📄 জিকিরের ব্যক্তিগত পন্থা
জিকিরের ব্যক্তিগত পন্থাসমূহের মধ্যে সর্বাগ্রে যেগুলো উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হচ্ছে ফরজ ইবাদতসমূহ। একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দার জন্য আমার নৈকট্য অর্জনের যত পন্থা আছে তার মধ্যে ফরজ ইবাদতসমূহই আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় (বুখারি)। প্রতিটি অবশ্য পালনীয় আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা আল্লাহ তায়ালার প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতাকেই আত্মউন্নয়নের অন্যতম উপায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যখন আমরা নিয়মিত যথাসময়ে স্বচ্ছ নিয়তে আন্তরিকতার সাথে একাকী বা সম্ভব হলে জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, যখন আমরা ধৈর্য্য ও খোদাভীতির সাথে রমজান মাসে রোজা রাখি, যখনই আমদের উপর জাকাত ফরজ হয় যদি আমরা উদার মন নিয়ে তা যথাসময়ে বিনয়ের সাথে পরিপূর্ণভাবে আদায় করি, এবং যখন আমাদের হজ করার সামর্থ্য আসে তখন যথাশীঘ্র আমরা হজ পালন করি তখন এসব বাধ্যতামূলক ইবাদতই আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য দান করে। বস্তুত যদি আমরা গভীর মনোযোগ আর আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে এই কাজগুলি করি তবে আমরা আল্লাহ তায়ালার আরও নিকটবর্তী হতে পারি। উপরে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, এভাবে আমার বান্দা আমার নৈকট্য অর্জনের জন্য আরও আন্তরিকতাসহ চেষ্টা করে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আমার ভালোবাসা লাভ করে। (তারপর) যখন আমি তাকে ভালোবাসি (তখন অবস্থা এমন হয় যে) আমি হয়ে যাই তার চোখ (দৃষ্টি) যা দিয়ে সে দেখে, আমি হয়ে যাই তার কান যা দিয়ে সে শোনে, আমি হয়ে যাই তার হাত সে যা দিয়ে কাজ করে, আমি হয়ে যাই তার পা যা দিয়ে সে চলে। তখন সে আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি নিশ্চিতভাবেই তাকে আশ্রয় প্রদান করি (বুখারি)।
প্রতিটি ফরজ ইবাদতের সাথে আরও কিছু নফল ইবাদতও আছে। যেমন:
১. সুন্নত নামাজ-এগুলো হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সাথে যুক্ত (ফরজ নামাজের আগের বা পরের) অতিরিক্ত নামাজ। এছাড়াও তাহাজ্জুদ নামাজও গুরুত্বপূর্ণ।
২. সুন্নত রোজা- এই নফল রোজাগুলির বিষয়েও রসুলের উপদেশ আছে। এগুলো হচ্ছে প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার, প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে এবং হিজরি ক্যালেন্ডারের আরও কিছু নির্দেশিত দিন।
৩. আল্লাহ তায়ালার পথে সাদাকা- আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে যখনই সম্ভব সাধ্যমতো দান-খয়রাত করা।
৪. উমরা হজ- ঐচ্ছিক, সংক্ষিপ্ত উমরা হজ পালন।
উপরে বর্ণিত ফরজ এবং তাদের সাথে সম্পর্কিত নফল ইবাদতসমূহ ছাড়াও ব্যক্তিগত পর্যায়ে জিকিরের অন্তর্ভুক্ত আরও দুটি সুনির্দিষ্ট পন্থা আছে, তা হচ্ছে প্রথমত, প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াত এবং দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তায়ালার দয়া, ক্ষমা, নির্দেশনা, নেয়ামত চেয়ে প্রতিনিয়ত তাঁর কাছে দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
এখন চলুন উপরে বর্ণিত ব্যক্তিগত পর্যায়ের জিকিরের প্রত্যেকটি সম্পর্কে বিশেষভাবে আত্মা পরিশুদ্ধকরণে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে আলাপ করা যাক।
📄 সালাত (নামাজ)
নামাজ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আমাদের জন্য নির্ধারিত সবচাইতে অধিক মাত্রায় পালনীয় ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজ বয়ানে কুরআনে বলেন,
নিয়মিতভাবে নামাজ কায়েম করো যাতে তোমরা আমাকে স্মরণ করতে পারো (সুরা ত্বহা, ২০: ১৪)।
সামগ্রিকভাবে নামাজের উদ্দেশ্য বান্দার মধ্যে সার্বক্ষণিকভাবে সারা জাহানের স্রষ্টা ও পালনকর্তা আল্লাহ তায়ালার স্মরণ জারি রাখা। যখন আমরা নামাজ আদায় করি তখন আমরা আমাদের হৃদয়ের আকুতির সাথে যুক্ত করি আমাদের জিহ্বা এবং সমগ্র শরীরকে। কাজেই, এই জন্য নামাজ হচ্ছে এমন এক ইবাদত যা যুগপৎ শরীর এবং আত্মার জিকির নিশ্চিত করে। সম্ভবত এজন্যেই একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা যেসব কাজের মাধ্যমে আমার নিকটতর হয় সেসবের মধ্যে নামাজই আমার কাছে সবচাইতে প্রিয় (বুখারি)। এটা আমাদের জন্য হবে দুর্ভাগ্যজনক যদি আমরা সবসময় আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের এই উত্তম সুযোগের সদ্ব্যবহার না করি। আমরা হয়তো ঠিকই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি কিন্তু আমাদের এই খেয়াল থাকে না যে এই নামাজের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালার সাথে আমাদের দৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমরা প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজকে দিনে পাঁচবার গোসল করার সাথে তুলনা করতে পারি। যদি এমন হয় যে এভাবে একদিনে পাঁচবার গোসল করার পরও আপনার শরীরে ময়লা থেকে গেলো তাহলে এই গোসলের কার্যকারিতা আর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তেমনি দিনে পাঁচবার নামাজ আদায়ের পরও যদি আপনার হৃদয় অপবিত্র থেকে যায়, আপনার নৈতিক মান অবনত থাকে, আপনার আচার-ব্যবহার অপরিবর্তিত থাকে তবে আপনার এমন নামাজের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন করা যায়। যদি নামাজে প্রবেশ করার পরও নামাজ তার কোনো পরিবর্তন আনতে না পারে তাহলে বুঝতে হবে যে সেই ব্যক্তি কিছু হারাচ্ছে। এভাবে প্রতিদিনই আমরা হয়তো অনেক সুবর্ণ সুযোগ হারাচ্ছি।
এখানে এটা মনে রাখা উচিত যে হৃদয় নামাজে মনোযোগী নয় এ অজুহাতে নামাজ আদায়ে কোনো গাফিলতি করা যাবে না। কারণ নামাজ হচ্ছে বাধ্যতামূলক। কাজেই, কোনো অবস্থাতেই ফরজ নামাজ বাদ দেওয়া যাবে না। বাধ্যতামূলক এই নামাজ আদায় করতে করতেই সচেষ্ট হতে হবে যাতে এই নামাজ নিজের অন্তরে সার্বক্ষণিক খোদাভীতি ও খোদাসচেতনতা তৈরি করে।
এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে কীভাবে একজন তার নামাজের মানোন্নয়ন করতে পারেন? এ বিষয়ে প্রথমত মনে রাখবেন যে যখনই আপনি নামাজে দাঁড়াবেন তখনই শয়তান চেষ্টা করবে যে, যেভাবেই হোক আপনার মনে আল্লাহ তায়ালা-প্রসঙ্গ ছাড়া আর অন্য যে কোনো প্রসঙ্গে চিন্তার উদ্রেক ঘটাতে (সুরা আ'রাফ, ৭ : ১৬-১৭)।
কারণ শয়তান সব সময় এ বিষয়ে সচেতন যে আপনার আল্লাহ তায়ালার স্মরণ আপনাকে তাঁর নিকটতর করে। কাজেই সে অবিরাম সচেষ্ট থাকে যে কোনোভাবে আপনাকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও নৈকট্য প্রপ্তি থেকে দূরে রাখতে। অতএব আপনাকে সবচেয়ে কঠিন যে বাধা অতিক্রম করতে হবে তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার স্মরণহীনতা থেকে মুক্ত হওয়া। এটা হচ্ছে সেই দোষ যা আপনার নামাজের মানকে অবনত করে। কারণ আল্লাহ তায়ালা সেই নামাজকে গ্রহণ করেন না যাতে আল্লাহ তায়ালার সচেতন স্মরণ নেই। রসুল সা. বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দার নামাজকে গ্রহণ করবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না শরীরের নামাজের সাথে অন্তরের আকুতি যুক্ত হবে (এহইয়াউ উলুমুদ্দীন এ গাজ্জালী রহ. কর্তৃক উদ্ধৃত)।
নামাজে মনোযোগী হওয়ার সামর্থ্যকে আরও বাড়ানো যায় যদি এর জন্য পর্যাপ্ত মানসিক, মনস্তাত্বিক এবং শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং নামাজের মধ্যেও মনোযোগ বাড়াতে উদ্যোগী হওয়া যায়। নিচে আমরা এ ধরনের কয়েকটি পদক্ষেপ বিষয়ে আলোচনা করছি:
📄 মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক প্রস্তুতি
* আপনার সারাদিনের কর্মতৎপরতার পরিকল্পনা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে তৈরি করুন (সুরা মাআরিজ, ৭০ : ২২-২৩)। এমন যেন না হয় আপনি প্রচণ্ড ব্যস্ত এক কর্মপরিকল্পনা করলেন এরপর দিনের কাজ শুরু করে এই ব্যস্ততার মাঝে নামাজেকে স্থান দিতে চেষ্টা করলেন。
* এটা নিশ্চিত করুন যে যেসব আইন-কানুন নামাজ নিয়ন্ত্রণ করে তার সবগুলো আপনি মেনে চলছেন। নামাজে উচ্চারিত এবং নামাজ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতসমূহ এবং হাদিসগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করুন。
* আপনার নামাজ আদায়ে সময়ানুগ হউন (সুরা নিসা, ৪ : ১০৩)। ওয়াক্ত হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে নামাজ আদায় করুন। রসুল সা. বলেছেন যে (আফজল) সঠিক সময়ে আদায়কৃত নামাজই আল্লাহ তায়ালার সবচাইতে পছন্দনীয়。
* যথাসময়ে ফরজ নামাজগুলো জামায়াতের সাথে আদায়ের চেষ্টা করুন (সুরা বাকারা, ২ : ৪৩)।
যখন আপনি শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত এবং অবসাদগ্রস্ত থাকেন তখন নয় বরং যখন আপনার মন নামাজের জন্য প্রস্তুত উন্মুক্ত এবং শরীর সতেজ থাকে তখনই নামাজ পড়ুন (সুরা নিসা, ৪ : ৪৩)।
আপনার মনকে সকল শয়তানী চিন্তা এবং ধারণা থেকে মুক্ত করুন (সুরা মাউন, ১০৭: ৪-৬)।
নামাজের মধ্যে আপনার মনকে দুনিয়ার সকল দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করুন।
আপনি কোন আয়াত, দু'আ পড়বেন তার সম্পর্কে পরিকল্পনা করুন।
মনে রাখুন যে আপনি নিজেকে নামাজে নিয়োজিত করার মাধ্যমে নিজেকে এই দুনিয়ার যাবতীয় দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করার এক অনুপম সুযোগ পাচ্ছেন। রসুল সা. বলেছেন যে নামাজেই তাঁর সুখ নিহিত। অতএব, এই পৃথিবীর দাসত্ব এবং বোঝা থেকে নিজকে মুক্ত করার এই সুযোগকে সাদরে গ্রহণ করুন (সুরা বাকারা, ২: ৪৫)।
আপনার পুরো জীবনকে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশিত মিশনের দিকে চালিত করতে নামাজকে ব্যবহার করুন।
আপনার জীবনে আরও উদ্দীপনা, শক্তি ও কর্মতৎপরতা আনতে নামাজের সাহায্য নিন।
📄 শারীরিক প্রস্তুতি
নামাজে দাঁড়াবার আগে আপনার শারীরিক আবশ্যকীয়তা গুলো যেমন ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটানো বা প্রস্রাব-পায়খানার বেগ থাকলে তার সমাধান করে নামাজে দাঁড়ান।
শারীরিক পবিত্রতা নিশ্চিত করে নামাজ পড়ুন। সতর্কতা এবং নিষ্ঠার সাথে অজুর প্রতিটি ফরজ আদায় করে অজু করুন (সুরা মায়েদা, ৫: ৬)।
যদিও পৃথিবীর প্রতিটি স্থানই একটি মসজিদ বা নামাজের জন্য উপযোগী স্থান, তবুও খেয়াল রাখুন যেখানে নামাজ পড়ছেন সেই স্থানটি পরিচ্ছন্ন কিনা।
কোলাহলমুক্ত পরিবেশে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়ুন।
পরিষ্কার এবং সম্মানজনক পোশাক পরে নামাজ পড়ুন কারণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে আদম সন্তান! তোমরা প্রতিটি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজেদের উত্তম পোশাকে সজ্জিত করো (সুরা আ'রাফ, ৭ : ৩১)।