📄 অন্যান্য ধর্মগুলোর বিশুদ্ধতার দাবি ও বাস্তবতা
পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন, তত্ত্ব, ধর্মীয় দল-উপদল, সম্প্রদায় রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। সবারই দাবি একমাত্র তাদের আন্দোলন বা দর্শনই সঠিক; কিংবা একমাত্র তাদের ধর্ম বা সম্প্রদায়ই স্রষ্টার নির্দেশিত সঠিক পথের উপর রয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবে যে, এগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল?
নিজেদের যারা সত্য পথের অনুসারী বলে দাবি করে, তাদের প্রচারিত মতবাদের মধ্যে বাহ্যিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। এগুলো বাদ দিয়ে আমরা যদি এটা চিহ্নিত করতে পারি যে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারা মূলত কীসের উপাসনা করার জন্য ডাকছে, তাহলেই বুঝতে পারব কোনটি সঠিক আর কোনটি সঠিক নয়। কেননা, ইসলাম ব্যাতীত বাকি সব ধর্মগুলোর প্রত্যেকের মধ্যেই একটি জিনিস অভিন্ন। সেটা হচ্ছে—হয় এরা দাবি করবে সব মানুষই ঈশ্বর, কিংবা কিছু নির্দিষ্ট মানুষ ঈশ্বর ছিলেন, কিংবা এই প্রকৃতিই স্রষ্টা অথবা স্রষ্টা মানুষের কল্পনাপ্রসূত অলীক ভাবনা।
সুতরাং বলা যেতে পারে যে, মিথ্যা ধর্মগুলোর মূল বার্তা হচ্ছে, স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে উপাসনা করা। মিথ্যা ধর্মগুলো সৃষ্টিজগৎ বা কোনো সৃষ্টিকে ঈশ্বর নাম দিয়ে তার উপাসনার আহ্বান জানায়। উদাহরণস্বরূপ, নবী যিশু তাঁর অনুসারীদের বলেছিলেন স্রষ্টার উপাসনা করতে। কিন্তু আজ যারা নিজেকে যিশুর অনুসারী বলে দাবি করেন, তারা মানুষকে স্বয়ং যিশুর উপাসনা করার আহ্বান জানান। তারা বলেন যে, যিশুই ছিলেন ঈশ্বর।
বুদ্ধ ছিলেন একজন ধর্মীয় সংস্কারক। তিনি ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত তৎকালীন ধর্মে নানাবিধ মানবীয় রীতি প্রচলন করেন। তিনি কখনো নিজেকে ঈশ্বর দাবি করেননি। তাঁর অনুসারীদের কখনো বলেননি যে, তোমরা আমার উপাসনা করো। এরপরও ভারতের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় যেসব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করেন তারা গৌতম বুদ্ধকেই তাদের ঈশ্বর বলে দাবি করেন। তারা গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতি যেভাবে কল্পনা করেছেন, তার আদলে বুদ্ধের একটি প্রতিমূর্তি বানিয়ে সেই মূর্তির পূজো করেন।
সুতরাং উপাসনার মূল লক্ষ্যবস্তু কী—এই মূলনীতির আলোকে সহজেই আমরা বুঝতে পারব কোনটি মিথ্যা ধর্ম আর কোনটি সত্য ধর্ম। বুঝতে পারব কোন ধর্মগুলো মানুষের তৈরি। স্রষ্টা আল কুরআনে বলে দিয়েছেন,
مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা তো কেবল কতগুলো নামের উপাসনা করো। আর এই নামগুলো রেখেছ তোমরা আর তোমাদের পূর্বপুরুষেরা। আল্লাহ ওগুলো সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাঠাননি। কার্যকর নির্দেশ দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি তোমাদের আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারও উপাসনা করবে না। এটাই সঠিক ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। (ইউসুফ, ১২: ৪০)
কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, সব ধর্মই তো ভালো কথা বলে, ভালো জিনিস শেখায়; তাহলে আমরা যে ধর্মই অনুসরণ করি না কেন, তাতে কী আসে যায়? এর উত্তর হচ্ছে, সব মিথ্যা ধর্মই সবচেয়ে জঘন্য যে শিক্ষাটি দেয় সেটা হলো স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির উপাসনা করা। একজন মানুষ সবচেয়ে বড় যে পাপ কাজে নিজেকে জড়াতে পারে সেটা হচ্ছে সৃষ্টির উপাসনা। কারণ এটা মানুষ সৃষ্টির একমাত্র যে উদ্দেশ্য—স্রষ্টার উপাসনা—সে উদ্দেশ্যকেই বরবাদ করে দেয়। স্রষ্টা আল কুরআনে স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার উপাসনার জন্যই সৃষ্টি করেছি। (আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
আর তাই সৃষ্টির উপাসনা করা এমনই এক মহা পাপ, পরকালে যেটা কক্ষনো কাউকে ক্ষমা করা হবে না। যিনি এ অবস্থায় মারা যাবেন, পরকালে তিনি যেন তার ভাগ্য জাহান্নামে নিশ্চিত করে নিলেন। এটা কারও ব্যক্তিগত অভিমত নয়। স্রষ্টা তাঁর সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থে এই সত্য প্রকাশ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ
যে লোক আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে, আল্লাহ কক্ষনো তার পাপ ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্যান্য পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। (আন-নিসা, ৪:৪৮ ও ১১৬)
📄 স্রষ্টা কেন তার অনুগ্রহের অসম বন্টন করলেন?
সব মানবসমাজেই উদারতা এবং নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাকে একটি মহৎ গুণ মনে করা হয়। কিন্তু সবার কাছে সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে এই দুটি গুণের একটিও বিকাশ লাভ করতে পারত না। উদারতা শুধুমাত্র তখনই অর্জন করা যাবে যখন একজন মানুষ সম্পদ জমা করে রাখার আকাঙ্ক্ষা দমন করে দরিদ্রদের দান করাটাকে একটি মহৎ কাজ হিসেবে গ্রহণ করবে। অন্যদিকে আত্মাকে হিংসা এবং লোভের মতো কুপ্রবৃত্তির উপর জয়ী করতে পারলেই কেবল সন্তুষ্টি বা আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব। আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের এই পরীক্ষাগুলোর জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করতেই সৃষ্টিকর্তা অত্যন্ত বিচক্ষণভাবে পৃথিবীতে তার অনুগ্রহ অসমভাবে বন্টন করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَاللَّهُ فَضَّلَ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ فِي الرِّزْقِ
আল্লাহ জীবিকার ক্ষেত্রে তোমাদের কাউকে কারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। (আন-নাহল, ১৬:৭১)
তিনি আরও বলেন,
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةً
আর জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো একটি পরীক্ষা মাত্র। (আল আনফাল, ৮:২৮)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ
যারা বিশ্বাস করেছ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে দেয়। (আল মুনাফিকুন, ৬৩:৯)
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ
তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং কারও উপর কারও মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন সে ব্যাপারে পরীক্ষা করে নিতে পারেন। (আল আন'আম, ৬:১৬৫)
সম্পদ সঞ্চয়ের স্পৃহাকে এই জীবনে কিছুতেই তৃপ্ত করা সম্ভব নয়। মানুষ যত পায় তত চায়। নবী ﷺ বলেছেন, 'মানুষকে এক পাহাড় স্বর্ণ দেওয়া হলে সে আরেকটি চাইবে। (কবরের) মাটি ছাড়া কোনো কিছু তাকে পরিতৃপ্ত করতে পারবে না।'[১]
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ
তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। (আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّابِلِ وَالْمَحْرُومِ এবং তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক আছে। (আয-যারিয়াত, ৫১:১৯)
তবে দান করতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দান করলে তা আল্লাহর কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَى যারা বিশ্বাস করেছ! তোমরা খোঁটা এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান সাদাকাকে বরবাদ করে দিয়ো না। (আল বাকারা, ২:২৬৪)
পরশ্রীকাতরতা সম্পদের লোভকে আরও তীব্র করে। তাই আল্লাহ অন্যদের যা দিয়েছেন তার প্রতি লোভ করতে আমাদের তিনি নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ আর আল্লাহ তা'আলা যে সব বিষয়ে তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তোমরা তা কামনা করো না। (আন-নিসা, ৪:৩২)
নবী এই মহান উপদেশের পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, 'তোমার চেয়ে যারা কম সৌভাগ্যবান তাদের দিকে তাকাও, তোমার উপরে যারা আছে তাদের দিকে তাকিও না। আল্লাহ তোমাকে যেসব নিয়ামত দিয়েছেন তার প্রতি যদি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে না চাও, তবে এটাই তোমার জন্য উত্তম।' [১] আবু হুরায়রা থেকে আরও বর্ণিত আছে যে নবী বলেছেন, 'প্রাচুর্যতা সম্পদ দিয়ে নয় বরং আত্মতৃপ্তি দিয়ে মাপা হয়।' [২]
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর শান্তি পায়। (আর-রা'দ, ১৩:২৮)
টিকাঃ
[১] সহীহ আল বুখারি, খন্ড ৮, পৃ. ২৯৭-৯৮, নং ৪৪৭।
[১] সহীহ আল বুখারি, খন্ড ৮, পৃ. ৩২৮, নং ৪৯৭ এবং সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৫৩০, নং ৭০৭০।
[২] সহীহ আল বুখারি, খন্ড ৮, পৃ. ৩০৪, নং ৪৫৩।
📄 বিপদ ও বিপর্যয় কেন আসে?
আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। এই জীবন ও মৃত্যুর মূল উদ্দেশ্যই হলো, কে উত্তম কর্ম সম্পাদনকারী তা যাচাই করে নেওয়া। আর এই জীবনের পরীক্ষাগুলো অনেক সময় 'দুর্ভাগ্য' এবং বিপদআপদ রূপেও আসতে পারে। এসব পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রকৃত বিশ্বাসীদের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে সহায়তা করা এবং তাদেরকে পাপ থেকে পবিত্র করা। এ ধরনের পরীক্ষাগুলো বিপথগামী মুসলিমদের সঠিক পথে ফিরে আসার কথা মনে করিয়ে দেয়, আর অবিশ্বাসীদের জন্য এই পরীক্ষাগুলো পরকালীন শাস্তির পূর্বে এই দুনিয়ার শাস্তি স্বরূপ দেওয়া হয়।
“ধৈর্য' নামক উত্তম আত্মিক গুণটি বিকাশের মূল ভিত্তি হচ্ছে, নানা রকম বিপদ-আপদ ও বিপর্যয়। আর এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিরাই জীবনে বেশি দুঃখকষ্ট ও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। সা'দ বর্ণনা করেন, তিনি নবী -কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে মানুষের মধ্যে কারা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। উত্তরে তিনি বলেন, 'নবীগণ, এরপর যারা তাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তারা, এরপর যারা তাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তারা। মানুষকে তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। ঈমান যত দৃঢ় হয় তার পরীক্ষা তত কঠিন হতে থাকে। আর দুর্বল ঈমানের লোকদেরকে তাদের স্তর অনুযায়ীই পরীক্ষা করা হয়।' [১]
বিপদের সময় আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখার মাধ্যমেই প্রকৃত ধৈর্য অর্জিত হয়। যেমন কুরআনে বলা রয়েছে,
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ
বিধান একমাত্র আল্লাহরই। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি এবং ভরসাকারীদের কেবল তাঁরই উপর ভরসা করা উচিত। (ইউসুফ, ১২:৬৭)
আল্লাহ মানুষকে আরও নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন যে, তারা যদি আল্লাহর উপর সম্পূর্ণরূপে আস্থা রাখে তবে তাদের কঠিনতম সময়েও কেবল তিনিই তাদের জন্য যথেষ্ট হবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُه যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। (আত-তালাক, ৬৫:৩)
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْءًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْءًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ তোমরা হয়তো কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হয়তো-বা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয়, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আসলে আল্লাহই জানেন, তোমরা জানো না। (আল বাকারাহ, ২:২১৬)
আল্লাহ প্রত্যেকটি মানুষকে বিশেষভাবে তার প্রয়োজন ও অবস্থা অনুযায়ী পরীক্ষা করেন। তিনি কারও উপর অবিচার করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا তোমার প্রভু কারও সাথে অবিচার করেন না। (আল কাহফ, ১৮:৪৯)
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا আল্লাহ কারও উপর সাধ্যাতীত কোন ভার চাপিয়ে দেন না। (আল বাকারাহ, ২:২৮৬)
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ কেবল কাফির-অবিশ্বাসীরা ছাড়া আর কেউ আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয় না। (ইউসুফ, ১২:৮৭)
তাই, সূরা আল ফাত্হ-এ আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণকারীদের শাস্তি হচ্ছে জাহান্নামের অনন্ত পীড়ন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَابِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
তিনি মুনাফিক নারী-পুরুষ এবং আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা নারী-পুরুষদের শাস্তি দেবেন, কারণ তারা আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে। তাদের জন্য রয়েছে খারাপ পরিণতি। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন জাহান্নাম। কত নিকৃষ্ট নিবাস সেটা! (আল ফাতহ, ৪৮:৬)
মহান আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং দয়ার অঙ্গীকার বিশ্বাসীদেরকে এই জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষাকে ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস যোগায়। তাই আল্লাহর অনুগ্রহের উপর আশা রাখা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ যারা বিশ্বাস করো, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন। (আল বাকারাহ, ২:১৫৩)
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ যারা বিশ্বাস করে, আল্লাহর জন্য দেশত্যাগ করে, জিহাদ করে, তারাই আল্লাহর দয়ার আশা রাখে। আর আল্লাহ পুনঃপুনঃ ক্ষমাশীল, করুণাময়। (আল বাকারাহ, ২:২১৮)
আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা ধৈর্যের প্রতিদান নিশ্চিতভাবেই জান্নাত। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসীদের এই পুরস্কারের কথা জানিয়ে বলেছেন,
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ সুসংবাদ দাও সেইসব ধৈর্যশীলদের যারা বিপদ এলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব। (আল বাকারাহ, ২:১৫৫-১৫৬)
ধৈর্যের আরেকটি ভিত্তি রয়েছে। আর তা হলো এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, মানবজাতির উপর যত বিপর্যয় আপতিত হয় তা তাদের নিজেদের খারাপ কাজেরই ফলাফল। [১] এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ আসে সেগুলো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল; কিন্তু তিনি অনেক অপরাধই ক্ষমা করে দেন। (আশ-শূরা, ৪২:৩০)
আসলে মানুষ যে পাপাচার করে তার বেশির ভাগই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। যদি আল্লাহ মানবজাতিকে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রাপ্য শাস্তি দিতেন তাহলে তারা সহ এ পৃথিবীর অন্য সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যেত। এ ব্যাপারে সূরা ফাতিরে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِن دَابَّةٍ আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করতেন তাহলে পৃথিবীর বুকে চলমান কাউকেই তিনি রেহাই দিতেন না। (ফাতির, ৩৫: ৪৫)
শুহাইব ইবনু সিনান থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'মুমিনের বিষয়টা খুবই চমৎকার! তার পুরো জীবনটাই কল্যাণময়, আর এটা শুধুই মুমিনের জন্য। যখন তার ভালো সময় আসে তখন সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। তাই এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর খারাপ সময় আসলে সে ধৈর্য ধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর।' [২] আল্লাহর নির্ধারিত নিয়তিকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই এই আত্মিক উৎকর্ষতা অর্জন করা সম্ভব। তাই, কারও জন্য নির্ধারিত ভালো এবং আপাতদৃষ্ট খারাপ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে—এই বিশ্বাস ঈমানের ষষ্ঠ স্তম্ভ।
যদি ইসলামে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তির জীবনে কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে যে, কোথাও ভুল হচ্ছে। এমতাবস্থায় একজন প্রকৃত বিশ্বাসীকে অবশ্যই সময় নিয়ে তার জীবনের বাস্তবতাগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। হয় তার পরীক্ষাগুলো স্পষ্ট নয় এবং সেগুলো সম্পর্কে সে সচেতন নয়, অথবা সে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে গেছে।
وَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَأَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُعَذِّبَهُم بِهَا فِي الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ
তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাকে মুগ্ধ না করে। এগুলো দিয়েই আল্লাহ এই পৃথিবীতে তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অবিশ্বাসী অবস্থাতেই তাদের আত্মা দেহত্যাগ করবে। (আত-তাওবাহ, ৯:৮৫)
তবে এর মানে এই নয় যে, বিশ্বাসীরা তাদের জীবনে সমস্যা আর বিপর্যয় কামনা করবে। কারণ আল্লাহ তাদেরকে এই বলে দু'আ করতে শিখিয়েছেন, 'হে আমাদের রব! আমাদের উপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে দেবেন না যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।' [১] বরং যেসব পরীক্ষা থেকে আল্লাহ তাদের রেহাই দিয়েছেন সেগুলোর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। তবে সুখের দিনে তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যেন তারা জীবনের পরীক্ষাগুলোর ব্যাপারে উদাসীন না হয়ে পড়ে। কারণ সুখ এবং সাফল্য প্রায়ই মানুষকে জীবনের পরীক্ষাগুলোর ব্যাপারে অন্ধ করে দেয়।
পথভ্রষ্টদের জন্য পরীক্ষাগুলো কখনো কখনো শাস্তির মাধ্যমে ভুল শুধরে দেওয়ার উপায় হিসাবে কাজ করে। আর এগুলো তাদেরকে সঠিক পথে ফিরে আসতেও অনুপ্রাণিত করে। মানুষ বিপথগামী হয়ে গেলে সাধারণত সুপরামর্শ কানে তোলে না। কিন্তু তাদের উপর বা তাদের আপনজনের উপর কোনো বিপদ এলে সেটা তাদেরকে নাড়া দিয়ে যায়। তাদের মাঝে ঈমানের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকলে তারা তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারে।
وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (আখিরাতের) বড় শাস্তির পূর্বে আমরা দুনিয়াতে তাদেরকে ছোট ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে। (আস-সাজদাহ, ৩২:২১)
মানবজাতিকে তাদের বিপথগামিতার-কথা-স্মরণ-করিয়ে-দেওয়া পরীক্ষাগুলো মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার-নির্যাতনের রূপেও আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া বসনিয়ার মুসলিমদের ওপর সার্বদের অকথ্য নৃশংসতার কথা বলা যেতে পারে। ফিলিস্তিনের মুসলিমদের ওপর ইসরায়েলি বর্বরতা, কুয়েতে সাদ্দামের আক্রমণ, ইরাক ও আফগানিস্তানের মানুষদের উপর আমেরিকানদের নির্বিচার বোমা হামলা তথা গোটা পৃথিবীতে মুসলিম জাতির ওপর চলমান অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ওদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি ওদেরকে আস্বাদন করানো হয় যাতে ওরা সৎপথে ফিরে আসে। (আর-রুম, ৩০:৪১)
যারা কপটভাবে ঈমান আনার দাবি করে, বিপদ আপদ আর বিপর্যয় তাদের আসল রূপ প্রকাশ করে দেয়। আর যারা ঈমান আনতে অস্বীকার করে তারা যে স্বেচ্ছায় জাহান্নামকে বেছে নিচ্ছে এই পরীক্ষাগুলো এটাও পরিষ্কার করে দেয়।
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ
মানুষ কি মনে করে, "আমরা বিশ্বাস করি” একথা বললেই কোনো পরীক্ষা না করেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে? এদের পূর্ববর্তীদেরও আমরা পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ অবশ্যই সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদীদের সুস্পষ্টভাবে জেনে নেবেন। (আল 'আনকাবুত, ২৯:২-৩)
টিকাঃ
[১] সুনান আত-তিরমিযি, খন্ড ২, পৃ. ২৮৬, নং ১৯৫৬।
[১] প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সব বিপর্যয়ই মানুষের অপকর্মের ফল। এটি আল্লাহ সূরা আর-রুম এ (৩০:৪১) উল্লেখ করেছেন। বইটির পরবর্তী অংশে আয়াতটি উদ্ধৃত করা হবে।
[২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৫৪১, নং ৭১৩৮।
[১] সূরা আল বাকারা ২:২৮৬।