📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 মু'মিনের জীবনে সুন্নাহর গুরুত্ব

📄 মু'মিনের জীবনে সুন্নাহর গুরুত্ব


রসুল সা. যতদিনে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান ততদিনে তিনি এমন হাজার হাজার মানুষ তৈরি করে যান যাঁদের জীবন ছিল তাঁরই জীবনের প্রতিফলন। তিনি এমন একটি সমাজ রেখে যান যার প্রতিটি দিকেই ছিল তাঁর জীবনের ছাপ। তাঁর নির্দেশনা, তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদেশ সেই সমাজকে শুধুমাত্র তাঁর জীবদ্দশাতেই সমৃদ্ধ করেনি বরং তাঁর তিরোধানের পরও সেই সমাজকে আলোকিতও প্রভাবিত করেছে। তিনি এক নতুন সমাজ তৈরি করেন এবং কুরআনের শিক্ষার আলোকে এক নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণে নেতৃত্ব দেন, যা করতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে আদেশ করেছিলেন:

হে রসুল, তোমার খোদার তরফ থেকে তোমার প্রতি যা কিছু নাজিল করা হয়েছে, তা লোকদের পর্যন্ত পৌছে দাও। তুমি যদি এটা না পৌছাও তবে কিন্তু তা পৌছে দেওয়ার হক তুমি আদায় করলে না (সুরা মায়েদা, ৫: ৬৭)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 রসূল সা.-এর মিশন

📄 রসূল সা.-এর মিশন


রসুল সা. শুধুমাত্র একজন দূত বা বাণীবাহক ছিলেন না যার দায়িত্ব শুধু আল্লাহ তায়ালার বাণী পৌঁছানো বরং তাঁর কাজের পরিধি বাণীবহন থেকে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল। মানুষকে আল্লাহ তায়ালার কিতাব শিক্ষা দেওয়া মানুষের মাঝে আল্লাহ তায়ালার বিধান বুঝার মতো প্রজ্ঞা সৃষ্টি করা, তাদের পরিশুদ্ধ করা এবং তাদের কুরআনের আলোকে আদর্শ বান্দা হিসেবে গড়ে তোলা, এসবই তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কুরআনের অনেক জায়গায় রসুল সা.-এর এসব দায়িত্বের কথা স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে। সুরা বাকারায় যেখানে ইবরাহিম আ. নতুন রসুলের জন্য দোয়া করেছেন; সেখানে বলা হয়েছে:

হে আল্লাহ তায়ালা! তুমি এদের প্রতি এদের জাতির মধ্য হতেই এমন একজন রসুল প্রেরণ করো যে তাদেরকে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবে, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষাদান করবে এবং তাদের বাস্তব জীবনকে পরিশুদ্ধ ও সুষ্ঠুরূপে গড়বে। তুমি নিশ্চয়ই মহাপরাক্রমশালী ও সুবিজ্ঞ (সুরা বাকারা, ২: ১২৯)।

উপরোক্ত আয়াতে রসুলগণের চারটি প্রধান কাজের কথা বলা হয়েছে, যথা-
ক. মানুষের কাছে আল্লাহ তায়ালার বাণী পৌছানো;
খ. তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার আইন শিক্ষা দেওয়া;
গ. জীবনকে আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত পন্থায় পরিচালনার প্রজ্ঞাসম্পন্ন রূপে মানুষকে গড়ে তোলা;
ঘ. মানুষকে পরিশুদ্ধ করা।

কাজেই রসুল সা.-এর জীবনের মিশন শুধু কুরআন প্রচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জনগণকে কুরআন ব্যাখ্যা করা এবং আল্লাহ তায়ালার পথে প্রতিনিয়ত চলার জন্য সময়ে সময়ে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেওয়াও ছিল তাঁর দায়িত্ব। কুরআনের আরও কয়েকটি জায়গায় আল্লাহ তায়ালা তাঁর আরও কয়েকটি দায়িত্বের কথা বলেছেন (দেখুন সুরা বাকারা, ২: ১৫১; ৪৮: ২৮; সুরা আহযাব, ৩৩: ৪-৫; সুরা মায়েদা, ৫: ৬৭; সুরা আ'রাফ, ৭: ১৫৭; সুরা তাওবা, ৯: ৩৩; সুরা আস সফ, ৬১: ৯;)। এগুলো হচ্ছে যথা:

১. ইনজার অর্থাৎ করা;
২. তাবশির তথা সুসংবাদ দান;
৩. দাওয়া তথা আল্লাহ তায়ালার পথে ডাকা বা আহ্বান;
৪. তাবলীগ তথা যোগাযোগ;
৫. তাজকির তথা মনে করিয়ে দেয়া;
৬. তালিম তথা শিক্ষা দান;
৭. তিলাওয়াত তথা বাণী পড়ে শুনানো ও প্রচার;
৮. আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ;
৯. ইকামা তথা দ্বীন বা ইসলামি জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা;
১০. কিস্ত তথা ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করা;
১১. ইজহার তথা ঐশী আদেশকে প্রতিষ্ঠিত করা;
১২. শাহাদাৎ তথা জনগণের সামনে সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া ও তাদের জন্য সাক্ষী হওয়া।

এসব কাজ একই মিশনের অন্তর্ভুক্ত, যদিও এসবের প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিত ও গুরুত্ব রয়েছে।

রসুল সা.-এর আরও কর্তৃত্ব ছিল লোকজনের কাছে হালাল ও হারামের বিধান পৌঁছানো। একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই তাঁকে এ কাজের কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন:

রসুল তোমাদের যা কিছু দান করেন তা হতে গ্রহণ করো। আর যে জিনিস হতে তিনি তোমাদের বিরত রাখেন তা হতে বিরত থাকো (সুরা হাশর, ৫৯: ৭)।

নিজের উপর অর্পিত এই দায়িত্ব পালনের জন্যই রসুল সা. তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের আচরণ পরিবর্তন করতে এবং একটি নতুন সমাজ গড়তে। এ জন্যই কুরআনে তাঁকে এমন মর্যাদাপূর্ণভাবে সম্বোধন করা হয়েছে যে মর্যাদা আর অন্য কেউ পায়নি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যে ব্যক্তি রসুলকে মেনে চলল সে মূলত আল্লাহ তায়ালারই আনুগত্য করলো (সুরা নিসা, ৪:৮০)।

হে নবি যেসব লোক তোমার নিকট বায়াত করছিল তারা আসলে আল্লাহ তায়ালার নিকট বায়াত করছিল। তাঁদের হাতের উপর আল্লাহ তায়ালার হাত ছিল (সুরা ফাতহ, ৪৮: ১০)।

রসুল সা. যে বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত বা মতামত দিয়েছেন কোনো ইমানদার পুরুষ বা নারীর পক্ষে সে সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন, সন্দেহ অথবা কোনো ধরনের অননুমোদন বা অনাস্থার ভাবকে মনে প্রশ্রয় দিতে পারবে না। তাদের সবাইকে ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুল যখন কোনো বিষয়ে ফয়সালা করে দেবেন তখন কোনো মুমিন বা মুমিনার সেই ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্ত দেবার কোনো অধিকার থাকবে না। আর যে লোক আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসুলের নাফরমানি করবে সে নিশ্চয়ই সুস্পষ্ট গোমরাহিতে লিপ্ত হল (সুরা আহযাব, ৩৩: ৩৬)।

কুরআন মতে, আমাদের জন্য রসুল সা.-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম অনুকরণীয় আদর্শ।

প্রকৃতপক্ষে তোমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার রসুলের জীবনে এক সর্বোত্তম নমুনা বর্তমান আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ তায়ালা এবং পরকালের প্রতি আশাবাদী এবং যে খুব বেশি বেশি আল্লাহ তায়ালার স্মরণ করে (সুরা আহজাব, ৩৩: ২১)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 সুন্নাহ অধ্যয়নে দিক-নির্দেশনা

📄 সুন্নাহ অধ্যয়নে দিক-নির্দেশনা


কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন যে এত হাদিস গ্রন্থ থেকে রসুলের সুন্নাহ কীভাবে খুঁজে বের করা যাবে। বস্তুত রসুল সা. শুধু কিছু কথা ও কাজের রেকর্ডই রেখে যাননি, তিনি রেখে গিয়েছিলেন তাঁর গড়া একদল মানুষ এবং একটি জীবন্ত সমাজ ব্যবস্থা। এই মানুষগুলোর জীবনের মাঝে এবং এই জীবন্ত সমাজের মাঝে আমরা রসুল সা.-এর সুন্নাহ খুঁজে পেতে পারি। রসুল সা.-এর ইন্তিকালের দেড় হাজার বছর পরও আজও উম্মাহর মাঝে যতটুকু ঐক্য, সাদৃশ্য ও মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা এই সুন্নাহরই অনুসরণের ফল।

আপনি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের যে কোনো মসজিদে গিয়ে দেখুন সর্বত্রই নামাজের আসন ও দোয়াগুলো এবং ভাষা প্রায় অভিন্ন। আপনি যে কোনো মুসলমানের বাসায় গিয়ে দেখুন যে তারা প্রায় সবাই খাবার সময় ডান হাতে খাচ্ছে। এর কারণ তারা সবাই রসুলের সা.-এর সুন্নাহ অনুসরণ করছে।

এই উদাহরণগুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু আমি এই বিষয়গুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে এটাই বুঝাতে চাচ্ছি যে সুন্নতের অনুসরণের কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে অতি সাধারণ ব্যবহারিক বিষয়গুলোতেও ঐক্যতা ও সামঞ্জস্য রয়েছে। যদি মুসলমানরা সুন্নাহকে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে গণ্য না করতো, যদি সুন্নাহকে কুরআন থেকে পৃথক করে ফেলা হতো তাহলে মুসলিম সমাজ এই দেড় হাজার বছরের নানান উত্থান-পতন ও বিপর্যয়ের মুখে, নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পারতো না, সহজেই বিজাতীয় সংস্কৃতি মুসলিম সমাজকে গ্রাস করে মুসলমানদের সতন্ত্র পরিচয়কে লুপ্ত করতো। রসুলের সা. রেখে যাওয়া জীবন-ধারার অনুসরণ মুসলিম সমাজকে তার একটা নিজস্ব পরিচয় ও রং দিয়েছে।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 পশ্চিমা সমাজের প্রেক্ষাপটে সুন্নাহ

📄 পশ্চিমা সমাজের প্রেক্ষাপটে সুন্নাহ


পশ্চিমা সমাজে মুসলমানদেরকে এক বৈরী সংস্কৃতির প্রভাবের মধ্যে অবস্থান করতে হয়। এই সমাজে থাকা বা না থাকা আপনার নিজের সিদ্ধান্ত। তবে যার জন্ম পাশ্চাত্যে তার জন্য তো আর অন্য কোনো বিকল্প উন্মুক্ত নেই। তাছাড়া পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিত মুসলিম রাষ্ট্রনায়কদের কারণে অনেক মুসলিম দেশেও পশ্চিমা সাংস্কৃতিই প্রকৃত ইসলামি সংস্কৃতিও মূল্যবোধকে প্রতিস্থাপিত করছে। এ ধরনের বৈরী সমাজে ইমান নিয়ে টিকে থাকতে এবং সফল হতে আপনাকে ইসলামি মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিষয়ে দৃঢ় আস্থা ও সাহস রাখতে হবে। ইসলামি আদর্শ ও সংস্কৃতি বিষয়ে আপনার প্রকৃত জ্ঞান থাকতে হবে। ইসলামি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি নিহিত আছে জীবন সম্পর্কে বস্তুবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে জীবনের আধ্যাত্মিক ও আত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণার উপর। সুরা বাকারার শুরুতে বলা হয়েছে যে,

এই কুরআনের হেদায়াত তারাই লাভ করবে যারা গায়েবে বিশ্বাস করে (সুরা বাকারা, ২: ৪)।

কাজেই, ইসলামি সংস্কৃতির ভেতর প্রবেশ করতে হলে প্রথমেই আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতা, রেসালাত, কেয়ামত, হাশর, বেহেশত, দোজখ ইত্যাদি অদেখা বিষয়কে বাস্তব বলে জানতে ও মানতে হবে। যদিও এগুলো সবই মানবিক অনুভূতিতে দেখা বা পরিমাপ করা যায় না।

অন্যদিকে পশ্চিমা যে সংস্কৃতি আজ বিশ্বায়নের নামে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে তার মূল কথা হচ্ছে, যা কিছু চোখে দেখা বা পরিমাপ করা যায় শুধুমাত্র তা-ই বাস্তব। যা বস্তুগতভাবে দেখা বা মাপা যায় না তার কোনো পার্থিব মূল্য নেই। কাজেই এই দর্শনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা ও ইসলামি মূল্যবোধ সরাসরি পরস্পর বিপরীত। এমন একটি পশ্চিমা সমাজে ইমান নিয়ে টিকে থাকতে হলে একমাত্র রসুলের জীবনাদর্শই আপনাকে সাহায্য করতে পারে। রসুলও একই ধরনের বৈরী পরিবেশ মোকাবেলা করেছিলেন। তিনি যখন হেরা গুহা থেকে আল্লাহ তায়ালার ওহি নিয়ে নেমে এলেন তখন তিনি সেই সমাজে পুনঃপ্রবেশ করলেন যে সমাজ ছিল তাঁর নতুন সংস্কৃতির প্রতি বৈরী। তাদের তিনি আল্লাহ তায়ালার বিধান অনুযায়ী জীবনকে পুনর্গঠন করতে বললেন। সেটাই ছিল তাঁর বৈরী সমাজ পরিবর্তনের মিশনের শুরু। তিনি বললেন, মানুষের সকল জ্ঞান, সকল সংস্কৃতি, সভ্যতা, মানুষের সকল তৎপরতার কেন্দ্রে থাকতে হবে আল্লাহ তায়ালার অনুভূতি। এই আহবান ছিল সেই সমাজের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এবং অপরিচিত। কাজেই বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য বৈরী সংস্কৃতির মাঝে কীভাবে ইমান নিয়ে সফলভাবে টিকে থাকা যায় তা বুঝতে আমাদের রসুলের সা. জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00