📄 রিবাল বুয়ূ (কেনাবেচা সম্পর্কিত সুদ)
সভ্যতার শুরুতে বর্তমানের মতো ধাতব মুদ্রা বা কাগজের অর্থের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মুদ্রার ইতিহাসে একে বলা হয় 'বিনিময় প্রথা', আরবিতে বলে 'ত্বরিকুল মুকায়াদাহ্' আর ইংরেজিতে বলে 'Barter System' । তৎকালীন আরবেও এমন কিছু লেনদেনের প্রচলন ছিল। তারা বহুল প্রচলিত কিছু দ্রব্য যেমন- গম, যব, খেজুর ইত্যাদি ও সরাসরি স্বর্ণ বা রূপাকে (দিরহাম-দিনার) বিনিময় মাধ্যম (Medium of Exchange) হিসেবে ব্যবহার করত।
মানুষ যদি এক দিরহাম দুই দিরহামের বিনিময়ে বা এক কেজি গমকে দেড় কেজি গমের বিনিময়ে নগদ কেনাবেচায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তাহলে এ চর্চা তাদেরকে মূলত নির্ধারিত ঋণ বা দায়ের বিপরীতে সমজাতীয় মুদ্রার অতিরিক্ত গ্রহণে অভ্যস্ত করে তুলতে পারে। মানুষ বলতে পারে, এক কেজি গমের বিনিময়ে যদি দেড় কেজি গমের লেনদেন করা যায়, তাহলে একশ টাকা দায় বা ঋণের বিপরীতে একশত পাঁচ টাকার লেনদেনও করা যাবে। কারণ, দুটি ক্ষেত্রেই সমজাতীয় বস্তুর পারস্পরিক লেনদেনে অতিরিক্ত বিনিময় হচ্ছে। অথচ এটি স্পষ্ট রিবান-নাসিয়াহ। যা কুরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা (নগদে) এক দিনার দুই দিনারের বিনিময়ে, এক দিরহাম দুই দিরহামের বিনিময়ে এক সা' দুই সা'য়ের বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় কর না। কেননা আমি তোমাদের উপর রিবার ভয় করি।"
উবাদা বিন সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "স্বর্ণের সাথে স্বর্ণের লেনদেন সমান সমান হবে, রুপার সাথে রুপার লেনদেন সমান সমান হবে, খেজুরের সাথে খেজুরের লেনদেন সমান সমান হবে, গমের সাথে গমের লেনদেন সমান সমান হবে, লবণের সাথে লবণের লেনদেন সমান সমান হবে, যবের সাথে যবের লেনদেন সমান সমান হবে। উভয় দিকে সমান সমান লেনদেন না করে যে কোনো একদিকে বৃদ্ধি করা হলে সেটা রিবা হবে। আর স্বর্ণের সাথে রুপার লেনদেন কম-বেশি করে যেভাবে খুশি সেভাবে করতে পার। তবে নগদে হতে হবে। তেমনি খেজুরের সাথে গমের লেনদেন যেভাবে খুশি কম-বেশি করতে পার। তবে নগদে হতে হবে। তদ্রূপ খেজুরের সাথে যবের লেনদেন যেভাবে খুশি কম-বেশি করে কর। তবে নগদে হতে হবে।"
রিবাল বুয়ু' বা কেনাবেচা সম্পর্কিত সুদ দুই প্রকার। যথা: রিবাল ফযল ও রিবান নাসা।
📄 রিবাল ফযল
ফযল শব্দটার অর্থ হলো 'কোনো কিছু অতিরিক্ত হওয়া'। প্রখ্যাত ফকিহ আলাউদ্দীন আল-কাসানী (রহ.) বলেছিলেন, "রিবাল-ফযল হলো, ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে কোনো এক পক্ষ সম্পদ বাড়িয়ে দেয়ার শর্ত করা যা শরিয়তের মানদণ্ডে অতিরিক্ত বলে গণ্য হয়।"
সমজাতীয় বস্তু যেমন- ধানের সাথে ধান, ময়দার সাথে ময়দা, তেলের সাথে তেল ইত্যাদির লেনদেন বা বিনিময়ের সময় কম-বেশি করে লেনদেন করাটাই হলো রিবাল ফযল। অর্থাৎ, সমজাতীয় বস্তু লেনদেনের ক্ষেত্রে ক. উভয়দিকে সমান সমান হতে হবে। কম-বেশি করা যাবে না। খ. উভয়টি নগদে হতে হবে। কোনো একটিও বাকি রাখা যাবে না।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে খায়বরের সরকারি বিশেষ কাজে নিযুক্ত করলেন। লোকটি ভালো মানের কিছু খেজুর নিয়ে আসল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, "খায়বরের সব খেজুর কি এরকম?" লোকটি জবাবে বলল, "না, ভালো মানের এক সা' খেজুর ক্রয় করি নিম্ন মানের দুই সা' খেজুরের বিনিময়ে।" নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব শুনে বললেন, "তোমরা এমনটি করবে না। বরং প্রথমে তোমাদের নিকট সংরক্ষিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করবে। এরপর ঐ দিরহাম দিয়ে ভালো মানের খেজুর ক্রয় করবে।"
হাদিসে বর্ণিত ছয়টি জিনিস হলো: ১. স্বর্ণ ২. রুপা ৩. গম ৪. যব ৫. খেজুর ৬. লবণ।
ফকিহগণ ইজতিহাদ করে উক্ত ৬টা দ্রব্যের ২টি সাধারণ বৈশিষ্ট্য বের করেছেন এবং সেই বৈশিষ্ট্যগুলো অন্য যেসকল দ্রব্যে পাওয়া যাবে, সেগুলোতেও একই বিধান কার্যকর হবে। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. ওজন বা পাত্রে পরিমাপ করা যায় এমন হওয়া (ক্বদর)
২. সমজাতীয় হওয়া (জিনস)
টিকাঃ
৫ আলাউদ্দিন আল-কাসানী, মালিকুল উলামা ইমাম আলাউদ্দিন আবু বকর ইবনে সুষুদ আল-কাসানী, মৃত-৫৮৭হি, বাদায়িউস সানায়ে', থানবি প্রকাশনী, দেওবন্দ, খ.৪ পৃ.৪০০।
৬ শামসুল আইম্মাহ আস-সারাখসী, ফকীহ আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে আহমদ ইবনে আবী সাহল, মৃত-৪৯০হি., আল-মাবসূত, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ্, বৈরুত, প্রকাশকাল-২০০১ইং, খ.১২ পৃ.১৩০।
৭ শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী, ফিকহুল বুয়ু', মাকতাবাতু মায়ারিফিল কুরআন, করাচি, খ.২ পৃ. ৬৬২।
৮ মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৩৬। আলইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১।
৯ শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী, ফিকহুল বুয়ু', খ.২ পৃ.৬৭০।
১০ এটি তখনি যখন দুটি কোম্পানির পণ্যে বিভিন্ন দিক থেকে তারতম্য হবে। যেমন: স্যামসাং মোবাইল ও সিম্ফনি মোবাইল। ফিকহুল বুয়ু, খ.২, পৃ.৬৭০।
১১ শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী, ফিকহুল বুয়ু', খ.২ পৃ.৬৭০।
📄 রিবাল ফযলের কিছু উদাহরণ
সমজাতীয় মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে
মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে উভয় মুদ্রা যদি একই জাতীয় ও শ্রেণিভুক্ত হয়, তাহলে লেনদেন সমানে সমান হতে হবে এবং উভয়পক্ষের হস্তগত হতে হবে। এজন্য পুরানো নোট বা ভাংতি টাকার অসম লেনদেন হারাম। ঈদের মৌসুমে মানুষজন 'সালামি' দেয়ার জন্য নতুন নোট কেনে, যেখানে পুরানো ১০৫/১১০ টাকার বিনিময়ে নতুন ১০০ টাকার নোট কেনাবেচা হয়। এই ব্যবসা হারাম। কিন্তু দুইটি ভিন্ন নোট যেমন ডলারের বিনিময়ে টাকা বা রুপির বিনিময়ে ইউরো ইত্যাদির লেনদেন করা যাবে।
ধানের বিনিময়ে ধান
আমাদের সমাজে শীতের সময় হরেক রকমের পিঠা তৈরি হয়। এ সময় পিঠার উৎসবে মেতে উঠে গ্রাম-বাংলার বধূরা। টাঙ্গাইল এলাকায় বিশেষ এক প্রকার ধান আছে যা 'চামারা ধান' নামে পরিচিত। এ ধানের পিঠা খুবই সুস্বাদু! এই ধানের চিড়াও বেশ সুস্বাদু! তাইতো কথিত আছে, 'ধানের মাঝে চামারা আর আত্মীয়ের মাঝে মামারা!!' যাই হোক, অনেক সময় দেখা যায় একজন ব্যক্তির কাছে চামারা ধান না থাকায় সে ব্রি-২৯ বা ব্রি-২৮ ধান দিয়ে চামারা ধান কেনে পিঠা খাওয়ার জন্য। যেমন: দেড় মন ব্রি-২৯ ধানের বিনিময়ে এক মন চামারা ধান। এই লেনদেনটা অবৈধ হবে। কারণ, সমজাতীয় বস্তুর কম-বেশি লেনদেন। এক্ষেত্রে শরঈ বিকল্প হলো- প্রথমে ব্রি-২৯ ধান টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে চামারা ধান ক্রয় করা। অথবা লেনদেনের সময়ই হিসেব করে নেয়া যে, ব্রি-২৯ এর ১ মন ধানের দাম ২০০০ টাকা এবং দেড় মন চামারা ধানের দাম ২০০০ টাকা, তাই এই ২০০০ টাকার বিপরীতে এই কেনাবেচাটা হলো।
লাউয়ের বিনিময়ে লাউ
আপনার খেতে আজকে ২ টা কচি লাউ আছে যেটার বাজার মূল্য ৮০ টাকা করে মোট ১৬০ টাকা। কিন্তু আপনার বাসায় আজকে অনেক মেহমান, সবাইকে খাওয়াতে আপনার দরকার ৪টা বড় লাউ। একটু পরেই দেখলেন বাসার সামনে দিয়ে পাশের গ্রামের রবিউল মুনশি লাউয়ের ঝাঁকা নিয়ে গঞ্জে যাচ্ছে। তাকে থামিয়ে তাঁর সাথে চুক্তি করলেন যে সে আপনাকে ৪টা বড় লাউ দিবে, বিনিময়ে আপনি তাকে ২টা কচি লাউ দিবেন। রবিউল বাজারদর জানে, সে রাজি হলো। এই যে আপনি ৪টা লাউ নিলেন ২টা লাউয়ের পরিবর্তে, এটা সম্পূর্ণ জায়েজ একটা কাজ। আপনার পরিমাপ করে ঠিকঠাক জানার দরকার নেই বা বাজারদর সমান হওয়ার কিছু নেই। সংখ্যায় কমবেশি হলেও দুই পক্ষ রাজি থাকলেই গণনীয় কোনো কিছু নগদে বিনিময় করা যাবে।
টীকা 'সমজাতীয়' হওয়ার অর্থ
কোনো কিছু অসমজাতীয় হয় তিন দিক থেকে। যথা:
এক. সত্তাগত বা বাস্তবতায় ভিন্ন হওয়া। যেমন: গম ও ধান অসমজাতীয়, এরা সত্ত্বাগতভাবেই আলাদা।
দুই. নাম এক হলেও মূল উৎস ভিন্ন হওয়া। যেমন: আঙুর থেকে তৈরি সিরকা ও খেজুর থেকে তৈরি সিরকা। গরুর গোশত ও খাসির গোশত। সরিষার তেল ও জয়তুনের তেল ইত্যাদি।
তিন. উদ্দেশ্যে ভিন্ন হওয়া। যেমন: ছাগলের পশম ও ভেড়ার লোম। এরা অসমজাতীয় দ্রব্য।
তবে ভালো-মন্দ গুণের দিক থেকে অভিন্ন হওয়াটা সমজাতীয় হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধক বা বাধা না। যেমন: দিনাজপুরের লিচু আর সাধারণ লিচু।
টীকা 'পরিমেয়' হওয়ার অর্থ
কোনো বস্তু পরিমেয় কি না তা বুঝার সহজ উপায় হলো সেটি যত খুশি তত পরিমাণ হুবহু মেপে নেয়া যায়। যেমন চাল। পক্ষান্তরে মুরগি, মাছ এগুলো খুশিমত পরিমাণ মেপে নিতে পারবেন না বরং গণনীয়। আমরা আসলে দাম জানার জন্য পরিমাপ করি। এজন্যই পরিমাণে কিছু কম-বেশি হলে সেটা ছাড় দেয়া হয়। কোনো বস্তু পরিমেয় হওয়ার অর্থ হলো তাতে রিবাল ফযল ও রিবান নাসা প্রয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
টিকাঃ
১২. শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী, ফিকহুল বুয়ু', মাকতাবাতু মায়ারিফিল কুরআন, করাচি, খ.২ পৃ.৬৬৭-৬৬৮। ইতরে হিদায়া, ফাতাহ মুহাম্মাদ লখনভী, মৃত-১৩২৭ হি., মাকতাবাতুল হারামাইন ঢাকা, প্রকাশকাল-২০১৪ ইং, পৃ.১৭১।
১৩. ফাতাহ মুহাম্মাদ লখনভী, মৃত ১৩২৭হি., ইতরে হিদায়াহ, মাকতাবাতুল হারামাইন, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০১৪ ইং, পৃ. ১৭২।
📄 রিবান নাসা
'আন্-নাসা' শব্দটির অর্থ হলো বিলম্বিত করা, দেরি করানো: দূরে রাখা, পিছিয়ে দেওয়া। যেহেতু এই রিবা বাকিতে লেনদেন করার কারণে পাওয়া যায় তাই একে রিবান-নাসা বলা হয়।