📘 সুদ হারাম কর্জে হাসানা একটি সমাধান > 📄 রিবাল কর্জ

📄 রিবাল কর্জ


'কর্জ' শব্দটি আরবি (القرض) (আল-কর্জ)। এর মূল অর্থ হল- 'القطع' কাটা বা কর্তন করা। যেহেতু ঋণদাতা তার সম্পদের একটি অংশ কেটে ঋণগ্রহীতাকে প্রদান করে থাকে তাই ঋণকে 'قرض' (করদ্/কুর্দ/কর্জ) বলা হয়।

রিবাল কর্জে মূল ৩টি বিষয় লক্ষ করা হয় : ১. ঋণ-সংক্রান্ত লেনদেন হবে ২. যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদ ঋণ দেয়া হয়েছে, সেই পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ-সম্পদ নেয়ার জন্য শর্ত দেয়া হবে ৩. মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আরো অতিরিক্ত অর্থ-সম্পদ নেয়ার শর্ত দেয়া হবে এই রিবাল কর্জকে দুইভাবে পাওয়া যেতে পারে :

এক. অতিরিক্ত প্রদানের শর্তে ঋণ দেয়া।
পলাশপুরের ছোটন ভাই তার চাচাতো ভাই টুকুনকে ১০ হাজার টাকা ১ বছরের জন্য এই শর্তে ঋণ দিল যে মেয়াদ শেষে টুকুন ৫ শতাংশ অতিরিক্ত (৫০০ টাকা) ফেরত দেবে। এই ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ বা ৫০০ টাকা সুদ হবে। ছোটন ভাই যদি টাকা ধার না দিয়ে টুকুনকে ২০ কেজি চাল এই শর্তে ধার দিত যে, ১ বছর পর ২৫ কেজি চাল ফেরত দিতে হবে তাহলেও অতিরিক্ত পাঁচ কেজি চাল হবে সুদ বা রিবাল কর্জ।

দুই. ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণের বিনিময়ে কোনো উপকার নেয়া।
ছোটন তাঁর চাচাতো ভাই টুকুনকে ঋণ দেয়ার পর বলে বসল যে, ভাই তোর কাছ থেকে এখন থেকে সব মুদি জিনিসপত্র কিনব, কিন্তু আমাকে কেনা মূল্যে দিবি। ঋণ দেয়ার বিনিময়ে এই যে ডিস্কাউন্টে পণ্য চেয়ে বসল ছোটন, এটাও রিবাল কর্জের অন্তর্ভুক্ত। ঋণ দেয়ার কারণে কোনো প্রকার উপকার নেয়া যাবে না।

আড়ত বাণিজ্যে এই রিবা আমরা দেখি। অনেক সময় দেখা যায়, কৃষক বা ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত পুঁজি বা অর্থ থাকে না। তখন আড়ত ব্যবসায়ীরা তাদেরকে অর্থ প্রদান করে কর্জ হিসাবে। তবে শর্ত করে, পণ্য তাদের কাছেই বিক্রি করতে হবে। এটি বৈধ নয়। কারণ তাতে ঋণ প্রদান করে অতিরিক্ত সুবিধা নেয়া হচ্ছে।

এক কথায় ঋণের বিনিময়ে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতা থেকে যে-কোনভাবে উপকার নেয়ার শর্ত 'রিবাল কর্জ' বলে গণ্য হবে। এই ব্যাপারে ফাযালা বিন উবাইদ রা. বলেন, “যেই কর্জ কোনো মুনাফা নিয়ে আসে তা রিবার প্রকারসমূহের একটি প্রকার।" - আস্-সুনানুল কুবরা, খ.৫ পৃ.৭৪১, হাদিস নং- ১০৯৩৩।

📘 সুদ হারাম কর্জে হাসানা একটি সমাধান > 📄 রিবাদ-দাইন

📄 রিবাদ-দাইন


دین (দাইন) শব্দটির শাব্দিক অর্থ- ঋণ দেয়া, ঋণ নেয়া। কারো থেকে কোনো পণ্যের নির্ধারিত বকেয়া মূল্য বা নির্ধারিত ভাড়া বা নির্ধারিত বেতন ইত্যাদি আর্থিক সুনির্দিষ্ট দায় পরিশোধের সময় হলে অতিরিক্ত প্রদানের শর্তে বা মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়ার শর্তে অতিরিক্ত প্রদান করাই রিবাদ দাইন। ফকিহগণের আলোচনায় ৩ ধরনের রিবাদ-দাইনের কথা উঠে এসেছে।

ক. পণ্যের বকেয়া মূল্যে অতিরিক্ত নেয়া
এই প্রকারের রিবা হলো যে-কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট বকেয়া মূল্যের উপর মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত প্রদান করার শর্ত দেয়া। যেমন : আলম মিয়ার দোকান থেকে সিরাজ ভাই নিয়মিত কেনাকাটা করেন। এই মাসে সিরাজ ভাইয়ের বেতন বাকি পড়ায় সে চুক্তি করল যে, বাকিতে মোট ২ হাজার টাকার সদাই করে ৩০ দিন পর আলম ভাইকে পরিশোধ করবেন। কিন্তু পরের মাসেও সিরাজ ভাইয়ের বেতন দেরি করা হলো। তাই তিনি আলম ভাইয়ের কাছে আরও ১০ দিন অতিরিক্ত সময় চাইল। আলম ভাই এই অতিরিক্ত ১০ দিনের জন্য ২ হাজারের সাথে আরো ১০০ টাকা অতিরিক্ত দাবি করলেন। এই অতিরিক্ত সময়ের জন্য চাওয়া অতিরিক্ত ১০০ টাকাটা হচ্ছে রিবাদ-দাইন, যা হারাম।

খ. পণ্যের বকেয়া মূল্যে ছাড় দেয়া
পণ্যের নির্দিষ্ট বকেয়া মূল্য তাড়াতাড়ি পরিশোধ করার শর্তে ছাড় প্রদান করা। যেমন: কোনো কোম্পানি ৩ হাজার টাকার ১২টা কিস্তিতে ফ্রিজ বিক্রি করল। কিন্তু মূল চুক্তিতে শর্ত দেওয়া থাকল যে নির্ধারিত সময়ের আগেই কিস্তিগুলো দিয়ে দিলে ৫% রেয়াত (ছাড়/ডিসকাউন্ট) দেয়া হবে। এই শর্ত দিয়ে যে ছাড় দেয়া হলো, এটাও রিবাদ-দাইনের ভিতরে পড়বে।

গ. যে-কোনো আর্থিক দায়ের বিপরীতে মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত গ্রহণ
পণ্যমূল্যের মতো অন্যান্য আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রেও মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত গ্রহণ করা যাবে না। যেমন : বকেয়া ভাড়া, বকেয়া বেতন ইত্যাদি। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, “এটা দায় পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে (পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মতোই) অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের নামান্তর। যা নিঃসন্দেহে রিবা।” -মুয়াত্তা মালেক, পৃ.২৭৯।

উদাহরণ: সিরাজ ভাই বিয়ে করেছেন ২ বছর হলো। তিনি বিয়েতে মোহরানা ধরেছিলেন ৫ লাখ টাকা। বিয়ের সময় তিনি কথা দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী শম্পাকে পুরো দেনমোহর ২ বছরের মধ্যে শোধ করে দিবেন। কিন্তু তিনি ২ বছরে শোধ করলেন মাত্র ২ লাখ টাকা। এবার ২ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর শম্পার কাছে আরো সময় চাইলেন দেনমোহর পরিশোধের জন্য। শম্পা শর্ত জুড়ে দিল যে, সিরাজ ভাই যেন তাকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা দেয়। এই অতিরিক্ত সময়ের সাথে শর্ত করে দেয়া টাকাটা রিবাদ-দাইন।

টিকাঃ
৪ ইসলামি পরিভাষায় একে 'যা ওয়া তাআজ্জাল' (وتعجل ضع) বলে। ইংরেজিতে Cut Off and Pay Now.

📘 সুদ হারাম কর্জে হাসানা একটি সমাধান > 📄 কয়েকটা ব্যতিক্রম

📄 কয়েকটা ব্যতিক্রম


উপরের আলম ভাইয়ের গ্রাম শফিপুরের রেওয়াজ হলো ১লা বৈশাখে হালখাতা খোলা। গ্রামের সবাই কমবেশি বাকিতে কেনাকাটা করে আর ব্যবসায়ীরা এই সময়ের অপেক্ষায় থাকে যে, যত টাকা পারা যায় এই দিনে উদ্ধার করা। দেখা গেল, আলম ভাইদের মতো বিভিন্ন মুদি, ঔষধ আর মনোহারি দোকানের মালিকেরা ছাড় দিয়ে হলেও টাকা আদায় করার চেষ্টা করে। তারা ৯০% বা ৯৫% বাকি টাকা পেলেই খুশি থাকে, বাকি ৫% বা ১০% ছেড়ে দেয়। সবাই বড় অঙ্কের টাকা আটকে গেলে সেই টাকা উদ্ধারে হালখাতার দিন কত টাকা দিলে কত টাকা ছাড় পাবে সেই নিয়ে দরকষাকষি করে আর সেই বোঝাপড়া অনুযায়ী যারা ঋণগ্রস্ত গ্রাহকেরা বিভিন্নভাবে টাকা জোগাড় করে হালখাতার দিন শোধ করে কিছু ছাড় পায়।

এই যে বকেয়া টাকা ফেরত দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়, এটা রিবাদ-দাইন মনে হলেও এটি আসলে রিবাদ-দাইন হচ্ছে না, কারণ এক্ষেত্রে বাকিতে পণ্য নেয়ার সময় কত টাকা ছাড় দেয়া হবে তা নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। যদি বাকিতে পণ্য নেয়ার সময়ই এমন করা হয়, তাহলে সেটা নিষিদ্ধ।

করোনার সময় অনেক ব্যবসা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকে, অনেকেই চাকরি হারান। এই সময়ে অনেকের ক্রেডিট কার্ডের টাকা বাকি পড়ে। ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয় বাকি টাকা উদ্ধারে বিশেষ ছাড় দিবে। তারা ঘোষণা করে দেয়, যাদের কাছে পাওনা ৫০ হাজার টাকার নিচে, তাদের কেউ পাওনা টাকার ৫০% শোধ করলে বাকি টাকা মাফ। অর্থাৎ মোট ৫০ হাজার টাকা বাকি থাকলে, ২৫ হাজার টাকা শোধ করে দিলে বাকি ২৫ হাজার টাকা মাফ। ব্যাংক এমন সিদ্ধান্ত নিলে এটা রিবাদ-দাইন হবে না, এরকম চুক্তি গ্রাহকের জন্য সাদা চোখে রিবাদ-দাইন মনে হলেও আসলে শুরুতেই গ্রাহক এই চুক্তির আওতায় টাকা নেয়নি। পরে বিশেষ অবস্থায় এই অফার আসায় এটা আর রিবাদ-দাইন হচ্ছে না।

📘 সুদ হারাম কর্জে হাসানা একটি সমাধান > 📄 রিবাল বুয়ূ (কেনাবেচা সম্পর্কিত সুদ)

📄 রিবাল বুয়ূ (কেনাবেচা সম্পর্কিত সুদ)


সভ্যতার শুরুতে বর্তমানের মতো ধাতব মুদ্রা বা কাগজের অর্থের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মুদ্রার ইতিহাসে একে বলা হয় 'বিনিময় প্রথা', আরবিতে বলে 'ত্বরিকুল মুকায়াদাহ্' আর ইংরেজিতে বলে 'Barter System' । তৎকালীন আরবেও এমন কিছু লেনদেনের প্রচলন ছিল। তারা বহুল প্রচলিত কিছু দ্রব্য যেমন- গম, যব, খেজুর ইত্যাদি ও সরাসরি স্বর্ণ বা রূপাকে (দিরহাম-দিনার) বিনিময় মাধ্যম (Medium of Exchange) হিসেবে ব্যবহার করত।

মানুষ যদি এক দিরহাম দুই দিরহামের বিনিময়ে বা এক কেজি গমকে দেড় কেজি গমের বিনিময়ে নগদ কেনাবেচায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তাহলে এ চর্চা তাদেরকে মূলত নির্ধারিত ঋণ বা দায়ের বিপরীতে সমজাতীয় মুদ্রার অতিরিক্ত গ্রহণে অভ্যস্ত করে তুলতে পারে। মানুষ বলতে পারে, এক কেজি গমের বিনিময়ে যদি দেড় কেজি গমের লেনদেন করা যায়, তাহলে একশ টাকা দায় বা ঋণের বিপরীতে একশত পাঁচ টাকার লেনদেনও করা যাবে। কারণ, দুটি ক্ষেত্রেই সমজাতীয় বস্তুর পারস্পরিক লেনদেনে অতিরিক্ত বিনিময় হচ্ছে। অথচ এটি স্পষ্ট রিবান-নাসিয়াহ। যা কুরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা (নগদে) এক দিনার দুই দিনারের বিনিময়ে, এক দিরহাম দুই দিরহামের বিনিময়ে এক সা' দুই সা'য়ের বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় কর না। কেননা আমি তোমাদের উপর রিবার ভয় করি।"

উবাদা বিন সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "স্বর্ণের সাথে স্বর্ণের লেনদেন সমান সমান হবে, রুপার সাথে রুপার লেনদেন সমান সমান হবে, খেজুরের সাথে খেজুরের লেনদেন সমান সমান হবে, গমের সাথে গমের লেনদেন সমান সমান হবে, লবণের সাথে লবণের লেনদেন সমান সমান হবে, যবের সাথে যবের লেনদেন সমান সমান হবে। উভয় দিকে সমান সমান লেনদেন না করে যে কোনো একদিকে বৃদ্ধি করা হলে সেটা রিবা হবে। আর স্বর্ণের সাথে রুপার লেনদেন কম-বেশি করে যেভাবে খুশি সেভাবে করতে পার। তবে নগদে হতে হবে। তেমনি খেজুরের সাথে গমের লেনদেন যেভাবে খুশি কম-বেশি করতে পার। তবে নগদে হতে হবে। তদ্‌রূপ খেজুরের সাথে যবের লেনদেন যেভাবে খুশি কম-বেশি করে কর। তবে নগদে হতে হবে।"

রিবাল বুয়ু' বা কেনাবেচা সম্পর্কিত সুদ দুই প্রকার। যথা: রিবাল ফযল ও রিবান নাসা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00