📄 আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা পূরণ
রোজাকালীন মানুষের তিনটি অতি জরুরি শারীরিক চাহিদাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসিমুখে ত্যাগ করতে হয়। এগুলো হচ্ছে খাদ্য, পানীয় এবং ঘুম। তখন মুমিনের কাছে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা ক্ষতিকর মনে না হয়ে আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টিকেই ক্ষতিকর মনে হয়। শারীরিক পরিতৃপ্তি অর্জনের চাইতে আল্লাহ তায়ালার তুষ্টি অর্জনকেই বেশি আনন্দের এবং আরামের মনে হয়। কাজেই তখন মানুষের ভালোলাগা না লাগার স্বাভাবিক মানদণ্ডটাই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় উল্টে যায়। সে অনুসারে সুখ, বেদনা, সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এখানে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য মানুষের শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয় বরং মানুষের প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি তাঁর ইচ্ছার অনুগামী করা। শরীরকে এভাবে তৈরি করা যেন সে আল্লাহ তায়ালার আদেশ অনুসারেই ভোগ করবে, তার বাইরে নয়। যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন যে শরীর সারাদিন আল্লাহ তায়ালার আদেশে অভুক্ত থেকেছে তা আবার আল্লাহ তায়ালারই আদেশে যথা দ্রুত ইফতার গ্রহণে ব্যস্ত হয় (কারণ, এখন আল্লাহ তায়ালা দ্রুত ইফতার করা পছন্দ করেন)। যা কিছু দিনের বেলা তাঁর আদেশে নিষিদ্ধ ছিল এখন সেসব আবার তাঁরই আদেশে অনুমোদিত হয়ে গিয়েছে। একইভাবে সেহরি খেতে আল্লাহ তায়ালা তাগিদ দিয়েছেন তাই মানুষ ভোর রাতে আরাম-শয্যা ত্যাগ করে সেহরি খাচ্ছে। রোজা এবং নামাজ যেমন ইবাদত তেমনি আল্লাহ তায়ালার আদেশে পানাহারও (ইফতার ও সেহরি) ইবাদত।
📄 ইচ্ছাশক্তি
রোজা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে বলিষ্ঠ করে। রসুল মুহাম্মদ সা. বলেছেন, রোজা ঢাল স্বরূপ (দোজখের আগুন থেকে আত্মরক্ষার ঢাল স্বরূপ) (বুখারি)। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার আদেশে পানাহার ও যৌনতৃপ্তি থেকে নিজেকে বিরত রেখে একজন মুমিন এই শিক্ষাই লাভ করে যে এরপর থেকে সে যেন তার জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুমোদিত সীমার বাইরে কোনো কিছুই গ্রহণ, বর্জন বা স্পর্শ না করে। এভাবে একজন মানুষ তার প্রবৃত্তির দাস না হয়ে বাস্তবিকভাবেই আল্লাহ তায়ালার দাস হয়ে উঠে।
অনেকের পক্ষে রোজার এই দীর্ঘ সময় ক্ষুধা-পিপাসায় কষ্ট করা, রাতে নিদ্রাহীন থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। বস্তুত আমরা এমন এক বস্তুবাদী সভ্যতার মাঝে বাস করছি যখন সব কিছুই আর্থিক মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়। কাজেই এমন যুগে রোজার পানাহার ও নিদ্রাত্যাগের গুরুত্ব বুঝতে একটু বেগ পেতেই হবে। ইসলাম মতে, আমরা সৃষ্টি হয়েছি এমন এক জীবন পরিচালনা করতে যা শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালারই ইচ্ছা ও আদেশ অনুসারে চালিত হবে। সব লাভ-ক্ষতির মাপকাঠির ঊর্ধ্বে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিকে স্থান দিতে হবে। এভাবে চিন্তা করলে রোজায় পানাহার ত্যাগের গুরুত্ব বুঝা যাবে। এটা মুমিন জীবনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যেন তার শরীর-মন-আত্মা সবকিছু পূর্ণভাবে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে গড়ে উঠে।
📄 শয়তান থেকে আত্মরক্ষা
রোজা আমাদের শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষায় সক্ষম ক'রে তোলে। রসুল সা. বলেছেন, যখন আমরা রোজা রাখি তখন যেন আমাদের চোখ যে কোনো নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকে; কান যেন অশণ্টীল ও মন্দ কথা শোনা থেকে বিরত থাকে; জিহ্বা যেন অন্যায় ও অশণ্টীল কথা বলা থেকে বিরত থাকে; এবং হৃদয় যেন অসৎ চিন্তা থেকে বিরত থাকে (বুখারি)। রসুল সা. আরও বলেছেন, পাঁচটি বিষয় মানুষের রোজা নষ্ট করে যথা: মিথ্যা কথা বলা, গিবত করা, বদনাম রটানো, মিথ্যা সাক্ষ্য বা শপথ করা এবং লালসার দৃষ্টি দেওয়া (আযদি) (ইমাম গাজ্জালী'র এহইয়াউ উলুমুদ্দিন এ উদ্ধৃত)।
📄 আপনার জিকিরকে সংগঠিত করুন
এতক্ষণ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ের যত ধরনের জিকিরের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা করা হল সেগুলো ক্রমান্বয়ে আপনার প্রতিদিনের ইবাদত, অধ্যয়ন ও কর্মতৎপরতার মধ্যে বাস্তবায়ন করুন। প্রতিদিন একটু সময় আলাদা করে নিন শুধু এই জিকিরের জন্য যখন আপনার মাঝে দুনিয়াবি কোনো চিন্তার অনুপ্রবেশ থাকবে না। এভাবে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও নিয়মিত জিকির আপনাকে আল্লাহ তায়ালার কাছে উপনীত করবে এবং তাঁর দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থার সাথে আপনি একাত্ম হয়ে যাবেন।
প্রতিদিন সকালে ফজর নামাজের পর কিছু জিকির করে আল্লাহ তায়ালার হুকুম অনুযায়ী পুরো দিন কাটানোর প্রতিজ্ঞা করুন। এভাবে জিকিরের পর সারাদিন যেন তাঁর পথে থাকা যায় সেই প্রার্থনা করে দোয়া করুন। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং কুরআনে বলেছেন,
হে ইমানদারগণ বার বার আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করো। সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর মহিমা ঘোষণা করো (সুরা আহজাব, ৩৩: ৪১)।
এভাবে ফজরের পর জিকির ও দোয়া শেষে কিছু সময় কুরআন অধ্যয়ন করুন। ফজরের পর কুরআন অধ্যয়ন আপনার পক্ষে সাক্ষ্য হবে (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ৭৮)।
যদি ফজরের পর সম্ভব না হয় তবে দিনের অন্য যে কোনো সময় অন্তত অল্প পরিমাণ হলেও কুরআন অধ্যয়ন করুন। একটি দিনও যেন আপনার জীবনে কুরআন ছাড়া না যায়। কুরআন অধ্যয়নের বাইরে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বরাদ্দ রাখুন পরিকল্পিত অধ্যয়নের জন্য যা এমন একটি সিলেবাসের অংশ হবে যাতে থাকবে কুরআন ও হাদিস নির্ভর সাহিত্য, শরিয়ত বা ইসলামি আইন, উসুল-আল-ফিকাহ বা ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্স, সিরাত বা নবিজীবনী এবং ইসলামও মুসলমানদের ইতিহাস।
সম্ভবত ইসলাম সম্পর্কে শেখার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখা যিনি আপনার চাইতে বেশি জ্ঞান রাখেন। কাজেই আপনি চেষ্টা করবেন বিভিন্ন ইসলামি পাঠচক্র, প্রশিক্ষণ কোর্স ও ক্যম্পে অংশ নিতে। আপনি নতুন নতুন ইসলামি জ্ঞান লাভ করার সাথে আপনার পরিবারের সদস্যদের এবং আপনার সহকর্মীদের প্রতি আপনার দায়িত্ব ভুলে যাবেন না। আপনার সময় থেকে কিছু সময় আলাদা করে রাখুন তাদের ইসলামি জ্ঞান দেওয়ার প্রয়োজনে।
এভাবে আল্লাহ তায়ালার পথে কর্মব্যস্ত দিন কাটানোর শেষে মাগরিবের নামাজের পর যখন রাত শুরু হবে তখন জিকিরের আর একটি পর্যায় শুরু হবে। এটা শুরু হবে আল্লাহ তায়ালার কাছে রাত্রিকালীন নিরাপত্তা প্রার্থনা করে। এশার পর রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে একবার গভীরভাবে চিন্তা করুন আপনার আজকের সারাদিনের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে। সারাদিনে আপনি যেসব ভালো কাজ করেছেন, যেসব কাজে সফল হয়েছেন তার জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। কারণ আল্লাহ তায়ালাই আপনাকে সাফল্য অর্জনে সক্ষম করেছেন। যেসব কাজে আপনি ব্যর্থ হয়েছেন তার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে বিনয় ও নিষ্ঠার সাথে ক্ষমা চান। অতঃপর আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে আপনার দুর্বলতাসমূহ দূর করে দেওয়ার জন্য এবং আপনার সামর্থ্য বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সাহায্য এবং নির্দেশনা চেয়ে দোয়া করার মাধ্যমে দিনটি শেষ করুন।