📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 আল্লাহ তায়ালার পথে হানিফ হওয়া

📄 আল্লাহ তায়ালার পথে হানিফ হওয়া


যারা আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরতে চায় তাদের অবশ্যই হানিফ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। হানিফ বলতে বুঝায় এমন একজনকে যে নিজেকে যাবতীয় মিথ্যা এবং ভ্রান্তি থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করে। এই শব্দটি কুরআনে দশবার ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাঝে ছয়বার ব্যবহৃত হয়েছে হজরত ইবরাহিম আ.-এর প্রসঙ্গ আলোচনায় আর চারবার ব্যবহৃত হয়েছে এমন একজনের প্রসঙ্গে যে আল্লাহ তায়ালার পথে আন্তরিক ও দৃঢ়ভাবে নিয়োজিত। হানিফ শব্দটি হচ্ছে আন্তরিকতা, দৃঢ়তা, এবং আল্লাহ তায়ালার পথে একাগ্রতার সমন্বয়ে তৈরি।

ক. ইবরাহিম আ.-এর উদাহরণ
ইবরাহিম আ.-এর পুরো জীবনই আল্লাহ তায়ালার পথে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার উদাহরণে ভরপুর। এখানে আমরা তাঁর দুটো অসাধারণ গুণের দৃষ্টান্ত দিচ্ছি:

খ. আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা
ইবরাহিম আ. আল্লাহ তায়ালাকে এমনভাবে ভালোবাসতেন যে তিনি আল্লাহ তায়ালার প্রতি প্রেম ও আনুগত্যকে দুনিয়ার আর সব আকর্ষণ-এর উপরে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন,

আমি (পার্থিব সকল আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে) একমুখী হয়ে নিজের লক্ষ্য সেই মহান সত্তার দিকে কেন্দ্রীভূত করছি যিনি জমিন ও আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন (সুরা আন'আম ৬: ৭৯)।

তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ও সত্তাকে আল্লাহ তায়ালার অধীন করেছিলেন। তিনি শরীর ও আত্মা দিয়ে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করেছেন। ইবরাহিম আ. উপলব্ধি করেছিলেন যে আল্লাহ তায়ালার বিধানকে সর্বত্র কায়েম করতে হবে তা যেমন মানুষের হৃদয়ে তেমনি মানুষের ঘরে, যেমন চিন্তায় তেমন আচরণে, যেমন ব্যক্তিগত জীবনে তেমনি জনজীবনে। আল্লাহ তায়ালার পথে তাঁর আত্মসমর্পণ ছিল সম্পূর্ণরূপে তাঁর অন্তর থেকে উদ্ভূত। আল্লাহ তায়ালার পথে অন্তহীন পথ চলাই ছিল তাঁর সারা জীবনের মূল লক্ষ্য তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সম্মান করে নাম দেন খলিলুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বন্ধু (সুরা নিসা ৪: ১২৫)।

গভীর আন্তরিকতার সাথে তিনি বলতে পেরেছেন,

আমার নামাজ, আমার ইবাদতসমূহ, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই সারা জাহানের রব আল্লাহ তায়ালারই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমাকে এভাবেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সর্বপ্রথম আনুগত্যের মাথা অবনতকারী হচ্ছি আমি নিজে (সুরা আন'আম ৬: ১৬২-১৬৩)।

গ. আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ আস্থা
ইবরাহিম আ.-কে আল্লাহ তায়ালা সম্ভাব্য সকল উপায়ে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই কোনো পরীক্ষায় ধৈর্যহারা হননি। যখনই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে কোনো কাজের আদেশ করতেন তখনই তিনি বলতেন,

আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম (সুরা বাকারা ২: ১৩১)।

তিনি আরও বলেছিলেন: হে আল্লাহ তায়ালা যদি তুমি আমাকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে জীবন্ত দগ্ধ করতে চাও, আমি তার জন্যও প্রস্তুত! যদি তুমি আমাকে সংসার ত্যাগ করতে আদেশ করো, আমি সেজন্যও প্রস্তুত! যদি তুমি চাও যে আমি আমার স্ত্রী এবং আমার পুত্রকে এমন জায়গায় নির্বাসন দেই যেখানে কোনো আশ্রয় নেই, কোনো খাবার নেই, তাদের রক্ষার জন্য কেউ নেই, তবুও আমি তোমার আদেশ পালনে প্রস্তুত। এমনকি তুমি যদি চাও তোমার আদেশে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য আমি আমার সবচাইতে প্রিয় বস্তু আমার প্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালাতেও প্রস্তুত আছি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এভাবে সম্মানিত করেছেন যে তাঁর পদ্ধতি অনুসরণ করে আজও প্রতি বছর মিলিয়ন-মিলিয়ন মানুষ আল্লাহ তায়ালার ঘর বায়তুল্লাহর পথে যায় এবং সেখানে তাওয়াফের সময় তারা ইবরাহিম আ.-এর কথার প্রতিধ্বনি করেণ,

আমি উপস্থিত, হে প্রভু আমি এখানে উপস্থিত,
হে প্রভু আমি তোমার বাধ্যানুগত, আমি সর্বদাই তোমার বাধ্যানুগত
আমি সর্বদা তোমার প্রতি সমর্পিত, আমি সর্বদা তোমার উৎসর্গিকৃত।

ইবরাহিম আ. আল্লাহতায়ালাকে একমাত্র প্রভু এবং একমাত্র আনুগত্যের উৎস হিসেবে বরণ করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালার সকল আদেশের প্রতি ছিল তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্য। তিনি আল্লাহ তায়ালার আদেশে মুহূর্তের নোটিশে নির্দ্বিধায় সর্বস্ব পরিত্যাগ করতে সবসময় প্রস্তুত থাকতেন। আল্লাহ তায়ালার প্রতি তাঁর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা ছিল চূড়ান্ত। তাঁর এই আল্লাহ তায়ালা নির্ভরতার কথা কুরআনে উদাহরণ হিসেবে এসেছে এভাবে,

যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট (সুরা তালাক ৬৫ : ৩)।

আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত এবং সফল বান্দা হতে চাইলে আমাদের নিয়ত: কুরআনের এ কথার প্রতিধ্বনি করতে হবে এবং তদনুযায়ী চলতে হবে:

হাসবুনাল্লাহি নিয়মাল ওয়াকিল (আল্লাহ তায়ালাই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং সর্বোত্তম কর্ম অভিভাবক) (সুরা আলে ইমরান ৩ : ১৭৩)।

আল্লাহ তায়ালার পথে ইবরাহিম আ.-এর মতো হানিফ হতে চাইলে আপনাকেও নিজ জীবনে ইবরাহিম আ.-এর মতো আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসতে হবে; তিনি যেমন আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (আস্থাবান ও নির্ভরশীল) ছিলেন তেমন হতে হবে এবং তিনি যেমন আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য জীবনের সবকিছু ত্যাগে সদা প্রস্তুত ছিলেন আপনাকেও তেমন সতত প্রস্তুত থাকতে হবে। কুরআনের ভাষায়:

প্রত্যেকের একটি লক্ষ্য রয়েছে, যেদিকে সে অগ্রসর হয়। কাজেই তোমরা কল্যাণের জন্য প্রতিযোগিতার সাথে অগ্রসর হও (সুরা বাকারা, ২: ১৪৮)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 জিহাদ-আল্লাহ তায়ালার পথে সংগ্রাম

📄 জিহাদ-আল্লাহ তায়ালার পথে সংগ্রাম


আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হলে এরপর যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে তা হচ্ছে আপনার এবং আপনার পার্শ্ববর্তীদের হৃদয়ে সর্বান্তকরণে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা এবং আদেশকেই সবার উপর ক্রিয়াশীল করতে সকল উদ্যম নিয়োজিত করা। আপনাকে অবশ্যই সকল মানুষকে আল্লাহ তায়ালার পথে আনতে উদ্যোগী হতে হবে তাদের সামনে সত্যের সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়ানোর মাধ্যমে, যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

আর এভাবেই তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মৎ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তোমরা দুনিয়ার মানুষের সামনে সত্যের সাক্ষ্য হও আর রসুল সা. যেন সাক্ষী হন তোমাদের জন্য (সুরা বাকারা ২: ১৪৩)।

রসুল সা.-এর জীবনী থেকে আমরা পাই যে, তাঁর কাছে প্রথম যে বিশ্বকাঁপানো ঐশী বাণী এসেছিলো তা হচ্ছে ইকুরা অর্থাৎ পড়ো। (সুরা আলাক ৯৬: ১-৫)।

এই বাণী লাভ করে তিনি কেঁপে উঠেছিলেন। এর পরেই যে ঐশী বাণী আসে তাতে বলা হয়েছিল,

জেগে উঠো এবং (লোকদের সতর্ক করো)! আর তোমার খোদার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো (সুরা মুদ্দাস্সির ৭৪: ২-৩)।

এই আদেশের পর পরই রসুল সা. নির্দ্বিধায় একাগ্রচিত্তে আল্লাহ তায়ালার আদেশ বাস্তবায়নে নেমে পড়েন এবং আমরা দেখি যে সুকঠিন বাধাও তাঁকে তাঁর পথ থেকে টলাতে পারেনি।

জগতের সকল প্রভুত্বের আনুগত্য ছিন্ন করে সবার উপর আল্লাহ তায়ালার প্রাধান্য ঘোষণা করার কাজটি সহজ নয়। সকল কায়েমি স্বার্থবাদী মহলই এমন আহ্বান-কারীকে রুখে দাঁড়াবে। তাইতো আমরা দেখি যে আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে গিয়ে রসুল সা. কে সর্বোচ্চ ত্যাগ বা হিজরত করতে হয়েছে। তারপর তাঁকে জীবনপণ করে সর্বস্ব নিয়োগ করে প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেন:

এবং আল্লাহ তায়ালার পথে জিহাদ করো যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিজের কাজের জন্য বাছাই করে নিয়েছেন। আর দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি। আর তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের উপর প্রতিষ্ঠিত হও (সুরা হাজ্জ ২২:৭৮)।

প্রকৃতপক্ষে মুমিন তো তারাই যারা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলের প্রতি ইমান এনেছে, অতঃপর কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালার পথে জিহাদ করেছে। তারাই সত্যবাদী সত্যনিষ্ঠ লোক (সুরা হুজুরাত ৪৯: ১৫)।

জেহাদি জীবন লাভ করতে হলে কিছু যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তা হচ্ছে: কুরআনের জ্ঞান এবং কুরআনমুখী জীবন, আল্লাহ তায়ালার উপর দৃঢ় ইমান, ধৈর্য এবং অটল সংকল্প। কুরআন পড়লে আপনি নিজে দেখবেন যে দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্যের জন্য আপনাকে এসব বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে।

ক. জ্ঞানার্জন
পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে নিজের জীবনের মিশন সফল করতে এবং তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হলে সবার আগে নিজেকে ইসলামের জ্ঞানের বলে বলীয়ান করতে হবে। রসুল সা. বলেছেন: আল্লাহ তায়ালা যাঁর কল্যাণ চান তাঁকে দ্বীনের যথাযথ জ্ঞান প্রদান করেন (বুখারি, মুসিলম)। যাদের দ্বীনের যথার্থ জ্ঞান আছে কুরআন তাদের তাগিদ দেয় এই জ্ঞানকে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে।

যে জানে এবং যে জানে না এরা উভয়েই কি কখনো সমান হতে পারে? শুধুমাত্র বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরাই নসিহত কবুল করে থাকে (সূরা যুমার, ৩৯: ৯)।

তোমাদের মধ্যে যারা ইমানদার এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তায়ালা তাদের সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন (সুরা মুজাদালা, ৫৮: ১১)।

প্রকৃত কথা এই যে আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের মধ্যে কেবল ইলম-সম্পন্ন লোকেরা তাঁকে ভয় করে (সুরা ফাতির ৩৫: ২৮)।

রসুল সা. তাঁর বহুসংখ্যক হাদিসে একথা বলেছেন যে যারা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে অপরিসীম পুরস্কার।

যদি কেউ জ্ঞানের সন্ধানে ভ্রমণ করে, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বেহেশতে ভ্রমণের সুযোগ দেবেন। ফেরেশতারা তাদের উপর খুশি হয়ে তাদের ডানা জ্ঞানান্বেষণের সন্ধানীর উপর প্রসারিত করে দিবেন। পৃথিবী এবং বেহেশতের সবকিছু এমনকি পানির গভীরে বাসরত মাছও একজন জ্ঞানীর জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করে। এবং একজন সাধারণ ইবাদত গুজার ব্যক্তির চাইতে জ্ঞানী ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের তুলনা হতে পারে সকল তারকারাজির উপর পূর্ণ চাঁদের সাথে (আহমদ)।

নিজেকে শিক্ষিত করতে আপনি নিম্নবর্ণিত কাজের ধারা অনুসরণ করতে পারেন:

* কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কের গভীর জ্ঞান ও বুঝ অর্জনের সঠিক অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করুন।
* আপনার পড়া, লেখা ও বলার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করুন।
* দৈনন্দিন ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ও সচেতন থাকতে নিয়মিত সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও জার্নাল পড়ুন।
* সমসাময়িক সামাজিক ইস্যু ও সমস্যাসমূহ সম্পর্কে সঠিক বুঝ লাভে সচেষ্ট হোন।
* মুসলিম উম্মাহর সমস্যা সম্পর্কে এমন গভীর জ্ঞান লাভের চেষ্টা করুন যাতে করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আপনি নিজে এসবের সমাধান বিষয়ে চিন্তা করতে পারেন।
* আকারে ছোট হলেও একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার (বইয়ের ভাণ্ডার) প্রতিষ্ঠা করুন এবং ইসলাম সম্পর্কিত বই দিয়ে তা সমৃদ্ধ করুন।

খ. আগে নিজে আমল করুন
অন্তরে একবার প্রকৃত ইমান প্রতিষ্ঠিত হলে এবং তা জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলে জীবন সত্যই সৎকর্মে সমৃদ্ধ বৃক্ষের মতো হবে। প্রকৃত ইমান যা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় তা অবশ্যই জীবনকে পুনর্গঠিত করে এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহ তায়ালার সাহচর্যে সমৃদ্ধ হয়ে ইসলামের মূর্ত প্রতীক হয়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

এই মরুচারী লোকেরা বলে, আমরা ইমান এনেছি; এদেরকে বলে দাও তোমরা ইমান আনোনি, বরং বলো যে, আমরা অনুগত হয়েছি। ইমান এখনও তোমাদের দিলে প্রবিষ্ট হয়নি (সুরা হুজুরাত ৪৯: ১৪)।

একইভাবে কুরআনে শুধুমাত্র মুখে ইমানের স্বীকৃতি ও কাজে তার বিপরীত আচরণকারীকে তিরস্কার করা হয়েছে এই ভাষায়:

হে নবি! সেইসব লোক যারা প্রতিযোগিতা করে কুফরির পথে অগ্রসর হচ্ছে তারা যেন তোমার দুশ্চিন্তার কারণ না হয়, তারা সেসব লোক যারা মুখে বলে আমরা ইমান এনেছি কিন্তু তাদের দিল ইমান গ্রহণ করেননি (সুরা মায়েদা ৫: ৪১)।

এমনকি ইমানদারদেরও আল্লাহ তায়ালা ইমান অর্জন করতে তাগিদ দিয়েছেন এভাবে:
হে ইমানদারগণ, ইমান আনো আল্লাহ তায়ালার প্রতি, তাঁর রসুলের প্রতি এবং এই কিতাবের প্রতি যা আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেছেন (সুরা নিসা ৪: ১৩৬)।

আরও বলা হয়েছে:

ইমান আনো আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসুলের উপর এবং ব্যয় করো সেই সম্পদ হতে যেসবের উপর তিনি তোমাদের খলিফা বানিয়েছেন (সুরা হাদিদ ৫৭: ৭)।

কুরআনের যেখানেই ইমানের আলোচনা এসেছে সেখানেই বাস্তব জীবনে ইমানের প্রতিফলনের কথা এমনভাবে এসেছে যাতে বুঝা যায় যে জীবনের সাথে সম্পর্কহীন কোনোোকিছু ইমান হতে পারে না। আল্লাজিনা আমানু ওয়া আমিলুস সোয়ালিহাত (যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে)।

সত্যিকার ইমানের সাথে আনুষ্ঠানিক ইবাদত এবং পুরোপুরি ইবাদতপূর্ণ জীবন- যা সমাজে ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করে-এর সম্পর্কে কুরআনে বহু জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে।

তুমি কি দেখেছো সেই ব্যক্তিকে যে পরকালের বিচারকে অবিশ্বাস করে? এতো সেই লোক যে এতিমকে গলাধাক্কা দেয় আর মিসকিনকে খাবার দিতে উৎসাহিত করে না। পরন্তু ধ্বংস সেই নামাজিদের জন্য যারা নিজেদের নামাজের ব্যাপারে গাফিলতি করে। যারা লোক দেখায় মাত্র। আর (প্রতিবেশীদের) দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিস দিতে অস্বীকার করে (সুরা মাউন ১০৭: ১-৫)।

আমরা রসুল সা.-এর হাদিস অধ্যয়ন করলে উপলব্ধি করতে পারি যে, তিনি জীবনের কত বিস্তৃত কর্মপরিধি ও দায়িত্ব পালনের সাথে ইমানকে যুক্ত করছেন। কয়েকটি হাদিস দেখা যাক-

তোমাদের কেউ ইমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমাদের সকল ইচ্ছা আমার ইচ্ছার অনুগামী না হয়। (শরহে আল সুন্নাহ)।
মুমিন এবং কাফেরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামাজ (মুসলিম)।
যখন কেউ জেনা করে তখন সে ইমানদার নয়, যখন কেউ চুরি করে তখন সে ইমানদার নয়, যখন কেউ মদ্যপান করে তখন সে ইমানদার নয়, যখন কেউ অন্যের সম্পদ লুট করে তখন সে ইমানদার নয়, যখন কেউ প্রতারণা করে তখন সে ইমানদার নয় (বুখারি, মুসলিম)।
অবৈধ অর্থে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মাংশ (শরীর) বেহেশতে প্রবেশ করবে না, অবৈধ আয়ে বর্ধিত গোশতের জন্য দোজখই উত্তম আশ্রয় (আহমদ)।

সর্বোপরি মনে রাখুন দ্বীনের একজন দায়ী অর্থাৎ ইসলামের দিকে দাওয়াত দানকারী হিসেবে মানুষের কাছে নিজেকে একজন উত্তম এবং অনুকরণীয় মডেল হিসেবে আপনার নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সবচাইতে জরুরি হচ্ছে আপনার কথা ও কাজের মিল; যে পথে আপনি মানুষকে ডাকছেন সে পথে চলার বাস্তব উদাহরণ নিজেকে পেশ করতে হবে। যাদের জীবনে কথার সাথে কাজের মিল নেই তাদের আল্লাহ তায়ালা কুরআনে তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করেছেন:

হে ইমানদারগণ তোমরা এমন কথা কেন বলো যা কার্যত তোমরা করো না? আল্লাহ তায়ালার নিকট এটা অত্যন্ত ক্রোধ- উদ্রেককারী ব্যাপার যে তোমরা বলবে এমন কথা যা তোমরা করো না (সুরা আস সফ ৬১: ২-৩)।

তোমরা অন্য লোকদের ন্যায় পথ অবলম্বন করতে বলো, কিন্তু নিজেদের কথা তোমরা ভুলে যাও; অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন করতে থাকো, তোমাদের বুদ্ধি কি কোনো কাজেই লাগাও না (সুরা বাকারা ২:৪৪)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 সারসংক্ষেপ

📄 সারসংক্ষেপ


সহজ সরল পথে (সিরাতুল মুস্তাকিম) চলার জন্য কুরআন কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম হচ্ছে, দৃঢ়ভাবে আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে ধারণ করা।

আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার মানে হচ্ছে আপনি আপনার সকল অর্জনের জন্য শুধুমাত্র তাঁরই হামদ ও শুকর করবেন, শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করবেন, পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে আল্লাহ তায়ালাকে বেশি ভালোবাসবেন, শুধুমাত্র তাঁর জন্য সংগ্রাম করবেন এবং হানিফ হতে চেষ্টা করবেন।

একই সাথে আল্লাহ তায়ালার রজ্জু ধারণের বাধা গুলোর কথা খেয়াল রাখবেন, এগুলো হচ্ছে গর্ব, শঠতা, হতাশা, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, জিহ্বার (কথা) অসংযত ব্যবহার এবং অননুমোদিত যৌন লালসা।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেদায়াতের পথে চালিত করুন, কারণ তিনি যাকেই চান তাকেই হেদায়াতের পথে চালিত করেন (সুরা ইউনুস, ১০: ২৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00