📄 দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয়
দরিদ্র মিসকিন মানুষের জন্য দান করাকে কুরআনে উঁচুমানের ইবাদত এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রসুল সা. ঘোষণা দিয়েছেন দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কাছের মানুষ, সে বেহেশতের নিকটে, জনগণের কাছে এবং দোজখ থেকে দূরে অবস্থান করে। অন্যদিকে একজন কৃপণ লোক আল্লাহ তায়ালা থেকে দূরে, বেহেশত থেকে দূরে, জনগণ থেকে দূরে কিন্তু دোজখের নিকটতর। আল্লাহ তায়ালা একজন দানশীল অজ্ঞ লোককেও কৃপণ ধার্মিক লোকের চাইতে বেশি পছন্দ করেন (তিরমিজি)।
আপনি অবশ্যই আপনার দানের বিনিময়ে দান গ্রহণকারী ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো প্রতিদান প্রত্যাশা করবেন না। কখনও যেন আমরা এটা আশা না করি যে দান গ্রহণকারী ব্যক্তি আমদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে এবং দানের বিনিময়ে কিছু প্রদান করবে, বরং আমরা আল্লাহ তায়ালার পথে দান করেছি এবং তাঁর কাছ থেকেই প্রতিদান বা পুরস্কার প্রত্যাশা করবো। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন :
হে ইমানদারগণ, তোমরা নিজেদের দান-খয়রাতের কথা বলে (অনুগ্রহের দোহাই দিয়ে) এবং কষ্ট দিয়ে তাকে সেই ব্যক্তির ন্যায় নষ্ট করে দিও না যে ব্যক্তি শুধু লোকদের দেখাবার উদ্দেশ্যেই নিজের ধন-মাল ব্যয় করে (সুরা বাকারা, ২: ২৬৪)।
আমাদের দান-সাদাকা হতে হবে কর্যে হাসানা যা শুধু আল্লাহ তায়ালার পথে কোনো লাভ বা প্রতিদানের আশা ব্যতিরেকে করা হয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
এবং (তারা) আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও কয়েদিকে খাবার খাওয়ায়। (আর) তাদেরকে বলে আমরা তোমাদেরকে কেবল আল্লাহ তায়ালার জন্যই খাওয়াচ্ছি। আমরা তোমাদের নিকট হতে না কোন প্রতিদান চাই, আর না কৃতজ্ঞতা (সুরা আদ দাহর, ৭৬ : ৮-৯)।
এমন দাতাদের আল্লাহ তায়ালা নিজে পুরস্কৃত করেন। আর জগতে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিদান বা পুরস্কারের চাইতে শ্রেষ্ঠতর পুরস্কার আর কে দিতে পারবে? বরং আমাদের দান-সাদকার বিনিময়ে দুনিয়াবি সুবিধা খোঁজার পরিবর্তে আমাদের উচিত হবে আমাদের দান গ্রহণকারী ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। কারণ, তারা আমাদের দান গ্রহণ করে আমাদের আল্লাহ তায়ালার সাথে কারবার করার সুযোগ দিয়েছেন যিনি বিনিয়োগের সাতশ গুণ লাভ দিতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহ তায়ালার পথে খরচ করে তাদের খরচের দৃষ্টান্ত এই রূপ: যেমন একটি বীজ বপন করা হলো এবং তা হতে সাতটি শীষ বের হলো আর প্রতিটি শীষে একশতটি দানা (সুরা বাকারা, ২: ২৬১)।
শুধু একবার চিন্তা করুন যদি দুনিয়ার কোনো কোম্পানি শেয়ার বাজারে এমন আকর্ষণীয় মুনাফার শেয়ার বিক্রি করতো তবে আপনি আপনার সর্বশেষ সম্পদ পর্যন্ত বিনিয়োগ করে সেই শেয়ার কিনতেন। আল্লাহ তায়ালার পথে এভাবে সর্বস্ব বিনিয়োগ করার জন্য শুধু দরকার এতটুকু ইমান যা আপনাকে পরকালের প্রতিদান সম্পর্কে নিশ্চিত করবে। এ ধরনের ইমানদারদের আল্লাহ তায়ালা নিশ্চিত করছেন এই বলে,
নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জান এবং মাল জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন (সুরা তাওবা, ৯: ১১১)।
যখন একজন মুমিন এই বিশ্বাস অর্জন করে যে তার কাজের পূর্ণ প্রতিদান সে পাবে আখেরাতে তখন তার হৃদয় এত প্রশস্ত হয় আর তার চতুপাশের লোকদের প্রতি সে এত উদার হয় যে তার দানশীলতা কোনো সীমা মানে না। এর প্রতিদানে আল্লাহ তায়ালা তাকে চিরস্থায়ী পুরস্কারের ঘোষণা দিচ্ছেন।
আসলে তোমাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার বিভিন্ন উদ্দেশ্য থাকে। যে লোক (খোদার পথে) ধন-মাল দিল, (খোদার নাফরমানী হতে) আত্মরক্ষা করল এবং কল্যাণ ও মঙ্গলকে সত্য মেনে নিল, তাকে আমি সহজ পথে চলার সহজতা দিবো। আর যে কার্পণ্য করলো, (আল্লাহ তায়ালার প্রতি) বিমুখ হলো এবং কল্যাণ ও মঙ্গলকে অমান্য করল, তার জন্য আমি শক্ত ও দুষ্কর পথকে নির্দিষ্ট করে দিবো (সুরা লাইল, ৯২: ৪-১০)।
আমাদের প্রিয় রসুল সা. ছিলেন তাঁর সমাজের সবচাইতে দানশীল মানুষ। তাঁর অনুপম দানশীলতা ও মানুষের প্রতি দরদ সেই সমাজের মানুষের হৃদয়কে জয় করেছিল এবং তাদের ইসলামের মধ্যে নিয়ে এসেছিল। তাঁর চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য দাওয়াহ্ কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। ইমাম বুখারি রহ. রসুল সা.-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সাহাবি জাবির রা. এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, আমাদের রসুল সা. তাঁর কাছে কোনো কিছু চাইতে আগত কোনো ব্যক্তিকে কখনও সরাসরি না করেন নি। রসুল সা. নিজেই বলেছেন, যদি আমার কাছে পর্বত পরিমাণ স্বর্ণও থাকতো তাহলেও আমি তা থেকে শুধুমাত্র ঋণ পরিশোধের টাকা ছাড়া অন্য তিনদিনের বেশি চলার মতো সম্পদের অতিরিক্ত জমা রাখতাম না, সবই দান করতাম (বুখারি)। রসুল সা.-এর সমুদ্র পরিমাণ দানশীলতা হোক আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
📄 ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ ব্যয়
চতুপার্শ্বের মানুষের জন্য যথা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, দরিদ্র ব্যক্তি, এতিম, বিপদগ্রস্তদের জন্য ব্যয় হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পথে ব্যয় তথা ইনফাক ফিসাবিলিল্লাহর একটি ধরন। এর আর একটি ধরন হচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থব্যয়। ইসলামের জন্য অর্থব্যয় প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
এমন কে আছে যে আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দিবে (সুরা হাদিদ, ৫৭: ১১)।
আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার উদারতা লক্ষ্য করুন! আমাদের সকল সম্পদই তো তাঁর দান এবং তাঁর একচ্ছত্র অধিকারভুক্ত। যে কোনো সময় তিনি তা নিয়ে নিতে পারেন। কোনো বিনিময় ছাড়াই তিনি আমাদের কাছে এটা ফেরত চাইতে পারেন। অথচ দয়ালু আল্লাহ তায়ালা তাঁরই দেওয়া সম্পদ আমাদের কাছ থেকে কিনে বা ঋণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আমাদের আখেরাতে আরও লাভবান হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।
ইসলামের জন্য যখন আমাদের কিছু দান করার কথা বলা হয়, আমাদের তখনকার আচরণের কথা চিন্তা করুন। বস্তুত আমরা আসলেই কৃপণ। ইসলামের জন্য ব্যয়ের প্রশ্ন আসলে আমরা আমাদের বাড়ি-ঘর, সন্তান-সন্ততি, পোষাক জন্য বা খাদ্যের জন্য যা খরচ করি তার শতভাগের একভাগও খরচ করতে চাই না। সুরা আল-হাদিদে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে, যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে, প্রকৃত ইদমানদার হতে এবং তাদের জীবন ও সম্পদ আল্লাহ তায়ালার পথে বিনিয়োগ করতে আহবান জানিয়েছেন। আর সর্বশেষে তিনি মুসলমানদের বলেছেন আল্লাহ তায়ালাকে উত্তম ঋণ দিতে যা তিনি বহুগুণে বর্ধিত করে পুরস্কারসহ ফিরিয়ে দেবেন।
এমন কে আছে যে আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দিবে, উত্তম ঋণ? যেন আল্লাহ তায়ালা তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দিতে পারেন এবং তার জন্য অতীব উত্তম প্রতিফল রয়েছে। সেদিন যখন তোমরা মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকদেরকে দেখবে যে, তাদের আলো তাদের সামনে এবং তাদের ডান দিকে দৌড়াতে থাকবে। (তাদেরকে বলা হবে যে) আজ সুসংবাদ রয়েছে তোমাদের জন্য। জান্নাতসমূহ হবে তাদের আবাস যে সবের নিচে ঝর্নাধারাসমূহ প্রবাহমান হয়ে থাকবে, যাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো বড় সাফল্য। সেইদিন মুনাফিক পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের অবস্থা এই হবে যে, তারা মুমিন লোকদেরকে বলবে, আমাদের দিকেও একটু দেখো, যেন আমরা তোমাদের আলো হতে কিছুটা উপকার লাভ করতে পরি। কিন্তু তাদেরকে বলা হবে পিছনে সরে যাও, অন্য কোথাও হতে তোমাদের জন্য নূর সন্ধান করে নাও। অতঃপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীরের আড়াল দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে যাতে একটি দুয়ার থাকবে। সেই দুয়ারের ভিতর রহমত থাকবে এবং বাইরে থাকবে আজাব।
তারা মুমিন লোকদের ডেকে ডেকে বলবে আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? মুমিনগণ জবাব দিবে হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করেছ। সুযোগ সন্ধানে নিয়োজিত ছিলে, সন্দেহ-সংশয়ে ডুবে ছিলে এবং মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষা তোমাদেরকে প্রতারিত করছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা এসে গেল। আর শেষ পর্যন্ত সেই বড় প্রতারক (শয়তান) তোমাদের আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে ধোঁকা দিতে থাকলো।
কাজেই আজ না তোমাদের নিকট হতে কোন বিনিময় কবুল করা হবে, আর না সেই লোকদের হতে যারা প্রকাশ্যে কুফরি করেছিল। তোমাদের ঠিকানা, চূড়ান্ত আশ্রয় জাহান্নাম। সেই জাহান্নামই এখন তোমাদের আশ্রয় এবং কতই না নিকৃষ্ট এই পরিণতি।
ইমানদার লোকদের জন্য এখনও কি সেই সময় আসেনি যে, তাদের ছিল আল্লাহ তায়ালার জিকিরে এ বিগলিত হবে এবং তাঁর নাজিল করা মহাসত্যের সম্মুখে অবনত হবে এবং তারা সেই লোকদের মতো হয়ে যাবে না যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, পরে একটা দীর্ঘকাল তাদের উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে, তাতে তাদের দিল শক্ত হয়ে গিয়েছে, আজ তাদের অনেকেই ফাসেক হয়ে রয়েছে?
ভালোভাবে জেনে নাও যে, আল্লাহ তায়ালা ভূপৃষ্ঠকে তার মৃত্যুর পর জীবন দান করেন। আমরা তোমাদের নিদর্শনসমূহ পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছি। সম্ভবত তোমরা অনুধাবন করবে। পুরুষ এবং স্ত্রীলোকদের মধ্যে যারা দান খয়রাত করে এবং যারা আল্লাহ তায়ালাকে উত্তম ঋণ দিয়েছে, তাদেরকে নিশ্চয়ই কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। আর তাদের জন্য সর্বোত্তম প্রতিফল রয়েছে (সুরা হাদিদ, ৫৭: ১২-১৮)।
উপরের আয়াতসমূহে কেয়ামত তথা হাশরের দিনের এক প্রাঞ্জল চিত্র বর্ণিত হয়েছে। এখানে দু-ধরনের মানুষের কথা বলা হয়েছে একদল মানুষ হচ্ছে প্রকৃত ইমানদার আর অপর একদল হচ্ছে তারা যারা দুর্বল ইমানের, সন্দেহপ্রবণ এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি ওয়াদা পূরণে কপট।
প্রথম আয়াতে ইমানদার নারী-পুরুষদের কথা বলা হয়েছে। তাদের কাজের পুরস্কারস্বরূপ তারা একটি নুর বা আলো লাভ করবে যা তাদের ডানপাশে থাকবে। সেই আলোর নির্দেশনায় তারা তাদের লক্ষ্যপানে পথ চলবে। যে পথের শেষে তারা সৌন্দর্যময় বাগ-বাগিচা ভরা চিরস্থায়ী বেহেশত লাভ করবে। এটা হচ্ছে মানুষের বোধগম্য সর্বোচ্চ সাফল্য।
এই আয়াতের পর্যালোচনায় প্রথমে যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হচ্ছে এখানে ইমানদার নারী এবং পুরুষ উভয়কে আলাদাভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে আল্লাহ তায়ালার খলিফা হিসেবে পৃথিবীতে দায়িত্বপালন এবং তার প্রতিদানে পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে কোনো প্রভেদ নেই। জীবনে সফল ইমানদার নারী এবং পুরুষ উভয়েই সেইদিন নুর লাভ করবে।
অতঃপর কুরআন দ্বিতীয় দল সম্পর্কে আলোচনা করেছে। এরা হচ্ছে সেই নারী এবং পুরুষ যারা কৃপণ, দ্বিধান্বিত বা মুনাফিক এবং যারা হাশরের দিনে নুর থেকে বঞ্চিত হবে। এ ধরনের দ্বিধান্বিত মানুষ যারা দুনিয়ায় আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেনি, তারা সেদিন নুরের জন্য ইমানদার লোকদের শরণাপন্ন হবে, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। দ্বিধান্বিত ইমানের দাবিদার, কৃপণ আর প্রকৃত ইমানদারদের মাঝে এক পার্থক্যকারী প্রাচীর সেদিন তাদের পৃথক করে রাখবে। ইমানদাররা চাইলেও তাদের নুর কৃপণদের মাঝে বিতরণ করতে পারবে না। ইমানদাররা আল্লাহ তায়ালার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে আর কৃপণ, মুনাফিকরা আল্লাহ তায়ালার রোষানলে পড়বে। সেদিন এই দুই দল মানুষে যে কথোপকথন হবে তা ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন এভাবে: মুনাফিক এবং কপট লোকেরা বলবে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? আমরা কি তোমাদের সাথে জুমার নামাজে যেতাম না? আমরা কি তোমাদের সাথে নামাজের জামাতে ও দোয়ায় শামিল হতাম না? আমরা কি তোমাদের সাথে সমাজের অন্যান্য কাজেও শামিল হতাম না? আমরা কি জেহাদের ময়দানে তোমাদের পাশে থাকিনি? অতএব আজ কেন তোমরা আমাদের পেছনে ফেলে যাচ্ছ? এ অবস্থায় প্রকৃত ইমানদারগণ জবাব দিবে, হ্যাঁ একথা ঠিক তোমরা আমাদের সাথে ছিলে। কিন্তু তোমরা শুধু উপরে উপরেই আমাদের সাথে ছিলে। নিবেদিতপ্রাণ ও আন্তরিকভাবে তোমরা আমাদের সহযাত্রী ছিলে না। তোমরা সততঃই পার্থিব সুখ ও চাকচিক্যকে জীবনে বেশি আপন ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলে। তোমরা নিছক তোমাদের পরিবারের স্বার্থে বেশি সচেতন ছিলে, বেশি নিবেদিত ছিলে পার্থিব সম্পদ অর্জনে। জীবনকে আরও সুখময় করতেই তোমরা সচেষ্ট ছিলে। কাজেই যখন এসব পার্থিব বিষয় অর্জনই তোমাদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে পড়ল তখন তোমরা সত্য পথ থেকে সরে এই পরিণতির দিকে অগ্রসর হলে। বস্তুত তোমরা ছিলে দ্বিধান্বিত ও আল্লাহ তায়ালার পথ অনুসরণে পশ্চাৎপদ।
যদি আমরা পুরো দৃশ্যটার উপর দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখবো সেখানে দু'দল লোকের মাঝে সৃষ্ট দেয়ালে একটি দরজার অস্তিত্বের উল্লেখ পরোক্ষভাবে আছে। যদি আমরা এটা বিশ্বাস করি যে আখেরাতে যা ঘটতে যাচ্ছে তা দুনিয়ায় আজ যা ঘটছে তার ফল। তবে আমরা অনুভব করতে পরি যে আজকের জীবনেও প্রকৃত মুমিন আর দ্বিধান্বিত ইমানের কপট মানুষকে পৃথককারী দেয়ালের অস্তিত্ব আছে। তবে আখেরাতের দেয়ালের সথে এই দেয়ালের পার্থক্য এই যে এখানে একটি দরজা রয়েছে যার মধ্যদিয়ে দুর্বল ইমানের মানুষ সবল ইমানের মানুষের কাছে এসে ইমানদার হতে পারে। মৃত্যুর পর যে দরজার অস্তিত্ব থাকে না।
যদি আজ কেউ সিদ্ধান্ত নেয় যে সে দুর্বল দ্বিধাগ্রস্ত ইমানদারদের দল থেকে খাঁটি ইমানদারদের দলে শমিল হবে তবে তার দুটো জিনিস থাকতে হবে: একটি হচ্ছে প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি (নিয়ত) এবং অন্যটি হচ্ছে সক্রিয় পদক্ষেপ মাত্র এ দুটো জিনিসই আপনাকে কপট ইমানদারদের দল থেকে আল্লাহ তায়ালার সাহায্যপ্রাপ্ত দলে শামিল করার জন্য যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে যে দেয়ালের মাঝের দরজা দিয়ে ঢুকবার উপযুক্ত সময় আজ এবং আজই; আগামীকাল নয়। কারণ আগামীকাল এই দরজা উন্মুক্ত নাও থাকতে পারে। আজ যদিও দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর নিষ্ঠাবান ইমানদারদের কপট লোকদের থেকে এবং দানশীলদের কৃপণ থেকে পৃথক করে রেখেছে তবুও ইমানের পাশে যাওয়ার দরজা (যথা তওবা ও ইস্তিগফার) খোলা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালার পথে প্রত্যাবর্তনের এবং নিষ্ঠাবান বান্দায় পরিণত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দরজাও উন্মুক্ত।
অতএব এখনই সময় আপনার নিজেকে ইসলামের পথে নিবেদিত করে আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান মুসলিম হওয়ার। আপনাকে অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার গোটা জীবন আল্লাহ তায়ালার পথে নিবেদিত করতে পর্যাপ্ত সময়, মানোযোগ, হৃদয় এবং মন দিতে হবে। আপনার ক্ষমতা জ্ঞান ও বুদ্ধির সব দরজা যথা বলার ক্ষমতা, লেখনি, চিন্তাশক্তি ও প্রজ্ঞা সবকিছুকে আল্লাহ তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত করতে হবে। শুধুমাত্র তখনই আপনি ইমানের সর্বোচ্চ ধাপে উপনীত হতে পারবেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
তোমরা কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা (খোদার পথে) সেইসব জিনিস ব্যয় ও নিয়োগ করবে যা তোমাদের প্রিয় ও পছন্দনীয়। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল (সুরা আলে ইমরান, ৩: ৯২)।
📄 ছোট-ছোট দান
কোনো দানকেই যেন আমরা ক্ষুদ্র মনে করে অবহেলা না করি। এমনকি অপর মুসলিম ভাই বা বোনের সাথে সাক্ষাতের সময় হাসিমুখে থাকা, বা কাউকে একটি মিষ্টি কথা বা উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলাও সাদকার উত্তম উদাহরণ। আদী ইবনে হাতেম তায়ী বলেছেন যে রসুল সা. বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই একদিন আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভ করবে। সেইদিন তাদের ও আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোনো পর্দা থাকবে না। কোনো অনুবাদকও থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা তাদের বলবেন, আমি কি তোমাদের কাছে আমার বাণীবাহক রসুল প্রেরণ করিনি? তারা জবাব দিবে অবশ্যই! আল্লাহ তায়ালা আরও বলবেন, আমি কি তোমাদের অনুগ্রহ করিনি এবং সম্পদশালী করিনি? তারা জবাবে বলবে অবশ্যই হে আল্লাহ তায়ালা! তখন তারা তাদের ডানদিকে তাকাবে এবং শুধুমাত্র জাহান্নাম দেখবে, অতঃপর তাদের বামদিকে তাকাবে এবং শুধুমাত্র জাহান্নামই দেখবে। অতঃপর রসুল সা. বললেন, এই জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করো, যদি তা একটি খেজুরের অর্ধেক দিয়েও হয়। আর যদি কারও কাছে তাও পর্যন্ত না থাকে তবে সে যেন উত্তম কথার মাধ্যমে তা করে (বুখারি)।
কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এতো সংকীর্ণ যে তারা একটি সুন্দর বা দয়ালু শব্দ উচ্চারণ করে না। আল্লাহ তায়ালার রসুল সা. বলেছেন, তোমরা ক্ষুদ্রতম কোমলতা বা দয়াকেও বর্জন করবে না, এমনকি এটা যদি হয় তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি-খুশি মুখে সাক্ষাৎ করা (মুসলিম)।
একটি উত্তম বা সুন্দর কথা বলতে একটি পয়সাও খরচ হয় না। অথচ আমরা এতই কৃপণ যে আমরা দয়ার, প্রশংসার বা উৎসাহের একটি শব্দও উচ্চারণ করতে চাই না। যদি আমরা এমন দয়া ও ভালোবাসাময় আন্ত-ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি তবে তা আমাদের সংসারে ও প্রতিবেশীদের (মুসলিম ও অমুসলিম) মাঝে বন্ধুত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে সমাজকে আরও সুখী করবে।
📄 দানের ধরন
আপনার জীবনে চলার পদ্ধতি দু'ধরনের যে কোনো একটি হতে পারে। একধরনের জীবন পদ্ধতি হচ্ছে আপনি সবসময় শুধু নিজের স্বার্থ উদ্ধারেই সচেষ্ট থাকবেন, আত্মস্বার্থ ভিন্ন অন্য কোনো চিন্তা আপনার হৃদয়ে স্থান পায় না। আর এক ধরনের জীবন পদ্ধতি হচ্ছে যে আল্লাহ তায়ালার তুষ্টি অর্জনের জন্য আপনি সব সময় অন্যের ভালো করার চেষ্টা করবেন, এমনকি আপনার নিজস্বার্থ ত্যাগ করে হলেও। এই দুটো হচ্ছে বিপরীতমুখী দুটো জীবন দর্শন। এখন আল্লাহ তায়ালার পথ হচ্ছে ত্যাগের পথ। রসুল সা. এই দুটো জীবন দর্শনের তুলনা করেছেন এভাবে, কৃপণ এবং দানশীল লোকের উপমা হচ্ছে এমন দু'জন লোক যাদের বুক থেকে কণ্ঠাস্থি (Clavicle/Collarbone) পর্যন্ত লৌহবর্ম পরা আছে। যখন দানশীল ব্যক্তি দান করে কখন তার বর্ম প্রসারিত হয়ে তার হাত এবং আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে যখন কৃপণ ব্যক্তি কোনো কিছু দান করার কথা চিন্তা করে তখন তার বর্মের প্রতিটি জোড়া তার বুকের উপর চেপে বসে। সে এটাকে ঢিল করার চেষ্টা করলেও তা পারে না (বুখারি, মুসলিম)।
ধন-সম্পদ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাওয়া বরকত বা উপহার যদি তা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হয়। অন্যথায় এটা হতে পারে আমাদের ভয়াবহ শত্রু বা অভিশাপ। যখনই আমরা এটা অনুধাবন করবো যে আমাদের সমস্ত সম্পদই হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার এবং এর যথাযথ ব্যয়ের উপরই আমাদের আখেরাতের পুরস্কার প্রাপ্তি নির্ভর করছে তখনই আমাদের পকেটের অর্থদান আমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। তখন দান এবং কুরবানি হবে আনন্দের বিষয়, বোঝা নয়।