📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 আল্লাহ তায়ালার শুকুরগুজার হওয়া

📄 আল্লাহ তায়ালার শুকুরগুজার হওয়া


আল্লাহ তায়ালার রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণকারীদের মধ্যে শামিল হতে প্রথম যে গুণ আমাদের অর্জন করতে হবে তা হচ্ছে নিজের জীবন, সম্পদ, মেধা, স্বাস্থ্য, সবকিছুর জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকুরগুজার হতে হবে। আপনাকে এটা নিত্য অনুভব করতে হবে যে আপনার অস্তিত্ব এবং প্রতিমুহূর্তের স্থায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আপনার যা কিছু আছে তার সব প্রাপ্তির জন্য প্রশংসার প্রাপ্য হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও অনুমোদন ভিন্ন কোনো বান্দার পক্ষে আপনার জন্য কল্যাণ বা ক্ষতি কিছুই করা সম্ভব নয়। তাঁর রহমত ও বরকত সীমাহীন এবং সর্বব্যাপ্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

অনন্তর যিনি সৃষ্টি করতে পারেন আর যে কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না উভয় কি সমান? তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত সমূহকে গণনা করতে চাও, তবে তা গুনতে পারো না, প্রকৃত কথা এই যে, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান; অথচ তিনি তোমাদের প্রকাশ্য এবং গোপন সকল বিষয় অবহিত (সুরা নাহল ১৬: ১৭-১৯)।

এ কারনেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবি ইবরাহিম আ. কে বলতে বলেছিলেন:

আল্লাহ সেই সত্তা যিনি আমাকে পয়দা করেছেন এবং তারপর আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। যিনি আমাকে খাওয়ান ও পান করান, আর যখন আমি রোগক্রান্ত হয়ে পড়ি তখন আমাকে আরোগ্য দান করেন, যিনি আমাকে মৃত্যু দিবেন এবং পরে আবার জীবন দান করবেন; আর যাঁর নিকট আমি আশা পোষণ করি যে, বিচার দিনে তিনি আমার ত্রুটিসূমহ মাফ করে দিবেন (সুরা আশ-শুআরা ২৬: ৭৮-৮২)।

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালা শুকর ও কুফরের তুলনা করেছেন (সুরা বাকারা ২: ১৫২, সুরা লোকমান ৩১: ১২)।

ইমান আর শুকর বা কৃতজ্ঞতাবোধ সমার্থক আর কুফর এবং অকৃতজ্ঞতা সমার্থক। একজন অবিশ্বাসী বা কাফের হচ্ছে সেই সত্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ যার কাছ থেকে সে সবকিছু পায়। অপরদিকে একজন মুমিন বা বিশ্বাসী হচ্ছে সেই সত্ত্বার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ যার কাছ থেকে সে সবকিছু পায়। সে স্বস্ফূর্তভাবে বলে,

নিঃসন্দেহে আমার খোদা বড়ই দয়াবান এবং নিজ সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী (সুরা হৃদ ১১: ৯০)।

অতএব ইমান অর্জনের পূর্বশর্ত আল্লাহ তায়ালার প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসাজ্ঞাপন করা। যদি আপনি আল্লাহ তায়ালার প্রতি অকৃতজ্ঞও হন তবু তাতে আল্লাহ তায়ালার কিছুই ক্ষতি হয় না বরং আপনার ইমানই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকর গুজার হওয়া সত্যিকার ইমানদার হওয়ার লক্ষ্যে প্রথম প্রদক্ষেপ। এজন্যেই রসুল সা. আমাদের বলেছেন, আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাস, কারণ আমরা নিত্য তাঁর দয়ায় উপকৃত হই (তিরমিজি)।

প্রতি মুহূর্তে প্রতি অবস্থায় আমরা আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার প্রভাব ও অস্তিত্ব অনুভব করি। তাঁর অটল সিংহাসনে বসে তিনি সবকিছু সৃষ্টি, বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন। গোটা জগৎকে তিনি পরিচালনা ও সুরক্ষা করছেন। তাঁর অজ্ঞাতে বা তাঁর অনিচ্ছা বা বিনা অনুমতিতে একটি গাছের পাতাও নড়ে না। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

যা কিছু মাটিতে প্রবিষ্ট হয়, যা কিছু তা হতে নিষ্কৃত হয় আর যা কিছু আকাশমণ্ডল হতে অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাতে উত্থিত হয় তা সবকিছুই তাঁর জানা আছে। তিনি তোমাদের সঙ্গেই রয়েছেন। তোমরা যেখানেই থাক, যে কাজই কর তা তিনি দেখছেন (সুরা হাদিদ ৫৭:৪)।

আমাদের জীবনে যা কিছুই ঘটে এমন কি যেসব বিষয়কে আমরা ব্যক্তিগত ইচ্ছার ফসল বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে মনে করি সেগুলোও প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। কাজেই আমাদের এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে এমনকি আমাদের দুঃখ কষ্ট বা বিপর্যয় এর মাঝেও কোনো কল্যাণ নিহিত থাকতে পারে যদি আমরা তার মধ্যে ধৈর্যধারণ করতে পারি। রসুল সা. বলেছেন, একজন মুমিনের বিষয়টি কী সুন্দর! তার জীবনে যা কিছু ঘটে সে তা থেকে কল্যাণ লাভ করে। যদি সে কিছু সুখ বা সম্পদ লাভ করে এবং তার জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তবে এই সম্পদ প্রাপ্তি তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আবার যদি সে কোনো বিপদে পড়ে এবং আল্লাহ তায়ালার উপর আস্থা ও ধৈর্য রাখে তবে এই ধৈর্য্যধারণও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে (মুসলিম)।

লক্ষ্য করুন, কুরআন মজিদের প্রথম ভূমিকায় আল্লাহ তায়ালার পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে আর-রাহমান আর রাহিম (দয়াময়, অনন্তদাতা) হিসাবে (সুরা ফাতিহা ১: ১)।

আল্লাহ তায়ালা নিজে তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলছেন যে তিনি পরম দয়াময় ও পরম ক্ষমাশীল। তিনি সকল বান্দাকেই সাহায্য করেন। এমনকি যারা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ বা বিদ্রোহী তারাও তাঁর সাহায্য মুখাপেক্ষী,

বস্তুত আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতি বড়ই অনুগ্রহদানকারী। কিন্তু অধিকাংশ লোকই তাঁর শুকর আদায় করে না (সুরা বাকারা ২: ২৪৩)।

আপনার নিজের জীবনের দিকে তাকালে এমন অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ দেখবেন যখন একমাত্র আল্লাহ তা'আলার হাত আপনাকে রক্ষা করেছে এবং সাহায্য করেছে। প্রায়ই আমরা আলহামদুলিল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করি, আমাদের জীবনে এই শব্দের অন্তর্নিহিত প্রভাব পুরো না বুঝেই। কুরআন খোদ রসূল সা. কে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, তাঁর জীবনের শুরুতে কীভাবে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ও মদদ তাঁর সহায় হয়েছে,

তিনি কি আপনাকে এতিম রূপে পাননি এবং পরে আশ্রয় দান করেন নাই? তিনি আপনাকে পথ-অনভিজ্ঞ রূপে পেয়েছেন এবং তিনি আপনাকে হেদায়েত দিয়েছেন; আর তিনি আপনাকে নিঃস্ব দরিদ্র অবস্থায় পেয়েছেন এবং পরে সচ্ছল বানিয়েছেন। অতএব আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না এবং প্রার্থীকে বিমুখ করবেন না (সূরা দুহা ৯৩ : ৬-১০)।

বস্তুত এই কথা শুধু রসূল সা.-এর জীবনেই সত্য নয় বরং আমাদের সবার ক্ষেত্রে এটা সত্য। পৃথিবীতে আমাদের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি নিশ্বাসে প্রতি মুহূর্তে আমরা আল্লাহ তা'আলার সাহায্যের মুখাপেক্ষী। এমনকি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পরও হাশরের বিচার পর্যন্ত আমরা আল্লাহ তা'আলার দয়ার উপরেই নির্ভরশীল। কাজেই প্রতিনিয়ত নিজের সত্তাকে স্মরণ করিয়ে দিন যে আপনার গোটা অস্তিত্বই আল্লাহ তা'আলার দয়ার উপর নির্ভরশীল। তিনি আপনার প্রভু, পালনকর্তা ও রক্ষাকারী। বিশেষ যা কিছু অস্তিত্ববান তার সবকিছুই তিনি রক্ষাকর্তা। অতএব সকাল থেকে সাঁজ পর্যন্ত আপনার জিহ্বা যেন তাঁর প্রশংসাতেই সিক্ত থাকে, যার বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর তাঁর সাহায্য ও রহমত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তিনি বলেন:

যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে আমি তোমাদের আরো বেশি বেশি দান করবো (সূরা ইবরাহীম ১৪ : ৭)।

এটা হচ্ছে আপনার ঈমানের অন্যতম ভিত্তি এবং ইসলামি জীবন বিধানে প্রবেশের পথ। যদি আপনি ঈমানের তথা আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্কের এই প্রথম অধ্যায় ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন তবেই আপনার আল্লাহ তা'আলার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

যে কেউ আল্লাহ তা'আলার তক্বওয়াহ করবে, তার তক্বওয়াহ তার নিজের জন্যই কল্যাণকর হবে (সূরা লোকমান ৩১ : ১২)।

আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ এবং তাঁর রহমত তোমাদের ত্যাগ করেননি; অন্যথায় তোমরা বহু পূর্বেই ধ্বংস হয়ে যেতে (সুরা বাকারা ২: ৬৪)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 আল্লাহ তায়ালার ইবাদত

📄 আল্লাহ তায়ালার ইবাদত


আমাদের সব প্রাপ্তি আর অর্জনই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালার দান এই অনুভূতি অন্তরে প্রতিষ্ঠার পর আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে তা হচ্ছে সার্বিকভাবে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে ততক্ষণ পর্যন্ত তাক্বওয়া অর্জিত হবে না, যতক্ষণ না সকল কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

হে মানবজাতি, শুধুমাত্র তোমাদের প্রভুর ইবাদত করো যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকল লোকেরই সৃষ্টিকর্তা; তোমাদের তাক্বওয়া বা সত্যপথ অর্জনের এটাই পথ (সুরা বাকারা ২: ২১)।

আপনাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন আপনার ক্বলব বা হৃদয় পুরোপুরি এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহ তায়ালার দিকে সমর্পিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

হে ইমানাদরগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের মধ্যে দাখিল হও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না (সুরা বাকারা ২:২০৮)।

আল্লাহ তায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র সঠিক পথ হচ্ছে ইসলাম (আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ) (সুরা আলে ইমরান, ৩: ৮৫)।

আপনার হৃদয় বা সত্তাকে বিভক্ত করা যায় না। এমনটা সম্ভব নয় যে আপনার হৃদয়ের এক প্রকোষ্টকে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিয়োজিত করলেন আর অন্য প্রকোষ্টকে ভিন্ন কোনো খোদার (যেমন সম্পদ/পদমর্যাদা/ক্যারিয়ার/পরিবার) আনুগত্যে নিয়োজিত করলেন।

কুরআনের এই চমৎকার আয়াতে এ ধরনের দ্বৈত আনুগত্যের বা দোটানা ইমানের অসারতা সফলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে মক্কার মুশরিকরা পশু কুরবানি করে বলত, এই পশুর এক অংশ আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং অন্য অংশ দেবতার (মূর্তি) জন্য নিবেদিত। সেই আয়াতে এটা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে আল্লাহ তায়ালা যা শুধুমাত্র তাঁর উদ্দ্যেশ্যে পরিপূর্ণভাবে নিবেদিত নয় তা ছাড়া অন্য কোনো অর্ঘ্য কবুল করেন না। তিনি অবিভাজ্য একক সত্তা এবং তিনি মানবজাতির কাছ থেকেও অবিভাজ্য আনুগত্য ও ইবাদত প্রত্যাশা করেন। যতক্ষণ আমাদের হৃদয় শতদিকের ভাবনায় নিয়োজিত থাকবে, যতক্ষণ আমাদের চোখ বিভিন্ন লক্ষ্যে দৃষ্টিপাত করবে, যতক্ষণ আমাদের আনুগত্য বিভিন্ন দিকে নিবেদিত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আল্লাহ তায়ালার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবো না।

কেন আমরা আমাদের হৃদয়কে এক আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিবেদিত না করে বিভিন্নমুখী আনুগত্যে নিয়োজিত করবো? এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের সঙ্গে যাবে না তার জন্য আমরা যত পরিশ্রমই করি না কেন বা তা যত মূল্যবানই হোক না কেন। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত যে, যেই মহান পুরস্কারের জন্য আমাদের সকল সাধ্য সাধনা নিয়োজিত করা উচিত তা কোন মানুষের পক্ষে প্রদান সম্ভব নয়। একমাত্র আমাদের মহান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহুয়াতায়ালার পক্ষেই আমাদের গোটা জীবনের চেষ্টার বিনিময়ে একটি সফল সার্থক ও পরিপূর্ণ পুরস্কার প্রদান সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

হে ইমানদারগণ আমি কি তোমাদের এমন একটি ব্যবসার কথা বলবো না যা তোমাদেকে কষ্টদায়ক আজাব থেকে মুক্তি দিবে (সুরা আস সফ, ৬১: ১০)?

আর এই ব্যবসা আপনার পুরো সত্ত্বাকে অবিভাজ্য রেখে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে নিয়োজিত করার মাধ্যমে, তাঁর তুষ্টি অর্জনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 ইবাদতে আন্তরিকতা

📄 ইবাদতে আন্তরিকতা


সবকিছু আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে তথা ফি সাবিলিল্লাহ করার মানে কি? যা হচ্ছে আমাদের জীবনের মূল। অনেক মানুষই তার পার্থিব জীবন এবং ধর্মীয় জীবন কে আলাদা করে চিন্তা করে। অথচ শুধুমাত্র সেসব কাজগুলোই যা আল্লাহ তায়ালার উদ্দ্যেশ্যে তাঁর নিয়মানুযায়ী করা হবে তার সবই ধর্মীয় কাজ। আর যেসব কাজ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হবে না তার কোনোটিই (যদি তার মধ্যে লোক দেখানো ইবাদতও থাকে) ধর্মীয় কাজ বলে গণ্য হবে না। যদি কোনো মানুষ শুধুমাত্র অন্যকে দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে বা রোজা রাখে তবে তার নামাজ বা রোজাও দুনিয়াবি কাজেই পর্যবসিত হবে। অন্যদিকে সে যদি দুনিয়াবি কাজের মাধ্যমে হাজার হাজার পাউণ্ড ও উপার্জন করে এই নিয়তে যে সে এই অর্থ তার পরিবারের ভরণ পোষণে ও আল্লাহ তায়ালার পথে ব্যয় করবে তবে তার এই অর্থ উপার্জনের কাজটিও হবে ধর্মীয় এবং আধ্যত্মিক কাজের অন্তর্ভুক্ত। রসুল সা. বলেছেন, অনেকেই রোজা রাখে কিন্তু এই রোজা থেকে সে উপবাস আর তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই পায় না। আবার অনেকে সারারাত নফল নামাজ পড়ে এবং তা থেকে শুধু নিদ্রাহীন রজনি ছাড়া আর কিছুই পায় না (দারিমি)।

আমাদের যে দিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে ইবাদত এর উদ্দ্যেশ্যের দিকে, তার বহিরাবরণের দিকে নয়। আমরা যত গভীর মনোযোগ সহকারে ইবাদতের বাহ্যিক পদ্ধতি তথা প্রোটোকল অনুসরণ করি না কেন, সব ইবাদতের পেছনে আমাদের আন্তরিকতা আর নিয়তের বিশুদ্ধতাই আসল কথা। রসুল সা. বলেছেন,

নিশ্চয়ই কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল (বুখারি, মুসলিম)।

মনে রাখবেন, কাজের উদ্দেশ্য আর লক্ষ্য হচ্ছে একটি শরীরের আত্মার মতো বা একটি বীজের মাঝে অন্তনির্হিত নবজীবন (ভ্রুণ) এর মতো। বহু বীজই দেখতে একরকম হয়। কিন্তু তাদের মাঝ থেকে যখন চারা গজায় এবং বিকশিত গাছে যখন ফল হয় তখন বীজগুলোর পার্থক্য বুঝা যায়। যত বিশুদ্ধ এবং উচ্চমানের নিয়ত হবে ততই আপনার বিনিময়ে পাওয়া ফল তত বড় হবে। আপনার দৈনন্দিনের সকল কাজের নেপথ্যের নিয়ত এর কথা বারবার চিন্তা করুন। সম্ভবত নিয়তের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার এটাই প্রকৃষ্ট উপায়।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 আল্লাহ তায়ালার প্রেম

📄 আল্লাহ তায়ালার প্রেম


যারা আল্লাহ তায়ালার রজ্জু দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরতে চায় তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

যাদের ইমান আছে তারা সবার উপর আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসাকে স্থান দেয় (সুরা বাকারা ২: ১৬৫)।

লক্ষ্য করুন, কুরআনে এটা বলা হয়নি যে মানুষ শুধু আল্লাহ তায়ালাকেই ভালোবাসবে। ভালোবাসা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত এবং তা জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতে তবে, সর্বাগ্রে এবং সর্বোচ্চে থাকবে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা।

ভালোবাসা বলতে কি বুঝায়? সম্ভবত এটা এমন সুগভীর অনুভবের বিষয় যা পূর্ণভাবে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যেভাবে আমরা বৈজ্ঞানিক সত্যকে সূত্র দিয়ে বুঝাই সেভাবে ভালোবাসাকে বুঝানো যায় না। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি এবং বুঝি ভালোবাসা কী এবং তার কত অসীম শক্তি। বস্তুত মানব জীবনের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি এই ভালোবাসার। এটা আপনাকে তার অনুগামী বানিয়ে ফেলে, আপনাকে চালিত করে যার পরিণামে আপনি আপনার ভালোবাসার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকেন। যখন আপনার মাঝে কারো প্রতি ভালোবাসা থাকবে তখন আপনি শুধু আপনার উপর তার ব্যাপারে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেই খালাস হবেন না বরং তার সামগ্রিক চাওয়া পাওয়ার বিষয়ে সদা-সচেতন থাকবেন। ইমান হচ্ছে এমন কিছু যা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মাঝে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলের প্রতি এমন ধরনের ভালোবাসা তৈরি করে, তখন সে সবার উপর আল্লাহ তায়ালার পছন্দ-অপছন্দকে স্থান দেয়। যতক্ষণ আপনার হৃদয়ে এমন আল্লাহ তায়ালা প্রেম তৈরি না হবে ততক্ষণ আপনার মাঝে পূর্ণ ইমান আসবে না।

আল্লাহ তায়ালার প্রতি এমন গভীর প্রেম-ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের জীবন থেকে পালিয়ে কোনো মন্দিরে বা আশ্রমে গিয়ে ধ্যানমগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এই ভালোবাসা আমাদের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করা যায় আমাদের জীবনের সর্বত্র সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার পছন্দ অনুযায়ী কর্তব্য সম্পাদন করার মাধ্যমে; তা সে পরিবারেই হোক, অফিসেই হোক বা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে বা পথে ঘাটেই হোক না কেন। আল্লাহ তায়ালার প্রতি এমন ভালোবাসা লালন করে এবং এই ভালোবাসার জন্য যত কাজ, ত্যাগ বা কুরবানি করতে হয় তা করার মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালার প্রেম অর্জন করা যায়। বস্তুত এই ভালোবাসা আমাদের সমাজ বিচ্ছিন্ন না করে আরও বেশি করে আল্লাহ তায়ালার বান্দা ও তাঁর সৃষ্টিকূলের প্রতি দায়িত্ব সম্পাদনে সচেষ্ট করে। আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম আন্তরিক ভালোবাসা আমাদেরকে তাঁর বান্দার প্রতি আরও যত্নবান করে তোলে।

আপনার মাঝে আল্লাহ তায়ালার প্রতি এ ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়েছে কিনা তা আপনি অতি সহজেই পরখ করতে পারেন। যদি আপনি কাউকে ভালবাসেন তবে আপনি সবসময় তার আরও নিকটতর হতে চেষ্টা করবেন। ইসলামে আল্লাহ তায়ালার নিকটবর্তী হওয়ার এবং তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়ার মাধ্যম হচ্ছে সালাত। রসুল সা. বলেছেন, যখন বান্দা নামাজ আদায় করে তখন সে আল্লাহ তায়ালার সন্নিকটে উপনীত হয় এবং তাঁর সাথে কথা বলে। কাজেই যদি আপনি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন কীভাবে আপনি দিনে পাঁচবার নামাজ পড়েন, আপনার নামাজ সত্যিকার অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সাথে সংলাপের মতো হয় কিনা, তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনার মাঝে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা কতটুকু সৃষ্টি হয়েছে।

যখন আপনি আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ছেন, তখন আপনি তার সামনে দণ্ডায়মান, আপনি তাঁর অতি নিকটে, আপনি তার সাথে কথা বলছেন, আপনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাইছেন। নামাজ শুধুমাত্র এমন কোনো আনুষ্ঠনিকতা নয় যে আপনি কিছু শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করলেন। বরং নামাজে আপনার আত্মা যেন আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসায় বিভোর হয়ে পুরোপুরি তাঁর কাছে সমর্পিত হয়। এই ভালোবাসা হচ্ছে একটি বীজের মতো যতই এটা আপনার অন্তরে বিকশিত হয় ততই তা আপনার সমগ্র ব্যক্তিত্বকে আচ্ছন্ন করবে।

ইহসান-ইবাদতের প্রাণ
আমাদের মনকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণে নিয়োজিত করতে এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়াতে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সুন্দরভাবে কিছু উপায় বলেছেন:

প্রতিটি জিনিস যা পৃথিবীতে রয়েছে তা ধ্বংস হবে এবং কেবলমাত্র তোমার মহিয়ান, মহানুভব খোদার মহান চেহারাই (সত্তা) চিরকাল অস্তিত্বমান থাকবে (সুরা আর রহমান ৫৫: ২৬-২৭)।

জগতের সবকিছুই ধ্বংস হবে শুধুমাত্র আমাদের মহান রবের মহিমান্বিত চেহারা (সত্তা) ছাড়া। আর এই মহিমান্বিত চেহারার (সত্তার) সাহচর্যের আর ভালোবাসার প্রত্যাশাই আপনাকে করতে হবে। এখানে আল্লাহ তায়ালার চেহারা বলতে আবার এমনটি বুঝায় না যে আল্লাহ তায়ালা পাকেরও মানুষের মতো মুখমণ্ডল আছে। কিন্তু যদি আপনি কাউকে ভালোবাসেন তবে আপনি সর্বদাই তার চেহারার দিকে তাকাতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। আপনি সর্বদা সেই মুখের সাহচর্য চাইবেন এবং তার সন্তুষ্টির বা সুখের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবেন। কাজেই যখন কুরআন আল্লাহপাকের চেহারার কথা বলে তখন তা আমাদের সেই চেহারার/মুখমণ্ডলের দর্শন, সাহচর্য বা ভালোবাসা পেতে সচেতন করে। আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেখছেন এবং আমরা এমন কোনো কাজ যেন না করি যা তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে পারে। রসুল সা.-কে যখন ইহসানের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, ইহসান মানে হচ্ছে তুমি এমনভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো, যদি তুমি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে নিশ্চিতই তিনি তোমাকে দেখছেন (বুখারি, মুসলিম)।

যদি আপনি সবসময়ই নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেন যে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ইবাদতের সময়, লেখাপড়ার সময়, যখন আপনি আপনার পরিবারকে সময় দিচ্ছেন তখন, আপনার ইসলামি দাওয়া কাজের সময় অর্থাৎ এক কথায় প্রতিনিয়ত আপনার সকল কাজের সময়ই আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দেখছেন তখনই আপনি নিজেকে ইহসানের পথে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারবেন। ইহসান হচ্ছে ইবাদতে সাফল্যের সোপান। ইবাদতে ইহসান আমাদের আল্লাহ তায়ালার সবচাইতে নিকটবর্তী করে। এটা আমাদের সকল কাজকে তার প্রকৃত লক্ষ্যের অনুসারী করে এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00