📄 আল্লাহ তায়ালার দয়া অন্বেষণ
পবিত্র আমল বা কর্ম ব্যতিরেকে আল্লাহ তায়ালার দয়া ও রহমতের প্রাচুর্য আসবে না। নেক আমল করার মাধ্যমেই আপনি আল্লাহ তায়ালার দয়া পাওয়ার উপযুক্ত হতে যা ভবিষ্যতে আপনাকে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও জান্নাত হাসিলে সাহায্য করবে। আল্লাহ তায়ালাকেই ডাকো, ভয় সহকারে এবং আশান্বিত হয়ে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার রহমত নেক চরিত্রের লোকদের অতি নিকটে (সুরা আ'রাফ, ৭: ৫৬)।
আল্লাহ তায়ালার রসুল সা. বলেছেন, তোমাদের কেউই শুধুমাত্র তার আমল এর গুণে নিজেকে রক্ষা (দোজখের আগুন থেকে) করতে পারবে না। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ তায়ালা রসুল এমনকি আপনিও? রসুল সা. উত্তরে বললেন: হ্যাঁ, এমনকি আমিও, যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা তাঁর দয়ার গুণে আমাকে ক্ষমা করবেন। কাজেই তোমরা যথাযথভাবে, আন্তরিকতার সাথে ও মধ্যমপন্থা অবলম্বনে সকাল, দুপুর, রাতে সৎকাজ করো। সবসময় মধ্যমপন্থা অনুসরণ করো। এভাবেই তোমরা সঠিক লক্ষ্যপানে পৌঁছতে পারবে (বুখারি, মুসলিম)।
সব সময় মনে রাখবেন যে আল্লাহ তায়ালা প্রতিশোধপ্রবণ কোনো প্রভু নন যে, সবসময় শান্তি প্রদানে উৎসাহী বরং আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন দয়া ও ক্ষমার আঁধার। তিনি নিজেই বলেছেন:
আমার রহমত সকল জিনিসকে পরিব্যাপ্ত করে আছে (সুরা আ'রাফ, ৭: ১৫৬)।
তিনি কীভাবে আমলনামায় আমাদের ভালো-মন্দ কাজের হিসাব লেখেন সে প্রসঙ্গে হাদিসে বলা হয়েছে: আল্লাহ তায়ালা এভাবেই ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব রাখেন। যদি কেউ কোনো ভালো কাজের নিয়ত করে কিন্তু অবশেষে সেটা যদি করতে না পারে, তবে আল্লাহ তায়ালা তার আমলনামায় একটি ভালো কাজ হিসেবে লিখে রাখেন। যদি সে একটি ভালো কাজের নিয়ত করে এবং অবশেষে কাজটি করে ফেলে তখন আল্লাহ তায়ালা তা দশ থেকে সাত'শ টি ভালো কাজ হিসেবে লিখে রাখেন। যদি কেউ একটি খারাপ কাজ করার পরিকল্পনা করে কিন্তু কাজটি না করে তবে আল্লাহ তায়ালা তার আমলনামায় একটি ভালো কাজের রেকর্ড রাখেন। যদি কেউ একটি খারাপ কাজের ইচ্ছা করে এবং সেটা শেষপর্যন্ত করে তাহলে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালা তার আমলনামায় একটি খারাপ কাজের রেকর্ড রাখেন (বুখারি, মুসলিম)।
কাজেই যতক্ষণ আমাদের কাজ ঠিক থাকবে এবং আমরা তাঁর দয়া অন্বেষণ করবো ততক্ষণ তাঁর দয়া আমাদের প্রতি থাকবে। রসুল সা. বলেছেন: দয়ার একশ ভাগ আছে; তার মধ্যে মাত্র একভাগ আল্লাহ তায়ালা মানুষ, জ্বিন, পশু- পাখি এবং কীট-পতঙ্গের মাঝে বিতরণ করেছেন। এ জন্যই তারা পরস্পরের প্রতি দয়ালু, এ জন্যই বন্য প্রাণীরা তাদের বাচ্চদের হত্যা করে না। দয়ার বাকি নিরানব্বই ভাগ আল্লাহ তায়ালা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, যা তিনি তাঁর বান্দাদের হাশরের ময়দানে দেখাবেন (বুখারি, মুসলিম)।
📄 আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা অনুসন্ধান
আল্লাহ তায়ালার পথে জীবন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও এমন কোনো গ্যারান্টি নেই যে আমরা ভুল করবো না বা আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে যাবো না। হাদিসে বলা হয়েছে; সব আদম সন্তানই পাপী, কিন্তু তাদের মধ্যে উত্তম তারাই যারা অনুশোচনা করে (তিরমিজি)। ইমাম বুখারি উদ্ধৃত করেছেন যে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা রসুল সা. যিনি ছিলেন সকল পাপের ঊর্ধ্বে তিনি প্রতিদিন ৭০ বার আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাইতেন। কাজেই আমাদের প্রতিনিয়ত প্রতিটি ক্ষুদ্র বা বড় পাপের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে মাফ চাইতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
তোমরা আল্লাহ তায়ালার নিকট ক্ষমা চাও। অতঃপর তাঁর দিকেই অনুশোচনাসহ ফিরে এসো। তিনি তোমাদের জন্য আকাশের দুয়ার খুলে দেবেন এবং তোমাদের শক্তি ও ক্ষমতা আরো বাড়িয়ে দিবেন (সুরা হ্রদ, ১১:৫২)।
এভাবে প্রতিনিয়ত আল্লাহ তায়ালার নিকট ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে আমাদের হৃদয় ও আত্মা বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ থাকে, রসুল সা. এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যখন কোনো মুমিন পাপ করে তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। কিন্তু যদি সে অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে মাফ চায় তবে তার হৃদয় আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু যদি সে (অনুতাপবোধ ও ক্ষমা চাওয়া ছাড়া) একের পর এক পাপ করতে থাকে তবে সেই দাগ বাড়তে থাকে এবং একসময় পুরো হৃদয় ঢেকে ফেলে (আহমাদ, তিরমিজি)।
আল্লাহ তায়ালা এই দাগের কথা কুরআনেও বর্ণিত হয়েছে:
এই লোকদের দিলের উপর তাদের পাপ কাজের মরিচা জমে গিয়েছে (সুরা মুতাফফিফিন, ৮৩: ১৪)।
আমাদের ভুল বা অন্যায় যত বড়ই হোক আল্লাহ তায়ালা তার চাইতেও বড় দয়ালু মন নিয়ে আমাদের ক্ষমা করার জন্য আমাদের অনুতাপ প্রত্যাশা করেন। কাজেই কখনও আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাইতে দেরি বা দ্বিধা করবেন না, এমনকি যে পাপ পুনঃপুন হয় তার জন্যও।
হে আমার বান্দাগণ যারা নিজের নফসের উপর বাড়াবাড়ি করেছো, তোমরা আল্লাহ তায়ালার রহমত হতে নিরাশ হয়ে যেয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল ও দয়াবান (সুরা জুমার, ৩৯: ৫৩)।
কাজেই যতক্ষণ ক্ষমা লাভের আশা আছে ততক্ষণ মানুষের ফিরে আসার চেষ্টা ও মুক্তির উপায় থাকছে। তবে স্মরণ রাখবেন যে উত্তম অনুশোচনা মানে হচ্ছে একই পাপে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় শপথ এবং ভবিষ্যতে ভালো করবার অঙ্গীকার। আল্লাহ তায়ালা রসুল সা. বলেছেন, যেখানেই থাক সব সময় আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে সচেতন থাক এবং তাঁকে ভয় করো। মন্দ কাজের সাথে সাথে ভালো কাজ করো যা মন্দ কাজকে ধুয়ে ফেলবে এবং মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করো (তিরমিজি)।
📄 আত্মসমালোচনা
রসুল সা. এহতেসাব বা আত্মসমালোচনার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলেছেন। প্রত্যেকে তার দিন শুরু করে এবং তার আত্মাকে ব্যবসায় খাটায়। হয় সেটাকে মুক্ত করে অথবা এটাকে ধ্বংস করে (মুসলিম)। উমর ইবনে খাত্তাব রা. বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার কাছে হিসেব দেওয়ার আগে তুমি নিজের হিসেব নিয়ে নাও। এভাবে চূড়ান্ত হিসেব নিকেশের জন্য তৈরি হও।
প্রায় প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর এবং বিশেষভাবে ভোরে যখন আপনি একা এবং নিভৃতে আপনি আপনার হৃদয়ের কম্পনবোধ করেন তখনই আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চান। ফজর নামাজের সময়টি নিজেকে মূল্যায়ন করার এবং আগত দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার এক উত্তম সময়।
ইমাম তিরমিজি উদ্ধৃত করেছেন যে, রসুল সা. বলেছেন, হাশরের ময়দানে কোনো আদম সন্তান এক পা-ও নড়তে পারবে না যতক্ষণ না সে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেয় এই পাঁচটি প্রশ্ন হচ্ছে: ১. কোন চিন্তা এবং কাজে সে তার সময় ব্যয় করেছে? ২.' তার মানসিক এবং শারীরিক শক্তি কোন বিষয়ে ব্যয় করেছে? ৩. কোন পথে সে তার সম্পদ আয় করেছে? ৪. কোন পথে সে তার সম্পদ ব্যয় করেছে? ৫. সে যা হক বলে জানতো সেই অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে?
এই পাঁচটি প্রশ্ন প্রতিদিন আপনি আত্মসমালোচনার সময় নিজেকে করতে পারেন। এসব প্রশ্নের মাধ্যমে আমরা নিজেদের নৈতিক উন্নয়ন, খোদা সচেতনতা এবং তাঁর পথে কাজ করার ইচ্ছাশক্তি বাড়াতে পারি। এই আত্ম-বিশেষণ কর্মসূচি যদি আপনি নিয়মিত করেন তবে ধীরে ধীরে আপনি নিজেকে আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন।
📄 মৃত্যুভয় জয় করা
গদিও হাশরের দিনটিকে ভয় করতে হবে, তবে মনে রাখতে হবে যে এটা আমাদের আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভের দিনও বটে। হজরত বিবি আয়েশা রা. উল্লেখ করেছেন যে রসুল সা. বলেছেন যে আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভ পছন্দ করে আল্লাহ তায়ালা-ও তাঁর সাক্ষাৎ পেতে পছন্দ করেন। আর যে আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে আল্লাহ তায়ালাও তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন। তখন বিবি আয়েশা রা. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ তায়ালা রসুল সা. এটা কি মৃত্যুকে অপছন্দ করার কারণে হয়, কারণ আমরা সবাই মৃত্যুকে অপছন্দ করি। রসুল সা. বললেন, ঠিক তা নয়, বরং এটা হচ্ছে এই রকম যে, যখন কোনো ইমানদার বান্দাহ আল্লাহ তায়ালার দয়া, তাঁর তুষ্টি এবং তাঁর বেহেশতের সুসংবাদ শোনে তখন সে আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাতের জন্য আকুল হয়। আর আল্লাহ তায়ালাও তাঁর সাক্ষাৎ পেতে চান। অন্যদিকে যখন কোনো কাফের তাঁর শাস্তি এবং তাঁর অসন্তুষ্টির কথা শোনে তখন সে আল্লাহ তায়ালার দেখা পেতে অপছন্দ করে, আল্লাহ তায়ালাও তার দেখা পেতে অপছন্দ করেন (মুসলিম)।
কাজেই, আমাদের সব নামাজে এবং দোয়ায় আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ-সান্নিধ্য লাভের আগ্রহ প্রকাশিত হওয়া উচিত। রসুল সা. সবসময় এই দোয়া পড়তেন, হে আল্লাহ তায়ালা আমি আপনার কাছে পরকালে শান্তিময় জীবনের জন্য আবেদন করছি; আমি আপনার কাছে আপনার বরকতপূর্ণ মুখপানে তাকাবার সুযোগ লাভের এবং আপনার সাক্ষাৎ লাভের জন্য আবেদন করছি; যে কোনো কষ্ট বা এমন পরীক্ষা যা বিপথে নিয়ে যায় তা থেকে পানাহ চাচ্ছি; হে আল্লাহ তায়ালা আমাকে ইমানের বলে বলীয়ান করুন; আমাকে সত্য পথ প্রদর্শন করুন এবং সত্যপথে চালিত করুন (নাসায়ি)।
এভাবে আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভে আমাদের আগ্রহ আমাদের মন থেকে মৃত্যুভয় দূর করবে, যেই ভয় একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতা। এমনকি নবি মুসা আ. তাঁর লাঠি যখন আল্লাহ তায়ালার আদেশে সাপ হয়ে গেল তা দেখে ভয় পেয়েছিলেন (সুরা ত্বহা, ২০ : ১৭-২৪)।
এই ভয়কে জয় করা যায় জিকির, সৎকাজ এবং হাশরের ময়দানে আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি মনে রাখার মাধ্যমে।
যে লোক আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাতের জন্য আশান্বিত হবে সে যেন নেক আমল করে এবং বন্দেগি ও দাসত্বের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার সাথে অপর কাউকে শরিক বানিয়ে না নেয় (সুরা কাহাফ, ১৮: ১১০)।