📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 সালাত (নামাজ)

📄 সালাত (নামাজ)


নামাজ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আমাদের জন্য নির্ধারিত সবচাইতে অধিক মাত্রায় পালনীয় ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজ বয়ানে কুরআনে বলেন,

নিয়মিতভাবে নামাজ কায়েম করো যাতে তোমরা আমাকে স্মরণ করতে পারো (সুরা ত্বহা, ২০: ১৪)।

সামগ্রিকভাবে নামাজের উদ্দেশ্য বান্দার মধ্যে সার্বক্ষণিকভাবে সারা জাহানের স্রষ্টা ও পালনকর্তা আল্লাহ তায়ালার স্মরণ জারি রাখা। যখন আমরা নামাজ আদায় করি তখন আমরা আমাদের হৃদয়ের আকুতির সাথে যুক্ত করি আমাদের জিহ্বা এবং সমগ্র শরীরকে। কাজেই, এই জন্য নামাজ হচ্ছে এমন এক ইবাদত যা যুগপৎ শরীর এবং আত্মার জিকির নিশ্চিত করে। সম্ভবত এজন্যেই একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা যেসব কাজের মাধ্যমে আমার নিকটতর হয় সেসবের মধ্যে নামাজই আমার কাছে সবচাইতে প্রিয় (বুখারি)। এটা আমাদের জন্য হবে দুর্ভাগ্যজনক যদি আমরা সবসময় আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের এই উত্তম সুযোগের সদ্ব্যবহার না করি। আমরা হয়তো ঠিকই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি কিন্তু আমাদের এই খেয়াল থাকে না যে এই নামাজের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালার সাথে আমাদের দৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমরা প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজকে দিনে পাঁচবার গোসল করার সাথে তুলনা করতে পারি। যদি এমন হয় যে এভাবে একদিনে পাঁচবার গোসল করার পরও আপনার শরীরে ময়লা থেকে গেলো তাহলে এই গোসলের কার্যকারিতা আর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তেমনি দিনে পাঁচবার নামাজ আদায়ের পরও যদি আপনার হৃদয় অপবিত্র থেকে যায়, আপনার নৈতিক মান অবনত থাকে, আপনার আচার-ব্যবহার অপরিবর্তিত থাকে তবে আপনার এমন নামাজের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন করা যায়। যদি নামাজে প্রবেশ করার পরও নামাজ তার কোনো পরিবর্তন আনতে না পারে তাহলে বুঝতে হবে যে সেই ব্যক্তি কিছু হারাচ্ছে। এভাবে প্রতিদিনই আমরা হয়তো অনেক সুবর্ণ সুযোগ হারাচ্ছি।

এখানে এটা মনে রাখা উচিত যে হৃদয় নামাজে মনোযোগী নয় এ অজুহাতে নামাজ আদায়ে কোনো গাফিলতি করা যাবে না। কারণ নামাজ হচ্ছে বাধ্যতামূলক। কাজেই, কোনো অবস্থাতেই ফরজ নামাজ বাদ দেওয়া যাবে না। বাধ্যতামূলক এই নামাজ আদায় করতে করতেই সচেষ্ট হতে হবে যাতে এই নামাজ নিজের অন্তরে সার্বক্ষণিক খোদাভীতি ও খোদাসচেতনতা তৈরি করে।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে কীভাবে একজন তার নামাজের মানোন্নয়ন করতে পারেন? এ বিষয়ে প্রথমত মনে রাখবেন যে যখনই আপনি নামাজে দাঁড়াবেন তখনই শয়তান চেষ্টা করবে যে, যেভাবেই হোক আপনার মনে আল্লাহ তায়ালা-প্রসঙ্গ ছাড়া আর অন্য যে কোনো প্রসঙ্গে চিন্তার উদ্রেক ঘটাতে (সুরা আ'রাফ, ৭ : ১৬-১৭)।

কারণ শয়তান সব সময় এ বিষয়ে সচেতন যে আপনার আল্লাহ তায়ালার স্মরণ আপনাকে তাঁর নিকটতর করে। কাজেই সে অবিরাম সচেষ্ট থাকে যে কোনোভাবে আপনাকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও নৈকট্য প্রপ্তি থেকে দূরে রাখতে। অতএব আপনাকে সবচেয়ে কঠিন যে বাধা অতিক্রম করতে হবে তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার স্মরণহীনতা থেকে মুক্ত হওয়া। এটা হচ্ছে সেই দোষ যা আপনার নামাজের মানকে অবনত করে। কারণ আল্লাহ তায়ালা সেই নামাজকে গ্রহণ করেন না যাতে আল্লাহ তায়ালার সচেতন স্মরণ নেই। রসুল সা. বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দার নামাজকে গ্রহণ করবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না শরীরের নামাজের সাথে অন্তরের আকুতি যুক্ত হবে (এহইয়াউ উলুমুদ্দীন এ গাজ্জালী রহ. কর্তৃক উদ্ধৃত)।

নামাজে মনোযোগী হওয়ার সামর্থ্যকে আরও বাড়ানো যায় যদি এর জন্য পর্যাপ্ত মানসিক, মনস্তাত্বিক এবং শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং নামাজের মধ্যেও মনোযোগ বাড়াতে উদ্যোগী হওয়া যায়। নিচে আমরা এ ধরনের কয়েকটি পদক্ষেপ বিষয়ে আলোচনা করছি:

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক প্রস্তুতি

📄 মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক প্রস্তুতি


* আপনার সারাদিনের কর্মতৎপরতার পরিকল্পনা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে তৈরি করুন (সুরা মাআরিজ, ৭০ : ২২-২৩)। এমন যেন না হয় আপনি প্রচণ্ড ব্যস্ত এক কর্মপরিকল্পনা করলেন এরপর দিনের কাজ শুরু করে এই ব্যস্ততার মাঝে নামাজেকে স্থান দিতে চেষ্টা করলেন。
* এটা নিশ্চিত করুন যে যেসব আইন-কানুন নামাজ নিয়ন্ত্রণ করে তার সবগুলো আপনি মেনে চলছেন। নামাজে উচ্চারিত এবং নামাজ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতসমূহ এবং হাদিসগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করুন。
* আপনার নামাজ আদায়ে সময়ানুগ হউন (সুরা নিসা, ৪ : ১০৩)। ওয়াক্ত হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে নামাজ আদায় করুন। রসুল সা. বলেছেন যে (আফজল) সঠিক সময়ে আদায়কৃত নামাজই আল্লাহ তায়ালার সবচাইতে পছন্দনীয়。
* যথাসময়ে ফরজ নামাজগুলো জামায়াতের সাথে আদায়ের চেষ্টা করুন (সুরা বাকারা, ২ : ৪৩)।

যখন আপনি শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত এবং অবসাদগ্রস্ত থাকেন তখন নয় বরং যখন আপনার মন নামাজের জন্য প্রস্তুত উন্মুক্ত এবং শরীর সতেজ থাকে তখনই নামাজ পড়ুন (সুরা নিসা, ৪ : ৪৩)।

আপনার মনকে সকল শয়তানী চিন্তা এবং ধারণা থেকে মুক্ত করুন (সুরা মাউন, ১০৭: ৪-৬)।

নামাজের মধ্যে আপনার মনকে দুনিয়ার সকল দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করুন।

আপনি কোন আয়াত, দু'আ পড়বেন তার সম্পর্কে পরিকল্পনা করুন।

মনে রাখুন যে আপনি নিজেকে নামাজে নিয়োজিত করার মাধ্যমে নিজেকে এই দুনিয়ার যাবতীয় দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করার এক অনুপম সুযোগ পাচ্ছেন। রসুল সা. বলেছেন যে নামাজেই তাঁর সুখ নিহিত। অতএব, এই পৃথিবীর দাসত্ব এবং বোঝা থেকে নিজকে মুক্ত করার এই সুযোগকে সাদরে গ্রহণ করুন (সুরা বাকারা, ২: ৪৫)।

আপনার পুরো জীবনকে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশিত মিশনের দিকে চালিত করতে নামাজকে ব্যবহার করুন।

আপনার জীবনে আরও উদ্দীপনা, শক্তি ও কর্মতৎপরতা আনতে নামাজের সাহায্য নিন।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 শারীরিক প্রস্তুতি

📄 শারীরিক প্রস্তুতি


নামাজে দাঁড়াবার আগে আপনার শারীরিক আবশ্যকীয়তা গুলো যেমন ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটানো বা প্রস্রাব-পায়খানার বেগ থাকলে তার সমাধান করে নামাজে দাঁড়ান।
শারীরিক পবিত্রতা নিশ্চিত করে নামাজ পড়ুন। সতর্কতা এবং নিষ্ঠার সাথে অজুর প্রতিটি ফরজ আদায় করে অজু করুন (সুরা মায়েদা, ৫: ৬)।

যদিও পৃথিবীর প্রতিটি স্থানই একটি মসজিদ বা নামাজের জন্য উপযোগী স্থান, তবুও খেয়াল রাখুন যেখানে নামাজ পড়ছেন সেই স্থানটি পরিচ্ছন্ন কিনা।

কোলাহলমুক্ত পরিবেশে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়ুন।

পরিষ্কার এবং সম্মানজনক পোশাক পরে নামাজ পড়ুন কারণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে আদম সন্তান! তোমরা প্রতিটি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজেদের উত্তম পোশাকে সজ্জিত করো (সুরা আ'রাফ, ৭ : ৩১)।

📘 সুবহে সাদিক আধ্যাত্মিক ও আত্মন্নয়ন ভাবনা > 📄 সঠিক নিয়মে নামাজ আদায়

📄 সঠিক নিয়মে নামাজ আদায়


নামাজ শুরুর আগে আপনার নামাজের জন্য মানসিক প্রস্তুতি যাচাই করুন, নামাজের বিভিন্ন আসনের সাথে জড়িত দোয়া সমূহ, পঠিতব্য কুরআনের আয়াতসমূহ এবং নামাজ শেষে উচ্চারিত দোয়াগুলোর অর্থ চিন্তা করুন। নামাজের প্রতিটি আসনে আন্তরিকতা বাড়াতে চেষ্টা করুন।

নামাজের প্রতিটি আসনে শারীরিক এবং মানসিক বিনয়ের প্রকাশ ঘটান।

প্রতিটি দোয়া উচ্চারণ করুন আল্লাহ তায়ালার দয়া এবং ক্ষমা অর্জনের আশা এবং আস্থার সাথে।

প্রতিনিয়ত নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন যে আপনি নামাজে আপনার জীবনের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সত্তা অর্থাৎ আপনার স্রষ্টা এবং পালনকর্তার সাথে কথা বলছেন। আপনি তাঁর মুখোমুখি আছেন তিনি আপনাকে দেখছেন এবং আপনি তাঁর সাথে সংলাপরত আছেন (সুরা আলাক, ৯৬ : ১৯)।

শয়তানের ধোঁকা এবং প্রতারণা থেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় চেয়ে নামাজ শুরু করুন (সুরা নাহল, ১৬ : ৯৮)।

নামাজের সময় আপনার দৃষ্টিকে নত রাখুন এবং আপনার শারীরিক অবস্থা যেন আপনার মনকে নামাজের বাইরে নিতে না পারে। আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে রসুল সা. বলেছেন, হে আমার প্রিয় সন্তান, খেয়াল রেখো নামাজের সময় মন যেন নামাজের বাইরে না যায়, কারণ নামাজের ভেতর অন্যমনস্ক হওয়া এক বিপর্যয় (তাবারানি)।

বিভিন্ন ওয়াক্তে বিভিন্ন রাকাতে ভিন্ন ভিন্ন ও সময়োপযোগী কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করুন ও অন্যান্য দোয়া করুন, এতে আপনার নামাজে মনোযোগ, আন্তরিকতা ও সচেতনতা বাড়বে।

নামাজে বিভিন্ন আয়াত তেলাওয়াতের সময় এমনভাবে উচ্চারণ করুন যেন আপনি নিজেকেই কথাগুলো বলছেন। এই পদ্ধতির অনুসরণ আপনার মনকে আপনার উচ্চারিত কথামালার দিকে নিবদ্ধ রাখতে সাহায্য করবে (সুরা বনি ইসরাঈল, ১৭: ১১০)।

যখন কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করবেন তখন আপনার নিজের ভাষায় তার অর্থও অনুধাবন করতে চেষ্টা করবেন। যতই আপনি নামাজে উচ্চারিত কুরআনের আয়াত ও দোয়া সমূহের অর্থ ও শিক্ষা অনুধাবন করতে থাকবেন ততই আপনার মন থেকে দুনিয়াবি চিন্তা দূর হয়ে যাবে।

প্রতিবার রুকুর সেজদায় আপনি আল্লাহ তায়ালার সিফাত বর্ণনা করার সময় গভীরভাবে অনুভব করুন যে আল্লাহ তায়ালার নিকট আপনি কত ঋণী! তাঁর কাছে আপনি কতই না কৃতজ্ঞ! সত্যিকার আবেগ দিয়ে অনুভব করে রুকু সেজদার তসবিহ করুন।

সেজদার সময়টাকে আল্লাহ তায়ালার নিকট অতিরিক্ত কিছু চাইবার জন্য ব্যবহার করুন, রসুল সা. বলেছেন : সেজদার সময় বান্দা তার প্রভুর সবচাইতে কাছে থাকে। কাজেই সেজদার মধ্যে নিজের আবেগ ও আন্তরিকতা বাড়াও (মুসলিম)।

আপনার নামাজের সময়টাকে এতটুকু সীমার মধ্যে রাখুন যাতে আপনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে না পড়েন অথচ পূর্ণ আন্তরিকতা ও সচেতনতার সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।

নামাজের অন্তর্ভুক্ত সকল শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যথাযথভাবে আদায় করুন।

এমন দরদ ও আবেগসহকারে নামাজ পড়ুন যেন এটাই আপনার জীবনের শেষ নামাজ। আল্লাহ তায়ালার রসুল সা. বলেন : যখন তুমি নামাজে দাঁড়ালে, তখন এমনভাবে নামাজ পড়ো যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ নামাজ, এমন কোনো কথা বলবে না যার জন্য পরদিন ক্ষমা চাইতে হবে এবং মানুষের কাছে কোনো প্রার্থনা করবে না (আহম্মদ)।

এভাবে সন্তোষজনক পন্থায় নিয়মিত নামাজ আদায় আপনার দৈনন্দিন জীবনে এক নাটকীয় পরিবর্তন আনবে। নামাজ অবশ্যই হতে হবে তেমন যেমনটি বলা হয়েছে কুরআনে,

নিশ্চয়ই নামাজ অন্যায় ও অশণ্টীল কাজ থেকে বিরত রাখে (সুরা আনকাবূত, ২৯: ৪৫)।

আর আপনার উন্নত ও সুশৃঙ্খল জীবন আপনাকে আপনার নামাজের মান বাড়াতে সাহায্য করবে। এভাবে সফল নামাজ ও সুশৃঙ্খল জীবন একটি আপরটিকে ক্রমান্বয়ে উন্নত করতে সাহায্য করবে।

মনে রাখবেন, যে নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা হলো না তার জন্য সাজা পেতে হবে। এমন নামাজ হাশরের ময়দানে আপনার পক্ষের স্বাক্ষী না হয়ে আপনার বিপক্ষের সাক্ষী হবে। অন্যদিকে, সফল নামাজের প্রতিদান বা পুরস্কার অপরিমেয়। রসুলে করিম সা. বলেছেন, যদি একজন মানুষ কোনো রকম দুনিয়াবি চিন্তা বা পিছুটানমুক্ত হয়ে দু'রাকাত নামাজ আদায় করে তবে তার পূর্বের সকল গুনাহ্ মাফ করে দেওয়া হবে (বুখারি)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00