📄 ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ ব্যয়
চতুপার্শ্বের মানুষের জন্য যথা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, দরিদ্র ব্যক্তি, এতিম, বিপদগ্রস্তদের জন্য ব্যয় হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পথে ব্যয় তথা ইনফাক ফিসাবিলিল্লাহর একটি ধরন। এর আর একটি ধরন হচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থব্যয়। ইসলামের জন্য অর্থব্যয় প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
এমন কে আছে যে আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দিবে (সুরা হাদিদ, ৫৭: ১১)।
আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার উদারতা লক্ষ্য করুন! আমাদের সকল সম্পদই তো তাঁর দান এবং তাঁর একচ্ছত্র অধিকারভুক্ত। যে কোনো সময় তিনি তা নিয়ে নিতে পারেন। কোনো বিনিময় ছাড়াই তিনি আমাদের কাছে এটা ফেরত চাইতে পারেন। অথচ দয়ালু আল্লাহ তায়ালা তাঁরই দেওয়া সম্পদ আমাদের কাছ থেকে কিনে বা ঋণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আমাদের আখেরাতে আরও লাভবান হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।
ইসলামের জন্য যখন আমাদের কিছু দান করার কথা বলা হয়, আমাদের তখনকার আচরণের কথা চিন্তা করুন। বস্তুত আমরা আসলেই কৃপণ। ইসলামের জন্য ব্যয়ের প্রশ্ন আসলে আমরা আমাদের বাড়ি-ঘর, সন্তান-সন্ততি, পোষাক জন্য বা খাদ্যের জন্য যা খরচ করি তার শতভাগের একভাগও খরচ করতে চাই না। সুরা আল-হাদিদে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে, যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে, প্রকৃত ইদমানদার হতে এবং তাদের জীবন ও সম্পদ আল্লাহ তায়ালার পথে বিনিয়োগ করতে আহবান জানিয়েছেন। আর সর্বশেষে তিনি মুসলমানদের বলেছেন আল্লাহ তায়ালাকে উত্তম ঋণ দিতে যা তিনি বহুগুণে বর্ধিত করে পুরস্কারসহ ফিরিয়ে দেবেন।
এমন কে আছে যে আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দিবে, উত্তম ঋণ? যেন আল্লাহ তায়ালা তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দিতে পারেন এবং তার জন্য অতীব উত্তম প্রতিফল রয়েছে। সেদিন যখন তোমরা মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকদেরকে দেখবে যে, তাদের আলো তাদের সামনে এবং তাদের ডান দিকে দৌড়াতে থাকবে। (তাদেরকে বলা হবে যে) আজ সুসংবাদ রয়েছে তোমাদের জন্য। জান্নাতসমূহ হবে তাদের আবাস যে সবের নিচে ঝর্নাধারাসমূহ প্রবাহমান হয়ে থাকবে, যাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো বড় সাফল্য। সেইদিন মুনাফিক পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের অবস্থা এই হবে যে, তারা মুমিন লোকদেরকে বলবে, আমাদের দিকেও একটু দেখো, যেন আমরা তোমাদের আলো হতে কিছুটা উপকার লাভ করতে পরি। কিন্তু তাদেরকে বলা হবে পিছনে সরে যাও, অন্য কোথাও হতে তোমাদের জন্য নূর সন্ধান করে নাও। অতঃপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীরের আড়াল দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে যাতে একটি দুয়ার থাকবে। সেই দুয়ারের ভিতর রহমত থাকবে এবং বাইরে থাকবে আজাব।
তারা মুমিন লোকদের ডেকে ডেকে বলবে আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? মুমিনগণ জবাব দিবে হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করেছ। সুযোগ সন্ধানে নিয়োজিত ছিলে, সন্দেহ-সংশয়ে ডুবে ছিলে এবং মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষা তোমাদেরকে প্রতারিত করছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা এসে গেল। আর শেষ পর্যন্ত সেই বড় প্রতারক (শয়তান) তোমাদের আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে ধোঁকা দিতে থাকলো।
কাজেই আজ না তোমাদের নিকট হতে কোন বিনিময় কবুল করা হবে, আর না সেই লোকদের হতে যারা প্রকাশ্যে কুফরি করেছিল। তোমাদের ঠিকানা, চূড়ান্ত আশ্রয় জাহান্নাম। সেই জাহান্নামই এখন তোমাদের আশ্রয় এবং কতই না নিকৃষ্ট এই পরিণতি।
ইমানদার লোকদের জন্য এখনও কি সেই সময় আসেনি যে, তাদের ছিল আল্লাহ তায়ালার জিকিরে এ বিগলিত হবে এবং তাঁর নাজিল করা মহাসত্যের সম্মুখে অবনত হবে এবং তারা সেই লোকদের মতো হয়ে যাবে না যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, পরে একটা দীর্ঘকাল তাদের উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে, তাতে তাদের দিল শক্ত হয়ে গিয়েছে, আজ তাদের অনেকেই ফাসেক হয়ে রয়েছে?
ভালোভাবে জেনে নাও যে, আল্লাহ তায়ালা ভূপৃষ্ঠকে তার মৃত্যুর পর জীবন দান করেন। আমরা তোমাদের নিদর্শনসমূহ পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছি। সম্ভবত তোমরা অনুধাবন করবে। পুরুষ এবং স্ত্রীলোকদের মধ্যে যারা দান খয়রাত করে এবং যারা আল্লাহ তায়ালাকে উত্তম ঋণ দিয়েছে, তাদেরকে নিশ্চয়ই কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। আর তাদের জন্য সর্বোত্তম প্রতিফল রয়েছে (সুরা হাদিদ, ৫৭: ১২-১৮)।
উপরের আয়াতসমূহে কেয়ামত তথা হাশরের দিনের এক প্রাঞ্জল চিত্র বর্ণিত হয়েছে। এখানে দু-ধরনের মানুষের কথা বলা হয়েছে একদল মানুষ হচ্ছে প্রকৃত ইমানদার আর অপর একদল হচ্ছে তারা যারা দুর্বল ইমানের, সন্দেহপ্রবণ এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি ওয়াদা পূরণে কপট।
প্রথম আয়াতে ইমানদার নারী-পুরুষদের কথা বলা হয়েছে। তাদের কাজের পুরস্কারস্বরূপ তারা একটি নুর বা আলো লাভ করবে যা তাদের ডানপাশে থাকবে। সেই আলোর নির্দেশনায় তারা তাদের লক্ষ্যপানে পথ চলবে। যে পথের শেষে তারা সৌন্দর্যময় বাগ-বাগিচা ভরা চিরস্থায়ী বেহেশত লাভ করবে। এটা হচ্ছে মানুষের বোধগম্য সর্বোচ্চ সাফল্য।
এই আয়াতের পর্যালোচনায় প্রথমে যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হচ্ছে এখানে ইমানদার নারী এবং পুরুষ উভয়কে আলাদাভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে আল্লাহ তায়ালার খলিফা হিসেবে পৃথিবীতে দায়িত্বপালন এবং তার প্রতিদানে পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে কোনো প্রভেদ নেই। জীবনে সফল ইমানদার নারী এবং পুরুষ উভয়েই সেইদিন নুর লাভ করবে।
অতঃপর কুরআন দ্বিতীয় দল সম্পর্কে আলোচনা করেছে। এরা হচ্ছে সেই নারী এবং পুরুষ যারা কৃপণ, দ্বিধান্বিত বা মুনাফিক এবং যারা হাশরের দিনে নুর থেকে বঞ্চিত হবে। এ ধরনের দ্বিধান্বিত মানুষ যারা দুনিয়ায় আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেনি, তারা সেদিন নুরের জন্য ইমানদার লোকদের শরণাপন্ন হবে, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। দ্বিধান্বিত ইমানের দাবিদার, কৃপণ আর প্রকৃত ইমানদারদের মাঝে এক পার্থক্যকারী প্রাচীর সেদিন তাদের পৃথক করে রাখবে। ইমানদাররা চাইলেও তাদের নুর কৃপণদের মাঝে বিতরণ করতে পারবে না। ইমানদাররা আল্লাহ তায়ালার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে আর কৃপণ, মুনাফিকরা আল্লাহ তায়ালার রোষানলে পড়বে। সেদিন এই দুই দল মানুষে যে কথোপকথন হবে তা ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন এভাবে: মুনাফিক এবং কপট লোকেরা বলবে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? আমরা কি তোমাদের সাথে জুমার নামাজে যেতাম না? আমরা কি তোমাদের সাথে নামাজের জামাতে ও দোয়ায় শামিল হতাম না? আমরা কি তোমাদের সাথে সমাজের অন্যান্য কাজেও শামিল হতাম না? আমরা কি জেহাদের ময়দানে তোমাদের পাশে থাকিনি? অতএব আজ কেন তোমরা আমাদের পেছনে ফেলে যাচ্ছ? এ অবস্থায় প্রকৃত ইমানদারগণ জবাব দিবে, হ্যাঁ একথা ঠিক তোমরা আমাদের সাথে ছিলে। কিন্তু তোমরা শুধু উপরে উপরেই আমাদের সাথে ছিলে। নিবেদিতপ্রাণ ও আন্তরিকভাবে তোমরা আমাদের সহযাত্রী ছিলে না। তোমরা সততঃই পার্থিব সুখ ও চাকচিক্যকে জীবনে বেশি আপন ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলে। তোমরা নিছক তোমাদের পরিবারের স্বার্থে বেশি সচেতন ছিলে, বেশি নিবেদিত ছিলে পার্থিব সম্পদ অর্জনে। জীবনকে আরও সুখময় করতেই তোমরা সচেষ্ট ছিলে। কাজেই যখন এসব পার্থিব বিষয় অর্জনই তোমাদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে পড়ল তখন তোমরা সত্য পথ থেকে সরে এই পরিণতির দিকে অগ্রসর হলে। বস্তুত তোমরা ছিলে দ্বিধান্বিত ও আল্লাহ তায়ালার পথ অনুসরণে পশ্চাৎপদ।
যদি আমরা পুরো দৃশ্যটার উপর দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখবো সেখানে দু'দল লোকের মাঝে সৃষ্ট দেয়ালে একটি দরজার অস্তিত্বের উল্লেখ পরোক্ষভাবে আছে। যদি আমরা এটা বিশ্বাস করি যে আখেরাতে যা ঘটতে যাচ্ছে তা দুনিয়ায় আজ যা ঘটছে তার ফল। তবে আমরা অনুভব করতে পরি যে আজকের জীবনেও প্রকৃত মুমিন আর দ্বিধান্বিত ইমানের কপট মানুষকে পৃথককারী দেয়ালের অস্তিত্ব আছে। তবে আখেরাতের দেয়ালের সথে এই দেয়ালের পার্থক্য এই যে এখানে একটি দরজা রয়েছে যার মধ্যদিয়ে দুর্বল ইমানের মানুষ সবল ইমানের মানুষের কাছে এসে ইমানদার হতে পারে। মৃত্যুর পর যে দরজার অস্তিত্ব থাকে না।
যদি আজ কেউ সিদ্ধান্ত নেয় যে সে দুর্বল দ্বিধাগ্রস্ত ইমানদারদের দল থেকে খাঁটি ইমানদারদের দলে শমিল হবে তবে তার দুটো জিনিস থাকতে হবে: একটি হচ্ছে প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি (নিয়ত) এবং অন্যটি হচ্ছে সক্রিয় পদক্ষেপ মাত্র এ দুটো জিনিসই আপনাকে কপট ইমানদারদের দল থেকে আল্লাহ তায়ালার সাহায্যপ্রাপ্ত দলে শামিল করার জন্য যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে যে দেয়ালের মাঝের দরজা দিয়ে ঢুকবার উপযুক্ত সময় আজ এবং আজই; আগামীকাল নয়। কারণ আগামীকাল এই দরজা উন্মুক্ত নাও থাকতে পারে। আজ যদিও দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর নিষ্ঠাবান ইমানদারদের কপট লোকদের থেকে এবং দানশীলদের কৃপণ থেকে পৃথক করে রেখেছে তবুও ইমানের পাশে যাওয়ার দরজা (যথা তওবা ও ইস্তিগফার) খোলা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালার পথে প্রত্যাবর্তনের এবং নিষ্ঠাবান বান্দায় পরিণত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দরজাও উন্মুক্ত।
অতএব এখনই সময় আপনার নিজেকে ইসলামের পথে নিবেদিত করে আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান মুসলিম হওয়ার। আপনাকে অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার গোটা জীবন আল্লাহ তায়ালার পথে নিবেদিত করতে পর্যাপ্ত সময়, মানোযোগ, হৃদয় এবং মন দিতে হবে। আপনার ক্ষমতা জ্ঞান ও বুদ্ধির সব দরজা যথা বলার ক্ষমতা, লেখনি, চিন্তাশক্তি ও প্রজ্ঞা সবকিছুকে আল্লাহ তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত করতে হবে। শুধুমাত্র তখনই আপনি ইমানের সর্বোচ্চ ধাপে উপনীত হতে পারবেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
তোমরা কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা (খোদার পথে) সেইসব জিনিস ব্যয় ও নিয়োগ করবে যা তোমাদের প্রিয় ও পছন্দনীয়। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল (সুরা আলে ইমরান, ৩: ৯২)।
📄 ছোট-ছোট দান
কোনো দানকেই যেন আমরা ক্ষুদ্র মনে করে অবহেলা না করি। এমনকি অপর মুসলিম ভাই বা বোনের সাথে সাক্ষাতের সময় হাসিমুখে থাকা, বা কাউকে একটি মিষ্টি কথা বা উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলাও সাদকার উত্তম উদাহরণ। আদী ইবনে হাতেম তায়ী বলেছেন যে রসুল সা. বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই একদিন আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভ করবে। সেইদিন তাদের ও আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোনো পর্দা থাকবে না। কোনো অনুবাদকও থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের বলবেন, আমি কি তোমাদের কাছে আমার বাণীবাহক রসুল প্রেরণ করিনি? তারা জবাব দিবে অবশ্যই! আল্লাহ তায়ালা আরও বলবেন, আমি কি তোমাদের অনুগ্রহ করিনি এবং সম্পদশালী করিনি? তারা জবাবে বলবে অবশ্যই হে আল্লাহ তায়ালা! তখন তারা তাদের ডানদিকে তাকাবে এবং শুধুমাত্র জাহান্নাম দেখবে, অতঃপর তাদের বামদিকে তাকাবে এবং শুধুমাত্র জাহান্নামই দেখবে। অতঃপর রসুল সা. বললেন, এই জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করো, যদি তা একটি খেজুরের অর্ধেক দিয়েও হয়। আর যদি কারও কাছে তাও পর্যন্ত না থাকে তবে সে যেন উত্তম কথার মাধ্যমে তা করে (বুখারি)।
কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এতো সংকীর্ণ যে তারা একটি সুন্দর বা দয়ালু শব্দ উচ্চারণ করে না। আল্লাহ তায়ালার রসুল সা. বলেছেন, তোমরা ক্ষুদ্রতম কোমলতা বা দয়াকেও বর্জন করবে না, এমনকি এটা যদি হয় তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি-খুশি মুখে সাক্ষাৎ করা (মুসলিম)।
একটি উত্তম বা সুন্দর কথা বলতে একটি পয়সাও খরচ হয় না। অথচ আমরা এতই কৃপণ যে আমরা দয়ার, প্রশংসার বা উৎসাহের একটি শব্দও উচ্চারণ করতে চাই না। যদি আমরা এমন দয়া ও ভালোবাসাময় আন্ত-ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি তবে তা আমাদের সংসারে ও প্রতিবেশীদের (মুসলিম ও অমুসলিম) মাঝে বন্ধুত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে সমাজকে আরও সুখী করবে।
📄 দানের ধরন
আপনার জীবনে চলার পদ্ধতি দু'ধরনের যে কোনো একটি হতে পারে। একধরনের জীবন পদ্ধতি হচ্ছে আপনি সবসময় শুধু নিজের স্বার্থ উদ্ধারেই সচেষ্ট থাকবেন, আত্মস্বার্থ ভিন্ন অন্য কোনো চিন্তা আপনার হৃদয়ে স্থান পায় না। আর এক ধরনের জীবন পদ্ধতি হচ্ছে যে আল্লাহ তায়ালার তুষ্টি অর্জনের জন্য আপনি সব সময় অন্যের ভালো করার চেষ্টা করবেন, এমনকি আপনার নিজস্বার্থ ত্যাগ করে হলেও। এই দুটো হচ্ছে বিপরীতমুখী দুটো জীবন দর্শন। এখন আল্লাহ তায়ালার পথ হচ্ছে ত্যাগের পথ। রসুল সা. এই দুটো জীবন দর্শনের তুলনা করেছেন এভাবে, কৃপণ এবং দানশীল লোকের উপমা হচ্ছে এমন দু'জন লোক যাদের বুক থেকে কণ্ঠাস্থি (Clavicle/Collarbone) পর্যন্ত লৌহবর্ম পরা আছে। যখন দানশীল ব্যক্তি দান করে কখন তার বর্ম প্রসারিত হয়ে তার হাত এবং আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে যখন কৃপণ ব্যক্তি কোনো কিছু দান করার কথা চিন্তা করে তখন তার বর্মের প্রতিটি জোড়া তার বুকের উপর চেপে বসে। সে এটাকে ঢিল করার চেষ্টা করলেও তা পারে না (বুখারি, মুসলিম)।
ধন-সম্পদ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাওয়া বরকত বা উপহার যদি তা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হয়। অন্যথায় এটা হতে পারে আমাদের ভয়াবহ শত্রু বা অভিশাপ। যখনই আমরা এটা অনুধাবন করবো যে আমাদের সমস্ত সম্পদই হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার এবং এর যথাযথ ব্যয়ের উপরই আমাদের আখেরাতের পুরস্কার প্রাপ্তি নির্ভর করছে তখনই আমাদের পকেটের অর্থদান আমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। তখন দান এবং কুরবানি হবে আনন্দের বিষয়, বোঝা নয়।
📄 দুনিয়াপ্রীতি
আমি এমন কথা বলছি না যে আপনারা এ পৃথিবীর জীবন উপভোগ করবেন না বরং আমরা অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করবো আমাদের তথা মানবজাতির জন্য পৃথিবীকে সুখময় ও নিরাপদ করতে। কোনো সুখ বা উত্তম বিষয় বিনাশ্রমে অর্জিত হয় না। হজরত অবুবকর সিদ্দিক রা. বলেছেন, তোমার দ্বীন (ধর্ম) হচ্ছে তোমাদের ভবিষ্যৎ। তোমার অর্থ তোমার জীবিকা। কোনো মানুষের টাকা-পয়সাবিহীন হওয়ার মধ্যে উত্তম কিছুই নেই। অতএব আমাদের যথাযথভাবেই এ জীবন পরিচালনা করা উচিত। জীবনের প্রতি আমাদের আগ্রহ থাকা উচিত। আল্লাহ তায়ালাও আমাদের জীবনকে ভালোবাসতে বলেছেন,
আল্লাহ তায়ালা তোমাকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের ঘর বানানোর চিন্তা করো, অবশ্য দুনিয়া হতেও নিজের অংশ নিতে ভুলো না। তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তায়ালা তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করো না (সুরা কাসাস, ২৮: ৭৭)।
এ ছাড়া রসুল সা. বলেছেন, আমাদের সম্পদ আমাদের তাকওয়া বৃদ্ধিতেও সাহায্য করতে পারে। খোদা সচেতনতা রক্ষায় সম্পত্তি উত্তম সাহায্যকারী” (কানজ আল উম্মাল)। তিনি আরও বলেছেন, তোমাদের যে কেউ বৈধ পন্থায় ধন-সম্পদ লাভ করে এবং বৈধভাবে তা ব্যয় করে তার জন্য এই সম্পদ উত্তম সাহায্যকারী (মুসলিম)।
কাজেই জীবনকে সুন্দর করার উপকরণ অর্জন করায় কোনো দোষ নেই, শুধুমাত্র দুনিয়াপ্রীতি যেন আমাদের পেয়ে না বসে। যতক্ষণ আমরা আখেরাতে আমাদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে না পারি, ততক্ষণ পৃথিবীতে আমাদের সত্যিকার আনন্দ উপভোগের কিছু নেই। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ একটি কথা প্রায়ই বলতেন, যাকে আল্লাহ তায়ালা আখেরাতে কিছুই দিবেন না তার দুনিয়ার জীবনে ভালো বলে কিছুই নেই, যে জীবনের জন্য আমাদের আকর্ষণ বোধ করতে হবে তা হচ্ছে আখেরাত। এটা অর্জন তখনই করা যাবে যখন আমরা আর সব কিছুর চাইতে আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর নবি সা. কেই বেশি ভালোবাসবো (সুরা বাকারা, ২: ১৬৫)।
এর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়া এবং আখেরাতে উভয় স্থানেই সুখী হতে পারবো। একবার একজন সাহাবি রসুল সা.-এর কাছে এসে বললেন, আমাকে এমন উপায় বলুন, যার মাধ্যমে আমি আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা এবং অন্যান্য মানুষেরও ভালোবাসা অর্জন করতে পারবো। তখন রসুল সা. বললেন, দুনিয়াকে ব্যাগ্রভাবে কামনা করো না তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের সম্পদ কামনা করো না তাহলে মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে (বুখারি)।
কত টাকা বা কত সম্পদ আপনার মালিকানায় আছে সেটা আল্লাহ তায়ালার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই অর্থ বা সম্পদের মোহ আপনার মাঝে কতটুকু। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত দেখতে চান। কারো যদি মাত্র এক পাউন্ড থাকে আর তার হৃদয়ও সেই এক পাউন্ডেই নিবদ্ধ থাকে তবে সেই লোক দুনিয়াদার, পক্ষান্তরে কারো এক লক্ষ পাউন্ড আছে কিন্তু তার মন তাতে নিবদ্ধ নয়, বরং সে খোদার পথে এর যে কোনো অংশ ব্যয়ে প্রস্তুত তবে সে দুনিয়াদার নয় বরং সে একজন আধ্যাত্মিকতা সম্পন্ন মানুষ। একইভাবে আপনি দশ পাউন্ড আয় করে তা থেকে পাঁচ পাউন্ড ব্যয় করেন আল্লাহ তায়ালার পথে, আল্লাহ তায়ালার চোখে এটা আর একজন যিনি এক লক্ষ পাউন্ড আয় করেন এবং তা থেকে একহাজার পাউন্ড ব্যয় করেন তার থেকেও উত্তম দান। কারণ, আপনি আপনার আয়ের অর্ধেক দান করছেন আর দ্বিতীয় ব্যক্তি আয়ের একশ ভাগের একভাগ দান করছেন।
রসুল সা.-এর জামানায় মানুষ আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা এত বাস্তবভাবে বিশ্বাস করতো যে তারা তাদের যাবতীয় সম্পদ রসুলের সা. সামনে এনে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে পেশ করতো। এই সাহাবাদের ত্যাগ সম্পর্কেই কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
এরা নিজেদের তুলনায় অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়-নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোক না কেন (সুরা হাশর, ৫৯: ৯)।
আপনি যদি সত্যই পরকালের পুরস্কার ও সুখের জীবন পেতে চান তবে আপনি আল্লাহ তায়ালার পথে দান করুন। এটা হচ্ছে আমাদের দুনিয়াপ্রীতি থেকে মুক্ত হওয়ার এবং আখেরাতমুখী হওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। শুধু তাই নয়, এটা আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়া) অর্জনেরও পথ। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
এবং যারা নিজেদের ধনমাল খালিসভাবে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মনের ঐকান্তিক স্থিরতা ও দৃঢ়তা সহকারে খরচ করে, তাদের এই ব্যয়ের দৃষ্টান্ত এরূপ যেমন কোনো উচ্চভূমিতে একটি উর্বর বাগান, প্রবল বেগে বৃষ্টি হলে তাতে দ্বিগুণ ফল ধরে (সুরা বাকারা, ২: ২৬৫)।
যখন আল্লাহ তায়ালার পথে ব্যয় করবেন তখন আপনি যত বেশি দিতে পারেন দেবেন, তবে তা করবেন মধ্যমপন্থায়, ঠিক তাদের মতো যারা খরচ করলে না বেহুদা খরচ করে আর না কার্পণ্য করে; বরং দুই সীমার মাঝখানে মধ্যম নীতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে (সুরা ফুরকান, ২৫: ৬৭)।
দরিদ্র ব্যক্তিকে দান করার সময় দুটো বিষয়ে খুব সতর্ক থাকুন। একটি হচ্ছে অহংকার এবং অপরটি হচ্ছে প্রদর্শনেচ্ছা। অহংকারের সাথে দান আপনার সম্পদই খরচ করাবে বিনিময়ে আখেরাতে কিছুই দেবে না। আর প্রদর্শনীর জন্য দান আপনার নিয়তকে নষ্ট করে আল্লাহ তায়ালার কাছে আপনার দানকে অর্থহীন করে দেবে।
আপনার সম্পদ ধরে রাখার আর আল্লাহ তায়ালার পথে ব্যয় করার প্রবণতার মাঝে সংগ্রাম আপনাকে করে যেতে হবে তাঁর সাথে সাক্ষাত (মৃত্যু) পর্যন্ত। এটা হচ্ছে আপনার পার্থিব লোভ/তাড়না আর আল্লাহ তায়ালা প্রেমের মঝে চিরন্তন এক দ্বন্দ্ব।
এই দুনিয়া সৌন্দর্য এবং আকর্ষণে ভরা, কিন্তু মনে রাখবেন আখেরাতের সৌন্দর্য অকল্পনীয়, সীমাহীন। কুরআনে আখেরাতের সাথে দুনিয়ার তুলনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,
মানুষের জন্য তাদের মনঃপুত জিনিস, নারী, সন্তান, স্বর্ণ-রৌপ্যের স্তুপ, বাছাই করা ঘোড়া, গৃহপালিত পশু ও কৃষি জমি বড়ই আনন্দদায়ক ও লালসার বস্তু বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা দুনিয়ার সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র। মূলত ভালো আশ্রয় তো আল্লাহ তায়ালার কাছেই রয়েছে। বলো, আমি কি তোমাদের বলব এসবের চেয়ে অধিক ভালো জিনিস কোনটি? যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করবে, তাদের জন্য খোদার নিকট রয়েছে বাগ-বাগিচা যার নিচ দিয়ে ঝর্নাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে, পবিত্রা স্ত্রীগণ তাদের সঙ্গী হবে এবং খোদার সন্তোষ লাভ করে তারা ধন্য হবে (সুরা আলে ইমরান, ৩: ১৪-১৫)।