📄 সুন্নাহ অধ্যয়নে দিক-নির্দেশনা
কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন যে এত হাদিস গ্রন্থ থেকে রসুলের সুন্নাহ কীভাবে খুঁজে বের করা যাবে। বস্তুত রসুল সা. শুধু কিছু কথা ও কাজের রেকর্ডই রেখে যাননি, তিনি রেখে গিয়েছিলেন তাঁর গড়া একদল মানুষ এবং একটি জীবন্ত সমাজ ব্যবস্থা। এই মানুষগুলোর জীবনের মাঝে এবং এই জীবন্ত সমাজের মাঝে আমরা রসুল সা.-এর সুন্নাহ খুঁজে পেতে পারি। রসুল সা.-এর ইন্তিকালের দেড় হাজার বছর পরও আজও উম্মাহর মাঝে যতটুকু ঐক্য, সাদৃশ্য ও মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা এই সুন্নাহরই অনুসরণের ফল।
আপনি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের যে কোনো মসজিদে গিয়ে দেখুন সর্বত্রই নামাজের আসন ও দোয়াগুলো এবং ভাষা প্রায় অভিন্ন। আপনি যে কোনো মুসলমানের বাসায় গিয়ে দেখুন যে তারা প্রায় সবাই খাবার সময় ডান হাতে খাচ্ছে। এর কারণ তারা সবাই রসুলের সা.-এর সুন্নাহ অনুসরণ করছে।
এই উদাহরণগুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু আমি এই বিষয়গুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে এটাই বুঝাতে চাচ্ছি যে সুন্নতের অনুসরণের কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে অতি সাধারণ ব্যবহারিক বিষয়গুলোতেও ঐক্যতা ও সামঞ্জস্য রয়েছে। যদি মুসলমানরা সুন্নাহকে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে গণ্য না করতো, যদি সুন্নাহকে কুরআন থেকে পৃথক করে ফেলা হতো তাহলে মুসলিম সমাজ এই দেড় হাজার বছরের নানান উত্থান-পতন ও বিপর্যয়ের মুখে, নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পারতো না, সহজেই বিজাতীয় সংস্কৃতি মুসলিম সমাজকে গ্রাস করে মুসলমানদের সতন্ত্র পরিচয়কে লুপ্ত করতো। রসুলের সা. রেখে যাওয়া জীবন-ধারার অনুসরণ মুসলিম সমাজকে তার একটা নিজস্ব পরিচয় ও রং দিয়েছে।
📄 পশ্চিমা সমাজের প্রেক্ষাপটে সুন্নাহ
পশ্চিমা সমাজে মুসলমানদেরকে এক বৈরী সংস্কৃতির প্রভাবের মধ্যে অবস্থান করতে হয়। এই সমাজে থাকা বা না থাকা আপনার নিজের সিদ্ধান্ত। তবে যার জন্ম পাশ্চাত্যে তার জন্য তো আর অন্য কোনো বিকল্প উন্মুক্ত নেই। তাছাড়া পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিত মুসলিম রাষ্ট্রনায়কদের কারণে অনেক মুসলিম দেশেও পশ্চিমা সাংস্কৃতিই প্রকৃত ইসলামি সংস্কৃতিও মূল্যবোধকে প্রতিস্থাপিত করছে। এ ধরনের বৈরী সমাজে ইমান নিয়ে টিকে থাকতে এবং সফল হতে আপনাকে ইসলামি মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিষয়ে দৃঢ় আস্থা ও সাহস রাখতে হবে। ইসলামি আদর্শ ও সংস্কৃতি বিষয়ে আপনার প্রকৃত জ্ঞান থাকতে হবে। ইসলামি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি নিহিত আছে জীবন সম্পর্কে বস্তুবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে জীবনের আধ্যাত্মিক ও আত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণার উপর। সুরা বাকারার শুরুতে বলা হয়েছে যে,
এই কুরআনের হেদায়াত তারাই লাভ করবে যারা গায়েবে বিশ্বাস করে (সুরা বাকারা, ২: ৪)।
কাজেই, ইসলামি সংস্কৃতির ভেতর প্রবেশ করতে হলে প্রথমেই আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতা, রেসালাত, কেয়ামত, হাশর, বেহেশত, দোজখ ইত্যাদি অদেখা বিষয়কে বাস্তব বলে জানতে ও মানতে হবে। যদিও এগুলো সবই মানবিক অনুভূতিতে দেখা বা পরিমাপ করা যায় না।
অন্যদিকে পশ্চিমা যে সংস্কৃতি আজ বিশ্বায়নের নামে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে তার মূল কথা হচ্ছে, যা কিছু চোখে দেখা বা পরিমাপ করা যায় শুধুমাত্র তা-ই বাস্তব। যা বস্তুগতভাবে দেখা বা মাপা যায় না তার কোনো পার্থিব মূল্য নেই। কাজেই এই দর্শনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা ও ইসলামি মূল্যবোধ সরাসরি পরস্পর বিপরীত। এমন একটি পশ্চিমা সমাজে ইমান নিয়ে টিকে থাকতে হলে একমাত্র রসুলের জীবনাদর্শই আপনাকে সাহায্য করতে পারে। রসুলও একই ধরনের বৈরী পরিবেশ মোকাবেলা করেছিলেন। তিনি যখন হেরা গুহা থেকে আল্লাহ তায়ালার ওহি নিয়ে নেমে এলেন তখন তিনি সেই সমাজে পুনঃপ্রবেশ করলেন যে সমাজ ছিল তাঁর নতুন সংস্কৃতির প্রতি বৈরী। তাদের তিনি আল্লাহ তায়ালার বিধান অনুযায়ী জীবনকে পুনর্গঠন করতে বললেন। সেটাই ছিল তাঁর বৈরী সমাজ পরিবর্তনের মিশনের শুরু। তিনি বললেন, মানুষের সকল জ্ঞান, সকল সংস্কৃতি, সভ্যতা, মানুষের সকল তৎপরতার কেন্দ্রে থাকতে হবে আল্লাহ তায়ালার অনুভূতি। এই আহবান ছিল সেই সমাজের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এবং অপরিচিত। কাজেই বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য বৈরী সংস্কৃতির মাঝে কীভাবে ইমান নিয়ে সফলভাবে টিকে থাকা যায় তা বুঝতে আমাদের রসুলের সা. জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
📄 সুন্নাহ শব্দের প্রকৃত অর্থ
সুন্নাহ শব্দের প্রায়োগিক অর্থ হলো যা কিছু রসুল সা. বলেছেন, করেছেন বা অনুমোদন করেছেন তার সব। সুন্নাহ শব্দ শুনলেই আমাদের অভ্যাসবশত মনে হয় এর অর্থ রসুল সা. ব্যক্তিগত জীবনে যেভাবে চলেছেন, যে পোশাক-আশাক পরেছেন, যেভাবে খাবার খেয়েছেন, অজু-গোসল করেছেন ইত্যাদি।
যদিও এসব তুলনামূলকভাবে সাধারণ অভ্যাসগত সুন্নাহগুলোকে খাটো বা গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, তবু এই প্রসঙ্গে আমার রসুলের জীবন থেকেই একটি কথা মনে পড়ছে। একবার বহুদূর থেকে এক ব্যক্তি এবং তার পুত্র এলেন রসুল সা.-এর সাথে দেখা করতে। যখন তারা রসুলের ঘরে আসলেন তখন সম্ভবত দ্বিপ্রহরের গরমের কারণে রসুল সা. জামার বোতাম খোলা রেখে তাদের সাথে দেখা করলেন এবং হাত মিলালেন। ওই ব্যক্তি তাঁর লোকালয়ে ফিরে গেলেন। পরবর্তী জীবনে আর রসুলের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। তবে তিনি এবং তার পুত্র সবসময় জামার বোতাম খোলা রাখতেন, যদিও তারাও বুঝতেন যে এটা শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত কোনো কাজ নয়। তবুও এর ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে যখন আপনি কারো প্রেমে পড়বেন তখন আপনি চাইবেন সর্বতোভাবে তাকে অনুকরণ করতে। এটা স্বভাবিক এবং প্রশংসনীয়।
এখন আসুন প্রকৃত সুন্নাতের বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। আমরা সুন্নাতের অর্থ অনুধাবনের জন্য রসুলের সা. গোটা জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করব। আমরা লক্ষ্য করব হেরা গুহায় প্রথম আল্লাহ তায়ালার ওহি লাভের পর থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি কী করেছেন। ওহি লাভের পর কোন কাজ এবং কোন লক্ষ্য অর্জনে তিনি জীবন নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দাওয়াহ্ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বাণী পৌছানো। তাঁর সমাজের মানুষকে আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করার আহবান। তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করেছেন মানুষকে পরিশুদ্ধ করার ও তাদের মাঝে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও ভালোবাসা তৈরি করার কাজে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি তাঁর মিশনের কথাই বলেছেন বা কাজ করেছেন। মক্কার পথে পথে, তায়েফের পথে-প্রান্তরে, বদর, অহুদ বা হুনায়েনের জেহাদের ময়দানে বা মদিনার পুরো কর্মময় সময়ে তাঁর জীবনের সকল কাজ কেন্দ্রীভূত ছিল দাওয়াতের লক্ষ্যে। এটাই তাঁর অত্যাবশ্যকীয় সুন্নাহ।
📄 আপনার মিশন
বর্তমান যুগের مسلمانوں সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম কাজ হচ্ছে দাওয়াহ। আপনার প্রতিদিনের কাজে এই সুন্নাহকেই আপনার হৃদয় ও মনে সবচাইতে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। আপনার সবচেয়ে বেশি সময় ও সম্পদ এই কাজেই নিয়োজিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: একটি বৈরী সংস্কৃতির প্রভাবসম্পন্ন সমাজে আপনার ইমান নিয়ে টিকে থাকতে হলে শুধু কিছু যুক্তির কথাই যথেষ্ট নয় বরং এজন্যে প্রচণ্ড আবেগ এবং নিজস্ব সাংস্কৃৃতিক ও সভ্যতার প্রতীক ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ আপনাকে এই সভ্যতার প্রতীক দেবে এবং আপনার স্বতন্ত্র পরিচয় ঘোষণা করে আপনার ইমানকে রক্ষা ও মজবুত করবে।
তৃতীয়ত: আপনাকে মনে রাখতে হবে যে সুন্নাহর অনুসরণের আসল সময় হচ্ছে আপনার যৌবনে। যুব বয়সেই মানুষের সবচাইতে বেশি শক্তি ও স্পৃহা থাকে রসুল সা.-এর মিশন অনুযায়ী কাজ করার।
চতুর্থত: বর্তমান সমাজে যখন ইসলাম নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে তখন আপনার জীবন হতে হবে ইসলামের বাস্তব উদাহরণ। ইসলাম মানবতার জন্য যে শান্তি ও কল্যাণের ঘোষণা দিয়েছে, রসুল সা. যেমনটি দেখিয়েছেন, আপনার জীবনে সেভাবে ইসলামের কল্যাণময় রূপকে মূর্ত করতে হবে। রসুল সা. ছিলেন রাহমাতাল্লিল আলামিন (জগৎসমূহের জন্য রহমত)। আপনার আচরণ যেন জগতবাসীর জন্য কল্যাণকর হয়।
রসুল সা. দয়ার এমন সাগর ছিলেন যে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি পথ থেকে একটি কাঁটা সরাবে সে জান্নাতের দিকে চালিত হবে। যে একটি কুকুরের তৃষ্ণা মিটাবে সে জান্নাতের দিকে ধাবিত হবে। যে একটি বিড়ালকে মৃত্যু পর্যন্ত বেঁধে রাখবে সে দোজখে ধাবিত হবে। এমনই ছিল তাঁর অনুসৃত পন্থা। আপনি শুধুমাত্র দয়ার এই গুণ অর্জন করেই মানুষকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে পারেন।