📄 স্রষ্টার কি সন্তান থাকতে পারে?
স্রষ্টা যদি মানুষের রূপ না-ও গ্রহণ করে থাকেন তবে কি তাঁর কোনো সন্তান আছে? যেহেতু তিনি সবকিছুই করতে সক্ষম সেহেতু তিনি তো সন্তান গ্রহণেও সক্ষম। মূলত এই দাবি স্রষ্টার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে তাঁকে সৃষ্টির সমপর্যায়ে নামিয়ে আনে। সৃষ্ট প্রাণী সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে; যারা বড় হয়ে আবার নিজেরা বংশবিস্তার করে এবং এভাবেই চলতে থাকে। কুকুর, বিড়াল, গরু, মানুষ সবকিছুই বাচ্চা প্রসব করে থাকে। সুতরাং এই প্রক্রিয়ায় স্রষ্টারও একজন সন্তান আছে বলে যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে তাকে কী বলা যায়?
শিশু স্রষ্টা?
কারণ, স্রষ্টা তো নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টার জন্ম দিবে। কিন্তু স্রষ্টার পক্ষে সন্তান জন্ম দিতে হলে তাঁর সাথে আরও একজন স্রষ্টা থাকতে হবে। অতএব, স্রষ্টার জন্য সন্তান জন্ম দেওয়া মোটেই শোভনীয় নয়, কারণ তা স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির স্তরে নামিয়ে দেয়।
স্রষ্টা ছাড়া বাকি সবকিছুই তাঁর আদেশবলে সৃষ্টি হয়েছে, স্রষ্টা কিংবা তাঁর অংশবিশেষ সৃষ্টির রূপ নেয়নি। স্রষ্টা না তাঁর সৃষ্টির রূপ গ্রহণ করেছেন, আর না কোনো সৃষ্টির জন্ম দিয়েছেন। স্রষ্টা কেবল স্রষ্টাই, একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, মহাবিশ্বে মানুষ এবং আরও যা কিছু আছে সবই তাঁর সৃষ্টি। মানুষ শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণা উপলব্ধি করতে না পারলেও স্রষ্টা ঠিক এভাবেই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছুই তিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন। স্রষ্টার যে গুণ তাঁকে সৃষ্টি থেকে আলাদা করেছে তা হলো তিনি সবকিছু একাই শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্টির ধরন মানুষের রূপান্তর প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
স্রষ্টা মানবজাতির কাছে যে সব নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন-ইবরাহীম, মূসা, ঈসা, মুহাম্মাদ এবং নাম না জানা আরও অসংখ্য নবী-রাসূল; আল্লাহ তাঁদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন—তাঁদের দাওয়াতের মূল বাণী ছিল এটাই। বর্তমানে এই নির্ভুল বাণী স্পষ্ট ও অবিকৃত আকারে পাওয়া যাবে কেবল মানবজাতির জন্য স্রষ্টার প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ আল কুরআনে। কারণ ১৪০০ বছর পূর্বে আল কুরআন অবতীর্ণের সময় থেকে এখন পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ অবিকৃত রয়েছে। যারা স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির পর্যায়ে নামিয়ে আনে তাদের উদ্দেশ্যে স্রষ্টা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ তাঁর মতো কিছুই নেই। (আশ-শূরা, ৪২:১১)
যারা তাঁর উপর সন্তান গ্রহণের অপবাদ আরোপ করে তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন-
وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময়ের জন্য শোভনীয় নয়। (মারইয়াম, ১৯:৯২)
যারা মনে করে আল্লাহ নিজের সত্তা থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ তিনি যখন কোনো কিছু করতে চান তখন তাকে শুধু ‘হও’ বলে নির্দেশ দেন, আর অমনি তা হয়ে যায়। (ইয়াসীন ৩৬:৮২)
যারা স্রষ্টার সাথে উপাসনায় অন্যকে শরিক করে, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,
وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ তাঁর সাথে অন্য কোনো উপাস্য নেই। থাকলে প্রত্যেক উপাস্য তার নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করত। (আল মু'মিনূন, ২৩:৯১)
আল্লাহ নাস্তিকদের প্রশ্ন করেন,
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? (আত তুর, ৫২:৩৫)
ঈসা ও তার মা যে মানুষ ছিলেন তা তিনি অত্যন্ত সরল ভাষায় বলে দিয়েছেন-
كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ তারা উভয়ে খাবার খেত। (আল মা'ইদাহ, ৫:৭৫)
স্রষ্টার মনুষ্যরূপ গ্রহণ না করার ধারণা প্রত্যেক মানুষের কাছে পরিষ্কার থাকা একান্ত জরুরি। কারণ এই বিশ্বাস ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মের মধ্যে পার্থক্যের মূল ভিত্তি। অন্য সব ধর্মেই স্রষ্টার ধারণা বিকৃত—তা যেমনই হোক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ধারণাটা পরিষ্কার থাকা উচিত তা হলো স্রষ্টা কখনোই মানুষের রূপ ধারণ করেননি। স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয়; তিনি একাই তাঁর সৃষ্টির ইবাদাতের যোগ্য। কোনো মানুষকে স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করা কিংবা কোনো মানুষ স্রষ্টা হতে পারে—এই ধারণা পোষণ করা পৃথিবীর বুকে সর্বাপেক্ষা বড় পাপ এবং মানুষের দ্বারা সম্পাদিত সর্বাধিক গর্হিত কাজ। এই উপলব্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এটাই শাশ্বত মুক্তির ভিত্তি রচনা করে। এর পরিষ্কার জ্ঞান ছাড়া কিছুতেই শাশ্বত মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। তবে কেবল বিশ্বাসই মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়।
এই বিশ্বাসকে নিখাদ ঈমানের রূপ দিতে হলে তা শুধু জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং তাকে কাজে পরিণত করতে হবে। শাশ্বত মুক্তি লাভের জন্য একজন মানুষকে সঠিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপন করতে হবে। আর তা শুরু করতে হবে স্রষ্টাকে চেনার মধ্য দিয়ে, স্রষ্টা কখনোই মানুষের রূপ ধারণ করেননি এবং ভবিষ্যতে কখনো করবেন না—এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে পোষণ করার মধ্য দিয়ে।
📄 স্রষ্টাই কেবল সৃষ্টির উপাসনা লাভের অধিকার রাখেন
যেহেতু ইবাদাহ বা উপাসনার মূল কথা হচ্ছে স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া, সেহেতু ইসলামের মূল বার্তাই হচ্ছে, কেবল এক ও একক স্রষ্টার উপাসনা। সেই সাথে স্রষ্টা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা অন্য সবকিছুর উপাসনা পরিত্যাগ করতে হবে। যেহেতু আল্লাহ একাই সবকিছুর স্রষ্টা—বাকি সবই তাঁর সৃষ্টি—সেহেতু ইসলাম মূলত সব সৃষ্টির উপাসনা বাদ দিয়ে কেবল এক স্রষ্টাকে উপাসনার আহ্বান জানায়। একমাত্র তিনিই মানুষের উপাসনা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তিনিই একমাত্র মানুষের প্রার্থনা কবুল করার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই কেউ যদি কোনো গাছের কাছে কিছু প্রার্থনা করে এবং তার সেই প্রার্থনা কবুল করা হয়, তার মানে এই নয় যে, গাছটা তার প্রার্থনা কবুল করে। আসলে স্রষ্টাই তার প্রার্থনা কবুল করেছেন। সে যা চেয়েছিলো সেটা স্রষ্টাই তাকে দিয়েছেন। কেউ বলতে পারেন, “স্রষ্টা প্রার্থনা কবুল করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক”। কিন্তু সেই গাছপূজারীর কাছে কিন্তু বিষয়টি এমন না-ও মনে হতে পারে। অনুরূপভাবে যিশু, বুদ্ধ, কৃষ্ণ, সাধু ক্রিস্টোফার বা সাধু যিহুদা এমনকি নবী মুহাম্মাদের কাছেও যে প্রার্থনা করা হয়, সেগুলোও কবুল করেন স্রষ্টা। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, যিশু তাঁর অনুসারীদের কখনোই বলেননি যে, তোমরা আমার উপাসনা করো। বরং তিনি বলেছেন এক আল্লাহর উপাসনা করতে। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে,
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُتِيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ
আর যখন আল্লাহ বলবেন, 'হে মারইয়াম পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষকে বলেছিলে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মা'কে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করো?' ঈসা বলবেন, 'মহিমা আপনার, যা বলার অধিকার আমার নেই, আমি তো সেটা কখনোই বলতে পারি না'। (আল মা'ইদাহ ৫:১১৬)
অন্যদিকে যিশুও যখন উপাসনা করেছেন, তখন তিনি নিজেকে উপাসনা করেননি; বরং তিনি আল্লাহরই উপাসনা করেছেন। গসপেলেই বলা হয়েছে, “তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরকেই ভক্তি করবে, কেবল তাঁরই সেবা করবে।” [লুক ৪:৮]
এই একই মূলনীতি দেওয়া হয়েছে আল কুরআনের প্রথম অধ্যায়ের ৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আমরা কেবল আপনারই দাসত্ব করি, এবং শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই।”
কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন,
ادْعُอนِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। (আল মু'মিন, ৪০:৬০)