📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 সত্য ধর্মের নয়টি বৈশিষ্ট্য

📄 সত্য ধর্মের নয়টি বৈশিষ্ট্য


১. স্রষ্টার মনোনীত ধর্মের সার্বজনীনতা
ইসলাম সম্পর্কে বুঝতে হলে একজন মানুষের প্রথম যে বিষয়টি জানা ও বোঝা দরকার তা হলো 'ইসলাম' শব্দের অর্থ। 'ইসলাম' শব্দের অর্থ নিজের ইচ্ছাকে একমাত্র স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করে দেওয়া, তাঁর বশ্যতা মেনে নেওয়া। ইসলাম ধর্মের বক্তব্য মতে এই স্রষ্টা হলেন একমাত্র 'আল্লাহ'। যে ব্যক্তি নিজের যাবতীয় ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে সঁপে দেন তাকে বলা হয় 'মুসলিম'। কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নামের উপর ভিত্তি করে ইসলাম ধর্মের নামকরণ করা হয়নি। কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা এই ধর্মের নামকরণ করেনি; যেমনটা আমরা অন্যান্য অনেক ধর্মের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। খ্রিষ্টান ধর্মের নাম দেওয়া হয়েছে যিশু খ্রিষ্টের নামের উপর ভিত্তি করে। গৌতম বুদ্ধের নামের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের নাম। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের নামের ওপর ভিত্তি করে কনফুসীয় মতবাদ, কার্ল মার্ক্সের নামের ওপর মার্ক্সবাদ, ইহুদি গোষ্ঠীর নামানুসারে ইহুদি ধর্ম, আর হিন্দ [সিন্ধু] অঞ্চলের অধিবাসীদের নামানুসারে হিন্দু ধর্ম।
স্রষ্টার প্রথম নবী ও প্রথম মানুষ আদম (আ)-কে যে-ধর্ম দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল, সেই ধর্মের নাম 'ইসলাম'। স্রষ্টা মানবজাতির কাছে আরও যেসব নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন তাঁদের সবার ধর্ম ছিল এই 'ইসলাম'। উপরন্তু স্রষ্টা নিজেই তাঁর মনোনীত ধর্মের জন্য এই নাম নির্ধারণ করেছেন। সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, তোমাদের জন্য আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং জীবনব্যবস্থা হিসেবে 'ইসলাম'কে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম। (আল মা'ইদাহ, ৫:৩)
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ
ইসলাম ছাড়া কেউ যদি অন্য কোনো জীবন-ব্যবস্থা অনুসরণ করতে চায়, তবে সেটা কখনো গ্রহণ করা হবে না। ('আল ইমরান, ৩:৮৫)
ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম নয়। ইসলাম বলে না যে, সপ্তম শতকে আরব উপদ্বীপে নবী মুহাম্মাদ প্রথম এই ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন। বরং ইসলাম তো একথাই বলে যে, পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী আদাম যে-ধর্ম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন-এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য নবীগণ যে ধর্ম প্রচার করেছেন-শেষ নবী মুহাম্মাদ-এর মাধ্যমে সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আল্লাহ সেই ধর্মকেই চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ রূপ দিয়েছেন।
নিজেকে একমাত্র সত্য ধর্ম বলে দাবি করা এমন আরও দুটো ধর্ম নিয়ে এ পর্যায়ে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে কিছু মন্তব্য তুলে ধরছি। বাইবেলের কোথাও আপনি একথা খুঁজে পাবেন না যে মূসা নবীর অনুসারী ও তাঁদের বংশধরদের স্রষ্টা বলেছেন, তাঁদের ধর্মের নাম ইহুদি ধর্ম; কিংবা যিশুখ্রিষ্টের অনুসারীদের বলা হয়েছে যে, তাঁদের ধর্মের নাম খ্রিষ্টান ধর্ম। অন্যভাবে বললে, 'ইহুদি' ও 'খ্রিষ্টান' নাম দুটো স্রষ্টা দেননি। এই নাম দুটোর কোনো ঐশ্বরিক অনুমোদন বা কোনো ওহীসূত্র নেই। পৃথিবী ছেড়ে যিশুখ্রিষ্টের চলে যাওয়ার বহুবছর পর যিশুর ধর্মকে 'খ্রিষ্টান ধর্ম' নাম দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কি যিশুর প্রচারিত ধর্মও এর নামের মতো পরিবর্তিত হয়েছে? Jesus থেকেই বাংলায় হয়েছে যিশু আর Christ থেকে বাংলায় খ্রিষ্ট; দুটোই হিব্রু শব্দ থেকে উদ্ভূত। গ্রিক Iesous থেকে ইংরেজি ও ল্যাটিনে হয়েছে Jesus; হিব্রুতে 'Yeshua' বা 'Yehoshua' (Joshua)। হিব্রু 'Messiah' শব্দের গ্রিক প্রতিশব্দ 'Christos'। এটা একটি রাজপদবির নাম। এর অর্থ 'ঐশ্বরিক বিধানে অভিষিক্ত রাজা'।
তবে ঈসা-এর প্রচারিত ধর্মোপদেশের মধ্যেই তাঁর মূল ধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়। স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে সেটা তিনি তাঁর ধর্মোপদেশের মধ্যে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল এটাই যে, তাঁর অনুসারীরা যেন এই ধর্মোপদেশগুলোকে জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশক মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। ইসলামে জেসাস বা যিশু আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন নবী, তাঁর নাম ঈসা। তাঁর আগে অন্যান্য যেসব নবী এসেছিলেন তাঁদের মতো তিনিও মানুষদের আহ্বান করছিলেন যে, তারা যেন নিজেদের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে দেয়। যেমন বাইবেলে বলা আছে, যিশু তাঁর অনুসারীদের শিখিয়েছিলেন, তারা যেন এভাবে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে,
হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতা, তোমার নাম পবিত্র বলে মান্য হোক। তোমার রাজ্য আসুক। তোমার ইচ্ছা যেমন স্বর্গে তেমনি পৃথিবীতেও পূর্ণ হোক। [লুক ১১:২/মথি ৬: ৯-১০]
স্রষ্টার কাছে নিজের ইচ্ছাকে সঁপে দেওয়ার এই বিশ্বাসের কথা গসপেলের বহু জায়গায় বলা হয়েছে। যেমন: যিশু বলেছেন, যারা নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করেছে কেবল তারাই জান্নাতের অধিবাসী হবে।
যারা আমাকে 'প্রভু প্রভু' বলে তারা প্রত্যেকে যে স্বর্গরাজ্যে ঢুকতে পারবে তা নয়, কিন্তু আমার স্বর্গস্থ পিতার ইচ্ছা যে পালন করে সে-ই প্রবেশ করতে পারবে। [মথি ৭:২১]
আমি নিজ থেকে কিছুই করতে পারি না; যেমন শুনি তেমনই বিচার করি। আমি ন্যা- য়ভাবে বিচার করি, আমি আমার ইচ্ছামতো কাজ করতে চাই না; বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁরই ইচ্ছামতো কাজ করতে চাই। [জন ৫:৩০]
গসপেলে এ ধরনের আরও অনেক উক্তি আছে, যেগুলো থেকে বোঝা যায়, যিশু সুস্পষ্টভাবেই তাঁর অনুসারীদের বলেছেন যে, তিনি প্রকৃত ঈশ্বর নন। যেমন, কিয়ামাতের ব্যাপারে যিশু বলেছেন,
সেই দিন ও সেই সময়ের কথা কেউই জানে না-স্বর্গের দূতেরাও না, পুত্রও না, কেবল পিতাই জানেন। [মার্ক ১৩:৩২]
সুতরাং, পূর্বে আগত নবীদের মতো যিশু যে ধর্মের বাণী প্রচার করেছিলেন, তাঁর পরে যে নবী এসেছিলেন, তিনিও সেই একই ধর্ম প্রচার করেছেন; আর সে ধর্ম হচ্ছে 'ইসলাম': কেবল এক ও একক স্রষ্টার কাছে নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করা।
২. ধর্মের সব বিধান একই মূলসূত্রে বাঁধা থাকবে
গোটা বিশ্ব জগতের স্রষ্টা যেহেতু একজন তাই প্রতিটি সৃষ্টিই নিজের অস্তিত্বের জন্য তাঁর নিকট বাধিত। তিনিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, তাই তিনি ব্যতীত অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়া নিরর্থক। স্রষ্টার সত্য ধর্মের অবশ্যই একটি মূল বক্তব্য থাকবে, যেখানে কেবল তাঁরই ইবাদাত করতে বলা হবে। তাই যে-ধর্মটি একমাত্র সত্য ধর্ম হওয়ার দাবি করছে সেখানে মানুষকে কেবল এক স্রষ্টার ইবাদাতের নির্দেশ দেওয়া উচিত। আর যেহেতু তিনি ছাড়া বাকি সবকিছুই তাঁর সৃষ্টি, তাই সত্য ধর্মে তিনি ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর প্রতি ইবাদাতের আহ্বান করা হবে না—এটাই স্বাভাবিক। অন্য মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা বা কোনো জিনিস কখনোই ইবাদাহ পাওয়ার যোগ্য হতে পারে না, কারণ এরা কেউই নিজ থেকে কারও উপকার বা ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউই সৃষ্টির কোনো কল্যাণ সাধন করতে পারে না।
আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের একটিই মূল বক্তব্য হওয়া উচিত, আর তা হলো একমাত্র তাঁরই ইবাদাহ করা। একমাত্র ইসলাম ধর্মই তাত্ত্বিক ও বাস্তব চর্চা—উভয় ক্ষেত্রে এক আল্লাহর ইবাদাতের নির্দেশ দেয়। একমাত্র ইসলামেই ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই স্রষ্টার একত্ববাদ সংরক্ষিত হয়েছে।
অন্যদিকে, খ্রিষ্টান ধর্ম তাত্ত্বিকভাবে অনেক স্থানে এক ঈশ্বরের ইবাদতের কথা বললেও এ ধর্মের বাস্তবতা সম্পূর্ণ এর উল্টো। উদাহরণস্বরূপ, গসপেলে লুকের ৪:৮-এ বলা হয়েছে যে, শয়তান যিশুকে কর্তৃত্ব ও বিত্ত-বৈভবের লোভ দেখিয়ে তার নিজের ইবাদাহ করতে প্ররোচনা দিয়েছিল। "যিশু তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি কেবল তোমার প্রভুরই উপাসনা করবে এবং কেবল তাঁরই সেবা করবে।” অর্থাৎ যিশুর বাণীর মূল বক্তব্যও ছিল এটাই যে, স্রষ্টা একাই ইবাদাহ পাওয়ার যোগ্য। তাই তাঁর পরিবর্তে বা তাঁর পাশাপাশি অন্য কারও ইবাদাহ করা ভুল।
যিশুর একত্ববাদের শিক্ষা যখন গ্রিস আর রোমান দর্শনের ত্রিত্ববাদের মতাদর্শে রূপান্তরিত হয় তখন যিশুর এই স্পষ্ট সহজবোধ্য বক্তব্যও হারিয়ে যায়। যিশুকে ঈশ্বরের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। তাকে ঈশ্বরের পুত্রের উপাধি দেওয়া হয়। 'ঈশ্বর বা পিতা' এবং ‘ঈশ্বর বা পবিত্র আত্মা'-র মতোই তাকেও প্রভুত্বের অংশীদার করা হয়। খ্রিষ্টানরা যিশুকে ঈশ্বরের অবতার হিসেবে ঘোষণা করে। তারা ক্রুশবিদ্ধ হয়ে যিশুর তথাকথিত মৃত্যুর প্রতীকস্বরূপ যিশুর প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। পরবর্তীকালে তিনিই খ্রিষ্টানদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাস্যে পরিণত হয়েছেন।
একইভাবে হিন্দুধর্মের উপনিষদ, পুরাণ, বেদ এবং ভগবদ্গীতায় কেবল একজন নিরাকার ঈশ্বর, ব্রহ্মার কথা বলা হয়েছে যিনি অদ্বিতীয়। আবার ব্রহ্মা নিজেই 'ব্রহ্মা' (স্রষ্টা), বিষ্ণু (পরিচালক) এবং শিব (সংহারকর্তা)। আর বিষ্ণু থেকেই প্রতেক যুগে অবতার এসেছে। হিন্দুরা অসংখ্য মূর্তির পূজা করার মাধ্যমে সবকিছুকেই ঈশ্বর বানিয়ে নিয়েছে।
৩. ইবাদাহ-উপাসনায় ব্যাপকতা ইসলামে শুধুমাত্র আল্লাহর প্রশংসা করা ও বিপদআপদে তাকে ডাকার মধ্যেই ইবাদাত সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের সব ক্ষেত্রে তাঁর সব আদেশনিষেধ মেনে চলাও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রাথমিকভাবে ফার্দ (ফরজ) বা অবশ্যকরণীয় দায়িত্বগুলোর প্রতি অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে আল্লাহ যেগুলোকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা। এরপরে রয়েছে নাফ্ল (নফল) ইবাদাহ, যেগুলো আল্লাহকে আরও বেশি সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, দান করা, সিয়াম পালন, হাজ্জ করা, গরিব-অসহায়দের সাহায্য করা, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া- এগুলো সবই ইবাদাহ। এমনিভাবে নিত্যদিনের দৈনন্দিন কাজগুলোকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করার মাধ্যমে ইবাদাতে রূপান্তরিত করা যায়।
ইসলামের মূল কথা হলো এক আল্লাহর ইবাদাহ করা। আর এই ইবাদাহগুলো আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য লোকদেখানো নয়, একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি নিবেদন করতে হবে।।
৪. ধর্মীয় মূলনীতি অক্ষুণ্ণ থাকা শুরু থেকেই ইসলাম ধর্মের মূল বক্তব্য অবিকৃত ও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। আদম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ পর্যন্ত আগত এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীদের সবার প্রচারিত ধর্মের শিক্ষা ছিল একটিই-ইসলাম: একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা, তাঁর সাথে কোনো শির্ক না করা এবং নিঃশর্তভাবে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই এই আহ্বান নিয়ে একজন বার্তাবাহক পাঠিয়েছি, “তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং মিথ্যা উপাস্যকে পরিহার করো।” (আন নাহল ১৬:৩৬)
ইসলাম আরও শিক্ষা দেয় যে, যারা নিজেদেরকে ঈশ্বর দাবি করে অন্যদেরকে তাদের উপাসনা করার আহ্বান জানায় তারা অনুসারীদের কেবল প্রতারণাই করছে, তাদেরকে বিপথগামী করছে এবং আল্লাহর সত্য ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইসলামে ইবাদাতের মূলকথাকে সুরা আল ফাতিহার ৪ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে- 'আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।'
আদম ও হাওয়া-কেও আল্লাহর হুকুমের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে একটি বাগানে রাখা হয়েছিল এবং কেবল একটি মাত্র গাছ ব্যতীত অন্য যেকোনো গাছ থেকে খাওয়ার অনুমতি তাদের দেওয়া হয়েছিল।
প্রত্যেক যুগেই মানুষকে নবীদের মাধ্যমে কিছু কাজ করার এবং কিছু কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটা নিষিদ্ধ কাজের বিপরীতে মানুষের প্রয়োজনকে বিবেচনায় রেখে অনুরূপ অনেক কিছুকেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ এবং সুদের লেনদেন নিষিদ্ধ। কিন্তু জলেস্থলে এবং আকাশে বিচরণকারী অসংখ্য প্রাণীকে আল্লাহ হালাল করেছেন। তেমনি সুদ হারাম হলেও ব্যবসার আরও অনেক লেনদেনকেই বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
অনেকেই এমনভাবে এসব হারাম কাজে লিপ্ত হয় যেন এসব হারাম কাজ বাদ দিলে তাদের জীবন অচল হয়ে পড়বে। বস্তুত মানুষকে অকল্যাণ থেকে রক্ষা করার জন্যই এগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহর সৃষ্ট প্রত্যেকটি জিনিসের মধ্যেই কল্যাণ আছে, কিন্তু যেগুলোতে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ বেশি সেগুলোকে আল্লাহ তা'আলা নিজেই হারাম ঘোষণা করেছেন।
৫. ধর্মীয় বিধিনিষেধের মধ্যে সামঞ্জস্যতা থাকা
স্রষ্টার সত্য ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। স্থান-কাল-পাত্রের ব্যবধানে তা বদলে যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, বিবাহ, ইবাদাত, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া এবং কথাবার্তা এসব বিষয়ে যিশুর প্রথম দিকের অনুসারীরা তৎকালীন ইহুদীদের মতোই ছিল। তারা বহুবিবাহ করত, মাটির উপর সিজদা করত, তাদের মহিলারা মাথা আবৃত করত, তারা শূকরের মাংস খেত না, কারও সাথে দেখা হলে তারা 'আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক' বলে সম্ভাষণ জানাত এবং সমকামিতাকে মৃত্যুদণ্ডতুল্য পাপ মনে করত। বর্তমানে অধিকাংশ খ্রিষ্টানরা বহুবিবাহকে ঘৃণা করে, হাঁটু গেড়ে উপাসনা করে, সন্ন্যাসিনীরা এবং বিবাহের সময় ছাড়া সাধারণ মহিলারা মাথা আবৃত করে না, তারা শূকরের মাংস খায় এবং 'হাই' বলে একে অপরকে সম্ভাষণ করে। ১৯৭০ দশক থেকে অধিকাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান সমকামিতাকে এত ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে নেয় যে, এখন সমকামী যাজক অতিসাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
অনুরূপভাবে আগেকার হিন্দুরা মাংস খেত, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকেও তার সাথে একই চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো এবং মন্দিরের পতিতাদের (দেবদাসী) ভোগ করত। এখন অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা নিরামিষভোজী, ব্রিটিশ শাসকদের সাথে থাকা হিন্দু সংস্কারকগণ ঊনবিংশ শতকে সতীদাহ প্রথা এবং বিংশ শতকে দেবদাসীকে বিলুপ্ত করে দেয়।
অন্যদিকে ইসলামের শিক্ষা ও চর্চা অবতীর্ণের সময় থেকে এখন পর্যন্ত অপরিবর্তিত আছে। এবং থাকবে। ইসলামে বহুবিবাহ (স্ত্রীদের সাথে ন্যায়ানুগ আচরণের শর্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ চারটি) এখনো বৈধ, মুসলিমরা এখনো সালাতের সময় সিজদা করে, নারীরা পর্দা করে, শূকরের মাংশ নিষিদ্ধ, 'আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক' এই ভাষায় তারা পরস্পরকে সম্ভাষণ করে, সমকামিতা এখনো মহাপাপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তারা এখনো কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত করে।
পক্ষান্তে যেসব খ্রিষ্টানরা যিশুর সময়ে থেকে একই কাজ করেছে তাদেরকে ধর্মচ্যুত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। চতুর্থ শতকে যিশু এবং তার পূর্বের সব নবীর প্রচারিত 'একত্ববাদ' পরিণত হয়েছে 'ত্রিত্ববাদে'। একইভাবে যদিও হিন্দুধর্মের সনাতন গ্রন্থগুলোতে মূর্তিপূজাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বর্তমানে হিন্দুদের লক্ষাধিক ঈশ্বর আছে যাদেরকে তারা মূর্তির প্রতিকৃতিতে পূজা করে।
৬. জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা
যে-ধর্মটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হবে তাতে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে বর্ণিত থাকা উচিত। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে থাকবে, যদি তা সত্যিই স্রষ্টাপ্রদত্ত হয়। অথচ হিন্দুদের যদি তাদের ধর্মে উল্লিখিত জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের অধিকাংশই এ ব্যাপারে অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেবে অথবা ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি না দিয়ে তাদের আধুনিক গুরুদের বিভিন্ন দার্শনিক ব্যাখ্যা দিতে শুরু করবে। খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাইবেলের ওল্ড বা নিউ টেস্টামেন্টে কোথাও স্পষ্টভাবে জীবনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। একমাত্র ইসলামেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানুষের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। চির অপরিবর্তনীয় শাশ্বত গ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় জীবনের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বলেছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ আমি মানুষ ও জিন জাতিকে কেবল আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি। (আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
অতএব, জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদাহ করা। সত্যি বলতে এটা যেকোনো ধর্ম—বিশেষ করে সত্য ধর্মের মূল বিষয় হওয়া উচিত। আর এটা কেবল ইসলামের মধ্যেই আছে।
৭. সবার জন্য পাপ থেকে মুক্তিলাভের উপায় থাকা
সত্য ধর্মের আরেকটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো পাপ থেকে নিষ্কৃতির ক্ষেত্রে তা সবাইকে সমান বিচার করবে। পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন থাকবে না, কারণ স্রষ্টাই কেবল পাপ ক্ষমা করতে পারেন। আদাম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করার পূর্ব থেকেই আল্লাহ জানেন যে, তারা তাঁর হুকুম অমান্য করবে এবং তাঁর নিষেধ করা গাছ থেকে খাবে। তাই তিনি তাদের শিখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে পাপ থেকে তাওবা করতে হবে। এরপর যখন তারা পাপ করে ফেললেন, তারা তাওবা করলেন, তখন আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিলেন। যদি আল্লাহ তাদের তাওবা করতে না শেখাতেন তাহলে সেই পাপ যিশু পর্যন্ত তাদের পরবর্তী সব প্রজন্মে বংশ পরম্পরায় চলে আসত—যার ইঙ্গিত পাওয়া যায় খ্রিষ্ট ধর্ম থেকে। অবশ্যই এটি হতো অন্যায্য। কিন্তু স্রষ্টা সম্পূর্ণ ন্যায্য। তাই এটাই স্বাভাবিক যে, তিনি মানুষকে পাপ থেকে মুক্তি লাভের উপায় শিক্ষা দেবেন। অধিকন্তু, কোনো মানুষই তার পিতামাতা বা সন্তানদের পাপের জন্য দায়ী নয়; বরং তারা প্রত্যেকেই নিজ পাপের জন্য দায়ী। কেউ কারও পাপের বোঝা বইবে না।
أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى একজন আরেকজনের পাপের বোঝা বহন করবে না। (আন-নাজম, ৫৩:৩৮)
বরং প্রত্যেক ব্যক্তিরই উচিত সরাসরি সৃষ্টিকর্তা-প্রভু-প্রতিপালক মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং তিনিও তাদের ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কুরআনে মহান আল্লাহ বলছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
বলো, "আমার দাসেরা! যারা নিজেদের উপর অবিচার করেছ তোমরা আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন।” (আয-যুমার, ৩৯:৫৩)
যেহেতু সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর ইবাদাহ করা এবং এটাই সত্য ধর্মের প্রধান ভিত্তি; তাই হত্যা, চুরি ইত্যাদি যদিও পাপ কিন্তু এই পাপগুলো মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট। সবচেয়ে বড় পাপ হলো আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে তাকে সৃষ্টি করেছেন তা পালন না করা। তাই সবচেয়ে ভয়ানক পাপ হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক বা অংশীদার সাব্যস্ত করা; কারণ এটা হলো এই বিশ্বজাহানের স্রষ্টা মহান আল্লাহর সাথে সংঘটিত নিকৃষ্টতম পাপ। তাই শির্কে নিপতিত অবস্থায় একজন মানুষ যদি মৃত্যুবরণ করে, তবে এই শির্কের অপরাধে তার সব ভালো কাজও বাতিল হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ
আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার পাপকে কিছুতেই ক্ষমা করেন না। (আন-নিসা, ৪:৪৮)
ইসলামে প্রবেশ করলে আল্লাহ তা'আলা ওই ব্যক্তির পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন; এমনকি তা যদি শির্কের পাপও হয়।
কোনো ধর্মকে সত্য হতে হলে অবশ্যই তার মধ্যে সব যুগের সব মানুষের জন্য মুক্তির উপায় থাকতে হবে-চাই সে সত্য ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারুক কিংবা না পারুক। একজন মানুষ কোথায় জন্মগ্রহণ করবে সেটা তার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তাই সত্য ধর্মের সন্ধান না পাওয়ার কারণে তাকে দোষারোপ করা যায় না।
মুসা, ঈসা অথবা বুদ্ধ বা কনফিউসিয়াসের আনিত ধর্মের সাথে যার পরিচয় হয়নি তার পক্ষে তো তাদের ধর্ম অনুসরণ করা সম্ভব নয়। অথচ এসব ধর্মানুসারে মুক্তি কেবল তারাই পাবে যারা তাদের অনুসরণ করেছে। অন্যদিকে ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, মানব জাতির শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত যারা আন্তরিকভাবে মন থেকে এক ও একক স্রষ্টা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না, সে-ই পরকালে পুরস্কৃত হবে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
যারা বিশ্বাস করে এবং [নবী মুহাম্মাদের আগমনের পূর্বে] ইহুদি, খ্রিষ্টান ও সাবিয়ানদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষদিবসে বিশ্বাস করে সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে অবশ্যই পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (আল বাকারা, ২:৬২)
ইসলাম অনুযায়ী সব নবীদের অনুসারীরাই মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ তারা নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে কেবল এক আল্লাহর কাছেই সমর্পণ করেছে এবং কেবল তাঁরই ইবাদাহ করেছে, আর এটাই 'মুসলিম' শব্দের অর্থ।
যেসব নবীরা স্রষ্টার প্রকৃত বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদের সবাইকেই বিশ্বাস করতে হবে, অনুসরণ করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুগে যুগে স্রষ্টা অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যারাই তাঁদের বার্তাকে অস্বীকার করেছে, পরকালে তারা কখনোই মুক্তি পাবে না। নবী মুহাম্মাদ বলেছেন যে, বিভিন্ন যুগে পৃথিবীতে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীদের পাঠানো হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই এই বার্তা নিয়ে এসেছিলেন: 'এক আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য কোনো উপাস্য নেই।'
ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই সব মানুষ এই বার্তা পেয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা প্রথম মানব আদমকে সৃষ্টির পর তার সব বংশধরদের আত্মাকে একত্রিত করে তাদের কাছ থেকে একমাত্র তাঁর ইবাদাহ করার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন। প্রতিটি আত্মাই তখন এই সাক্ষ্য প্রদান করেছিল। এই সাক্ষ্য প্রতিটা মানুষের অন্তরে মুদ্রিত হয়ে আছে। আর এটাই হলো আল্লাহকে জানা ও তাঁর ইবাদাহ করার সেই সহজাত প্রবণতা। যখন মানুষের উপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, তখন নাস্তিকও সাহায্যের জন্য অবচেতন মনে আল্লাহকে ডেকে ওঠে। সব আত্মার কাছ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণের সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
আর যখন তোমার প্রভু আদমের সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বললেন (এই বলে যে), "আমি কি তোমাদের প্রভু নই?” তারা বলল, "হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।” এটা এজন্য যে, তোমরা যেন পুনরুত্থানের দিন না বলো, "আমরা তো এ সম্পর্কে বেখবর ছিলাম।” (আল আ'রাফ, ৭:১৭২)
মানুষ এই জগতে আগমনের পূর্বেই রুহের জগতে সাক্ষ্য গ্রহণের এ-ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যখন একজন মানুষ পরিণত বয়সে উপনীত হয়, যখন সে সত্য ধর্মের সন্ধান পায় তখন তার উপর তা মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক। তার উচিত নিজেকে পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করা। তবে কিছু লোক থাকতে পারে যারা লোকালয় থেকে দূরে থাকা কিংবা অন্য কোনো কারণে তাদের জীবনে কখনোই সত্য ধর্মের সন্ধান পায়নি। কিছু লোক এমনও থাকতে পারে শারীরিক বা মানসিক কোনো বৈকল্যের কারণে যাদের পক্ষে ধর্মের কথা অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا রাসূল না-পাঠানো পর্যন্ত আমি লোকদের শাস্তি দিই না। (আল ইস্রা, ১৭:১৫)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির ইবনে কাসিরে উপরে বর্ণিত মানুষদেরে ব্যাপারে নবী মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন, এসব লোকদের পরীক্ষা নেওয়া হবে বিচার দিবসে। তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে প্রাপ্ত বয়সে সুস্থ মস্তিষ্ক ও শারীরিক সক্ষমতাসহ। তারপর তাদের কাছ থেকে আল্লাহ তাঁর আনুগত্যের অঙ্গীকার নিবেন এবং তাদের সম্মুখে একটি আগুনের দেওয়াল তৈরি করবেন। একজন দূত আগুনের ভেতর থেকে এসে তাদের কাছে আল্লাহর বাণী শোনাবে-তাঁর একত্ব এবং তিনিই একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য এই বিষয়সমূহ বুঝিয়ে বলবে। এরপর সেই দূত তাদেরকে সেই আগুনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলবে। যারা তার কথা শুনে প্রবেশ করবে তারা দেখবে দরজার অন্যপাশে রয়েছে জান্নাতের বাগানসমূহ এবং তাদের ভাগ্যে থাকবে জান্নাত। কিন্তু যারা প্রবেশ করতে অসম্মতি জানাবে তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ এর দ্বারা প্রমাণ হবে যে, দুনিয়াতেও যদি তাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছাত তবে সেখানেও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাত। এভাবেই এমন কেউই বাকি থাকবে না, যার কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর আগেই তাকে বিচারের জন্য আল্লাহর সামনে হাজির করা হয়েছে।
সত্য ধর্ম সম্পর্কে কোনো ধারণা লাভের পূর্ব থেকেই সব মানুষের অন্তঃকরণে এমন এক বার্তা প্রবেশ করানো আছে, যেন তাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদাহ করার একটি সহজাত প্রবণতা থাকে। অধিকন্তু মানুষ অনেক সত্যের মুখোমুখি হয় এবং এই পৃথিবীর জীবনে নানাভাবে তাদেরকে সত্যের নিদর্শন দেখানো হয়। সত্য গ্রহণের সুযোগও তাদের দেওয়া হয়। সত্যকে গ্রহণ করা না করার স্বাধীনতা তাদের দেওয়া হয় যেন কেউ নিজের পথভ্রষ্টতার জন্য অন্য কাউকে দায়ী করতে না পারে। উপরন্তু আল্লাহ তা'আলা মানুষকে অনেক ধরনের নিদর্শন দেখান, যদি সত্যি তারা আন্তরিক হয়ে থাকে তবে এগুলো তাদের সত্য ধর্ম খুঁজে বের করতে অনুপ্রাণিত করবে। চতুর্দিকে এমনকি তাদের প্রত্যেকের মধ্যে আল্লাহর নিদর্শন রয়েছে। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ
বিশ্বজগতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাব যেন তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে, তিনি সত্য। (ফুসসিলাত, ৪১:৫৩)
৮. ধর্ম গ্রন্থের সংরক্ষণ
কোনো ধর্মকে সত্য ধর্ম বলে দাবি করতে হলে সে-ধর্মের একটি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ও অপরিবর্তিত ধর্মগ্রন্থ থাকতে হবে যা সত্যি স্রষ্টার বাণীকে ধারণ করছে। এই গ্রন্থটি চিরকাল অপরিবর্তিত ও বিশুদ্ধ থাকা উচিত। তবে এর পূর্বের ধর্মগ্রন্থগুলোকে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন নেই। কারণ স্রষ্টা নতুন গ্রন্থ দিয়ে আরও নবী পাঠিয়েছেন। কিন্তু তিনি যখন শেষ নবী ও রাসূল পাঠালেন তখন তার আনীত বার্তা সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত হতে হবে, কারণ তারপর আর কোনো নবী আসবেন না। পৃথিবীর সব ধর্মের মধ্যে কেবল ইসলামের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনই অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান। অন্য কোনো ধর্মের কোনো গ্রন্থই অবিকৃত নেই। এসব ধর্মের বিশেষজ্ঞগণ স্বীকারও করে নিয়েছেন যে, কালের আবর্তে তাদের ধর্মগ্রন্থসমূহ বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। তারা একথাও স্বীকার করেছেন যে তাদের ধর্মগ্রন্থসমূহ তাদের ধর্মের প্রবর্তকদের মৃত্যুর অনেক পরে লেখা হয়েছে এবং তাদের হুবহু কথাগুলো তাদের জানাও নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গ্রন্থগুলোর লেখককেও শনাক্ত করা যায় না।
অন্যদিকে ইসলামের চূড়ান্ত বাণী সম্পূর্ণ অবিকৃত ও অক্ষত অবস্থায় অক্ষরে অক্ষরে সংরক্ষিত রয়েছে আল কুরআনে। এটা মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী মানুষের কাছে সংরক্ষিত একমাত্র গ্রন্থ। এর পূর্বে অন্য কোনো গ্রন্থকে এভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। এটা এমন একটি গ্রন্থ যার প্রতিটি কথা পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। কুরআন কেবল একটি লিখিত কপির মাধ্যমেই সংগৃহীত হয়নি; বরং যুগে যুগে অসংখ্য মুসলিমের অন্তরের অন্তঃস্থলে এটি সংরক্ষিত হয়েছে। এই পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মুসলিম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআনকে মুখস্থ করেছে। নবী মুহাম্মাদের ﷺ সময় থেকে এযাবৎ শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ কুরআন মুখস্থ করে এর সংরক্ষণ করে যাচ্ছে।
৯. মহাগ্রন্থ আল কুরআনের অলৌকিকত্ব
সত্য ধর্মের আর যে একটি বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা হলো যে-নবী এই ধর্ম প্রচার করেছেন তিনি অলৌকিক এমন কিছু রেখে যাবেন যেটা এই পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের কাছে নিদর্শন হয়ে থাকবে। কেবল ইসলামেই আছে এমন চিরন্তন অলৌকিকত্ব। আর সবচেয়ে বড় সেই অলৌকিক মু'জিযা আল কুরআন নিজেই। কুরআনে এমন অনেক তথ্য রয়েছে যা ১৪০০ বছর পূর্বে কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কুরআনে এমন অনেক তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে যা ১৪০০ বছর পূর্বে নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর পক্ষে জানা একেবারেই অসম্ভব ছিল। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞানীরা কুরআনে মাতৃগর্ভে ভূণের অবস্থার একেবারে সঠিক বিবরণ দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন, অথচ খালি চোখে এটি দেখা কিছুতেই সম্ভব নয়। কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রায় এক হাজার বছর পর মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কৃত হয়েছে, অথচ কুরআনে যে ধাপগুলো বর্ণিত হয়েছে তা দেখার জন্য মাইক্রোস্কোপ আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ - ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
আমি তো মানুষকে মাটির উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাকে এক নিরাপদ আধারে [নারীর গর্ভে] শুক্রুবিন্দু রূপে রাখি। তারপর শুক্রুবিন্দুকে জমাট রক্তে এবং জমাট রক্তকে পরিণত করি মাংসপিণ্ডে। এরপর মাংসপিণ্ড থেকে হাড় সৃষ্টি করি আর সেই হাড়গুলোকে ঢেকে দিই মাংস দিয়ে। শেষে তাকে আরেক রূপ দেই। নিপুণ স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! (আল মু'মিনূন ২৩:১২-১৪)
ড. কিথ মুর অ্যানাটমি ও ভ্রূণবিদ্যায় বিশ্বের একজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রূণবিদ্যায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পাঠ্যপুস্তকটি তাঁর লিখিত। এতে তিনি বলেছেন যে, পনের বা ষোল শতকে মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পূর্বে মানব ভূণের বিকাশ সম্পর্কে কারও-ই তেমন কিছু জানা ছিল না। একবার একটি সেমিনারে কিথ মুরকে ভ্রূণবিদ্যা সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতসমূহকে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়। আয়াতসমূহ পড়ার পর তিনি বলেন, 'কুরআনের ভ্রূণবিদ্যা সম্পর্কিত বক্তব্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারছি বলে আমি খুবই আনন্দিত। এটা আমার কাছে সুস্পষ্ট যে এই বাণী ঈশ্বরের পক্ষ থেকেই মুহাম্মাদের কাছে এসেছে; কারণ এতে বিবৃত বিষয়ের প্রায় সবগুলোই অনেক অনেক শতাব্দী পর আবিষ্কৃত হয়েছে। এটাই আমার কাছে প্রমাণ করেছে যে, মুহাম্মাদ অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত দূত।' যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে তিনি কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে বিশ্বাস করেন কি না, তিনি উত্তরে বলেন, 'এটি মেনে নেওয়ায় আমার কোনো অসুবিধা নেই।'
কুরআনে পাহাড়, সমুদ্র, মেঘ প্রভৃতি প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কিত আরও অনেক বৈজ্ঞানিক বিষয়ে এমন অনেক বর্ণনা রয়েছে যেগুলো মাত্র কয়েক শতাব্দী পূর্বেও মানুষের জানা ছিল না। যদিও কুরআনে বিজ্ঞানের বিষয়ে অনেক কিছু বলা হয়েছে, কিন্তু এটা মূলত কোনো বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বাণী মানবজাতির কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রত্যেকটা মানুষের আত্মিক আরোগ্যের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয়ের নির্দেশনা দেওয়া আছে কুরআনে। তাই প্রতিটি মানুষ সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে ঐশীভাবে প্রত্যাদিষ্ট এই মহাগ্রন্থ আল কুরআন পড়তে বাধ্য।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 অন্যান্য ধর্মগুলোর বিশুদ্ধতার দাবি ও বাস্তবতা

📄 অন্যান্য ধর্মগুলোর বিশুদ্ধতার দাবি ও বাস্তবতা


পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন, তত্ত্ব, ধর্মীয় দল-উপদল, সম্প্রদায় রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। সবারই দাবি একমাত্র তাদের আন্দোলন বা দর্শনই সঠিক; কিংবা একমাত্র তাদের ধর্ম বা সম্প্রদায়ই স্রষ্টার নির্দেশিত সঠিক পথের উপর রয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবে যে, এগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল?
নিজেদের যারা সত্য পথের অনুসারী বলে দাবি করে, তাদের প্রচারিত মতবাদের মধ্যে বাহ্যিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। এগুলো বাদ দিয়ে আমরা যদি এটা চিহ্নিত করতে পারি যে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারা মূলত কীসের উপাসনা করার জন্য ডাকছে, তাহলেই বুঝতে পারব কোনটি সঠিক আর কোনটি সঠিক নয়। কেননা, ইসলাম ব্যাতীত বাকি সব ধর্মগুলোর প্রত্যেকের মধ্যেই একটি জিনিস অভিন্ন। সেটা হচ্ছে—হয় এরা দাবি করবে সব মানুষই ঈশ্বর, কিংবা কিছু নির্দিষ্ট মানুষ ঈশ্বর ছিলেন, কিংবা এই প্রকৃতিই স্রষ্টা অথবা স্রষ্টা মানুষের কল্পনাপ্রসূত অলীক ভাবনা।
সুতরাং বলা যেতে পারে যে, মিথ্যা ধর্মগুলোর মূল বার্তা হচ্ছে, স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে উপাসনা করা। মিথ্যা ধর্মগুলো সৃষ্টিজগৎ বা কোনো সৃষ্টিকে ঈশ্বর নাম দিয়ে তার উপাসনার আহ্বান জানায়। উদাহরণস্বরূপ, নবী যিশু তাঁর অনুসারীদের বলেছিলেন স্রষ্টার উপাসনা করতে। কিন্তু আজ যারা নিজেকে যিশুর অনুসারী বলে দাবি করেন, তারা মানুষকে স্বয়ং যিশুর উপাসনা করার আহ্বান জানান। তারা বলেন যে, যিশুই ছিলেন ঈশ্বর।
বুদ্ধ ছিলেন একজন ধর্মীয় সংস্কারক। তিনি ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত তৎকালীন ধর্মে নানাবিধ মানবীয় রীতি প্রচলন করেন। তিনি কখনো নিজেকে ঈশ্বর দাবি করেননি। তাঁর অনুসারীদের কখনো বলেননি যে, তোমরা আমার উপাসনা করো। এরপরও ভারতের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় যেসব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করেন তারা গৌতম বুদ্ধকেই তাদের ঈশ্বর বলে দাবি করেন। তারা গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতি যেভাবে কল্পনা করেছেন, তার আদলে বুদ্ধের একটি প্রতিমূর্তি বানিয়ে সেই মূর্তির পূজো করেন।
সুতরাং উপাসনার মূল লক্ষ্যবস্তু কী—এই মূলনীতির আলোকে সহজেই আমরা বুঝতে পারব কোনটি মিথ্যা ধর্ম আর কোনটি সত্য ধর্ম। বুঝতে পারব কোন ধর্মগুলো মানুষের তৈরি। স্রষ্টা আল কুরআনে বলে দিয়েছেন,
مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা তো কেবল কতগুলো নামের উপাসনা করো। আর এই নামগুলো রেখেছ তোমরা আর তোমাদের পূর্বপুরুষেরা। আল্লাহ ওগুলো সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাঠাননি। কার্যকর নির্দেশ দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি তোমাদের আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারও উপাসনা করবে না। এটাই সঠিক ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। (ইউসুফ, ১২: ৪০)
কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, সব ধর্মই তো ভালো কথা বলে, ভালো জিনিস শেখায়; তাহলে আমরা যে ধর্মই অনুসরণ করি না কেন, তাতে কী আসে যায়? এর উত্তর হচ্ছে, সব মিথ্যা ধর্মই সবচেয়ে জঘন্য যে শিক্ষাটি দেয় সেটা হলো স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির উপাসনা করা। একজন মানুষ সবচেয়ে বড় যে পাপ কাজে নিজেকে জড়াতে পারে সেটা হচ্ছে সৃষ্টির উপাসনা। কারণ এটা মানুষ সৃষ্টির একমাত্র যে উদ্দেশ্য—স্রষ্টার উপাসনা—সে উদ্দেশ্যকেই বরবাদ করে দেয়। স্রষ্টা আল কুরআনে স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার উপাসনার জন্যই সৃষ্টি করেছি। (আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
আর তাই সৃষ্টির উপাসনা করা এমনই এক মহা পাপ, পরকালে যেটা কক্ষনো কাউকে ক্ষমা করা হবে না। যিনি এ অবস্থায় মারা যাবেন, পরকালে তিনি যেন তার ভাগ্য জাহান্নামে নিশ্চিত করে নিলেন। এটা কারও ব্যক্তিগত অভিমত নয়। স্রষ্টা তাঁর সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থে এই সত্য প্রকাশ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ
যে লোক আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে, আল্লাহ কক্ষনো তার পাপ ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্যান্য পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। (আন-নিসা, ৪:৪৮ ও ১১৬)

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টা কেন তার অনুগ্রহের অসম বন্টন করলেন?

📄 স্রষ্টা কেন তার অনুগ্রহের অসম বন্টন করলেন?


সব মানবসমাজেই উদারতা এবং নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাকে একটি মহৎ গুণ মনে করা হয়। কিন্তু সবার কাছে সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে এই দুটি গুণের একটিও বিকাশ লাভ করতে পারত না। উদারতা শুধুমাত্র তখনই অর্জন করা যাবে যখন একজন মানুষ সম্পদ জমা করে রাখার আকাঙ্ক্ষা দমন করে দরিদ্রদের দান করাটাকে একটি মহৎ কাজ হিসেবে গ্রহণ করবে। অন্যদিকে আত্মাকে হিংসা এবং লোভের মতো কুপ্রবৃত্তির উপর জয়ী করতে পারলেই কেবল সন্তুষ্টি বা আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব। আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের এই পরীক্ষাগুলোর জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করতেই সৃষ্টিকর্তা অত্যন্ত বিচক্ষণভাবে পৃথিবীতে তার অনুগ্রহ অসমভাবে বন্টন করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَاللَّهُ فَضَّلَ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ فِي الرِّزْقِ
আল্লাহ জীবিকার ক্ষেত্রে তোমাদের কাউকে কারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। (আন-নাহল, ১৬:৭১)
তিনি আরও বলেন,
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةً
আর জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো একটি পরীক্ষা মাত্র। (আল আনফাল, ৮:২৮)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ
যারা বিশ্বাস করেছ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে দেয়। (আল মুনাফিকুন, ৬৩:৯)
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ
তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং কারও উপর কারও মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন সে ব্যাপারে পরীক্ষা করে নিতে পারেন। (আল আন'আম, ৬:১৬৫)
সম্পদ সঞ্চয়ের স্পৃহাকে এই জীবনে কিছুতেই তৃপ্ত করা সম্ভব নয়। মানুষ যত পায় তত চায়। নবী ﷺ বলেছেন, 'মানুষকে এক পাহাড় স্বর্ণ দেওয়া হলে সে আরেকটি চাইবে। (কবরের) মাটি ছাড়া কোনো কিছু তাকে পরিতৃপ্ত করতে পারবে না।'[১]
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ
তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। (আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّابِلِ وَالْمَحْرُومِ এবং তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক আছে। (আয-যারিয়াত, ৫১:১৯)
তবে দান করতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দান করলে তা আল্লাহর কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَى যারা বিশ্বাস করেছ! তোমরা খোঁটা এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান সাদাকাকে বরবাদ করে দিয়ো না। (আল বাকারা, ২:২৬৪)
পরশ্রীকাতরতা সম্পদের লোভকে আরও তীব্র করে। তাই আল্লাহ অন্যদের যা দিয়েছেন তার প্রতি লোভ করতে আমাদের তিনি নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ আর আল্লাহ তা'আলা যে সব বিষয়ে তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তোমরা তা কামনা করো না। (আন-নিসা, ৪:৩২)
নবী এই মহান উপদেশের পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, 'তোমার চেয়ে যারা কম সৌভাগ্যবান তাদের দিকে তাকাও, তোমার উপরে যারা আছে তাদের দিকে তাকিও না। আল্লাহ তোমাকে যেসব নিয়ামত দিয়েছেন তার প্রতি যদি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে না চাও, তবে এটাই তোমার জন্য উত্তম।' [১] আবু হুরায়রা থেকে আরও বর্ণিত আছে যে নবী বলেছেন, 'প্রাচুর্যতা সম্পদ দিয়ে নয় বরং আত্মতৃপ্তি দিয়ে মাপা হয়।' [২]
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর শান্তি পায়। (আর-রা'দ, ১৩:২৮)

টিকাঃ
[১] সহীহ আল বুখারি, খন্ড ৮, পৃ. ২৯৭-৯৮, নং ৪৪৭।
[১] সহীহ আল বুখারি, খন্ড ৮, পৃ. ৩২৮, নং ৪৯৭ এবং সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৫৩০, নং ৭০৭০।
[২] সহীহ আল বুখারি, খন্ড ৮, পৃ. ৩০৪, নং ৪৫৩।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 বিপদ ও বিপর্যয় কেন আসে?

📄 বিপদ ও বিপর্যয় কেন আসে?


আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। এই জীবন ও মৃত্যুর মূল উদ্দেশ্যই হলো, কে উত্তম কর্ম সম্পাদনকারী তা যাচাই করে নেওয়া। আর এই জীবনের পরীক্ষাগুলো অনেক সময় 'দুর্ভাগ্য' এবং বিপদআপদ রূপেও আসতে পারে। এসব পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রকৃত বিশ্বাসীদের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে সহায়তা করা এবং তাদেরকে পাপ থেকে পবিত্র করা। এ ধরনের পরীক্ষাগুলো বিপথগামী মুসলিমদের সঠিক পথে ফিরে আসার কথা মনে করিয়ে দেয়, আর অবিশ্বাসীদের জন্য এই পরীক্ষাগুলো পরকালীন শাস্তির পূর্বে এই দুনিয়ার শাস্তি স্বরূপ দেওয়া হয়।
“ধৈর্য' নামক উত্তম আত্মিক গুণটি বিকাশের মূল ভিত্তি হচ্ছে, নানা রকম বিপদ-আপদ ও বিপর্যয়। আর এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিরাই জীবনে বেশি দুঃখকষ্ট ও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। সা'দ বর্ণনা করেন, তিনি নবী -কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে মানুষের মধ্যে কারা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। উত্তরে তিনি বলেন, 'নবীগণ, এরপর যারা তাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তারা, এরপর যারা তাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তারা। মানুষকে তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। ঈমান যত দৃঢ় হয় তার পরীক্ষা তত কঠিন হতে থাকে। আর দুর্বল ঈমানের লোকদেরকে তাদের স্তর অনুযায়ীই পরীক্ষা করা হয়।' [১]
বিপদের সময় আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখার মাধ্যমেই প্রকৃত ধৈর্য অর্জিত হয়। যেমন কুরআনে বলা রয়েছে,
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ
বিধান একমাত্র আল্লাহরই। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি এবং ভরসাকারীদের কেবল তাঁরই উপর ভরসা করা উচিত। (ইউসুফ, ১২:৬৭)
আল্লাহ মানুষকে আরও নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন যে, তারা যদি আল্লাহর উপর সম্পূর্ণরূপে আস্থা রাখে তবে তাদের কঠিনতম সময়েও কেবল তিনিই তাদের জন্য যথেষ্ট হবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُه যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। (আত-তালাক, ৬৫:৩)
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْءًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْءًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ তোমরা হয়তো কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হয়তো-বা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয়, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আসলে আল্লাহই জানেন, তোমরা জানো না। (আল বাকারাহ, ২:২১৬)
আল্লাহ প্রত্যেকটি মানুষকে বিশেষভাবে তার প্রয়োজন ও অবস্থা অনুযায়ী পরীক্ষা করেন। তিনি কারও উপর অবিচার করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا তোমার প্রভু কারও সাথে অবিচার করেন না। (আল কাহফ, ১৮:৪৯)
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا আল্লাহ কারও উপর সাধ্যাতীত কোন ভার চাপিয়ে দেন না। (আল বাকারাহ, ২:২৮৬)
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ কেবল কাফির-অবিশ্বাসীরা ছাড়া আর কেউ আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয় না। (ইউসুফ, ১২:৮৭)
তাই, সূরা আল ফাত্হ-এ আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণকারীদের শাস্তি হচ্ছে জাহান্নামের অনন্ত পীড়ন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَابِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
তিনি মুনাফিক নারী-পুরুষ এবং আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা নারী-পুরুষদের শাস্তি দেবেন, কারণ তারা আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে। তাদের জন্য রয়েছে খারাপ পরিণতি। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন জাহান্নাম। কত নিকৃষ্ট নিবাস সেটা! (আল ফাতহ, ৪৮:৬)
মহান আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং দয়ার অঙ্গীকার বিশ্বাসীদেরকে এই জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষাকে ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস যোগায়। তাই আল্লাহর অনুগ্রহের উপর আশা রাখা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ যারা বিশ্বাস করো, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন। (আল বাকারাহ, ২:১৫৩)
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ যারা বিশ্বাস করে, আল্লাহর জন্য দেশত্যাগ করে, জিহাদ করে, তারাই আল্লাহর দয়ার আশা রাখে। আর আল্লাহ পুনঃপুনঃ ক্ষমাশীল, করুণাময়। (আল বাকারাহ, ২:২১৮)
আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা ধৈর্যের প্রতিদান নিশ্চিতভাবেই জান্নাত। আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাসীদের এই পুরস্কারের কথা জানিয়ে বলেছেন,
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ সুসংবাদ দাও সেইসব ধৈর্যশীলদের যারা বিপদ এলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব। (আল বাকারাহ, ২:১৫৫-১৫৬)
ধৈর্যের আরেকটি ভিত্তি রয়েছে। আর তা হলো এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, মানবজাতির উপর যত বিপর্যয় আপতিত হয় তা তাদের নিজেদের খারাপ কাজেরই ফলাফল। [১] এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ আসে সেগুলো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল; কিন্তু তিনি অনেক অপরাধই ক্ষমা করে দেন। (আশ-শূরা, ৪২:৩০)
আসলে মানুষ যে পাপাচার করে তার বেশির ভাগই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। যদি আল্লাহ মানবজাতিকে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রাপ্য শাস্তি দিতেন তাহলে তারা সহ এ পৃথিবীর অন্য সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যেত। এ ব্যাপারে সূরা ফাতিরে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِن دَابَّةٍ আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করতেন তাহলে পৃথিবীর বুকে চলমান কাউকেই তিনি রেহাই দিতেন না। (ফাতির, ৩৫: ৪৫)
শুহাইব ইবনু সিনান থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'মুমিনের বিষয়টা খুবই চমৎকার! তার পুরো জীবনটাই কল্যাণময়, আর এটা শুধুই মুমিনের জন্য। যখন তার ভালো সময় আসে তখন সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। তাই এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর খারাপ সময় আসলে সে ধৈর্য ধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর।' [২] আল্লাহর নির্ধারিত নিয়তিকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই এই আত্মিক উৎকর্ষতা অর্জন করা সম্ভব। তাই, কারও জন্য নির্ধারিত ভালো এবং আপাতদৃষ্ট খারাপ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে—এই বিশ্বাস ঈমানের ষষ্ঠ স্তম্ভ।
যদি ইসলামে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তির জীবনে কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে যে, কোথাও ভুল হচ্ছে। এমতাবস্থায় একজন প্রকৃত বিশ্বাসীকে অবশ্যই সময় নিয়ে তার জীবনের বাস্তবতাগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। হয় তার পরীক্ষাগুলো স্পষ্ট নয় এবং সেগুলো সম্পর্কে সে সচেতন নয়, অথবা সে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে গেছে।
وَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَأَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُعَذِّبَهُم بِهَا فِي الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ
তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাকে মুগ্ধ না করে। এগুলো দিয়েই আল্লাহ এই পৃথিবীতে তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অবিশ্বাসী অবস্থাতেই তাদের আত্মা দেহত্যাগ করবে। (আত-তাওবাহ, ৯:৮৫)
তবে এর মানে এই নয় যে, বিশ্বাসীরা তাদের জীবনে সমস্যা আর বিপর্যয় কামনা করবে। কারণ আল্লাহ তাদেরকে এই বলে দু'আ করতে শিখিয়েছেন, 'হে আমাদের রব! আমাদের উপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে দেবেন না যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।' [১] বরং যেসব পরীক্ষা থেকে আল্লাহ তাদের রেহাই দিয়েছেন সেগুলোর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। তবে সুখের দিনে তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যেন তারা জীবনের পরীক্ষাগুলোর ব্যাপারে উদাসীন না হয়ে পড়ে। কারণ সুখ এবং সাফল্য প্রায়ই মানুষকে জীবনের পরীক্ষাগুলোর ব্যাপারে অন্ধ করে দেয়।
পথভ্রষ্টদের জন্য পরীক্ষাগুলো কখনো কখনো শাস্তির মাধ্যমে ভুল শুধরে দেওয়ার উপায় হিসাবে কাজ করে। আর এগুলো তাদেরকে সঠিক পথে ফিরে আসতেও অনুপ্রাণিত করে। মানুষ বিপথগামী হয়ে গেলে সাধারণত সুপরামর্শ কানে তোলে না। কিন্তু তাদের উপর বা তাদের আপনজনের উপর কোনো বিপদ এলে সেটা তাদেরকে নাড়া দিয়ে যায়। তাদের মাঝে ঈমানের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকলে তারা তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারে।
وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (আখিরাতের) বড় শাস্তির পূর্বে আমরা দুনিয়াতে তাদেরকে ছোট ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে। (আস-সাজদাহ, ৩২:২১)
মানবজাতিকে তাদের বিপথগামিতার-কথা-স্মরণ-করিয়ে-দেওয়া পরীক্ষাগুলো মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার-নির্যাতনের রূপেও আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া বসনিয়ার মুসলিমদের ওপর সার্বদের অকথ্য নৃশংসতার কথা বলা যেতে পারে। ফিলিস্তিনের মুসলিমদের ওপর ইসরায়েলি বর্বরতা, কুয়েতে সাদ্দামের আক্রমণ, ইরাক ও আফগানিস্তানের মানুষদের উপর আমেরিকানদের নির্বিচার বোমা হামলা তথা গোটা পৃথিবীতে মুসলিম জাতির ওপর চলমান অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ওদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি ওদেরকে আস্বাদন করানো হয় যাতে ওরা সৎপথে ফিরে আসে। (আর-রুম, ৩০:৪১)
যারা কপটভাবে ঈমান আনার দাবি করে, বিপদ আপদ আর বিপর্যয় তাদের আসল রূপ প্রকাশ করে দেয়। আর যারা ঈমান আনতে অস্বীকার করে তারা যে স্বেচ্ছায় জাহান্নামকে বেছে নিচ্ছে এই পরীক্ষাগুলো এটাও পরিষ্কার করে দেয়।
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ
মানুষ কি মনে করে, "আমরা বিশ্বাস করি” একথা বললেই কোনো পরীক্ষা না করেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে? এদের পূর্ববর্তীদেরও আমরা পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ অবশ্যই সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদীদের সুস্পষ্টভাবে জেনে নেবেন। (আল 'আনকাবুত, ২৯:২-৩)

টিকাঃ
[১] সুনান আত-তিরমিযি, খন্ড ২, পৃ. ২৮৬, নং ১৯৫৬।
[১] প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সব বিপর্যয়ই মানুষের অপকর্মের ফল। এটি আল্লাহ সূরা আর-রুম এ (৩০:৪১) উল্লেখ করেছেন। বইটির পরবর্তী অংশে আয়াতটি উদ্ধৃত করা হবে।
[২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৫৪১, নং ৭১৩৮।
[১] সূরা আল বাকারা ২:২৮৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00