📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টার স্বরূপ নিয়ে বিভ্রান্তির মূল কারণ

📄 স্রষ্টার স্বরূপ নিয়ে বিভ্রান্তির মূল কারণ


স্রষ্টার মানুষে পরিণত হওয়া অথবা স্রষ্টা এবং মানুষ একই সত্তার মধ্যে একাকার হওয়ার এই ধারণা উদ্ভব হওয়ার প্রধান কারণ হলো, যে-মহান স্রষ্টা শূন্য থেকে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন তাঁকে চেনার অক্ষমতা। তারা স্রষ্টাকে তাদের নিজেদের মতোই বিদ্যমান বস্তু থেকে সৃষ্ট মনে করে থাকে।
মানুষ বিদ্যমান বস্তুকে বিভিন্ন অবস্থা এবং আকার-আকৃতিতে রূপ দিয়ে বিভিন্ন কাজের উপযোগী নতুন বস্তু তৈরি করে। যেমন: একটি কাঠের টেবিল একসময় বনের একটি গাছ হিসেবে ছিল এবং তার পেরেক ও ক্রুগুলো একসময় ভূগর্ভস্থ খনিতে লোহার আকর হিসেবে বিদ্যমান ছিল। মানুষ গাছ কেটে তাকে টেবিলের রূপ দান করে, খনি থেকে আকর সংগ্রহ করে তাকে গলিয়ে এবং ছাঁচে ঢেলে পেরেক ও স্ক্রু তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করে বিভিন্ন কাজের উপযোগী একটি টেবিল তৈরি করে।
একইভাবে মানুষ এখন যেসব প্লাস্টিক চেয়ার ব্যবহার করে সেগুলো একসময় ভূগর্ভে তেলের আকারে ছিল। মানুষ যেভাবে চেয়ারে বসে থাকে সেভাবে তেলের উপর বসার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না। তেলের রাসαινিক উপাদান থেকে প্লাস্টিক তৈরি করে মানুষ তা দিয়ে চেয়ার বানিয়ে ব্যবহার করে। মনুষ্য ক্ষমতার এটাই মূলকথা; মানুষ শুধু বিদ্যমান বস্তুর সংস্কার ও রূপান্তর করতে পারে। তারা গাছ সৃষ্টি করতে পারে না কিংবা তেলও তৈরি করতে পারে না। মানুষ যখন তেল উৎপাদনের কথা বলে তখন আসলে তেল শোধনের কথাই বলে। লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেল সৃষ্ট হয়; অতঃপর মানুষ সেটিকে ভূপৃষ্ঠ থেকে শোধন করে সংস্কার করে। মানুষ গাছও সৃষ্টি করেনি। এমনকি যদি তারা বীজও বপন করে তবুও বলা যায়, যে-বীজ তারা বপন করল সেটাও তো তাদের সৃষ্ট নয়।
স্রষ্টার ব্যাপারে এমন নিদারুণ অজ্ঞতার কারণে মানুষ স্রষ্টাকে ঠিক তাদের নিজেদের মতোই মনে করে বসেছে। যেমন ওল্ড টেস্টামেন্টে রয়েছে যে, 'স্রষ্টা নিজের প্রতিচ্ছবির উপর মানুষ তৈরি করেন; তিনি স্রষ্টার প্রতিচ্ছবিতেই মানুষকে তৈরি করেন।' হিন্দুধর্ম অনুযায়ী সৃষ্টির ঈশ্বর 'পুরুষা' যার মনুষ্য রূপ হলো 'ব্রহ্মা' এবং মানুষ যেভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক কিছু তৈরি করেছে সেভাবেই সৃষ্টির ঈশ্বরও সবকিছু তৈরি করে থাকেন।
হিন্দু দর্শন অনুযায়ী 'পুরুষা' হলো 'ব্রহ্মা'র এক বৃহৎ সন্তান, যার এক হাজার মাথা এবং এক হাজার চোখ রয়েছে। তাঁর থেকেই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় তার সঙ্গিনী 'বিরাজ'-এর আবির্ভাব ঘটে। শাশ্বত 'পুরুষা' বলির জন্য নিবেদিত এবং তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে চারটি প্রচলিত সামাজিক শ্রেণির (বর্ণ)[১] উদ্ভব ঘটে। পেরুষা স্তোত্রগীত অনুযায়ী ব্রাহ্মনরা 'পুরুষা'র মুখ থেকে, ক্ষত্রিয়রা তার বাহু থেকে, বৈশ্যরা উরু থেকে এবং শূদ্ররা পা থেকে সৃষ্টি হয়েছে।[২] শূন্য থেকে স্রষ্টার পৃথিবী সৃষ্টি করার ক্ষমতা উপলব্ধিতে অক্ষমতার কারণেই হিন্দুরা এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, স্রষ্টা পৃথিবী এবং পৃথিবীর মানুষকে তার নিজের দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে সৃষ্টি করেছেন।
মানুষের চিন্তা ও বোধশক্তি সীমিত, আর তাই মানুষ অসীমকে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারে না। স্রষ্টা আদমকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হলো স্রষ্টা এই পৃথিবী শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যখন তিনি কোনো কিছু অস্তিত্বে আনতে চান তখন শুধু বলেন, 'হও'; আর তাঁর আদেশে তা অস্তিত্ব লাভ করে। এই পৃথিবী কিংবা তার কোনো বস্তু স্রষ্টার সত্তা থেকে সৃষ্ট হয়নি। এ ধারণা স্রষ্টাকে তাঁর সেই সৃষ্টির স্তরে নামিয়ে আনে যারা কেবল বস্তুর রূপান্তর ঘটাতে পারে, কোনো মৌলিক সৃষ্টিতে সক্ষম নয়। এমন বিশ্বাস পোষণকারীরা প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টার একত্ববাদ অনুধাবন করতেই ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এক ও অদ্বিতীয় এবং তাঁর সমতুল্য কোনো কিছুই নেই। তিনি যদি তাঁর নিজের সত্তা থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করতেন তবে তিনি তাঁর সৃষ্টির অনুরূপ হয়ে যেতেন।

টিকাঃ
[১] ডিকশনারি অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস; পৃ-৫৮৭।
[২] দ্য নিউ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা; খন্ড-২০; পৃ-৫৫২।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টা এবং সৃষ্টি কখনো এক বা একাকার হতে পারে না

📄 স্রষ্টা এবং সৃষ্টি কখনো এক বা একাকার হতে পারে না


এখানে আরেকটা কথা জোর গুরুত্বের দাবি রাখে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এটা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্ন দুই সত্তা। স্রষ্টা যেমন তাঁর সৃষ্টির সমান বা এর কোনো অংশ হতে পারে না, তেমনি তাঁর সৃষ্টিও তাঁর সমান কিংবা তাঁর কোনো অংশ হতে পারে না।
স্রষ্টা ও সৃষ্টি ভিন্ন হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অজ্ঞতা ও অবহেলার দরুন এ বিষয়ট অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। না-জানার ফলে তারা স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির উপাসনা করতে লেগে যায়। স্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান, কিংবা স্রষ্টার ঐশ্বরিক সত্তা তাঁর সৃষ্টির কিছু অংশ জুড়ে ছিল বা আছে—এ ধরনের বিশ্বাসই স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে মানুষকে সৃষ্টির উপাসনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ ধরনের বিশ্বাসই এমন ধারণার উদ্ভব ঘটিয়েছে যে, সৃষ্টির উপাসনা করলেই স্রষ্টা বা ঈশ্বরের উপাসনা করা হয়। অপরদিকে ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে—কেবল আল্লাহর উপাসনা করা এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যে ভাবেই হোক না কেন, তাঁর সৃষ্টির উপাসনা ত্যাগ করা। সব নবীগণ এই বার্তা নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন। আল কুরআনে আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই এই আহ্বান নিয়ে একজন করে বার্তাবাহক পাঠিয়েছি, "তোমরা আমার ইবাদাত করো এবং মিথ্যা উপাস্য থেকে দূরে থাকো।" (আন-নাহ্, ১৬:৩৬)
বিভিন্ন ধর্মের মূর্তিপূজারীদের যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তারা কেন মানুষের তৈরি প্রতিমার সামনে মাথা নত করে, তখন তাদের সবাই প্রায় এক ও অভিন্ন উত্তর দিয়ে থাকেন। তারা বলেন, আমরা আসলে পাথরের প্রতিমার পূজো করছি না; বরং পূজো করছি এই প্রতিমার মধ্যে মূর্তিমান ঈশ্বরকে। তাদের দাবি, স্বয়ং পাথরের মূর্তিটিই ঈশ্বর নয় বরং ঈশ্বরের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু! যিনি এই ধ্যানধারণা পোষণ করেন যে, স্রষ্টা যেকোনো উপায়েই হোক, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে উপস্থিত থাকতে পারেন-প্রতিমাপূজোর জন্য তিনি এই যুক্তি মানতে বাধ্য। পক্ষান্তরে যিনি ইসলামের মূল বার্তা ও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝেন, যত যুক্তিই দেখানো হোক না-কেন, তিনি কখনোই প্রতিমাপূজা করতে রাজি হবেন না।
পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব লোক নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের এই দাবির ভিত্তি ছিল 'স্রষ্টা মানুষের মধ্যে বিরাজমান'-এই ধারণা। একধাপ এগিয়ে এদের কেউ কেউ এমনও দাবি করেছে যে, অন্যান্যদের চেয়ে তার মধ্যেই স্রষ্টা বেশি বিরাজ করে। কাজেই বাকি লোকেরা যেন তার কাছে নতি স্বীকার করে এবং তাকেই যেন ঈশ্বর হিসেবে উপাসনা করে। অন্যদিকে কিছু লোক ছিল যারা নিজেদের ঈশ্বর দাবি না করলেও, অন্যকে ঈশ্বর হিসেবে প্রচার করত। কথিত এসব ঈশ্বরের মৃত্যুর পর, এ লোকগুলো ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসীদের সমাজে আরও ব্যাপকভাবে এসব অপবিশ্বাস ছড়াতে থাকে।
কোনো লোক যদি ইসলামের বার্তা ও এর অন্তর্নিহিত অর্থ একবার বুঝে যান, তার পক্ষে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা সম্ভব নয়। স্রষ্টার সত্য ধর্মের মূল কথা স্পষ্ট; আর তা হলো শুধু স্রষ্টার উপাসনা করা এবং সৃষ্টির যাবতীয় উপাসনা পরিত্যাগ করা। আর এটাই ইসলামের মূলমন্ত্র- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো উপাস্য নেই।
অকপটভাবে এ কথা ঘোষণা করে নবী মুহাম্মাদ -কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে মেনে নিলেই একজন লোক ইসলামের বলয়ে চলে আসেন। এ দুটো কথার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস তাকে দেয় জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতের নিশ্চয়তা। নবী মুহাম্মাদ বলেছেন, “যে লোক বলবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং এই বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এই ঘোষণার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করতে হলে নবীর দেখানো পথে নিজের ইচ্ছাকে স্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করতে হবে। সেই সাথে বাদ দিতে হবে সব মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টার কি সন্তান থাকতে পারে?

📄 স্রষ্টার কি সন্তান থাকতে পারে?


স্রষ্টা যদি মানুষের রূপ না-ও গ্রহণ করে থাকেন তবে কি তাঁর কোনো সন্তান আছে? যেহেতু তিনি সবকিছুই করতে সক্ষম সেহেতু তিনি তো সন্তান গ্রহণেও সক্ষম। মূলত এই দাবি স্রষ্টার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে তাঁকে সৃষ্টির সমপর্যায়ে নামিয়ে আনে। সৃষ্ট প্রাণী সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে; যারা বড় হয়ে আবার নিজেরা বংশবিস্তার করে এবং এভাবেই চলতে থাকে। কুকুর, বিড়াল, গরু, মানুষ সবকিছুই বাচ্চা প্রসব করে থাকে। সুতরাং এই প্রক্রিয়ায় স্রষ্টারও একজন সন্তান আছে বলে যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে তাকে কী বলা যায়?
শিশু স্রষ্টা?
কারণ, স্রষ্টা তো নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টার জন্ম দিবে। কিন্তু স্রষ্টার পক্ষে সন্তান জন্ম দিতে হলে তাঁর সাথে আরও একজন স্রষ্টা থাকতে হবে। অতএব, স্রষ্টার জন্য সন্তান জন্ম দেওয়া মোটেই শোভনীয় নয়, কারণ তা স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির স্তরে নামিয়ে দেয়।
স্রষ্টা ছাড়া বাকি সবকিছুই তাঁর আদেশবলে সৃষ্টি হয়েছে, স্রষ্টা কিংবা তাঁর অংশবিশেষ সৃষ্টির রূপ নেয়নি। স্রষ্টা না তাঁর সৃষ্টির রূপ গ্রহণ করেছেন, আর না কোনো সৃষ্টির জন্ম দিয়েছেন। স্রষ্টা কেবল স্রষ্টাই, একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, মহাবিশ্বে মানুষ এবং আরও যা কিছু আছে সবই তাঁর সৃষ্টি। মানুষ শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণা উপলব্ধি করতে না পারলেও স্রষ্টা ঠিক এভাবেই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছুই তিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন। স্রষ্টার যে গুণ তাঁকে সৃষ্টি থেকে আলাদা করেছে তা হলো তিনি সবকিছু একাই শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্টির ধরন মানুষের রূপান্তর প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
স্রষ্টা মানবজাতির কাছে যে সব নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন-ইবরাহীম, মূসা, ঈসা, মুহাম্মাদ এবং নাম না জানা আরও অসংখ্য নবী-রাসূল; আল্লাহ তাঁদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন—তাঁদের দাওয়াতের মূল বাণী ছিল এটাই। বর্তমানে এই নির্ভুল বাণী স্পষ্ট ও অবিকৃত আকারে পাওয়া যাবে কেবল মানবজাতির জন্য স্রষ্টার প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ আল কুরআনে। কারণ ১৪০০ বছর পূর্বে আল কুরআন অবতীর্ণের সময় থেকে এখন পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ অবিকৃত রয়েছে। যারা স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির পর্যায়ে নামিয়ে আনে তাদের উদ্দেশ্যে স্রষ্টা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ তাঁর মতো কিছুই নেই। (আশ-শূরা, ৪২:১১)
যারা তাঁর উপর সন্তান গ্রহণের অপবাদ আরোপ করে তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন-
وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময়ের জন্য শোভনীয় নয়। (মারইয়াম, ১৯:৯২)
যারা মনে করে আল্লাহ নিজের সত্তা থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন,
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ তিনি যখন কোনো কিছু করতে চান তখন তাকে শুধু ‘হও’ বলে নির্দেশ দেন, আর অমনি তা হয়ে যায়। (ইয়াসীন ৩৬:৮২)
যারা স্রষ্টার সাথে উপাসনায় অন্যকে শরিক করে, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,
وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ তাঁর সাথে অন্য কোনো উপাস্য নেই। থাকলে প্রত্যেক উপাস্য তার নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করত। (আল মু'মিনূন, ২৩:৯১)
আল্লাহ নাস্তিকদের প্রশ্ন করেন,
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? (আত তুর, ৫২:৩৫)
ঈসা ও তার মা যে মানুষ ছিলেন তা তিনি অত্যন্ত সরল ভাষায় বলে দিয়েছেন-
كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ তারা উভয়ে খাবার খেত। (আল মা'ইদাহ, ৫:৭৫)
স্রষ্টার মনুষ্যরূপ গ্রহণ না করার ধারণা প্রত্যেক মানুষের কাছে পরিষ্কার থাকা একান্ত জরুরি। কারণ এই বিশ্বাস ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মের মধ্যে পার্থক্যের মূল ভিত্তি। অন্য সব ধর্মেই স্রষ্টার ধারণা বিকৃত—তা যেমনই হোক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ধারণাটা পরিষ্কার থাকা উচিত তা হলো স্রষ্টা কখনোই মানুষের রূপ ধারণ করেননি। স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয়; তিনি একাই তাঁর সৃষ্টির ইবাদাতের যোগ্য। কোনো মানুষকে স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করা কিংবা কোনো মানুষ স্রষ্টা হতে পারে—এই ধারণা পোষণ করা পৃথিবীর বুকে সর্বাপেক্ষা বড় পাপ এবং মানুষের দ্বারা সম্পাদিত সর্বাধিক গর্হিত কাজ। এই উপলব্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এটাই শাশ্বত মুক্তির ভিত্তি রচনা করে। এর পরিষ্কার জ্ঞান ছাড়া কিছুতেই শাশ্বত মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। তবে কেবল বিশ্বাসই মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়।
এই বিশ্বাসকে নিখাদ ঈমানের রূপ দিতে হলে তা শুধু জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং তাকে কাজে পরিণত করতে হবে। শাশ্বত মুক্তি লাভের জন্য একজন মানুষকে সঠিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপন করতে হবে। আর তা শুরু করতে হবে স্রষ্টাকে চেনার মধ্য দিয়ে, স্রষ্টা কখনোই মানুষের রূপ ধারণ করেননি এবং ভবিষ্যতে কখনো করবেন না—এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে পোষণ করার মধ্য দিয়ে।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টাই কেবল সৃষ্টির উপাসনা লাভের অধিকার রাখেন

📄 স্রষ্টাই কেবল সৃষ্টির উপাসনা লাভের অধিকার রাখেন


যেহেতু ইবাদাহ বা উপাসনার মূল কথা হচ্ছে স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া, সেহেতু ইসলামের মূল বার্তাই হচ্ছে, কেবল এক ও একক স্রষ্টার উপাসনা। সেই সাথে স্রষ্টা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা অন্য সবকিছুর উপাসনা পরিত্যাগ করতে হবে। যেহেতু আল্লাহ একাই সবকিছুর স্রষ্টা—বাকি সবই তাঁর সৃষ্টি—সেহেতু ইসলাম মূলত সব সৃষ্টির উপাসনা বাদ দিয়ে কেবল এক স্রষ্টাকে উপাসনার আহ্বান জানায়। একমাত্র তিনিই মানুষের উপাসনা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তিনিই একমাত্র মানুষের প্রার্থনা কবুল করার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই কেউ যদি কোনো গাছের কাছে কিছু প্রার্থনা করে এবং তার সেই প্রার্থনা কবুল করা হয়, তার মানে এই নয় যে, গাছটা তার প্রার্থনা কবুল করে। আসলে স্রষ্টাই তার প্রার্থনা কবুল করেছেন। সে যা চেয়েছিলো সেটা স্রষ্টাই তাকে দিয়েছেন। কেউ বলতে পারেন, “স্রষ্টা প্রার্থনা কবুল করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক”। কিন্তু সেই গাছপূজারীর কাছে কিন্তু বিষয়টি এমন না-ও মনে হতে পারে। অনুরূপভাবে যিশু, বুদ্ধ, কৃষ্ণ, সাধু ক্রিস্টোফার বা সাধু যিহুদা এমনকি নবী মুহাম্মাদের কাছেও যে প্রার্থনা করা হয়, সেগুলোও কবুল করেন স্রষ্টা। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, যিশু তাঁর অনুসারীদের কখনোই বলেননি যে, তোমরা আমার উপাসনা করো। বরং তিনি বলেছেন এক আল্লাহর উপাসনা করতে। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে,
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُتِيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ
আর যখন আল্লাহ বলবেন, 'হে মারইয়াম পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষকে বলেছিলে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মা'কে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করো?' ঈসা বলবেন, 'মহিমা আপনার, যা বলার অধিকার আমার নেই, আমি তো সেটা কখনোই বলতে পারি না'। (আল মা'ইদাহ ৫:১১৬)
অন্যদিকে যিশুও যখন উপাসনা করেছেন, তখন তিনি নিজেকে উপাসনা করেননি; বরং তিনি আল্লাহরই উপাসনা করেছেন। গসপেলেই বলা হয়েছে, “তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরকেই ভক্তি করবে, কেবল তাঁরই সেবা করবে।” [লুক ৪:৮]
এই একই মূলনীতি দেওয়া হয়েছে আল কুরআনের প্রথম অধ্যায়ের ৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আমরা কেবল আপনারই দাসত্ব করি, এবং শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই।”
কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন,
ادْعُอนِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। (আল মু'মিন, ৪০:৬০)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00