📄 আল্লাহ তায়ালার ইবাদত
আমাদের সব প্রাপ্তি আর অর্জনই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালার দান এই অনুভূতি অন্তরে প্রতিষ্ঠার পর আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে তা হচ্ছে সার্বিকভাবে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে ততক্ষণ পর্যন্ত তাক্বওয়া অর্জিত হবে না, যতক্ষণ না সকল কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
হে মানবজাতি, শুধুমাত্র তোমাদের প্রভুর ইবাদত করো যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকল লোকেরই সৃষ্টিকর্তা; তোমাদের তাক্বওয়া বা সত্যপথ অর্জনের এটাই পথ (সুরা বাকারা ২: ২১)।
আপনাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন আপনার ক্বলব বা হৃদয় পুরোপুরি এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহ তায়ালার দিকে সমর্পিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
হে ইমানাদরগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের মধ্যে দাখিল হও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না (সুরা বাকারা ২:২০৮)।
আল্লাহ তায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র সঠিক পথ হচ্ছে ইসলাম (আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ) (সুরা আলে ইমরান, ৩: ৮৫)।
আপনার হৃদয় বা সত্তাকে বিভক্ত করা যায় না। এমনটা সম্ভব নয় যে আপনার হৃদয়ের এক প্রকোষ্টকে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিয়োজিত করলেন আর অন্য প্রকোষ্টকে ভিন্ন কোনো খোদার (যেমন সম্পদ/পদমর্যাদা/ক্যারিয়ার/পরিবার) আনুগত্যে নিয়োজিত করলেন।
কুরআনের এই চমৎকার আয়াতে এ ধরনের দ্বৈত আনুগত্যের বা দোটানা ইমানের অসারতা সফলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে মক্কার মুশরিকরা পশু কুরবানি করে বলত, এই পশুর এক অংশ আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং অন্য অংশ দেবতার (মূর্তি) জন্য নিবেদিত। সেই আয়াতে এটা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে আল্লাহ তায়ালা যা শুধুমাত্র তাঁর উদ্দ্যেশ্যে পরিপূর্ণভাবে নিবেদিত নয় তা ছাড়া অন্য কোনো অর্ঘ্য কবুল করেন না। তিনি অবিভাজ্য একক সত্তা এবং তিনি মানবজাতির কাছ থেকেও অবিভাজ্য আনুগত্য ও ইবাদত প্রত্যাশা করেন। যতক্ষণ আমাদের হৃদয় শতদিকের ভাবনায় নিয়োজিত থাকবে, যতক্ষণ আমাদের চোখ বিভিন্ন লক্ষ্যে দৃষ্টিপাত করবে, যতক্ষণ আমাদের আনুগত্য বিভিন্ন দিকে নিবেদিত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবো না।
কেন আমরা আমাদের হৃদয়কে এক আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিবেদিত না করে বিভিন্নমুখী আনুগত্যে নিয়োজিত করবো? এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের সঙ্গে যাবে না তার জন্য আমরা যত পরিশ্রমই করি না কেন বা তা যত মূল্যবানই হোক না কেন। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত যে, যেই মহান পুরস্কারের জন্য আমাদের সকল সাধ্য সাধনা নিয়োজিত করা উচিত তা কোন মানুষের পক্ষে প্রদান সম্ভব নয়। একমাত্র আমাদের মহান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহুয়াতায়ালার পক্ষেই আমাদের গোটা জীবনের চেষ্টার বিনিময়ে একটি সফল সার্থক ও পরিপূর্ণ পুরস্কার প্রদান সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
হে ইমানদারগণ আমি কি তোমাদের এমন একটি ব্যবসার কথা বলবো না যা তোমাদেকে কষ্টদায়ক আজাব থেকে মুক্তি দিবে (সুরা আস সফ, ৬১: ১০)?
আর এই ব্যবসা আপনার পুরো সত্ত্বাকে অবিভাজ্য রেখে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিয়োজিত করার মাধ্যমে, তাঁর তুষ্টি অর্জনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব।
📄 ইবাদতে আন্তরিকতা
সবকিছু আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে তথা ফি সাবিলিল্লাহ করার মানে কি? যা হচ্ছে আমাদের জীবনের মূল। অনেক মানুষই তার পার্থিব জীবন এবং ধর্মীয় জীবন কে আলাদা করে চিন্তা করে। অথচ শুধুমাত্র সেসব কাজগুলোই যা আল্লাহ তায়ালার উদ্দ্যেশ্যে তাঁর নিয়মানুযায়ী করা হবে তার সবই ধর্মীয় কাজ। আর যেসব কাজ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হবে না তার কোনোটিই (যদি তার মধ্যে লোক দেখানো ইবাদতও থাকে) ধর্মীয় কাজ বলে গণ্য হবে না। যদি কোনো মানুষ শুধুমাত্র অন্যকে দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে বা রোজা রাখে তবে তার নামাজ বা রোজাও দুনিয়াবি কাজেই পর্যবসিত হবে। অন্যদিকে সে যদি দুনিয়াবি কাজের মাধ্যমে হাজার হাজার পাউণ্ড ও উপার্জন করে এই নিয়তে যে সে এই অর্থ তার পরিবারের ভরণ পোষণে ও আল্লাহ তায়ালার পথে ব্যয় করবে তবে তার এই অর্থ উপার্জনের কাজটিও হবে ধর্মীয় এবং আধ্যত্মিক কাজের অন্তর্ভুক্ত। রসুল সা. বলেছেন, অনেকেই রোজা রাখে কিন্তু এই রোজা থেকে সে উপবাস আর তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই পায় না। আবার অনেকে সারারাত নফল নামাজ পড়ে এবং তা থেকে শুধু নিদ্রাহীন রজনি ছাড়া আর কিছুই পায় না (দারিমি)।
আমাদের যে দিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে ইবাদত এর উদ্দ্যেশ্যের দিকে, তার বহিরাবরণের দিকে নয়। আমরা যত গভীর মনোযোগ সহকারে ইবাদতের বাহ্যিক পদ্ধতি তথা প্রোটোকল অনুসরণ করি না কেন, সব ইবাদতের পেছনে আমাদের আন্তরিকতা আর নিয়তের বিশুদ্ধতাই আসল কথা। রসুল সা. বলেছেন,
নিশ্চয়ই কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল (বুখারি, মুসলিম)।
মনে রাখবেন, কাজের উদ্দেশ্য আর লক্ষ্য হচ্ছে একটি শরীরের আত্মার মতো বা একটি বীজের মাঝে অন্তনির্হিত নবজীবন (ভ্রুণ) এর মতো। বহু বীজই দেখতে একরকম হয়। কিন্তু তাদের মাঝ থেকে যখন চারা গজায় এবং বিকশিত গাছে যখন ফল হয় তখন বীজগুলোর পার্থক্য বুঝা যায়। যত বিশুদ্ধ এবং উচ্চমানের নিয়ত হবে ততই আপনার বিনিময়ে পাওয়া ফল তত বড় হবে। আপনার দৈনন্দিনের সকল কাজের নেপথ্যের নিয়ত এর কথা বারবার চিন্তা করুন। সম্ভবত নিয়তের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার এটাই প্রকৃষ্ট উপায়।
📄 আল্লাহ তায়ালার প্রেম
যারা আল্লাহ তায়ালার রজ্জু দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরতে চায় তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
যাদের ইমান আছে তারা সবার উপর আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসাকে স্থান দেয় (সুরা বাকারা ২: ১৬৫)।
লক্ষ্য করুন, কুরআনে এটা বলা হয়নি যে মানুষ শুধু আল্লাহ তায়ালাকেই ভালোবাসবে। ভালোবাসা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত এবং তা জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতে তবে, সর্বাগ্রে এবং সর্বোচ্চে থাকবে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা।
ভালোবাসা বলতে কি বুঝায়? সম্ভবত এটা এমন সুগভীর অনুভবের বিষয় যা পূর্ণভাবে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যেভাবে আমরা বৈজ্ঞানিক সত্যকে সূত্র দিয়ে বুঝাই সেভাবে ভালোবাসাকে বুঝানো যায় না। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি এবং বুঝি ভালোবাসা কী এবং তার কত অসীম শক্তি। বস্তুত মানব জীবনের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি এই ভালোবাসার। এটা আপনাকে তার অনুগামী বানিয়ে ফেলে, আপনাকে চালিত করে যার পরিণামে আপনি আপনার ভালোবাসার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকেন। যখন আপনার মাঝে কারো প্রতি ভালোবাসা থাকবে তখন আপনি শুধু আপনার উপর তার ব্যাপারে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেই খালাস হবেন না বরং তার সামগ্রিক চাওয়া পাওয়ার বিষয়ে সদা-সচেতন থাকবেন। ইমান হচ্ছে এমন কিছু যা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মাঝে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলের প্রতি এমন ধরনের ভালোবাসা তৈরি করে, তখন সে সবার উপর আল্লাহ তায়ালার পছন্দ-অপছন্দকে স্থান দেয়। যতক্ষণ আপনার হৃদয়ে এমন আল্লাহ তায়ালা প্রেম তৈরি না হবে ততক্ষণ আপনার মাঝে পূর্ণ ইমান আসবে না।
আল্লাহ তায়ালার প্রতি এমন গভীর প্রেম-ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের জীবন থেকে পালিয়ে কোনো মন্দিরে বা আশ্রমে গিয়ে ধ্যানমগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এই ভালোবাসা আমাদের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করা যায় আমাদের জীবনের সর্বত্র সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার পছন্দ অনুযায়ী কর্তব্য সম্পাদন করার মাধ্যমে; তা সে পরিবারেই হোক, অফিসেই হোক বা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে বা পথে ঘাটেই হোক না কেন। আল্লাহ তায়ালার প্রতি এমন ভালোবাসা লালন করে এবং এই ভালোবাসার জন্য যত কাজ, ত্যাগ বা কুরবানি করতে হয় তা করার মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালার প্রেম অর্জন করা যায়। বস্তুত এই ভালোবাসা আমাদের সমাজ বিচ্ছিন্ন না করে আরও বেশি করে আল্লাহ তায়ালার বান্দা ও তাঁর সৃষ্টিকূলের প্রতি দায়িত্ব সম্পাদনে সচেষ্ট করে। আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম আন্তরিক ভালোবাসা আমাদেরকে তাঁর বান্দার প্রতি আরও যত্নবান করে তোলে।
আপনার মাঝে আল্লাহ তায়ালার প্রতি এ ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়েছে কিনা তা আপনি অতি সহজেই পরখ করতে পারেন। যদি আপনি কাউকে ভালবাসেন তবে আপনি সবসময় তার আরও নিকটতর হতে চেষ্টা করবেন। ইসলামে আল্লাহ তায়ালার নিকটবর্তী হওয়ার এবং তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়ার মাধ্যম হচ্ছে সালাত। রসুল সা. বলেছেন, যখন বান্দা নামাজ আদায় করে তখন সে আল্লাহ তায়ালার সন্নিকটে উপনীত হয় এবং তাঁর সাথে কথা বলে। কাজেই যদি আপনি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন কীভাবে আপনি দিনে পাঁচবার নামাজ পড়েন, আপনার নামাজ সত্যিকার অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সাথে সংলাপের মতো হয় কিনা, তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনার মাঝে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা কতটুকু সৃষ্টি হয়েছে।
যখন আপনি আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ছেন, তখন আপনি তার সামনে দণ্ডায়মান, আপনি তাঁর অতি নিকটে, আপনি তার সাথে কথা বলছেন, আপনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাইছেন। নামাজ শুধুমাত্র এমন কোনো আনুষ্ঠনিকতা নয় যে আপনি কিছু শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করলেন। বরং নামাজে আপনার আত্মা যেন আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসায় বিভোর হয়ে পুরোপুরি তাঁর কাছে সমর্পিত হয়। এই ভালোবাসা হচ্ছে একটি বীজের মতো যতই এটা আপনার অন্তরে বিকশিত হয় ততই তা আপনার সমগ্র ব্যক্তিত্বকে আচ্ছন্ন করবে।
ইহসান-ইবাদতের প্রাণ
আমাদের মনকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণে নিয়োজিত করতে এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়াতে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সুন্দরভাবে কিছু উপায় বলেছেন:
প্রতিটি জিনিস যা পৃথিবীতে রয়েছে তা ধ্বংস হবে এবং কেবলমাত্র তোমার মহিয়ান, মহানুভব খোদার মহান চেহারাই (সত্তা) চিরকাল অস্তিত্বমান থাকবে (সুরা আর রহমান ৫৫: ২৬-২৭)।
জগতের সবকিছুই ধ্বংস হবে শুধুমাত্র আমাদের মহান রবের মহিমান্বিত চেহারা (সত্তা) ছাড়া। আর এই মহিমান্বিত চেহারার (সত্তার) সাহচর্যের আর ভালোবাসার প্রত্যাশাই আপনাকে করতে হবে। এখানে আল্লাহ তায়ালার চেহারা বলতে আবার এমনটি বুঝায় না যে আল্লাহ তায়ালা পাকেরও মানুষের মতো মুখমণ্ডল আছে। কিন্তু যদি আপনি কাউকে ভালোবাসেন তবে আপনি সর্বদাই তার চেহারার দিকে তাকাতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। আপনি সর্বদা সেই মুখের সাহচর্য চাইবেন এবং তার সন্তুষ্টির বা সুখের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবেন। কাজেই যখন কুরআন আল্লাহপাকের চেহারার কথা বলে তখন তা আমাদের সেই চেহারার/মুখমণ্ডলের দর্শন, সাহচর্য বা ভালোবাসা পেতে সচেতন করে। আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেখছেন এবং আমরা এমন কোনো কাজ যেন না করি যা তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে পারে। রসুল সা.-কে যখন ইহসানের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, ইহসান মানে হচ্ছে তুমি এমনভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো, যদি তুমি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে নিশ্চিতই তিনি তোমাকে দেখছেন (বুখারি, মুসলিম)।
যদি আপনি সবসময়ই নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেন যে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ইবাদতের সময়, লেখাপড়ার সময়, যখন আপনি আপনার পরিবারকে সময় দিচ্ছেন তখন, আপনার ইসলামি দাওয়া কাজের সময় অর্থাৎ এক কথায় প্রতিনিয়ত আপনার সকল কাজের সময়ই আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দেখছেন তখনই আপনি নিজেকে ইহসানের পথে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারবেন। ইহসান হচ্ছে ইবাদতে সাফল্যের সোপান। ইবাদতে ইহসান আমাদের আল্লাহ তায়ালার সবচাইতে নিকটবর্তী করে। এটা আমাদের সকল কাজকে তার প্রকৃত লক্ষ্যের অনুসারী করে এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
📄 আল্লাহ তায়ালার পথে হানিফ হওয়া
যারা আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরতে চায় তাদের অবশ্যই হানিফ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। হানিফ বলতে বুঝায় এমন একজনকে যে নিজেকে যাবতীয় মিথ্যা এবং ভ্রান্তি থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করে। এই শব্দটি কুরআনে দশবার ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাঝে ছয়বার ব্যবহৃত হয়েছে হজরত ইবরাহিম আ.-এর প্রসঙ্গ আলোচনায় আর চারবার ব্যবহৃত হয়েছে এমন একজনের প্রসঙ্গে যে আল্লাহ তায়ালার পথে আন্তরিক ও দৃঢ়ভাবে নিয়োজিত। হানিফ শব্দটি হচ্ছে আন্তরিকতা, দৃঢ়তা, এবং আল্লাহ তায়ালার পথে একাগ্রতার সমন্বয়ে তৈরি।
ক. ইবরাহিম আ.-এর উদাহরণ
ইবরাহিম আ.-এর পুরো জীবনই আল্লাহ তায়ালার পথে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার উদাহরণে ভরপুর। এখানে আমরা তাঁর দুটো অসাধারণ গুণের দৃষ্টান্ত দিচ্ছি:
খ. আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা
ইবরাহিম আ. আল্লাহ তায়ালাকে এমনভাবে ভালোবাসতেন যে তিনি আল্লাহ তায়ালার প্রতি প্রেম ও আনুগত্যকে দুনিয়ার আর সব আকর্ষণ-এর উপরে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন,
আমি (পার্থিব সকল আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে) একমুখী হয়ে নিজের লক্ষ্য সেই মহান সত্তার দিকে কেন্দ্রীভূত করছি যিনি জমিন ও আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন (সুরা আন'আম ৬: ৭৯)।
তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ও সত্তাকে আল্লাহ তায়ালার অধীন করেছিলেন। তিনি শরীর ও আত্মা দিয়ে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করেছেন। ইবরাহিম আ. উপলব্ধি করেছিলেন যে আল্লাহ তায়ালার বিধানকে সর্বত্র কায়েম করতে হবে তা যেমন মানুষের হৃদয়ে তেমনি মানুষের ঘরে, যেমন চিন্তায় তেমন আচরণে, যেমন ব্যক্তিগত জীবনে তেমনি জনজীবনে। আল্লাহ তায়ালার পথে তাঁর আত্মসমর্পণ ছিল সম্পূর্ণরূপে তাঁর অন্তর থেকে উদ্ভূত। আল্লাহ তায়ালার পথে অন্তহীন পথ চলাই ছিল তাঁর সারা জীবনের মূল লক্ষ্য তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সম্মান করে নাম দেন খলিলুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বন্ধু (সুরা নিসা ৪: ১২৫)।
গভীর আন্তরিকতার সাথে তিনি বলতে পেরেছেন,
আমার নামাজ, আমার ইবাদতসমূহ, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই সারা জাহানের রব আল্লাহ তায়ালারই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমাকে এভাবেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সর্বপ্রথম আনুগত্যের মাথা অবনতকারী হচ্ছি আমি নিজে (সুরা আন'আম ৬: ১৬২-১৬৩)।
গ. আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ আস্থা
ইবরাহিম আ.-কে আল্লাহ তায়ালা সম্ভাব্য সকল উপায়ে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই কোনো পরীক্ষায় ধৈর্যহারা হননি। যখনই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে কোনো কাজের আদেশ করতেন তখনই তিনি বলতেন,
আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম (সুরা বাকারা ২: ১৩১)।
তিনি আরও বলেছিলেন: হে আল্লাহ তায়ালা যদি তুমি আমাকে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে জীবন্ত দগ্ধ করতে চাও, আমি তার জন্যও প্রস্তুত! যদি তুমি আমাকে সংসার ত্যাগ করতে আদেশ করো, আমি সেজন্যও প্রস্তুত! যদি তুমি চাও যে আমি আমার স্ত্রী এবং আমার পুত্রকে এমন জায়গায় নির্বাসন দেই যেখানে কোনো আশ্রয় নেই, কোনো খাবার নেই, তাদের রক্ষার জন্য কেউ নেই, তবুও আমি তোমার আদেশ পালনে প্রস্তুত। এমনকি তুমি যদি চাও তোমার আদেশে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য আমি আমার সবচাইতে প্রিয় বস্তু আমার প্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালাতেও প্রস্তুত আছি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এভাবে সম্মানিত করেছেন যে তাঁর পদ্ধতি অনুসরণ করে আজও প্রতি বছর মিলিয়ন-মিলিয়ন মানুষ আল্লাহ তায়ালার ঘর বায়তুল্লাহর পথে যায় এবং সেখানে তাওয়াফের সময় তারা ইবরাহিম আ.-এর কথার প্রতিধ্বনি করেণ,
আমি উপস্থিত, হে প্রভু আমি এখানে উপস্থিত,
হে প্রভু আমি তোমার বাধ্যানুগত, আমি সর্বদাই তোমার বাধ্যানুগত
আমি সর্বদা তোমার প্রতি সমর্পিত, আমি সর্বদা তোমার উৎসর্গিকৃত।
ইবরাহিম আ. আল্লাহতায়ালাকে একমাত্র প্রভু এবং একমাত্র আনুগত্যের উৎস হিসেবে বরণ করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালার সকল আদেশের প্রতি ছিল তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্য। তিনি আল্লাহ তায়ালার আদেশে মুহূর্তের নোটিশে নির্দ্বিধায় সর্বস্ব পরিত্যাগ করতে সবসময় প্রস্তুত থাকতেন। আল্লাহ তায়ালার প্রতি তাঁর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা ছিল চূড়ান্ত। তাঁর এই আল্লাহ তায়ালা নির্ভরতার কথা কুরআনে উদাহরণ হিসেবে এসেছে এভাবে,
যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট (সুরা তালাক ৬৫ : ৩)।
আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত এবং সফল বান্দা হতে চাইলে আমাদের নিয়ত: কুরআনের এ কথার প্রতিধ্বনি করতে হবে এবং তদনুযায়ী চলতে হবে:
হাসবুনাল্লাহি নিয়মাল ওয়াকিল (আল্লাহ তায়ালাই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং সর্বোত্তম কর্ম অভিভাবক) (সুরা আলে ইমরান ৩ : ১৭৩)।
আল্লাহ তায়ালার পথে ইবরাহিম আ.-এর মতো হানিফ হতে চাইলে আপনাকেও নিজ জীবনে ইবরাহিম আ.-এর মতো আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসতে হবে; তিনি যেমন আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (আস্থাবান ও নির্ভরশীল) ছিলেন তেমন হতে হবে এবং তিনি যেমন আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য জীবনের সবকিছু ত্যাগে সদা প্রস্তুত ছিলেন আপনাকেও তেমন সতত প্রস্তুত থাকতে হবে। কুরআনের ভাষায়:
প্রত্যেকের একটি লক্ষ্য রয়েছে, যেদিকে সে অগ্রসর হয়। কাজেই তোমরা কল্যাণের জন্য প্রতিযোগিতার সাথে অগ্রসর হও (সুরা বাকারা, ২: ১৪৮)।