📄 আমলের রেজিস্টার
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রসুল সা. বলেছেন, আমাদের সম্পাদিত সব কাজ তিনটি রেজিস্ট্রার লেখা থাকে যথা
১. একটি রেজিস্ট্রার থাকে আল্লাহ তায়ালার সাথে শরিক করা সংক্রান্ত অপরাধের তালিকা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে শরিক করলে সে অপরাধ কখনো ক্ষমা করেন না।
২. দ্বিতীয় রেজিস্ট্রার থাকে আল্লাহ তায়ালার অন্যান্য বান্দার অধিকার ভঙ্গ সংক্রান্ত কর্মতালিকা। আল্লাহ তায়ালার অন্য বান্দার অধিকার নষ্ট করলে সেই বান্দা নিজে ক্ষমা না করলে আল্লাহ তায়ালা সে অপরাধ কখনো ক্ষমা করবেন না।
৩. তৃতীয় রেজিস্ট্রার থাকে আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব সংক্রান্ত কাজের তালিকা যথা: নামাজ, রোজা ইত্যাদি। এ সংক্রান্ত কোনো ত্রুটি ক্ষমা করা না করার বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা নিজেই সিদ্ধান্ত নেন।
কাজেই দ্বিতীয় রেজিস্ট্রারে লিখিত কাজগুলোর গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। কারণ যেখানে আল্লাহ তায়ালার অন্য সৃষ্টির অধিকার ক্ষুন্ন হয় সেখানে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মাফ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমা শুধু মাত্র সংশিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকেই আসতে পারে। এ বিষয়ে রসুল সা. বলেছেন, তোমাদের যেই অন্যের মর্যাদা বা অধিকার বিষয়ে কোনো অন্যায় করে বসে সে যেন অবশ্যই হাশরের পূর্বেই তার ক্ষতিপূরণ করে বিষয়টির ফয়সালা করে। যদি তার কাছে ক্ষতিপূরণের পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে তবে যেন সে হাশরের পূর্বে ক্ষমা চেয়ে নেয়। এটা না করা হলে শেষ বিচারের সময় আল্লাহ তায়ালা তার নেক আমল কেটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির খাতায় দেবেন। যদি তার খাতায় পর্যাপ্ত নেক আমল না থাকে তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির গোনাহ তার খাতায় চাপানো হবে (বুখারি)।
📄 পরিবারের প্রতি দায়িত্ব
আপনার নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর আপনার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে আপনার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে :
হে ইমানদারগণ! নিজেকে এবং স্বীয় পরিবারবর্গকে সেই আগুন হতে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর (সুরা তাহরিম, ৬৬ : ৬)।
আপনার পরিবারের প্রতি আপনার দায়িত্ব পালন অবশ্যই এক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য যা সম্পাদনে আপনাকে যথেষ্ট চেষ্টা ও সময় দিতে হবে। এই কাজটুকু সহজতর, আরও ফলদায়ক ও আনন্দের হতে পারে যদি আপনি বিয়ের সময় রসুল সা. এর নির্দেশনা মতো জীবন সঙ্গিনী নির্বাচন করেন। জীবন সঙ্গিনী নির্ধারণ করার সময় সবার আগে আপনার নিয়তের পরিশুদ্ধি নিশ্চিত করুন। নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন যে আপনি বিয়ে করছেন, প্রথমত কুরআনী বাধ্যবাধকতা (সুরা নূর, ২৪ : ৩২-৩৩) পুরণের জন্য এবং এটা রসুলের সুন্নারও অনুসরণ। ইমাম বুখারি রা. উদ্ধৃত করেছেন যে রসুল সা. বিয়ে করতে সক্ষম যুবকদের দ্রুত বিয়ে করতে তাগিদ দিয়েছেন। বিয়ে আপনার নৈতিক পবিত্রতা রক্ষায় আপনাকে সাহায্য করবে। আরও আশা করা যায় যে এটা আপনার ইমান এবং ইসলামের প্রতি দৃঢ়-সংকল্প বাড়াবে। রসুল সা. আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বিবাহিত জীবন সম্পর্কে আরও বলেছেন, যে আল্লাহ তায়ালার দয়ায় ইমানদার স্ত্রী পায়, আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে তার অর্ধেক ইমান পূর্ণ করার সুযোগ দেন, আর তার খোদাভীতি তার ইমানের বাকি অর্ধেক পুরো করে দিবে (তাবারানি)। এই কথা নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
আপনার জীবন সঙ্গিনী/সঙ্গী নির্বাচন যেন হয় তাকওয়ার ভিত্তিতে। এজন্য জীবনসাথী নির্ধারণের আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন আপনার এ সিদ্ধান্ত আপনার ও আপনার অনাগত সন্তানের জন্য বিনিয়োগ। রসুল সা. এ প্রসঙ্গে বলেছেন, রূপ দেখেই মেয়েদের বিয়ে করো না, হতে পারে এই রূপ তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে, সম্পদের জন্যই মেয়েদের বিয়ে করো না, হতে পারে এই সম্পদ তাদের গোমরাহিতে নিমজ্জিত করতে পারে। শুধুমাত্র তাকওয়া দেখেই তাদের বিয়ে করো। চওড়া ও বোঁচা নাকের কালো ইমানদার ক্রীতদাসীও (উপরের যোগ্যতাধারী ইমানহীন নারীর চেয়ে) উত্তম (ইবনে মাজাহ)।
এমন জীবন সাথী সন্ধান করুন যে আপনার নয়নের সুখ হবে। যে আপনার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং আপনাকে দাওয়াহ্ কাজে উৎসাহিত করবে (সুরা রূম, ৩০: ২১)।
এভাবে ইমানদার জীবনসাথী আপনার দাওয়াহ্ কাজে বরকত দেওয়ার পাশাপাশি আপনার ঘরকেও করবে আল্লাহ তায়ালার নুরে আলোকিত এবং ঘর হবে আপনার প্রেরণার উৎস (সুরা আ'রাফ, ৭: ১৮৯)।
এজন্য কুরআনে আমাদের এই দোয়া করতে বলা হয়েছে,
হে আল্লাহ তায়ালা! তোমার দয়ায় আমাদের জীবনসাথীকে আর আমাদের সন্তানদের আমাদের চক্ষুশীতলকারী বানিয়ে দাও। এবং আমাদের খোদাভীরু লোকদের জন্য উদাহরণ বানাও (সুরা ফুরকান, ২৫ : ৭৪)।
আপনার জন্য যোগ্যতম জীবনসাথী নির্বাচন করার মাধ্যমেই কিন্তু আপনার নিজের বা পরিবারের প্রতি আপনার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি বরং এক নতুন কর্মক্ষেত্রে আপনার দায়িত্বশীল জীবন শুরু হলো মাত্র। আপনি এক্ষেত্রে পরিবার প্রধান হিসেবে রসুল সা. যেভাবে চলেছেন তাঁকে অনুসরণ করে পরিবারের আর সবার কাছে নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করুন। হজরত আয়েশা রা. বলেছেন যে রসুল সা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম এবং তোমাদের মাঝে আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম (তিরমিজি)।
পরিবারের ভেতর স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন অথচ সমান দায়িত্ব রয়েছে। কাজেই উভয়েই যেন পরস্পরকে তাদের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
তারা তোমাদের জন্য পোশাক (স্বরূপ) এবং তোমরা তাদের পোশাক (স্বরূপ) (সুরা বাকারা, ২: ১৮৭)।
আপনার পরিবারের সদস্যদের মাঝে ভালোবাসা আরও গভীর করতে এবং পারস্পরিক যোগাযোগ আরও সমৃদ্ধ করতে আপনার বাড়িতে নিচের তিনটি কাজ চালু করুন:
প্রথমত- আপনার প্রতিদিনের কিছু নামাজ পরিবারের সদস্যদের সাথে জামায়াতে পড়ু ন। রসুল সা. বলেছেন, মসজিদে তোমাদের ফরজ নামাজ আদায়ের পর তোমরা তোমাদের বাকি নামাজ বাড়িতে আদায় করো যাতে নামাজের জন্য আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ঘরকে রহমতের ছায়া দেন (মুসলিম)।
দ্বিতীয়ত-পরিবারের ভিতর যৌথভাবে কুরআন অধ্যয়নের জন্য একটি উসরা বা স্টাডি সার্কেল চালু করুন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কুরআন পড়ার বিষয়ে কুরআনে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
স্মরণ রেখো খোদার আয়াত ও হেকমতপূর্ণ সেসব কথা যা তোমাদের ঘরে শুনানো হয়ে থাকে (সুরা আহযাব, ৩৩: ৩৪)।
লক্ষ্য রাখবেন যাতে সপ্তাহে অন্তত দু'বার এমন পাঠচক্র করা যায়। মনে রাখবেন যে রসুল সা. এর কাছ থেকে তাঁর বাড়ির লোকেরাই প্রথম কুরআনের বাণী শুনতে পেতেন। তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতেই তিনি তাঁর মিশনের প্রথম পর্যায়ে (মক্কায়) মনোযোগ দিয়েছিলেন। কাজেই আপনিও এটা নিশ্চিত করুন যে আপনি আপনার পরিবারের সদস্যদের ইসলামের শিক্ষা প্রদানে পর্যাপ্ত এবং কার্যকরী সময় দিয়েছেন।
তৃতীয়ত- পরিবারের সদস্যদের সাথে একসাথে খাবার অভ্যাস করুন। এটা পরিবারের সদস্যদের মাঝে সহজতম উপায়ে নিত্যদিনের বিষয়াদি আলাপের এবং ভাব বিনিময়ের সুযোগ এনে দেয়। সর্বোপরি, আপনার সংসারকে একটি পরম শান্তি ও স্বস্তির আবাস বানাতে আপনার জীবনকে দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনামুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ বানাতে সচেষ্ট হোন। জীবনের কিছু ভাবনা এবং চাপ আছে যা অনিবার্য এবং কখনো অপরিহার্য। যেগুলো আপনাকে সচেতন আর দায়িত্ববান করে। অবশ্য অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শ্রম আপনার জীবন ও স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করবে। এটা আল্লাহ তায়ালার পথে আপনার কাজ করার যোগ্যতাকেও কমিয়ে দেবে। যদি আপনি আপনার প্রতিদিনের কাজের চাপকে আপনার বাড়িতে বহন করে নিয়ে যান তবে বুঝবেন আপনার কল্যাণের সবচেয়ে বড় উৎসকে আপনি ধ্বংস করছেন। আপনি প্রতিনিয়ত আপনাকে মূল্যায়ন করবেন আপনার পরিবারের সাথে আপনার কাজ ও দক্ষতা সম্পর্কে মতামত নিয়ে। নিম্নলিখিত বিষয়সমূহে তাদের মত নিবেন-
১. লক্ষ্য রাখবেন যেন আপনি কর্মস্থলে বা পড়াশোনায় যে সময় ব্যয় করেন তা যেন আপনাকে আপনার পরিবারের সাথে কার্যকরী যোগাযোগ রাখতে বাধা সৃষ্টি না করে।
২. আপনার পরিবারের সদস্যদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার যে আপনি আপনার কর্মস্থলে বা অধ্যয়নে বা জীবনে কোন লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান।
৩. বাড়িতে আপনি যে সময়টুকু থাকেন তার বেশিরভাগ যেন পরিবারের সদস্যদের সাথে মিথস্ক্রিয়াতেই ব্যয় হয়, তা যেন কাজ বা পড়াশোনায় বেশি ব্যয় না হয়।
৪. পরিবারের সকল বিষয়াদিতে পর্যাপ্তভাবে অংশ নিন যাতে পরবর্তীতে মনে কখনো এই অনুভূতি না আসে যে আপনি পরিবারে সময় কম দিয়েছেন।
৫. আপনার সময়কে ভারসাম্যপূর্ণভাবে আপনার পরিবার, মসজিদ, ব্যক্তিগত দায়িত্বের জন্য এবং অমুসলিমদের জন্য বণ্টন করুন।
৬. এটা নিশ্চিত করুন যে জীবনের সব ক্ষেত্রে যথা কর্মক্ষেত্রে, বাড়িতে, মসজিদে এবং অমুসলিমদের সাথে সর্বত্র আপনি একই নৈতিকমান বজায় রাখছেন।
৭. আপনার পরিবার যেন আপনার কাছে পার্থিব আর যে কোনো সম্পদ বা অর্জনের চাইতে বেশি মূল্যবান বিবেচিত হয়।
৮. আপনার যে কোনো সিদ্ধান্ত আপনার পরিবারকে কতটা প্রভাবিত করে সে বিষয়ে মনকে সজাগ ও উন্মুক্ত রাখুন।
৯. আপনার পরিবারের সকল সদস্যদের সাথে সংযোগ রাখুন এবং প্রত্যেকের আগ্রহের বিষয় সম্পর্কে খোঁজ রাখুন।
১০. আপনার জন্য এটা কল্যাণকর যে মাঝে মাঝেই আপনি আপনার কাজ ও লেখাপড়া থেকে বিশ্রাম নিন। আপনার চারদিকের পৃথিবীতে প্রকৃতিতে আল্লাহ তায়ালা যে সৌন্দর্য দিয়েছেন তা কৃতজ্ঞতার সাথে উপভোগ করুন।
📄 সন্তানের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
পিতা/মাতা হিসেবে আপনি অবশ্যই আপনার সন্তানকে স্নেহ ও ভালোবাসার সাথে দেখবেন। রসুল সা. বলেছেন, সে ব্যক্তি আমাদের (মুসলিম) নয় যে আমাদের শিশুদের প্রতি স্নেহশীল এবং প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় (তিরমিজি)। প্রকৃতপক্ষে যদি মানুষ শুধু এই একটি হাদিস তার জীবনে বাস্তবায়ন করে তবে সমাজ থেকে অনেক অশান্তি এবং দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা দূর হয়ে যাবে।
প্রতিটি শিশুর একটি সুন্দর নাম, উত্তম চরিত্র, উত্তম প্রশিক্ষণ, মানসম্মত শিক্ষা লাভের অধিকার এবং যৌবনে উপযুক্ত সঙ্গীর সাথে বিয়ের অধিকার রয়েছে। রসুল সা. আরও বলেছেন, পিতার পক্ষ থেকে সন্তানকে উত্তম শিক্ষা প্রদানের চেয়ে বড় কোনো উপহার হতে পারে না (বায়হাকি)।
পরিবারের মধ্যে পিতা এবং মাতা উভয়েরই তাদের শিশুর বিকাশ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর মাঝে মায়ের আছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, কারণ মা-ই সন্তানের প্রকৃত শিক্ষক। মা যে ভালোবাসা এবং আবেগ দিতে পারেন পিতার পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য পিতাকেও যথাসাধ্য প্রয়াস রাখতে হবে তার সন্তানকে সর্বোচ্চ কার্যকর সময় দেওয়ার এবং তাদের কাছে অনুপম আদর্শ মানুষের মডেল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার জন্য। আর প্রকৃত প্রশিক্ষণ আসবে প্রথমত মায়ের স্নেহ, মমতা আর শিক্ষা থেকে।
লক্ষ্য রাখা উচিত যেন আমরা ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে আমাদের প্রত্যেক সন্তানকে তার যাথাযথ প্রাপ্য যত্ন ও মনোযোগ দিতে সচেষ্ট থাকি। রসুল সা. এর আগমনের পূর্বের সমাজে মানুষ পুত্র সন্তানকে অগ্রাধিকার দিত। সেজন্য রসুল সা. আমাদের কন্যাদের প্রতি দায়িত্বের কথা বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, তোমাদের যে কেউ তার তিনজন কন্যা সন্তান বা বোনকে স্নেহের সাথে পালন করে বড় করে এবং তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রদান করে তবে আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশতের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। একথা শুনে একজন সাহাবি বললেন যার দু'টি কন্যা সন্তান বা বোন রয়েছে তার বিষয়ে কি বিধান? জবাবে রসুল সা. বললেন, তাতেও হবে। কেউ জিজ্ঞেস করলেন যার মাত্র একটি রয়েছে তিনি বললেন, হ্যাঁ যদি মাত্র একটিও থাকে তবুও আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি কার্যকর (শারহ আল সুন্নাহ)।
এভাবেই রসুল সা. আমাদের সন্তানদের অধিকার এবং তাদের প্রতি দায়িত্বের কথা বলেছেন সাথে সাথে মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা যেন তাঁর আদেশ কঠোরভাবে অনুসরণ করি।
📄 পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
আল্লাহ তায়ালার প্রতি আপনার দায়িত্বের পরই আপনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে আপনার পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব। তাদের যথাযথ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দয়ার সাথে দেখাশোনা করা আপনার অবশ্য কর্তব্য।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: তোমার খোদা আদেশ করেছেন যে, তোমরা কারও ইবাদত করবে না কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তোমাদের কাছে যদি তাদের কোনো একজন বা উভয়েই বৃদ্ধাবস্থায় থাকে তবে তুমি তাদের (বিরক্তি সূচক) উহ্ পর্যন্ত বলবে না। তাদেরকে ভর্ৎসনা করবে না বরং তাদের সাথে বিশেষ মর্যাদা সহকারে কথা বলবে (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৩)।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আপনি তাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করবেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে: এবং বিনয় ও নম্রতা সহকারে তাদের সামনে নত হয়ে থাকবে। আর এই দোয়া করতে থাকবে, হে আল্লাহ তায়ালা এঁদের প্রতি রহম করো তেমনভাবে যেমনভাবে তারা স্নেহ-মমতার সাথে ছোটবেলায় আমাদের পালন করেছেন (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৪)।
এমনকি যদি আপনার মাতা-পিতা অমুসলিম হন এবং আপনাকে শরিয়ত বিরোধী কোনো কিছু করতে চাপ দেন, সেক্ষেত্রেও ভদ্রভাবে তাদের আদেশ অমান্য করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে তাদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তাদেরকে আপনার ইমানের প্রতি সহনশীল নাও করতে পারে। সেক্ষেত্রে ভালোবাসাপূর্ণ মমতাময় এবং অনুগত সন্তান হয়েই আপনি তাদের কাছে সর্বোত্তমভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারেন। এক্ষেত্রে কুরআনের আদেশ এবং রসুল সা. এর সুন্নাহ্ আপনার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে।
এক্ষেত্রে কুরআন আমাদের যে পন্থা অবলম্বন করতে বলে তা হচ্ছে: আরো সত্য কথা এই যে, আমি মানুষকে তাদের পিতা-মাতার হক বুঝবার জন্য নিজ হতেই তাগিদ দিয়েছি। তার মা দুর্বলতার উপর দুর্বলতা সহ্য করে তাকে নিজের পেটে বহন করেছে। আরো দু'টি বছর লেগেছে তার দুধ ছাড়াতে। (এ কারণেই) আমার শুকর করো এবং নিজের পিতা মাতার শুকর আদায় করো। আমারই দিকে তোমাদের ফিরে আসতে হবে। কিন্তু তারা যদি আমার সাথে কাউকে শরিক করতে চাপ দেয়, তা হলে তাদের কথা কিছুতেই মানতে পারবে না। (তা সত্ত্বেও) দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতেই থাকো। কিন্তু অনুসরণ করবে সেই লোকের পথ যে আমার দিকে ফিরে আছে (সুরা লোকমান, ৩১: ১৪-১৫)।
হাদিসেও একইভাবে মুসলমানদের প্রতি তাদের অমুসলিম পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। একটি ঘটনায় দেখা যায় আসমা বিনতে আবুবকর রা. কে রসুল সা. তাঁর মুশরিক মায়ের সাথে সুব্যবহার করতে আদেশ করেছেন। একবার মুসলিমদের সাথে কুরাইশদের শান্তিচুক্তি চলাকালীন আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর মা তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন। তখন রসুল সা. বললেন তিনি (আসমা) যেন তাঁর মাকে পূর্ণ আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করেন (বুখারি, মুসলিম)।