📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 সঠিক নিয়মে নামাজ আদায়

📄 সঠিক নিয়মে নামাজ আদায়


নামাজ শুরুর আগে আপনার নামাজের জন্য মানসিক প্রস্তুতি যাচাই করুন, নামাজের বিভিন্ন আসনের সাথে জড়িত দোয়া সমূহ, পঠিতব্য কুরআনের আয়াতসমূহ এবং নামাজ শেষে উচ্চারিত দোয়াগুলোর অর্থ চিন্তা করুন। নামাজের প্রতিটি আসনে আন্তরিকতা বাড়াতে চেষ্টা করুন।

নামাজের প্রতিটি আসনে শারীরিক এবং মানসিক বিনয়ের প্রকাশ ঘটান।

প্রতিটি দোয়া উচ্চারণ করুন আল্লাহ তায়ালার দয়া এবং ক্ষমা অর্জনের আশা এবং আস্থার সাথে।

প্রতিনিয়ত নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন যে আপনি নামাজে আপনার জীবনের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সত্তা অর্থাৎ আপনার স্রষ্টা এবং পালনকর্তার সাথে কথা বলছেন। আপনি তাঁর মুখোমুখি আছেন তিনি আপনাকে দেখছেন এবং আপনি তাঁর সাথে সংলাপরত আছেন (সুরা আলাক, ৯৬ : ১৯)।

শয়তানের ধোঁকা এবং প্রতারণা থেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় চেয়ে নামাজ শুরু করুন (সুরা নাহল, ১৬ : ৯৮)।

নামাজের সময় আপনার দৃষ্টিকে নত রাখুন এবং আপনার শারীরিক অবস্থা যেন আপনার মনকে নামাজের বাইরে নিতে না পারে। আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে রসুল সা. বলেছেন, হে আমার প্রিয় সন্তান, খেয়াল রেখো নামাজের সময় মন যেন নামাজের বাইরে না যায়, কারণ নামাজের ভেতর অন্যমনস্ক হওয়া এক বিপর্যয় (তাবারানি)।

বিভিন্ন ওয়াক্তে বিভিন্ন রাকাতে ভিন্ন ভিন্ন ও সময়োপযোগী কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করুন ও অন্যান্য দোয়া করুন, এতে আপনার নামাজে মনোযোগ, আন্তরিকতা ও সচেতনতা বাড়বে।

নামাজে বিভিন্ন আয়াত তেলাওয়াতের সময় এমনভাবে উচ্চারণ করুন যেন আপনি নিজেকেই কথাগুলো বলছেন। এই পদ্ধতির অনুসরণ আপনার মনকে আপনার উচ্চারিত কথামালার দিকে নিবদ্ধ রাখতে সাহায্য করবে (সুরা বনি ইসরাঈল, ১৭: ১১০)।

যখন কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করবেন তখন আপনার নিজের ভাষায় তার অর্থও অনুধাবন করতে চেষ্টা করবেন। যতই আপনি নামাজে উচ্চারিত কুরআনের আয়াত ও দোয়া সমূহের অর্থ ও শিক্ষা অনুধাবন করতে থাকবেন ততই আপনার মন থেকে দুনিয়াবি চিন্তা দূর হয়ে যাবে।

প্রতিবার রুকুর সেজদায় আপনি আল্লাহ তায়ালার সিফাত বর্ণনা করার সময় গভীরভাবে অনুভব করুন যে আল্লাহ তায়ালার নিকট আপনি কত ঋণী! তাঁর কাছে আপনি কতই না কৃতজ্ঞ! সত্যিকার আবেগ দিয়ে অনুভব করে রুকু সেজদার তসবিহ করুন।

সেজদার সময়টাকে আল্লাহ তায়ালার নিকট অতিরিক্ত কিছু চাইবার জন্য ব্যবহার করুন, রসুল সা. বলেছেন : সেজদার সময় বান্দা তার প্রভুর সবচাইতে কাছে থাকে। কাজেই সেজদার মধ্যে নিজের আবেগ ও আন্তরিকতা বাড়াও (মুসলিম)।

আপনার নামাজের সময়টাকে এতটুকু সীমার মধ্যে রাখুন যাতে আপনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে না পড়েন অথচ পূর্ণ আন্তরিকতা ও সচেতনতার সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।

নামাজের অন্তর্ভুক্ত সকল শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যথাযথভাবে আদায় করুন।

এমন দরদ ও আবেগসহকারে নামাজ পড়ুন যেন এটাই আপনার জীবনের শেষ নামাজ। আল্লাহ তায়ালার রসুল সা. বলেন : যখন তুমি নামাজে দাঁড়ালে, তখন এমনভাবে নামাজ পড়ো যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ নামাজ, এমন কোনো কথা বলবে না যার জন্য পরদিন ক্ষমা চাইতে হবে এবং মানুষের কাছে কোনো প্রার্থনা করবে না (আহম্মদ)।

এভাবে সন্তোষজনক পন্থায় নিয়মিত নামাজ আদায় আপনার দৈনন্দিন জীবনে এক নাটকীয় পরিবর্তন আনবে। নামাজ অবশ্যই হতে হবে তেমন যেমনটি বলা হয়েছে কুরআনে,

নিশ্চয়ই নামাজ অন্যায় ও অশণ্টীল কাজ থেকে বিরত রাখে (সুরা আনকাবূত, ২৯: ৪৫)।

আর আপনার উন্নত ও সুশৃঙ্খল জীবন আপনাকে আপনার নামাজের মান বাড়াতে সাহায্য করবে। এভাবে সফল নামাজ ও সুশৃঙ্খল জীবন একটি আপরটিকে ক্রমান্বয়ে উন্নত করতে সাহায্য করবে।

মনে রাখবেন, যে নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা হলো না তার জন্য সাজা পেতে হবে। এমন নামাজ হাশরের ময়দানে আপনার পক্ষের স্বাক্ষী না হয়ে আপনার বিপক্ষের সাক্ষী হবে। অন্যদিকে, সফল নামাজের প্রতিদান বা পুরস্কার অপরিমেয়। রসুলে করিম সা. বলেছেন, যদি একজন মানুষ কোনো রকম দুনিয়াবি চিন্তা বা পিছুটানমুক্ত হয়ে দু'রাকাত নামাজ আদায় করে তবে তার পূর্বের সকল গুনাহ্ মাফ করে দেওয়া হবে (বুখারি)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 তাহাজ্জুদ নামাজ

📄 তাহাজ্জুদ নামাজ


যদিও তাহাজ্জুদ নামাজ বাধ্যতামূলক নয় তবুও নিজের পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধির জন্য এটাকে আপনার রাত্রিকালীন কাজের একটি অংশে পরিণত করার চেষ্টা করুন। রসুল সা. বলেছেন:

ফরজ নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজ হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাজ (মুসলিম)।
আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে তারা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের জন্য রাতে ঘুম থেকে উঠে (সুরা ফুরকান, ২৫: ৬৪)।

বস্তুত আত্মিক ও আধ্যাত্মিকতা অর্জনে কিয়ামূল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদত এক উত্তম মাধ্যম। রসুল সা. বলেন, রাত্রের কিছু অংশ জাগরণ করে ইবাদত করো। এটা তোমাদের পূর্বের উম্মতরাও করেছে। এ নামাজ তোমাকে তোমার আল্লাহ তায়ালার নৈকট্যে বা সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। তোমার পাপকে লাঘব করে। তোমাকে শয়তান থেকে হেফাজত করে এবং তোমার দেহকে রোগ থেকে রক্ষা করে (তিরমিজি)।

যখন একজন লোক তার স্ত্রীকে রাতে ঘুম থেকে উঠায় এবং দুজনে একসাথে দু'রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে তখন তাদের নাম ওই সমস্ত মানুষের সাথে লেখা হয় যারা আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করে (আবু দাউদ)।

কুরআন আরও উৎসাহিত করে দিনের প্রথম প্রহর আল্লাহ তায়ালার স্মরণ দিয়ে শুরু করতে। বলা হয়েছে:

যে ব্যক্তি রাতে আন্তরিকতার সাথে নামাজে ও সিজদায় নত থাকে, এবং যে আল্লাহ তায়ালার রহমতের ও প্রত্যাশা করে আর যারা এমন করে না তাদের তুলনা করে বলো তারা উভয়ে কি এক হতে পারে যারা জানে আর যারা জানে না? বুদ্ধিমান তো তারাই যারা সতর্কবাণী গ্রহণ করে (সুরা যুমার, ৩৯: ৯)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 সিয়াম (রোজা)

📄 সিয়াম (রোজা)


তাক্বিয়া অর্জনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে সিয়াম বা রোজা পালন। সকল ধরনের আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে রোজার বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থান রয়েছে। একটি হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে: মানুষের প্রতিটি কাজের পুরস্কার অনেকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। ক্ষেত্র বিশেষে তা দশ থেকে সাতশত গুণ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোজা হচ্ছে এর ব্যতিক্রম। কারণ এটা একান্তভাবে আমারই জন্য এবং আমি নিজে এর প্রতিদান দিবো তা আমার যত ইচ্ছা (বুখারি, মুসলিম)।

রোজার মূল অর্জন হচ্ছে এই যে, এটা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত গুণে সমৃদ্ধ করে। কুরআন যাকে বলেছে তাক্বওয়া :

হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো (সুরা বাকারা, ২: ১৮৩)।

তাক্বওয়া হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও আনুকূল্য অর্জনের সবচাইতে মৌলিক পূবশর্ত। তাক্বওয়ার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা-সচেতনতা, আল্লাহ তায়ালার প্রতি দায়িত্ব বোধ, জবাবদিহিতা, তাঁর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এবং আন্তরিক হওয়া। এটা এমন গুণ যা আমাদের আল্লাহ তায়ালার প্রতি দায়িত্ব পালনে প্রেরণা যোগায়। তাক্বওয়ার ভিত্তিতেই আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের মূল্যায়ন করেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে বেশি তাক্বওয়া সম্পন্ন। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাময় (সুরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩)।

আমাদের অবশ্যই তাক্বওয়া অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়োজিত করতে হবে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা আদেশ করেছেন:

নিশ্চয়ই তাক্বওয়াই হচ্ছে উত্তম পাথেয়। অতএব হে দূর দৃষ্টিসম্পন্ন লোকগণ, সর্বদা আমার কথা স্মরণ রেখো (সুরা বাকারা, ২: ১৯৭)।

রোজা আমাদের সর্বক্ষণ আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও ভীতি জাগ্রত রাখতে শিক্ষা দেয়। এটা আমাদের অন্তরে এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটায় যা আমাদের তাক্বওয়া অর্জনে সাহায্য করে। এসব বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি এখানে আলোচনা করা হলো-

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা পূরণ

📄 আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা পূরণ


রোজাকালীন মানুষের তিনটি অতি জরুরি শারীরিক চাহিদাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসিমুখে ত্যাগ করতে হয়। এগুলো হচ্ছে খাদ্য, পানীয় এবং ঘুম। তখন মুমিনের কাছে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা ক্ষতিকর মনে না হয়ে আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টিকেই ক্ষতিকর মনে হয়। শারীরিক পরিতৃপ্তি অর্জনের চাইতে আল্লাহ তায়ালার তুষ্টি অর্জনকেই বেশি আনন্দের এবং আরামের মনে হয়। কাজেই তখন মানুষের ভালোলাগা না লাগার স্বাভাবিক মানদণ্ডটাই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় উল্টে যায়। সে অনুসারে সুখ, বেদনা, সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এখানে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য মানুষের শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয় বরং মানুষের প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি তাঁর ইচ্ছার অনুগামী করা। শরীরকে এভাবে তৈরি করা যেন সে আল্লাহ তায়ালার আদেশ অনুসারেই ভোগ করবে, তার বাইরে নয়। যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন যে শরীর সারাদিন আল্লাহ তায়ালার আদেশে অভুক্ত থেকেছে তা আবার আল্লাহ তায়ালারই আদেশে যথা দ্রুত ইফতার গ্রহণে ব্যস্ত হয় (কারণ, এখন আল্লাহ তায়ালা দ্রুত ইফতার করা পছন্দ করেন)। যা কিছু দিনের বেলা তাঁর আদেশে নিষিদ্ধ ছিল এখন সেসব আবার তাঁরই আদেশে অনুমোদিত হয়ে গিয়েছে। একইভাবে সেহরি খেতে আল্লাহ তায়ালা তাগিদ দিয়েছেন তাই মানুষ ভোর রাতে আরাম-শয্যা ত্যাগ করে সেহরি খাচ্ছে। রোজা এবং নামাজ যেমন ইবাদত তেমনি আল্লাহ তায়ালার আদেশে পানাহারও (ইফতার ও সেহরি) ইবাদত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00