📄 সিয়াম (রোজা)
তাক্বিয়া অর্জনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে সিয়াম বা রোজা পালন। সকল ধরনের আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে রোজার বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থান রয়েছে। একটি হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে: মানুষের প্রতিটি কাজের পুরস্কার অনেকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। ক্ষেত্র বিশেষে তা দশ থেকে সাতশত গুণ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোজা হচ্ছে এর ব্যতিক্রম। কারণ এটা একান্তভাবে আমারই জন্য এবং আমি নিজে এর প্রতিদান দিবো তা আমার যত ইচ্ছা (বুখারি, মুসলিম)।
রোজার মূল অর্জন হচ্ছে এই যে, এটা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত গুণে সমৃদ্ধ করে। কুরআন যাকে বলেছে তাক্বওয়া :
হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো (সুরা বাকারা, ২: ১৮৩)।
তাক্বওয়া হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও আনুকূল্য অর্জনের সবচাইতে মৌলিক পূবশর্ত। তাক্বওয়ার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা-সচেতনতা, আল্লাহ তায়ালার প্রতি দায়িত্ব বোধ, জবাবদিহিতা, তাঁর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এবং আন্তরিক হওয়া। এটা এমন গুণ যা আমাদের আল্লাহ তায়ালার প্রতি দায়িত্ব পালনে প্রেরণা যোগায়। তাক্বওয়ার ভিত্তিতেই আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের মূল্যায়ন করেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে বেশি তাক্বওয়া সম্পন্ন। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাময় (সুরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩)।
আমাদের অবশ্যই তাক্বওয়া অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়োজিত করতে হবে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা আদেশ করেছেন:
নিশ্চয়ই তাক্বওয়াই হচ্ছে উত্তম পাথেয়। অতএব হে দূর দৃষ্টিসম্পন্ন লোকগণ, সর্বদা আমার কথা স্মরণ রেখো (সুরা বাকারা, ২: ১৯৭)।
রোজা আমাদের সর্বক্ষণ আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও ভীতি জাগ্রত রাখতে শিক্ষা দেয়। এটা আমাদের অন্তরে এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটায় যা আমাদের তাক্বওয়া অর্জনে সাহায্য করে। এসব বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি এখানে আলোচনা করা হলো-
📄 আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা পূরণ
রোজাকালীন মানুষের তিনটি অতি জরুরি শারীরিক চাহিদাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসিমুখে ত্যাগ করতে হয়। এগুলো হচ্ছে খাদ্য, পানীয় এবং ঘুম। তখন মুমিনের কাছে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা ক্ষতিকর মনে না হয়ে আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টিকেই ক্ষতিকর মনে হয়। শারীরিক পরিতৃপ্তি অর্জনের চাইতে আল্লাহ তায়ালার তুষ্টি অর্জনকেই বেশি আনন্দের এবং আরামের মনে হয়। কাজেই তখন মানুষের ভালোলাগা না লাগার স্বাভাবিক মানদণ্ডটাই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় উল্টে যায়। সে অনুসারে সুখ, বেদনা, সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এখানে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য মানুষের শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয় বরং মানুষের প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি তাঁর ইচ্ছার অনুগামী করা। শরীরকে এভাবে তৈরি করা যেন সে আল্লাহ তায়ালার আদেশ অনুসারেই ভোগ করবে, তার বাইরে নয়। যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন যে শরীর সারাদিন আল্লাহ তায়ালার আদেশে অভুক্ত থেকেছে তা আবার আল্লাহ তায়ালারই আদেশে যথা দ্রুত ইফতার গ্রহণে ব্যস্ত হয় (কারণ, এখন আল্লাহ তায়ালা দ্রুত ইফতার করা পছন্দ করেন)। যা কিছু দিনের বেলা তাঁর আদেশে নিষিদ্ধ ছিল এখন সেসব আবার তাঁরই আদেশে অনুমোদিত হয়ে গিয়েছে। একইভাবে সেহরি খেতে আল্লাহ তায়ালা তাগিদ দিয়েছেন তাই মানুষ ভোর রাতে আরাম-শয্যা ত্যাগ করে সেহরি খাচ্ছে। রোজা এবং নামাজ যেমন ইবাদত তেমনি আল্লাহ তায়ালার আদেশে পানাহারও (ইফতার ও সেহরি) ইবাদত।
📄 ইচ্ছাশক্তি
রোজা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে বলিষ্ঠ করে। রসুল মুহাম্মদ সা. বলেছেন, রোজা ঢাল স্বরূপ (দোজখের আগুন থেকে আত্মরক্ষার ঢাল স্বরূপ) (বুখারি)। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার আদেশে পানাহার ও যৌনতৃপ্তি থেকে নিজেকে বিরত রেখে একজন মুমিন এই শিক্ষাই লাভ করে যে এরপর থেকে সে যেন তার জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুমোদিত সীমার বাইরে কোনো কিছুই গ্রহণ, বর্জন বা স্পর্শ না করে। এভাবে একজন মানুষ তার প্রবৃত্তির দাস না হয়ে বাস্তবিকভাবেই আল্লাহ তায়ালার দাস হয়ে উঠে।
অনেকের পক্ষে রোজার এই দীর্ঘ সময় ক্ষুধা-পিপাসায় কষ্ট করা, রাতে নিদ্রাহীন থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। বস্তুত আমরা এমন এক বস্তুবাদী সভ্যতার মাঝে বাস করছি যখন সব কিছুই আর্থিক মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়। কাজেই এমন যুগে রোজার পানাহার ও নিদ্রাত্যাগের গুরুত্ব বুঝতে একটু বেগ পেতেই হবে। ইসলাম মতে, আমরা সৃষ্টি হয়েছি এমন এক জীবন পরিচালনা করতে যা শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালারই ইচ্ছা ও আদেশ অনুসারে চালিত হবে। সব লাভ-ক্ষতির মাপকাঠির ঊর্ধ্বে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিকে স্থান দিতে হবে। এভাবে চিন্তা করলে রোজায় পানাহার ত্যাগের গুরুত্ব বুঝা যাবে। এটা মুমিন জীবনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যেন তার শরীর-মন-আত্মা সবকিছু পূর্ণভাবে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে গড়ে উঠে।
📄 শয়তান থেকে আত্মরক্ষা
রোজা আমাদের শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষায় সক্ষম ক'রে তোলে। রসুল সা. বলেছেন, যখন আমরা রোজা রাখি তখন যেন আমাদের চোখ যে কোনো নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকে; কান যেন অশণ্টীল ও মন্দ কথা শোনা থেকে বিরত থাকে; জিহ্বা যেন অন্যায় ও অশণ্টীল কথা বলা থেকে বিরত থাকে; এবং হৃদয় যেন অসৎ চিন্তা থেকে বিরত থাকে (বুখারি)। রসুল সা. আরও বলেছেন, পাঁচটি বিষয় মানুষের রোজা নষ্ট করে যথা: মিথ্যা কথা বলা, গিবত করা, বদনাম রটানো, মিথ্যা সাক্ষ্য বা শপথ করা এবং লালসার দৃষ্টি দেওয়া (আযদি) (ইমাম গাজ্জালী'র এহইয়াউ উলুমুদ্দিন এ উদ্ধৃত)।