📄 মালিক ও শ্রমিকের পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
একজন উদ্যোক্তা (মালিক) হিসেবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আপনার অধীনস্থ কর্মচারীর প্রতি সযত্ন হওয়া; তার জন্য উত্তম কাজের পরিবেশ তৈরি করা; এটা নিশ্চিত করা যে তাদের সকল কাজের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করা হচ্ছে: শ্রমিকের ঘام শুকাবার আগেই তার পাওনা পরিশোধ করো (ইবনে মাজাহ)।
রসুল সা. আরও বলেছেন যে, কেয়ামতের দিন তিনি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন যে তার অধীনস্থ কর্মচারীর ন্যায্য বেতন ঠিকমতো পরিশোধ করেনি।
অন্যদিকে একজন কর্মচারী/শ্রমিক হিসেবে আপনি আপনার উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে পালন করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন যে তার কাজ নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করে (বায়হাকি)। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
তোমরা কাজ (আমল) করো, আল্লাহ তায়ালা, তাঁর রসুল এবং মুমিনগণ সকলেই তোমার কাজের প্রতি লক্ষ্য করবেন (সুরা তাওবা, ৯: ১০৫)।
মনে রাখবেন সেই খাবারই সর্বশ্রেষ্ঠ যা আপনার হালাল শ্রমে অর্জিত। কেউই তার নিজের হাতে অর্জিত খাবারের চাইতে উত্তম কিছু খেতে পারে না (বুখারি)।
📄 প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
মুসলিম-অমুসিলম নির্বিশেষে আপনার প্রতিবেশীদের আপনার উপর হক আছে। রসুল সা. বলেছেন, সেই ব্যক্তি ইমানদার নয় যে প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেটভরে খেয়ে ঘুমুতে গেল (বায়হাকি)। এভাবেই আপনার ইমানের মান এবং আখেরাতে আপনার ভাগ্য নির্ধারিত হবে আপনার প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে। আবু হুরাইরা রা. একটি হাদিসে বলেছেন যে, একবার এক ব্যক্তি রসুল সা. কে বললেন: হে আল্লাহ তায়ালার রসুল অমুক ব্যক্তির ভালো নামাজী এবং দানশীল হওয়ার ব্যাপারে সুনাম আছে অথচ সে প্রায়ই প্রতিবেশীকে কটু কথা বলে কষ্ট দিয়ে থাকে। তখন রসুল সা. বললেন যে, সেই ব্যক্তি দোজখে যাবে। অতঃপর ওই ব্যক্তি আরও বললেন, হে আল্লাহ তায়ালার রসুল, আর এক ব্যক্তি ন্যূনতম পরিমাণ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে ও দান করে কিন্তু কখনও প্রতিবেশীকে কটু কথা বলে না তখন রসুল সা. বললেন যে সেই ব্যক্তি বেহেস্তে যাবে (আহমাদ, বায়হাকী)।
কুরআনে প্রতিবেশীর এক বিশদ তালিকা দেওয়া হয়েছে (সুরা নিসা, ৪: ৩৬-৩৭)।
এর মধ্যে এক জাতীয় প্রতিবেশী হচ্ছে আপনার আত্মীয়। আর এক জাতীয় প্রতিবেশী হচ্ছেন অনাত্মীয় প্রতিবেশী। তৃতীয় আর এক রকম প্রতিবেশী হচ্ছেন যারা চলা ফেরার সময় সফর সঙ্গী, যদি তা মাত্র কয়েক মিনিটের জন্যও হয়। এই তৃতীয় ধরনের প্রতিবেশীর মধ্যে অনেক মানুষই অন্তর্ভুক্ত। যখন আপনি ট্যাক্সি, বাস, ট্রেন অথবা বিমানে ভ্রমণ করেন তখন আপনার পাশের যাত্রী আপনার প্রতিবেশী। যখন আপনি অফিসে কাজ করেন তখন আপনার সহকর্মী আপনার প্রতিবেশী। যখন আপনি স্কুল-কলেজে পড়েন তখন আপনার সহপাঠী আপনার প্রতিবেশী। এক সাহাবির প্রশ্নের উত্তরে রসুল সা. প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বের এক বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। যদি তোমার প্রতিবেশী তোমার কাছে ঋণ চায় তবে তুমি তাকে ঋণ দাও; যদি সে তোমার সাহায্য চায় তবে তুমি তাকে সাহায্য করো; যদি সে অসুস্থ হয় তবে তুমি তাকে দেখতে যাও; যদি সে অভাবে পড়ে তবে তুমি তার অভাব পূরণে যথাসাধ্যে সাহায্য করো; যদি তার কোনো ভালো খবর আসে বা কোনো সাফল্য লাভ করে তবে তুমি তাকে মোবারকবাদ জানাও; যদি তার উপর কোনো আপদ-বিপদ আসে তবে তুমি তাকে সান্ত্বনা দাও; তোমার প্রতিবেশী মারা গেলে তুমি তার জানাজায় অংশ নাও; তোমার বাড়ির প্রাচীর এমন উঁচু করবে না যে তা প্রতিবেশীর বাড়িতে বায়ুপ্রবাহে বাধা হয়, এমনকি যদিও সে মত দেয়; তোমার বাড়িতে তৈরি করা সুস্বাদু ও দামি খাবারের ঘ্রাণ দিয়ে তাকে বিরক্ত বিব্রত করো না যদি না তার জন্য কিছু পাঠাও; যদি তাকে পাঠাতে না পারো তবে গোপনে খাও; খেয়াল রেখো, তোমার সন্তানেরা ভালো খাবার খেতে খেতে যেন প্রতিবেশীর বাড়ি না যায়, যেন তার সন্তানেরা দুঃখ না পায় (তাবারানি)।
আপনার প্রতিবেশীর জীবন, সম্মান-মর্যাদা এবং সম্পদ রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব। এর কোনোটির লঙ্ঘন আপনার জন্য হারাম। তার জীবন অমূল্য সম্পদ। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কাউকে হত্যা ইসলামে কঠোর অপরাধ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করবে তাকে চিরকাল জাহান্নামে থাকতে হবে। অবশ্য দুর্ঘটনাবশত মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ক্ষমা পেতে পারে।
মনে রাখবেন একজন অমুসলিমের জীবন একজন মুসলিমের জীবনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। রসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি (মুসলিম রাষ্ট্রের জিম্মাভুক্ত) কোনো অমুসলিমকে হত্যা করবে সে কখনও জান্নাতের সুবাস পাবে না এমনকি যদিও তা ৪০ বছরের দূরত্বে গিয়ে পৌঁছে তবুও (বুখারি, মুসলিম)।
কাজেই অমুসলিমদের সম্পদ, মর্যাদা আর জীবন রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবাই সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সমান দাবিদার। এটা আমাদের জন্য বর্তমান সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে আমরা এখন বহুধর্ম এবং বহু সংস্কৃতি বিশিষ্ট সমাজে বাস করছি এবং এক বিশাল সংখ্যক মুসলিম এর মাঝে এ বিষয়ে ভ্রান্তধারণা রয়েছে। রসুল সা. তাঁর জীবদ্দশায় মুসলিম সমাজের অনেক দারিদ্র্য আর অসুবিধার মাঝেও অমুসলিমদের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখতেন।
📄 জীবজন্তুর অধিকার
জীব-জানোয়ারেরও অধিকার আছে, কারণ এরা সবাই আল্লাহ তায়ালার পরিবারভুক্ত। সাহল ইবনে আমর বলেছেন: একবার রসুল সা. পথিমধ্যে একটি উট দেখলেন খাদ্যাভাবে যার পেট দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। তখন তিনি বললেন, যেসব পশু-পাখি কথা বলতে পারে না তাদের বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো, তারা যখন সুস্থ থাকে তখনই তাদের উপর চড়ো এবং সুস্থ অবস্থায়ই তাকে ভক্ষণ করো (আবু দাউদ)।
একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বলা হয়েছে যে একজন মহিলা দোজখে গিয়েছিলেন একটি বিড়াল হত্যার জন্য; তিনি সেটিকে বেঁধে রেখেছিলেন যাতে তা অনাহারে মারা যায়; তিনি সেটিকে কিছু খেতে বা পান করতে দেননি; সেটিকে মুক্ত করে দেননি যাতে সে নিজের আহার জোগাড় করে খেতে পারে (বুখারি, মুসলিম)। রসুল সা. আরও বলেছেন, এক বারবণিতার মধ্যেও দয়ার মতো গুণ ছিল! তিনি দেখলেন একটি কুয়ার কাছে একটি কুকুর তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছে। তিনি তার চামড়ার মোজা তার মাথার স্কার্ফের সাথে বেঁধে তাতে করে কুকুরটির জন্য পানি এনে সেটিকে পান করালেন। এই কাজের জন্য তার অপরাধ মাফ করে দেওয়া হলো। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে রসুল, আমরা কি জীবজন্তর প্রতি সদয় হওয়ার জন্যও সওয়াব পুরস্কৃত হবে? জবাবে রসুল সা. বললেন: যে কোনো জীবিত প্রাণীর সেবার জন্যই পুরস্কার পাওয়া যাবে (বুখারি, মুসলিম)।
📄 সারসংক্ষেপ
সকল সৃষ্টজীব আল্লাহ তায়ালার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা তাদের ভালাবাসেন যারা তাঁর পরিবারের সদস্যদের দয়া ও সেবা করেন। অন্যের প্রতি মামাদের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে, ব্যক্তির হক নষ্ট করার কোনো ক্ষমা নেই।
আপনার নিজের প্রয়োজন পূরণের পর আপনার প্রথম দায়িত্ব আপনার পরিবারের প্রতি। বস্তুত আল্লাহ তায়ালার পর আপনার উপর সবচাইতে বড় দায়িত্ব আপনার পিতা-মাতার প্রতি। আপনার স্ত্রী/স্বামীর প্রতি আপনার দায়িত্ব পূরণ করুন এবং আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে আপনার সন্তানদের যত্ন নিন। আপনার পার্শ্ববর্তী মুসলিমের প্রতি দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে মনে রাখবেন যে, ইমানের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভালোবাসা।
উদ্যোক্তা (মালিক) হিসেবে সব সময় মনে রাখবেন যে আপনার অধীনস্থ কর্মচারীর উপর আপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে কর্মচারী (শ্রমিক) হিসেবেও আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আপনার কাজ দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে করা।
আখেরাতে আপনার ভাগ্য আরও নির্ধারিত হবে এটার ভিত্তিতে যে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে আপনার প্রতিবেশীর উপর দায়িত্ব আপনি কীভাবে পালন করেছেন। রসুল সা. অমুসলিমদের প্রয়োজনের দিকে সবসময় বিশেষ খেয়াল রাখতেন, এমনকি মুসলিম সমাজের দারিদ্র সত্ত্বেও।
জীব-জানোয়ারেরও অধিকার আছে, কারণ তারাও আল্লাহ তায়ালার পরিবারভুক্ত। আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন সেই সব প্রাণীর স্বার্থের বিষয়ে যারা কথা বলতে পারে না। তাদের উপর আরোহন করুন যখন তারা সুস্থ এবং তাদের গোশতও খাবেন যখন তারা সুস্থ্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে সক্ষম ও সচেতন করুন।