📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টার অনুগ্রহ ও করুণার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো

📄 স্রষ্টার অনুগ্রহ ও করুণার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো


ক্ষমা, অনুগ্রহ এবং দয়ার মতো ঐশ্বরিক গুণাবলি মানবজাতির মাঝেও প্রতিভাত হয়। মানুষকে সৎ হিসেবে এবং ভালো ও মন্দ সম্পর্কে বোঝার সহজাত সচেতনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষের মাঝে কামনা-বাসনাও সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদেরকে তাঁর বিধান অনুযায়ী এই কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করার কিংবা লাগামহীনভাবে প্রবৃত্তির অনুসারী হওয়ার স্বাধীনতাও দিয়েছেন। মানুষ আল্লাহকে অমান্য করবে এটা জেনেই তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি আদম থেকে শুরু করে সব মানুষকে তাওবার মাধ্যমে পাপ থেকে নিজেদের পরিশুদ্ধ করার পদ্ধতি শিখিয়েছেন।
আদম এবং হাওয়া সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁরা আল্লাহর আদেশ ভুলে গিয়েছিলেন এবং শয়তান তাঁদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল। তবে তাঁরা আল্লাহকে অমান্য করার পর তাওবা করে পুনরায় আল্লাহর প্রতি অনুগত হন এবং আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করে দেন। অবাধ্যতার পরে মানবজাতির পুনরায় তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ঘটনার মধ্য দিয়েই আল্লাহর অসীম ক্ষমা এবং অপরিসীম করুণার ঐশ্বরিক গুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সর্বশেষ নবী তাঁর সাহাবাদের এই বিষয়টি সম্পর্কে জানিয়ে বলেন, 'তোমরা যদি পাপ না করতে এবং তারপর ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে না-যেতে তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে এমন এক সম্প্রদায়কে সৃষ্টি করতেন যারা পাপ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতেন।' [১]
কুরআনের ১১৪টি সূরার একটি বাদে বাকি সবকটির শুরু হয়েছে ‘পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে’—এই প্রার্থনা দিয়ে। মানুষ যেন হতাশায় ডুবে না যায় সেজন্য আল্লাহর ক্ষমা এবং করুণার প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাপ যত বড়ই হোক না কেন, কোনো ব্যক্তি যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করে এবং ক্ষমা চায় তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করার সময় করুণাকে আল্লাহ নিজের ওপর আবশ্যক করে বলেন: "আমার অনুগ্রহ আমার রাগের উপর প্রাধান্য লাভ করবে।"’ [২] রাসূলুল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহ দয়াকে একশ ভাগে ভাগ করেন। এর এক ভাগ তিনি জ্বিন, মানবজাতি এবং অন্যান্য প্রাণীর মাঝে ভাগ করে দেন। এই এক ভাগের অংশবিশেষের প্রভাবেই তারা একে অপরকে ভালোবাসে, একে অপরের প্রতি দয়ালু হয়। এমনকি পশুপাখিও তাদের বাচ্চাদের স্নেহের সাথে পালন করে। আর বাকি ৯৯ ভাগ আল্লাহ শেষ বিচারের দিনে তাঁর প্রকৃত আনুগত্যকারীদের জন্য নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন।’ [৩]
ফেরেশতাগণ যেমন পাপ করতে অক্ষম, আল্লাহ চাইলে মানুষকেও তেমন করে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু সেটি তাঁর অভিপ্রায় ছিল না, কারণ তিনি তো এমন বৈশিষ্ট্য দিয়ে ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেনই। মানুষকে ভুল করার সামর্থ্য দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে করে ভুল বুঝতে পারার পর তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে। আর এর মাধ্যমে যেন আল্লাহর দয়া এবং ক্ষমাশীলতার গুণ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।
মানুষ শুধুমাত্র তাদের ভালো কাজের দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আল্লাহর অনুগ্রহই শেষ পর্যন্ত তাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে। নবী এই বিষয়ে বলেছেন, 'সাধ্যমতো সৎ কাজ করো এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। কারণ কেউ শুধুমাত্র তার সৎ কাজ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' সাহাবারা বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনিও না?' তিনি বললেন, 'আমিও না। যদি আমার উপর আল্লাহ তাঁর দয়া এবং অনুগ্রহ বর্ষণ না করেন।[১] আর মনে রেখো, ছোট হলেও যে ভালো কাজটি নিয়মিত করা হয় আল্লাহ সেটিকেই বেশি পছন্দ করেন।' [২] তবে আল্লাহর অনুগ্রহ নিঃশর্ত নয়। এটি বিশুদ্ধ ঈমান এবং ভালো কাজের উপর নির্ভর করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
যে একটি সৎ কাজ করবে, সে তার দশগুণ বিনিময় পাবে। আবার যে একটি খারাপ কাজ করবে, তাকে শুধু সেটারই প্রতিফল দেওয়া হবে। তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। (আল আন'আম, ৬:১৬০)
আল্লাহ যদি কঠোরভাবে মানুষের কাজের হিসাব নিতেন তাহলে কারও ভালো কাজই তার খারাপ কাজের চেয়ে বেশি হতো না। তাই আল্লাহ প্রতিটি ভালো কাজের মূল্য অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু খারাপ কাজগুলোর জন্য সেগুলোর সমপরিমাণ শাস্তিই নির্ধারণ করেছেন। এতে আল্লাহর অনুগ্রহই প্রকাশ পায়। আল্লাহর অনুগ্রহেই বিশ্বাসী মুসলিমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, এতে মানুষের সৎ কাজের কোনো ভূমিকা নেই। মানুষের কৃতকর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটাই জান্নাত-জাহান্নাম নির্ধারক নয়। আল্লাহর অনুগ্রহের তুলনায় তা নিতান্তই নগণ্য।
একইভাবে, মানবজাতির সৃষ্টি, তাদের ভুল-ত্রুটি এবং ভালো কাজ—সবই আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলি যেমন: দয়া, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়বিচার, অনুগ্রহ প্রভৃতি সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করার বিভিন্ন অবস্থা।
আল্লাহর নিজ গুণাবলি প্রকাশের এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা কোনো মানুষের জন্য আদৌ সমীচীন নয়। কেননা, তিনি সর্বধিক জ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাময়। সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে যে, তিনি যে প্রক্রিয়ায় নিজ গুণাবলি প্রকাশ করেছেন সেটা নিশ্চয়ই সর্বোকৃষ্ট পন্থা। মানুষ তো শুধু ততটুকুই বুঝতে পারে যতটুকু আল্লাহ তাদের কাছে প্রকাশ করেছেন।
۞ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ
তিনি যতটুকু চান সেটুকু ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তাঁরা আয়ত্ত করতে পারে না। (আল বাকারা, ২:২৫৫)
তাই নিজেদের কখনোই কোনো ব্যাপারে আল্লাহর সমকক্ষ ভাবা উচিত নয়। কোনো সিদ্ধান্ত তিনি কেন নিয়েছেন—এটা যদি আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে জানান তবে সেটা ভিন্ন কথা; কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তটি কেন নিলেন—এমন প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর। এ রকম প্রশ্নের কোনো শেষ নেই; তাই এগুলো বোদ্ধা মানুষের সাধ্যের বাইরে। কিয়ামতের দিনে মানুষকে তার নিয়্যাত এবং কৃতকর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবদ করা হবে, আল্লাহকে নয়। মহান আল্লাহ এই বিষয়ে বলেন,
لَّا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ
তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং প্রশ্ন করা হবে তাদেরকেই। (আল আম্বিয়া, ২১:২৩)
এই বিষয়ে ইবন আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন যে, নবী মুহাম্মাদ সা. বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা করো, স্বয়ং আল্লাহর সত্ত্বার ব্যাপারে গবেষণা করতে যেও না।’[১] স্বয়ং আল্লাহকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা প্রকারান্তরে অসীম কোনো সত্তাকে নিয়ে চিন্তা করা। আল্লাহর সৃষ্ট এই বিশ্বজগৎ এবং তাঁর অন্তর্ভুক্ত ছায়াপথ আর তারকারাজি নিয়ে চিন্তা করলেই মানুষ আশ্চর্য্যন্বিত হয়ে পড়ে। সুতরাং আদি ও অনন্ত আল্লাহকে বোঝার চেষ্টা করলে মানুষ যে বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়বে তা বলাই বাহুল্য।
উত্তর নেই এমন প্রশ্ন করে শয়তান আল্লাহর ব্যাপারে বিশ্বাসীদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে নবী আমাদের সতর্ক করেছেন। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'শয়তান সবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করবে, এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে? তারপর এক পর্যায়ে সে জিজ্ঞেস করবে, 'তোমার প্রভুকে কে সৃষ্টি করেছে?' এই প্রশ্ন মনে আসা মাত্রই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে (বলতে হবে: আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করছি।) [১] এবং এ ধরনের চিন্তা এড়িয়ে যেতে হবে।' [২]

টিকাঃ
[১] আনাস বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর বার্তাবাহক বলেছেন, 'সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেছেন, "হে আদমসন্তান, তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে চাইবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে তোমার কৃতকর্মের জন্য মাফ করে দিতে থাকব এবং আমি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান, তোমার পাপ যদি আকাশ ছুঁয়ে ফেলে আর তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে মাফ করে দেব। হে আদম সন্তান, তুমি যদি আমার সাথে কাউকে শরীক না করে পৃথিবী-ভরা পাপ নিয়েও আমার কাছে আস তবে আমিও তেমন বিশাল ক্ষমাশীলতা নিয়ে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করব।”” সহীহ সুনান আত-তিরমিযি, খণ্ড ৩,পৃ. ১৭৫-৭৬, নং ২৮০৫।
[১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৩৫-৩৬, নং ৬৬২১, আবু আইয়ুব আল আনসারি থেকে বর্ণিত।
[২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৩৭, নং ৬৬২৮, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
[৩] প্রাগুক্ত, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৩৭, নং ৬৬৩১, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
[১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৭৩, নং ৬৭৬৫, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
[২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৭৩-৭৪, নং ৬৭৭০, 'আ'ইশাহ থেকে বর্ণিত।
[১] আল হিলায়া গ্রন্থে আবূ নু’আইম কর্তৃক সংগৃহীত, সিলসিলাহ আল আহাদিস আস-সাহীহাহ, খণ্ড ৪, পৃ. ৯২, নং ১৭৮৮। আল আওসাত গ্রন্থে আত্-তাবরানী এবং শু’আব আল ঈমান গ্রন্থে আল বায়হাকী অনুরূপ একটি বর্ণনা ইবনু উমার থেকে বর্ণনা করেছেন।
[১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১, পৃ. ৭৭, নং ২৪২ ও ২৪৩।
[২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১, পৃ. ৭৭, নং ২৪৪ এবং সহীহ আল বুখারি, খণ্ড ৪, পৃ. ৩২০, নং ৪৯৬।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য

📄 সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য


বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বিষয়টি একেক গ্রন্থে একেকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বাইবেলের সামগ্রিক পর্যালোচনা একজন নিষ্ঠাবান সত্যান্বেষীকে সত্যের সন্ধান না দিয়ে বরং তাকে আরও জটিল এক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়। মানবসৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টে আগের যুগের মানুষ এবং ইহুদিদের ইতিহাস ও আইনই প্রাধান্য পেয়েছে। [৩]
খ্রিষ্টানদের অধিকাংশ উপদলের অনুসারীরা সৃষ্টির উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে যে-অভিন্ন বিশ্বাস পোষণ করে তা হলো, আদম এবং তার সব সন্তানদের পাপ মোচন করতে সৃষ্টিকর্তা মানুষ হয়ে পৃথিবীতে এসে মানুষের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মতে এই পাপ এতই ভয়াবহ ছিল যে, কোনো মানবীয় প্রায়শ্চিত্ত এটিকে মোচন করতে পারত না। স্রষ্টা এত বেশি উঁচু মর্যাদাবান যে, কোনো পাপী ব্যক্তি তাঁর সামনে দাঁড়াতে পারে না। তাই শুধুমাত্র স্রষ্টার নিজের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই মানবজাতিকে এই পাপ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব।
চার্চের দাবি অনুযায়ী, মানুষের মনগড়া এই পৌরাণিক গল্পে বিশ্বাস স্থাপনই পাপ মোচনের একমাত্র উপায়। ফলে সৃষ্টির উদ্দেশ্যের ব্যাপারে খ্রিষ্টীয় মতবাদ দাঁড়ায় 'স্রষ্টার 'আত্মত্যাগ' কে বিশ্বাস করা এবং যিশু খ্রিষ্টকে প্রভু ও প্রতিপালক হিসাবে মেনে নেওয়া। জনের গসপেলে যিশুর বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্যবহৃত শব্দগুলো থেকে এটাই প্রমাণিত হয়। এখানে বলা হয়েছে যে, 'ঈশ্বর পৃথিবীকে এতই ভালোবাসেন যে, এর জন্য তিনি নিজের একমাত্র পুত্রকে সেখানে পাঠান এবং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে তারা অনন্ত জীবন লাভ করবে।' [১]
হিন্দুধর্মের গ্রন্থসমূহ শিক্ষা দেয় যে, ঈশ্বরের সংখ্যা অনেক, ঈশ্বরের অবতার রয়েছে, ঈশ্বরের মানবরূপ রয়েছে এবং সবকিছুই ঈশ্বর বা ব্রহ্মা। সব জীবিত সত্তাই ব্রহ্মা-এমন বিশ্বাসের দাবি করা সত্ত্বেও হিন্দুসমাজে চরম অমানবিক একটি বর্ণপ্রথা গড়ে উঠেছে। এই বর্ণপ্রথায় পুরোহিতদের বর্ণ এবং ব্রাহ্মণগোত্র জন্মসূত্রে আধ্যাত্মিক প্রাধান্য লাভের সুবিধা ভোগ করে। এরা বেদ[২] শিক্ষা দেয় এবং সামাজিক মর্যাদা ও প্রথাসমূহের বিশুদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরপক্ষে, শূদ্র বর্ণের কোনো ধর্মীয় মর্যাদা নেই এবং তাদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে অন্য তিনটি বর্ণ এবং সেগুলোর হাজারো উপবর্ণের লোকদের 'বিনয়ের সাথে সেবা করা।' [৩]
অদ্বৈতবাদী হিন্দু দার্শনিকদের মতে, মানবজাতির প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের নিজ ঈশ্বরত্ব উপলব্ধি করা এবং একটি পথ (মার্গ) অনুসরণের মাধ্যমে পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তিলাভ বা মোক্ষ অর্জন করা। আর এর মাধ্যমেই মহা সত্য অর্থাৎ ব্রহ্মের সাথে মানবাত্মার পুনর্মিলন ঘটবে। ভক্তি পথের[৪] অনুসারীদের মতে সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈশ্বরকে ভালোবাসা। কারণ, তাদের মতে ঈশ্বর মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন 'মানবীয় সম্পর্কগুলোকে ভালোবাসার জন্য-যেমনিভাবে বাবা তার সন্তানদের ভালোবাসেন' (শ্রীমদ ভাগওয়াতাম)। আর অন্যান্য সাধারণ হিন্দুদের পথ হচ্ছে কর্ম পথ।[৫] এই পথের অনুসারীদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক দায়িত্ব পালন করা এবং নিজ নিজ বর্ণ অনুযায়ী ধর্মীয় প্রথাসমূহ পালন করা।
সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ কুরআনে মহান আল্লাহ মানবজাতি সৃষ্টির পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছেন। এবং তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে মানুষের বোধগম্য করে সবকিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন।
'আল্লাহ কেন মানুষ সৃষ্টি করলেন?' মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নটির অর্থ দাঁড়ায় এ রকম: 'কী উদ্দেশ্যে মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে?' মহাগ্রন্থ আল কুরআনে কোনো রকম অস্পষ্টতা ছাড়াই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ প্রথমেই মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর ব্যাপারে সহজাত সচেতনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। সূরা আল আ'রাফ-এ আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ - أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِنْ بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ
আর যখন তোমার প্রভু আদমের সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বললেন (এই বলে যে), "আমি কি তোমাদের প্রভু নই?” তারা বলল, "হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।” এটা এজন্য যে, তোমরা যেন পুনরুত্থানের দিন না বলো, "আমরা এ সম্পর্কে বেখবর ছিলাম।” অথবা যেন না বলো, "আমাদের বাপ-দাদারাই তো আগে শির্ক করেছে; আর আমরা হলাম তাদেরই পরবর্তী বংশধর। অতএব, আপনি কি বাতিলপন্থীদের কৃতকর্মের জন্য আমাদের ধ্বংস করবেন।” (আল আ'রাফ, ৭:১৭২-১৭৩)
তাই প্রতিটি মানুষ আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের ব্যাপারে দায়বদ্ধ। কারণ আল্লাহর প্রতি এ বিশ্বাস প্রত্যেকটি মানুষের অন্তরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর উপর সহজাত এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই কুরআনে আল্লাহ মানবসৃষ্টির উদ্দেশ্যকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আর জিন[১] ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদাত করবে। (আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
সুতরাং, ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী মানবসৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত করা। তবে মানুষের ইবাদাতের কোনো প্রয়োজন সর্বশক্তিমান আল্লাহর নেই। অর্থাৎ, তিনি তাঁর নিজের কোনো প্রয়োজন মেটাতে মানবজাতিকে সৃষ্টি করেননি। একটি মানুষও যদি আল্লাহর ইবাদাত না করে তাতে তাঁর মহিমা কোনো অংশে কমবে না। একইভাবে সমগ্র মানবজাতি যদি আল্লাহর ইবাদাত করে তাতেও তাঁর মহিমা কোনো অংশে বৃদ্ধি পাবে না। আল্লাহ সব ত্রুটি ও মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত। একমাত্র তিনিই সব প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। সব সৃষ্ট সত্তারই কিছু না কিছু প্রয়োজন রয়েছে। তাই আল্লাহর ইবাদাত করাটা প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির নিজেদের কল্যাণের জন্যই প্রয়োজন।
আল্লাহর ইবাদাহ করা কেন মানুষের জন্য আবশ্যকীয় তা বুঝতে হলে প্রথমে 'ইবাদাহ' বা ইংরেজিতে worship শব্দটি ভালোভাবে বুঝতে হবে। 'Worship' শব্দটি প্রাচীন ইংরেজি শব্দ weorthscipe থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে যার অর্থ সম্মান (honor)। ইংরেজি ভাষায় worship শব্দটি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে: 'কোনো উপাস্যের প্রতি সম্মানবশত ভক্তিমূলক কোনো কাজ সম্পাদন করা।'[২] এই অর্থ অনুযায়ী মানুষকে আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ
আপনি আপনার প্রভুর কৃতজ্ঞতাসহ মহিমা ঘোষণা করুন। (আন-নাসর, ১১০:৩)
আল্লাহর উপাসনার মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিজগতের সবার সাথে একই ঐকতানে চলে আসে। কারণ অন্যান্য সব সৃষ্টি প্রাকৃতিকভাবেই আল্লাহর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে। আল্লাহ কুরআনের অনেক সূরাতে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আল ইসরাতে তিনি বলেন,
سَبَّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ
সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর কৃতজ্ঞতাসহ মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই যা তার সকৃতজ্ঞ মহিমা ঘোষণা করে না।[১] তবে তোমরা তাদের বর্ণণার ভাষা বুঝতে পারো না। (আল ইসরা, ১৭:৪৪)
আরবিতে উপাসনাকে বলা হয় 'ইবাদাহ। এটি 'আবিদ বিশেষ্যটির সাথে সম্পর্কযুক্ত যার অর্থ 'দাস'। একজন দাস তার প্রভুর ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। একইভাবে কুরআন অনুযায়ী 'ইবাদাহ বলতে বোঝায় 'আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি অনুগত আত্মসমর্পণ
আল্লাহ মানবজাতির কাছে যত বার্তাবাহক পাঠিয়েছিলেন, তাদের মূল বার্তার সারকথা ছিল এটাই। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাথিউর গসপেল ৭:২১ অনুযায়ী, উপাসনার এই অর্থের প্রতি নবী ঈসা জোর দিয়ে বলেছেন, 'আমাকে যারা প্রভু বলে ডাকে তাদের কেউ ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না। শুধু তারাই প্রবেশ করবে যারা আমার পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী চলে যিনি রয়েছেন আকাশের উপর।' তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, এখানে 'ইচ্ছা' বলতে 'আল্লাহ মানুষকে যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন' তা বোঝায়; 'আল্লাহ মানুষকে যা করার স্বাধীনতা দিয়েছেন' তা নয়। কারণ এই সৃষ্টজগতে কোনো কিছুই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঘটে না। ঐশী বাণীর মাঝেই 'আল্লাহর ইচ্ছা' বর্ণনা করা হয়েছে যা নবী-রাসূলগণ তাঁদের অনুসারীদের শিখিয়ে গেছেন। ফলে ঐশী বিধানের প্রতি আনুগত্যই হচ্ছে উপাসনার মূল ভিত্তি। তাই আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী করলে আল্লাহর প্রশংসা করাটাও ইবাদাতে পরিণত হয়।
মানুষকে কেন স্রষ্টার ইবাদাহ করতে হবে? কেন ঐশী বিধান মেনে চলতে হবে? কারণ এই জীবন এবং পরবর্তী জীবনে সাফল্য লাভের একমাত্র চাবিকাঠিই এই ইবাদাত। প্রথম মানব-মানবী আদম ও হাওয়া (আ:) -কে সৃষ্টি করে জান্নাতে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে আল্লাহর বিধান অমান্য করার কারণে জান্নাত থেকে তাদেরকে বের করে দেওয়া হয়। মানুষের জন্য জান্নাতে ফিরে যাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে সেই বিধানের প্রতি অনুগত হওয়া।
ম্যাথিউর গসপেলে বর্ণিত আছে যে, মসীহ ঈসা আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যকে জান্নাতের চাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে রয়েছে যে, একজন এসে তাঁকে বলল, 'হে মহান শিক্ষক, অনন্ত জীবন লাভ করতে হলে আমাকে কী কী ভালো কাজ করতে হবে?' তখন যিশু তাকে বললেন, 'তুমি আমাকে মহান বলছ কেন? আল্লাহ ছাড়া কেউ মহান নয়। তুমি যদি সেই জীবনে প্রবেশ করতে চাও তাহলে আল্লাহর আদেশ পালন করো।'
[১] ম্যাথিউর ৫:১৯ এ বলা হয়েছে যে, যিশু খ্রিষ্ট আল্লাহর বিধান কঠোরভাবে মেনে চলার উপর জোর দিয়ে বলেন, যদি কেউ এই নির্দেশগুলোর কোনো একটি ভঙ্গ করে এবং মানুষকে ভঙ্গ করতে শেখায় তবে তাকে পরকালে অপমানিত করা হবে; আর যারা সেগুলো পালন করে এবং মানুষকে শিক্ষা দেবে তাদেরকে পরকালে সম্মানিত করা হবে।

টিকাঃ
[৩] ইসাইয়াহতে বলা হয়েছে, ইহুদিদের সৃষ্টি করা হয়েছে ঈশ্বরের মহিমাস্বরূপ 'কিন্তু যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাকে আকৃতি দিয়েছেন সেই প্রভু বলছেন, হে জ্যাকব, হে ইসরাইল,..." আমি উত্তর দিককে বলব ছেড়ে দাও, দক্ষিণকে বলব, ধরে রেখো না। পৃথিবীর দূরদূরান্ত থেকে আমার পুত্র এবং কন্যাদের এনে দাও। যাদের আমার নামে ডাকা হয়, যাদের আমি আমার মহিমার নিদর্শনস্বরূপ সৃষ্টি করেছি, যাদের আমি তৈরি করেছি এবং আকৃতি দান করেছি।” (রিভাইড্ড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন, ইসাইয়াহ ৪৩:১, ৬-৭)।
[১] জন, ৩:১৬ (রিভাইজড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন)।
[২] বেদ (যার আভিধানিক অর্থ জ্ঞান) হচ্ছে হিন্দুদের ধারণামতে তাদের ধর্মের পবিত্র ঐশী গ্রন্থসমূহকে (এগুলোকে বলা হয় শ্রুতি) একত্রে বোঝাতে ব্যবহৃত একটি সামষ্টিক শব্দ। হিন্দুদের প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠান বর্ণনাকারী অন্যান্য যে গ্রন্থগুলোকে মানবরচিত বলে স্বীকার করা হয় সেগুলোকে বলা হয় স্মৃতি (যা মনে রাখা হয়)। (দি নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিয়া, খণ্ড ২০, পৃ. ৫৩)।
[৩] মানব ধর্মশাস্ত্র ১.৯১ (দি নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিয়া, খন্ড ২০, পৃ. ৫৫৩)।
[৪] মূর্তিপূজার মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে পরবর্তী জীবনে কৃস্নালোকে (একটি আধ্যাত্মিক জগৎ) যাওয়ার আশা করা।
[৫] দি নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিয়া, খন্ড ২০, পৃ. ৫২০।
[১] জিন হচ্ছে আগুনের উপাদান থেকে আল্লাহর সৃষ্ট এক প্রকার যুক্তিবোধ সম্পন্ন অদৃশ্য সত্তা। আল্লাহ মানুষের মতো তাদেরকেও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। তাই তাদের মাঝেও ভালো-খারাপ এবং বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী রয়েছে। তাদের খারাপদের সাধারণত প্রেতাত্মা, ভূত, শয়তান ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে।
[২] দি লিভিং ওয়েবস্টার এনসাইক্লোপেডিক ডিকশনারি, পৃ. ১১৪৮
[১] কুরআনে যথাক্রমে ১৩:১৩, ২১:২০ ও ৩৮:১৮ তে বলা হয়েছে বজ্রপাত, রাত-দিন এবং পাহাড়সমূহ আল্লাহর প্রশংসা করে।
[১] ম্যাথিউ ১৯:১৬-১৭ (রিভাইড্ড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00