📄 সন্তানের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
পিতা/মাতা হিসেবে আপনি অবশ্যই আপনার সন্তানকে স্নেহ ও ভালোবাসার সাথে দেখবেন। রসুল সা. বলেছেন, সে ব্যক্তি আমাদের (মুসলিম) নয় যে আমাদের শিশুদের প্রতি স্নেহশীল এবং প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় (তিরমিজি)। প্রকৃতপক্ষে যদি মানুষ শুধু এই একটি হাদিস তার জীবনে বাস্তবায়ন করে তবে সমাজ থেকে অনেক অশান্তি এবং দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা দূর হয়ে যাবে।
প্রতিটি শিশুর একটি সুন্দর নাম, উত্তম চরিত্র, উত্তম প্রশিক্ষণ, মানসম্মত শিক্ষা লাভের অধিকার এবং যৌবনে উপযুক্ত সঙ্গীর সাথে বিয়ের অধিকার রয়েছে। রসুল সা. আরও বলেছেন, পিতার পক্ষ থেকে সন্তানকে উত্তম শিক্ষা প্রদানের চেয়ে বড় কোনো উপহার হতে পারে না (বায়হাকি)।
পরিবারের মধ্যে পিতা এবং মাতা উভয়েরই তাদের শিশুর বিকাশ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর মাঝে মায়ের আছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, কারণ মা-ই সন্তানের প্রকৃত শিক্ষক। মা যে ভালোবাসা এবং আবেগ দিতে পারেন পিতার পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য পিতাকেও যথাসাধ্য প্রয়াস রাখতে হবে তার সন্তানকে সর্বোচ্চ কার্যকর সময় দেওয়ার এবং তাদের কাছে অনুপম আদর্শ মানুষের মডেল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার জন্য। আর প্রকৃত প্রশিক্ষণ আসবে প্রথমত মায়ের স্নেহ, মমতা আর শিক্ষা থেকে।
লক্ষ্য রাখা উচিত যেন আমরা ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে আমাদের প্রত্যেক সন্তানকে তার যাথাযথ প্রাপ্য যত্ন ও মনোযোগ দিতে সচেষ্ট থাকি। রসুল সা. এর আগমনের পূর্বের সমাজে মানুষ পুত্র সন্তানকে অগ্রাধিকার দিত। সেজন্য রসুল সা. আমাদের কন্যাদের প্রতি দায়িত্বের কথা বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, তোমাদের যে কেউ তার তিনজন কন্যা সন্তান বা বোনকে স্নেহের সাথে পালন করে বড় করে এবং তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রদান করে তবে আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশতের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। একথা শুনে একজন সাহাবি বললেন যার দু'টি কন্যা সন্তান বা বোন রয়েছে তার বিষয়ে কি বিধান? জবাবে রসুল সা. বললেন, তাতেও হবে। কেউ জিজ্ঞেস করলেন যার মাত্র একটি রয়েছে তিনি বললেন, হ্যাঁ যদি মাত্র একটিও থাকে তবুও আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি কার্যকর (শারহ আল সুন্নাহ)।
এভাবেই রসুল সা. আমাদের সন্তানদের অধিকার এবং তাদের প্রতি দায়িত্বের কথা বলেছেন সাথে সাথে মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা যেন তাঁর আদেশ কঠোরভাবে অনুসরণ করি।
📄 পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
আল্লাহ তায়ালার প্রতি আপনার দায়িত্বের পরই আপনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে আপনার পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব। তাদের যথাযথ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দয়ার সাথে দেখাশোনা করা আপনার অবশ্য কর্তব্য।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: তোমার খোদা আদেশ করেছেন যে, তোমরা কারও ইবাদত করবে না কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তোমাদের কাছে যদি তাদের কোনো একজন বা উভয়েই বৃদ্ধাবস্থায় থাকে তবে তুমি তাদের (বিরক্তি সূচক) উহ্ পর্যন্ত বলবে না। তাদেরকে ভর্ৎসনা করবে না বরং তাদের সাথে বিশেষ মর্যাদা সহকারে কথা বলবে (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৩)।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আপনি তাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করবেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে: এবং বিনয় ও নম্রতা সহকারে তাদের সামনে নত হয়ে থাকবে। আর এই দোয়া করতে থাকবে, হে আল্লাহ তায়ালা এঁদের প্রতি রহম করো তেমনভাবে যেমনভাবে তারা স্নেহ-মমতার সাথে ছোটবেলায় আমাদের পালন করেছেন (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৪)।
এমনকি যদি আপনার মাতা-পিতা অমুসলিম হন এবং আপনাকে শরিয়ত বিরোধী কোনো কিছু করতে চাপ দেন, সেক্ষেত্রেও ভদ্রভাবে তাদের আদেশ অমান্য করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে তাদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তাদেরকে আপনার ইমানের প্রতি সহনশীল নাও করতে পারে। সেক্ষেত্রে ভালোবাসাপূর্ণ মমতাময় এবং অনুগত সন্তান হয়েই আপনি তাদের কাছে সর্বোত্তমভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারেন। এক্ষেত্রে কুরআনের আদেশ এবং রসুল সা. এর সুন্নাহ্ আপনার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে।
এক্ষেত্রে কুরআন আমাদের যে পন্থা অবলম্বন করতে বলে তা হচ্ছে: আরো সত্য কথা এই যে, আমি মানুষকে তাদের পিতা-মাতার হক বুঝবার জন্য নিজ হতেই তাগিদ দিয়েছি। তার মা দুর্বলতার উপর দুর্বলতা সহ্য করে তাকে নিজের পেটে বহন করেছে। আরো দু'টি বছর লেগেছে তার দুধ ছাড়াতে। (এ কারণেই) আমার শুকর করো এবং নিজের পিতা মাতার শুকর আদায় করো। আমারই দিকে তোমাদের ফিরে আসতে হবে। কিন্তু তারা যদি আমার সাথে কাউকে শরিক করতে চাপ দেয়, তা হলে তাদের কথা কিছুতেই মানতে পারবে না। (তা সত্ত্বেও) দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতেই থাকো। কিন্তু অনুসরণ করবে সেই লোকের পথ যে আমার দিকে ফিরে আছে (সুরা লোকমান, ৩১: ১৪-১৫)।
হাদিসেও একইভাবে মুসলমানদের প্রতি তাদের অমুসলিম পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। একটি ঘটনায় দেখা যায় আসমা বিনতে আবুবকর রা. কে রসুল সা. তাঁর মুশরিক মায়ের সাথে সুব্যবহার করতে আদেশ করেছেন। একবার মুসলিমদের সাথে কুরাইশদের শান্তিচুক্তি চলাকালীন আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর মা তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন। তখন রসুল সা. বললেন তিনি (আসমা) যেন তাঁর মাকে পূর্ণ আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করেন (বুখারি, মুসলিম)।
📄 মুসলিম ভাই-বোনদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
উখুয়াত ভ্রাতৃত্ব হচ্ছে এমন একটি আদর্শিক বন্ধন যা মুসলিমদের একে অপরের সাথে আবদ্ধ করে (সুরা হুজুরাত, ৪৯ : ১০)। রসুল সা. বলেছেন, ইমানের সর্বোচ্চ প্রকাশ হচ্ছে কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহ তায়ালার তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালোবাসা থেকে বিরত থাকা (আহমাদ)। আপনার মুসলিম ভাই বা বোনের সাথে সম্পর্কের ভিত্তি হবে নিম্নরূপ:
ক. সদুপদেশ: আপনি সবসময় আপনার অন্যান্য মুসলিম ভাইকে সদুপদেশ এবং সুপরামর্শ দেবেন। তাদের সৎপথে চালিত করবেন এবং তাদের শুভকামনা করবেন।
খ. আত্মত্যাগ: আপনি সর্বদা আপনার নিজের কল্যাণের চেয়ে আপনার ভাইয়ের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিবেন।
গ. সুবিচার: কুরআন আদেশ করছে আমরা যেন অপরের প্রতি সবসময় ন্যায়বিচার (আদল) এবং সহানুভূতি (ইহসান) প্রদর্শন করি।
ঘ. উত্তম ব্যবহার: আদল মানে যদি হয় আপনার ভাইকে তার প্রাপ্যটুকু দেওয়া তবে ইহসান মানে হবে তাকে প্রাপ্যের চাইতেও বেশি দেওয়া।
ঙ. দয়া: কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের পরস্পরের প্রতি 'রাহমাহ' বা দয়া প্রদর্শন করতে বলেছে।
চ. ক্ষমা: আপনার দ্বীনি ভাইয়ের প্রতি আপনি ক্ষমাশীল হবেন তার মানবিক ভুলের বিষয়ে তাকে মাফ করবেন কারণ রাগ ইমানকে নষ্ট করে।
ছ. ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা: আপনি অবশ্যই আপনার দ্বীনি ভাইয়ের প্রতি সর্বোচ্চ ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা দেখাবেন।
জ. পারস্পরিক নির্ভরতা: আপনার দ্বীনি ভাই যেন তার প্রয়োজনের সময় আপনাকে কাছে পায় এবং আপনার উপর নির্ভর করতে পারে। তার সুখ-দুঃখ আর আপদ-বিপদে আপনি পাশে থাকবেন।
আপনার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষায় এবং তা ভেঙে যাওয়া রোধ করতে আরো কয়েকটি লক্ষ্যণীয় ও বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে:
১. তার অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা (সুরা বাকারা, ২: ২২৯)।
২. তার জীবনের (প্রাণের) প্রতি শ্রদ্ধা রাখা (সুরা নিসা, ৪: ৯৩)।
৩. আপনার কথায় কাজে, আপত্তিকর ভাষায় সে যেন মনে আঘাত না পায় সে দিকে লক্ষ্য রাখবেন (সুরা হুজুরাত, ৪৯: ১১)।
৪. কখনো তার নামে গিবত করবেন না বা তার দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবেন না (সুরা হুজুরাত, ৪৯: ১২)।
৫. কখনও আপনার মুসলিম ভাইকে অপদস্থ বা বিব্রত করবেন না, খাটো করবেন না, অথবা তার ত্রুটি অন্বেষণ করে বেড়াবেন না (সুরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১)।
৬. এটা নিশ্চিত করুন যেন কোনোভাবে আপনি অন্য মুসলিম ভাইকে আঘাত না করেন বা তার ক্ষতির কারণ না হন। সর্বোপরি, কখনও তার প্রতি হিংসা অনুভব করবেন না (সুরা ফালাক, ১১৩ ৫)।
আরও কয়েকটি কাজ যা আপনার মুসলিম ভাইয়ের সাথে আপনার সম্পর্ক আরও সংহত করবে তা হচ্ছে;
১. তার সম্মান মর্যাদা রক্ষা করে চলুন, তার দুঃখ-বেদনার শরিক হোন।
২. তার ভুল-ত্রুটি শুধরানোর জন্য বিনয়ী এবং আন্তরিকভাবে উপদেশ দিন। তার সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করুন।
৩. যখন তিনি অসুস্থ তখন সম্ভব হলে তার সেবা করুন এবং তাকে দেখতে যান। তার আরোগ্যের জন্য দোয়া করুন।
৪. দেখা হলে সবসময় দরদভরা হাসিমুখে দ্বীনিভাইকে গ্রহণ করুন, উত্তম শব্দ প্রয়োগ করে তাকে সম্বোধন করুন।
৫. দেখা হলে বুকে জড়িয়ে ধরুন ও মোসাফাহা করুন।
৬. সুন্দর বিশেষণে বা নামে তাকে ডাকুন
৭. তার ব্যক্তিগত বিষয়ে খোঁজ নিন, আপনার উদ্বেগের কথা জানান এবং যে কোনো প্রয়োজনে আপনার পূর্ণ সহযোগিতার হাত বাড়ান।
৮. আপনার ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা প্রকাশের জন্য তাকে মাঝে মাঝে উপহার দিন।
৯. আপনার প্রতি তার ভালোবাসা ও সহানুভূতির জন্য বারবার তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
১০. যখনই সম্ভব তার সাথে পানাহার করুন।
১১. তার জন্য নিয়মিত দোয়া করুন।
১২. তার যে কোনো আহ্বানে স্নেহ-ভালোবাসার সাথে সাড়া দিন।
১৩. তার সাথে আপনার যে কোনো দ্বিমত বা দ্বন্দ্ব কোমলভাবে মিটিয়ে ফেলুন, প্রয়োজনে যথাসম্ভব ক্ষমাশীল হন।
১৪. সব সময় কুরআনের এই আয়াত মনে রাখবেন : মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী-এরা পরস্পরের হেফাজতকারী বন্ধু। (এরা পরস্পরকে) যাবতীয় ভালো কাজের নির্দেশ দেয়, সব অন্যায় ও পাপকাজ হতে বিরত রাখে। নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে। এরা এমন লোক যাদের উপর আল্লাহ তায়ালার রহমত অবশ্যই নাজিল হবে। নিঃসন্দেহ আল্লাহ তায়ালা মহাপরাক্রমশালী সুবিজ্ঞ (সুরা তাওবা, ৯: ৭১)।
📄 মালিক ও শ্রমিকের পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
একজন উদ্যোক্তা (মালিক) হিসেবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আপনার অধীনস্থ কর্মচারীর প্রতি সযত্ন হওয়া; তার জন্য উত্তম কাজের পরিবেশ তৈরি করা; এটা নিশ্চিত করা যে তাদের সকল কাজের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করা হচ্ছে: শ্রমিকের ঘام শুকাবার আগেই তার পাওনা পরিশোধ করো (ইবনে মাজাহ)।
রসুল সা. আরও বলেছেন যে, কেয়ামতের দিন তিনি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন যে তার অধীনস্থ কর্মচারীর ন্যায্য বেতন ঠিকমতো পরিশোধ করেনি।
অন্যদিকে একজন কর্মচারী/শ্রমিক হিসেবে আপনি আপনার উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে পালন করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন যে তার কাজ নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করে (বায়হাকি)। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
তোমরা কাজ (আমল) করো, আল্লাহ তায়ালা, তাঁর রসুল এবং মুমিনগণ সকলেই তোমার কাজের প্রতি লক্ষ্য করবেন (সুরা তাওবা, ৯: ১০৫)।
মনে রাখবেন সেই খাবারই সর্বশ্রেষ্ঠ যা আপনার হালাল শ্রমে অর্জিত। কেউই তার নিজের হাতে অর্জিত খাবারের চাইতে উত্তম কিছু খেতে পারে না (বুখারি)।