয়। এ সময় পিঠার উৎসবে মেতে উঠে গ্রাম-বাংলার বধূরা। টাঙ্গাইল এলাকায় বিশেষ এক প্রকার ধান আছে যা 'চামারা ধান' নামে পরিচিত। এ ধানের পিঠা খুবই সুস্বাদু! এই ধানের চিড়াও বেশ সুস্বাদু! তাইতো কথিত আছে, 'ধানের মাঝে চামারা আর আত্মীয়ের মাঝে মামারা!!' যাই হোক, অনেক সময় দেখা যায় একজন ব্যক্তির কাছে চামারা ধান না থাকায় সে ব্রি-২৯ বা ব্রি-২৮ ধান দিয়ে চামারা ধান কেনে পিঠা খাওয়ার জন্য। যেমন: দেড় মন ব্রি-২৯ ধানের বিনিময়ে এক মন চামারা ধান। এই লেনদেনটা অবৈধ হবে। কারণ, সমজাতীয় বস্তুর কম-বেশি লেনদেন। এক্ষেত্রে শরঈ বিকল্প হলো- প্রথমে ব্রি-২৯ ধান টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে চামারা ধান ক্রয় করা। অথবা লেনদেনের সময়ই হিসেব করে নেয়া যে, ব্রি-২৯ এর ১ মন ধানের দাম ২০০০ টাকা এবং দেড় মন চামারা ধানের দাম ২০০০ টাকা, তাই এই ২০০০ টাকার বিপরীতে এই কেনাবেচাটা হলো।
লাউয়ের বিনিময়ে লাউ
আপনার খেতে আজকে ২ টা কচি লাউ আছে যেটার বাজার মূল্য ৮০ টাকা করে মোট ১৬০ টাকা। কিন্তু আপনার বাসায় আজকে অনেক মেহমান, সবাইকে খাওয়াতে আপনার দরকার ৪টা বড় লাউ। একটু পরেই দেখলেন বাসার সামনে দিয়ে পাশের গ্রামের রবিউল মুনশি লাউয়ের ঝাঁকা নিয়ে গঞ্জে যাচ্ছে। তাকে থামিয়ে তাঁর সাথে চুক্তি করলেন যে সে আপনাকে ৪টা বড় লাউ দিবে, বিনিময়ে আপনি তাকে ২টা কচি লাউ দিবেন। রবিউল বাজারদর জানে, সে রাজি হলো। এই যে আপনি ৪টা লাউ নিলেন ২টা লাউয়ের পরিবর্তে, এটা সম্পূর্ণ জায়েজ একটা কাজ। আপনার পরিমাপ করে ঠিকঠাক জানার দরকার নেই বা বাজারদর সমান হওয়ার কিছু নেই। সংখ্যায় কমবেশি হলেও দুই পক্ষ রাজি থাকলেই গণনীয় কোনো কিছু নগদে বিনিময় করা যাবে।
টীকা 'সমজাতীয়' হওয়ার অর্থ
কোনো কিছু অসমজাতীয় হয় তিন দিক থেকে। যথা:
এক. সত্তাগত বা বাস্তবতায় ভিন্ন হওয়া। যেমন: গম ও ধান অসমজাতীয়, এরা সত্ত্বাগতভাবেই আলাদা।
দুই. নাম এক হলেও মূল উৎস ভিন্ন হওয়া। যেমন: আঙুর থেকে তৈরি সিরকা ও খেজুর থেকে তৈরি সিরকা। গরুর গোশত ও খাসির গোশত। সরিষার তেল ও জয়তুনের তেল ইত্যাদি।
তিন. উদ্দেশ্যে ভিন্ন হওয়া। যেমন: ছাগলের পশম ও ভেড়ার লোম। এরা অসমজাতীয় দ্রব্য।
তবে ভালো-মন্দ গুণের দিক থেকে অভিন্ন হওয়াটা সমজাতীয় হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধক বা বাধা না। যেমন: দিনাজপুরের লিচু আর সাধারণ লিচু।
টীকা 'পরিমেয়' হওয়ার অর্থ
কোনো বস্তু পরিমেয় কি না তা বুঝার সহজ উপায় হলো সেটি যত খুশি তত পরিমাণ হুবহু মেপে নেয়া যায়। যেমন চাল। পক্ষান্তরে মুরগি, মাছ এগুলো খুশিমত পরিমাণ মেপে নিতে পারবেন না বরং গণনীয়। আমরা আসলে দাম জানার জন্য পরিমাপ করি। এজন্যই পরিমাণে কিছু কম-বেশি হলে সেটা ছাড় দেয়া হয়। কোনো বস্তু পরিমেয় হওয়ার অর্থ হলো তাতে রিবাল ফযল ও রিবান নাসা প্রয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
টিকাঃ
১২. শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী, ফিকহুল বুয়ু', মাকতাবাতু মায়ারিফিল কুরআন, করাচি, খ.২ পৃ.৬৬৭-৬৬৮। ইতরে হিদায়া, ফাতাহ মুহাম্মাদ লখনভী, মৃত-১৩২৭ হি., মাকতাবাতুল হারামাইন ঢাকা, প্রকাশকাল-২০১৪ ইং, পৃ.১৭১।
১৩. ফাতাহ মুহাম্মাদ লখনভী, মৃত ১৩২৭হি., ইতরে হিদায়াহ, মাকতাবাতুল হারামাইন, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০১৪ ইং, পৃ. ১৭২।
📄 রিবান নাসা
'আন্-নাসা' শব্দটির অর্থ হলো বিলম্বিত করা, দেরি করানো: দূরে রাখা, পিছিয়ে দেওয়া। যেহেতু এই রিবা বাকিতে লেনদেন করার কারণে পাওয়া যায় তাই একে রিবান-নাসা বলা হয়।
📄 রিবান-নাসার কিছু উদাহরণ
আলু ও পেয়ারার বিনিময়
কবির মোল্লার মাঠে এবার অনেক আলু হয়েছে। সে তবারক মুনশির কাছে ২ মন পেয়ারা চাইল। কবির মোল্লা এখনো আলু বিক্রি করে টাকা হাতে পায়নি। তবারক মুনশি এখন পেয়ারা দিয়ে যাবে আর পরের দিন এসে আলু নিয়ে যাবে। মাত্র ১ দিনের ব্যবধানে বাকিতে এই লেনদেন কি জায়েজ? অবশ্যই না। ২ মন পেয়ারার সাথে ৩ মন আলুর লেনদেন বৈধ, কিন্তু সেটা হতে হবে নগদে। বাকিতে লেনদেন হলেই সেটা হয়ে যাবে রিবান-নাসা।
চালের বদলে ডাল
৫০ কেজি চালের বিনিময়ে কেউ ২৫ কেজি ডাল কিনতে চাইলে লেনদেন হতে হবে নগদে। খেয়াল করে দেন, আগে ২ কেজি চালের দাম ১ কেজি ডালের সমান হতে পারে। কিন্তু বাকিতে ১ কেজি ডালের বিনিময়ে ২ কেজি চাল বিক্রি করার পর যদি দাম বেড়ে যায় বা কমে যায়, তাহলে কোনো এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সোনা-রুপার লেনদেন
সোনার গহনার সেট নিয়ে আব্দুল্লাহ জুয়েলারের কাছে গেল। জুয়েলার অফার দিল যে, ১ লাখ টাকা ক্যাশ দিবে আর ৫০ হাজার টাকার রুপার গহনা দিবে। কিন্তু শর্ত হলো, টাকা ও রুপার পরিমাণ ১ সপ্তাহ পরে নিতে হবে। না, সোনার বিপরীতে যে রুপা বা রুপার গহনা নেয়া হচ্ছে সেটা হতে হবে নগদে। এটা বাকি রাখলে সেটা রিবান-নাসা হয়ে যাবে।
সবজিওয়ালা
ক্রেতা হয়তো পাঁচ কেজি শসা চাইলো। বিক্রেতার কাছে আছে তিন কেজি শসা। তখন সে পাশের বিক্রেতার কাছ থেকে দুই কেজি শসা এ শর্তে নেয় যে, আগামীকাল আড়াই কেজি শসা সে পরিশোধ করবে। উক্ত লেনদেনটি একটি সুদি লেনদেন। এখানে যে সুদ হচ্ছে, সেটা রিবাল নাসা। কারণ এখানে সমজাতীয় ও পরিমেয় দুটি দ্রব্যের কমবেশি লেনদেন বাকিতে হচ্ছে।
📄 আধুনিক ব্যাংকিং ও মুদ্রা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা চমৎকারভাবে ইসলামি পরিভাষায় সব ধরনের রিবা চিনে নিয়েছি। এবার আমরা ফাঁদ চিনব। আধুনিক প্রেক্ষাপটে সুদকে ভালোভাবে বুঝতে হলে অবশ্যই টাকাকে বুঝতে হবে। আর টাকাকে বুঝতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে ব্যাংক ব্যবস্থার সাথে টাকার নিবিড় সম্পর্ককে।