📄 অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ
চতুর্থ যে বদগুণ মানুষকে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত রাগ। যখনই আপনি আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবেন তখনি দেখবেন আপনার জীবন আনন্দময় ও সহজ হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ তায়ালার পথে কাজ করাই আপনার জন্য আনন্দের বিষয় মনে হবে। দেখবেন ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অথবা সংগঠনের সদস্যদের মধ্যকার বিরোধগুলো অতি সহজেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সামাজিক এবং সাংগঠনিক জীবনে যেসব ব্যক্তিগত অমিল ও সংঘাত স্থায়ী হয় তা আসলে এজন্য যে আমরা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তায়ালার পথে আন্তরিক হতে পারিনি।
যদি আপনি শুধুমাত্র আল্লাহরই তুষ্টির জন্য সবকিছু করতে থাকেন তবে কারো পক্ষ থেকে অবমাননা বা উপেক্ষার জবাবে আপনার রাগ করবার প্রয়োজন হবে না। কারণ সেই ব্যক্তি তার কাজ দিয়ে আপনার কোনো ক্ষতি করছে না। কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টিই মুমিনকে শঙ্কিত করবে। মনে রাখবেন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
করো প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন এত উত্তেজিত করে না দেয় যে তার ফলে তোমরা বেইনসাফি করবে। সর্বদা ইনসাফ করো (সুরা মায়েদা, ৫:৮)।
আপনি কেন রাগ করবেন? একটি ইসলামি সংগঠনে যেখানে সকল ভাই-বোনদের একসাথে আল্লাহ তায়ালার পথে হাতে হাত রেখে চলতে হয় সেখানে অনিয়ন্ত্রিত রাগ বা অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা এবং পারস্পরিক বিবাদ ইসলামি জামায়াতকে সংকটাপন্ন করে। মনে রাখবেন যে আমরা শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করছি। সেখানে আপনার সকল ভালো আমলকে গর্ব-অহংকার দিয়ে ধ্বংস করবেন না অথবা আপনার নফসকে নিছক ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা শুধু নিজের লাভের লক্ষ্যে নিয়োজিত করবেন না। আপনার রাগকে নিয়ন্ত্রিত করার পন্থা উদ্ভাবন করুন। রসুল সা. উপদেশ দিয়েছেন, যদি তোমাদের কারো দাঁড়ানো অবস্থায় ক্রোধ জাগে তবে যেন সে বসে পড়ে। যদি এতেও তার রাগ দূর না হয় তবে যেন সে শুয়ে পড়ে (আহম্মদ, তিরমিজি)।
আমাদের হৃদয়কে সকল নেতিবাচক আচরণ থেকে মুক্ত করতে রসুল সা. আমাদের আরও কিছু দোয়া শিখিয়েছেন যেমন: হে আল্লাহ তায়ালা আমার হৃদয়কে শঠতা থেকে মুক্ত করে দাও এবং আমার কাজকে সকল ভান (লোক-দেখানো) থেকে মুক্ত করে দাও (বুখারি)।
হে আল্লাহ তায়ালা আমার মধ্যে তোমার প্রতি ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করে দাও। এমন ভালোবাসা পয়দা করে দাও যেভাবে তোমার প্রিয় মানুষ তোমাকে ভালোবাসে। এমন ভালোবাসা যা আমাকে তোমার নিকটতর করে দেয়। আমার প্রতি তোমার ভালোবাসাকে (তীব্র গরমে) শীতল পানির চাইতে প্রিয়তর করে দাও (বুখারি)।
এমন ধরনের আরও অনেক দোয়া রসুল সা. শিখিয়েছেন। এসব দোয়া ও ইবাদত হচ্ছে আত্মার খোরাক, ক্বলবের পুষ্টিদাতা, এবং জীবনে সফল হওয়ার পাথেয়। জীবনের সকল তৎপরতায় এসব দোয়া উচ্চারণ করুন পড়াশোনার সময়, কাজের সময়, সন্তানকে শিক্ষা প্রদানের সময়। মনে রাখবেন যদি আমরা নিছক দুনিয়াবি স্বার্থপ্রণোদিত হয়েই কাজ করি, তবে আত্মা তার খোরাক বঞ্চিত হবে, আমাদের সব ভালো আমল হারিয়ে যাবে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
যেসব লোক নিজেদের খোদার সাথে কুফরি করেছে তাদের কাজের দৃষ্টান্ত সেই ভন্মের মতো যাকে এক ঝটিকাপূর্ণ দিনের ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে দিয়েছে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের কোনো ফলই পেতে পারবে না। এটাঁত এক ঘোর বিভ্রান্তি (সুরা ইবরাহিম ১৪: ১৮)।
📄 জিহবার অপব্যবহার
পঞ্চম ভয়াবহ বদভ্যাস হচ্ছে জিহ্বার অপব্যবহার। জিহ্বার ব্যবহারের বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এর অপব্যবহার দোজখের আগুনকে দ্রুত নিকটতর করে। মিথ্যা, অশন্টীল-নোংরা কথা, গিবত এবং কটুভাষণ যেন আমাদের জিহ্বা থেকে নির্গত না হয়। অন্যদের বিষয়ে বলার সময় আমরা যেন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। রসুল সা. বলেছেন, তোমাদের কেউ আমাকে অন্যের বিষয়ে কিছু বলা থেকে বিরত থাকো, কারণ আমি তোমাদের প্রত্যেককে পরিষ্কার হৃদয়বিশিষ্ট দেখতে চাই (আবু দাউদ)।
যারা তাদের কথা উচ্চারণে সতর্ক, তাদের জন্য রসুল সা. বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের যে কেউ আমাকে তাঁর জিহ্বা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের আশ্বাস দিবে আমি তাকে বেহেশতের আশ্বাস দিবো (মুসলিম)।
জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সহজতম উপায় হচ্ছে পারস্পরিক কথোপকথনের সময়েও মনে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ জাগ্রত রাখা। এ বিষয়ে রসুল সা. বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া দীর্ঘ সময় কথা বলো না, কারণ দীর্ঘসময় আল্লাহ তায়ালার স্মরণ বিহীন কথাবার্তা হৃদয়কে কঠোর করে দেয়, আর যার হৃদয় কঠোর সে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সবচেয়ে দূরের মানুষ (তিরমিজি)।
📄 যৌন লালসা
আল্লাহ তায়ালার কাছের মানুষ হওয়ার পথে ষষ্ঠ এবং সর্বশেষ বাধা হচ্ছে লালসাপূর্ণ যৌনাকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের যেসব শক্তিশালী তাড়না দিয়ে তৈরি করেছেন যৌনতা সেগুলোর অন্যতম। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সেইসব মানুষের প্রশংসা করেছেন যারা তাদের যৌনাঙ্গকে হেফাজতে রাখে (সুরা নূর ২৪ : ৩০-৩১)।
প্রচণ্ড লোভের মুখেও মুমিন বান্দারা তাদের যৌনাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করতে সমর্থ হয়।
মানুষের যৌনাঙ্গের অপব্যবহার তাদের ব্যভিচার বা জ্বেনার দিকে চালিত করে যাকে কুরআনে মহাপাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-
হে ইমানদারগণ, তোমরা জেনার নিকটবর্তী হয়ো না, এটা এক বিরাট অসাধুতা এবং শয়তানী পন্থা (সুরা বনি ইসরাঈল ১৭: ৩২)।
এই আয়াতে অবৈধ যৌনাকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় বা নারী পুরুষের মাঝে আপত্তিকর সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এমন সব ক্ষেত্রকে এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে আমাদের নিম্নোক্ত উপদেশ দেওয়া হয়েছে:
১. সামর্থ্য থাকলে যথাসময়ে আমাদের বিয়ে করা উচিত। রসুল সা. বলেছেন, হে যুবকগণ! তোমাদের মাঝে যারা স্ত্রীর ভরণপোষণে সক্ষম তাদের বিয়ে করা উচিত। কারণ এটা তোমাদের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করবে এবং অন্য স্ত্রী লোকদের দিকে চাহনি থেকে তোমাদের মুক্ত রাখবে (বুখারি)।
যদি আপনার বিয়ের আর্থিক সঙ্গতি না থাকে তবে আপনার নফল রোজা রাখা উত্তম, কারণ এটা আপনার যৌনাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। রসুল সা. বলেছেন, হে যুবকগণ তোমাদের বিয়ে করা উচিত। যারা বিয়ে করতে (আর্থিকভাবে) অক্ষম তাদের রোজা রাখা উচিত কারণ রোজা যৌনকাঙ্ক্ষা হ্রাস করে (বুখারি)।
২. আমাদের শরীরের সকল অংশকে (শুধুমাত্র লজ্জাস্থানকে নয়) জেনার নিকটবর্তী হওয়া থেকে দূরে রাখতে হবে। রসুল সা. বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেক অঙ্গেরই জেনা হতে পারে। চোখে জ্বেনা হতে পারে লালসার দৃষ্টির মাধ্যমে। হাতের জ্বেনা হতে পারে স্পর্শের মাধ্যমে। পায়ের জেনা হতে পারে অনৈতিক কাজের স্থানে গমনের মাধ্যমে। মুখের জেনা হতে পারে চুম্বনের মাধ্যমে। হৃদয়ের জেনা হতে পারে কুচিন্তার মাধ্যমে যা যৌন অঙ্গের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে" (বুখারি, মুসলিম)।
এজন্য রসুল সা. সব সময় শয়তানের কবল থেকে আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় চাইতে বলেছেন, আমি আমার চোখ, কান, হৃদয় এবং বীর্যে অবস্থানরত শয়তানের কবল থেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় চাই (আবু দাউদ)।
৩. বিপরীত লিঙ্গের মানুষের দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকানো বর্জন করতে হবে। রসুল সা. কামনার দৃষ্টিতে তাকানোকে চোখের জ্বেনা বলেছেন, চোখেরও জেনা হতে পারে এবং তা হচ্ছে লালসার (কামনার) দৃষ্টি (বুখারি)।
তিনি আরও বলেছেন, লালসার দৃষ্টি হচ্ছে শয়তানের তরফ থেকে আসা এক বিষাক্ত তীর; যে এটা থেকে আল্লাহ তায়ালার ভয়ে নিজেকে বিরত রাখবে তার ইমান বৃদ্ধি পাবে; এর ফলে সে অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করবে (মুসনাদ ইবনে হামবাল)।
৪. অন্যের আওরা বা গোপন অঙ্গের দিকে তাকানো পরিহার করতে হবে। রসুল সা. অন্যের গোপন অঙ্গের দিকে তাকাতে বারণ করেছেন। একজন পুরুষ অপর পুরুষের গোপন অঙ্গের দিকে তাকাবে না, কোনো নারী অপর নারীর গোপন অঙ্গের দিকে তাকাবে না, এক চাদরের নিচে দুজন পুরুষ ঘুমানো ঠিক নয় এবং এক চাদরের নিচে দুজন নারীও ঘুমানো ঠিক নয় (মুসলিম)।
৫. আমাদের খালওয়া আইন মেনে চলা উচিত। খালওয়া হচ্ছে এক ঘরে নারী-পুরুষের এমন অবস্থান যেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নেই এবং তৃতীয় কোনো ব্যক্তি আসার সম্ভাবনা নেই। এ ধরনের পরিবেশ মানুষের অসৎ চিন্তা বাস্তবায়নে সহায়ক হয়। ইসলাম মাহরাম আত্মীয়তার বাইরের নারী পুরুষের খালওয়া নিষেধ করেছে। এর মানে এই নয় যে ইসলাম আমাদের উপর আস্থা কম রাখছে; এর মানে এই যে কোনো শয়তানী প্ররোচণার মুখোমুখি হওয়া থেকে আমাদের মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা। রসুল সা. বলেছেন, যারাই আল্লাহ তায়ালা এবং হাশরের বিশ্বাসী তারা যেন কোনো (গায়ের মাহরাম) মহিলার সাথে একাকী নিভৃতে (তার মাহরাম আত্মীয় বা তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়া) না বসে, তা না হলে তাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে শয়তান উপস্থিত হবে (আহমাদ)।