📄 বান্দা ও বন্দেগির বৈশিষ্ট্য
৬৪২. ইবরাহীম ইবনু ওয়ালিদ থেকে বর্ণিত, আবু সাঈদ বলেছেন: "দাসত্বের নিদর্শন তিনটি। যথাযথভাবে আল্লাহর বিধিবিধান পালন করা। শারীয়াতের বিষয়ে নবি ﷺ-এর অনুসরণ করা এবং গোটা উম্মাতের জন্য কল্যাণ কামনা করা।”
৬৪৩. আবুল হুসাইন আল ফারিসি বলেন, “ইবনু আতাকে বলতে শুনেছি : 'কবুলিয়াত তথা আল্লাহর দাসত্বের চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অঙ্গীকার পূরণ করা, আল্লাহর নির্ধারিত সীমা সংরক্ষণ করা, কিছু পেলে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি প্রকাশ করা এবং কিছু হারিয়ে গেলে ধৈর্য ধারণ।”
৬৪৪. আইয়াশ বিন ইসাম বলেন, “সাহালকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'মানুষ কখন আল্লাহর বান্দা হতে পারে?' উত্তরে আমি তাকে বলতে শুনেছি, 'যখন সে আল্লাহ তাআলার ওপর এবং আল্লাহ তাআলা তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়।”
৬৪৫. আবূ বকর যুবায়রি বলেন, “জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি : 'দ্রুত রেগে যাওয়া, দারিদ্র্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, ঘরবাড়ির প্রতি মোহ ও টান অনুভব করা-এ সবগুলোই নফসকে ভালোবাসার লক্ষণ। এর পরিণামে ব্যক্তি উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের স্তর থেকে নিচে নেমে যায় এবং রুবুবিয়াত তথা আল্লাহ তাআলার প্রতিপালক সত্তার সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।”
৬৪৬. আবদুর রহমান বলেন, “আমার দাদা ইসমাইলকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'বান্দার জন্য কোন বিষয়টি থাকা আবশ্যক?' তিনি উত্তরে বলেন, 'সুন্নাত অনুযায়ী উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বকে আঁকড়ে থাকা এবং সবসময় আল্লাহর ধ্যান করা।”
৬৪৭. মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল হক বলেন, “আমি আবুল আব্বাস ইবনু আতাকে বলতে শুনেছি : 'যে ব্যক্তি নিজের ওপর সুন্নাতের শিষ্টাচার আবশ্যক করে নেয়, আল্লাহ তাআলা মারিফাতের নূর দিয়ে তার অন্তরকে আলোকিত করে দেন। আর কথা-কাজ-আকীদা-বিশ্বাস-নিয়ত-শিষ্টাচার ও কাজকর্ম—মোটকথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবি ﷺ-এর অনুসরণের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ কোনো বিষয় নেই।”
৬৪৮. মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইবনু ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, আবূ উসমান চিঠি লিখে শাহকে জিজ্ঞেস করেন, "বান্দার মধ্যে কোন বিষয়টি থাকা অত্যাবশ্যক?” তিনি উত্তরে লিখেন, “সার্বিক বিষয়ে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ রাখা আবশ্যক। আর শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে আবশ্যক হচ্ছে, তাঁর কিতাব অনুসরণ করা, নবি ﷺ-এর সুন্নাত আঁকড়ে ধরা। সবসময় নবি ﷺ-এর শিষ্টাচারের এমন কোনো অংশ বাস্তবায়ন করা, যেটা তোমার জন্য অধিক উপযোগী। নফসকে শান্তি না দেওয়া। নফসের মাধ্যমে ধোঁকাগ্রস্ত না হওয়া। সাধারণ এবং বিশেষ-সর্বক্ষেত্রে অন্তরের মুরাকাবা করা। হালাল রিযক অন্বেষণের চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা। কারণ, এটি হলো মূল বিষয় এবং এই বিষয়ের ভিত্তি। আর অলসদের ওপর নির্ভর না করা।”
৬৪৯. আবূ আবদির রহমান আস সুলামি থেকে বর্ণিত, একজন যাহিদ বলেছেন:
صِفَةُ عِبَادِ اللهِ أَنْ يَكُونَ الْفَقْرُ كَرَامَتَهُمْ ، وَطَاعَةُ اللَّهِ حَلَاوَتَهُمْ ، وَحُبُّ اللَّهِ لَذَّتَهُمْ ، وَإِلَى اللهِ حَاجَتَهُمْ ، وَالتَّقْوَى زَادَهُمْ ، وَمَعَ اللَّهِ تِجَارَتَهُمْ ، وَعَلَيْهِ اعْتِمَادُهُمْ ، وَبِهِ أُنْسُهُمْ ، وَعَلَيْهِ تَوَكَّلُهُمْ ، وَالْجُوعُ طَعَامَهُمْ ، وَالزُّهْدُ ثِمَارَهُمْ ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ لِبَاسَهُمْ ، وَطَلاقَةُ الْوَجْهِ حُلْيَتَهُمْ ، وَسَخَاوَةُ النَّفْسِ حِرْفَتَهُمْ ، وَحُسْنُ الْمُعَاشَرَةِ صُحْبَتَهُمْ ، وَالْعِلْمُ قَائِدَهُمْ ، وَالصَّبْرُ سَائِقَهُمْ ، وَالْهُدَى مَرْكَبَهُمْ ، وَالْقُرْآنُ حَدِيثَهُمْ ، وَالشَّكْرُ زِينَتَهُمْ ، وَالذِّكْرُ نُهْمَتَهُمْ ، وَالرِّضَى رَاحَتَهُمْ ، وَالْقَنَاعَةُ مَالَهُمْ ، وَالْعِبَادَةُ كَسْبَهُمْ ، وَالشَّيْطَانُ عَدُوَّهُمْ ، وَالدُّنْيَا مَزَابِلَهُمْ ، وَالْحَيَاءُ قَمِيصَهُمْ ، وَالْخَوْفُ سَجِيَّتَهُمْ ، وَالنَّهَارُ عِبْرَتَهُمْ ، وَاللَّيْلُ فِكْرَتَهُمْ ، وَالْحِكْمَةُ سَيْفَهُمْ ، وَالْحَقُّ حَارِسَهُمْ ، وَالْحَيَاةُ مَرْحَلَتَهُمْ ، وَالْمَوْتُ مَنْزِلَهُمْ ، وَالْقَبْرُ حِصْنَهُمْ ، وَالْفِرْدَوْسُ مَسْكَنَهُمْ ، وَالنَّظَرُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ مُنْيَتَهُمْ ، هُمْ خَوَاصُ عِبَادِ اللَّهِ
"আল্লাহর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হলো : দরিদ্রতা তাদের জন্য মর্যাদার বিষয়। আল্লাহর আনুগত্য তাদের জন্য মিষ্টতা স্বরূপ। আল্লাহর ভালোবাসা হলো তাদের স্বাদ। আল্লাহর কাছেই তারা নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলে। তাকওয়া তাদের পাথেয়। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর সাথেই। আল্লাহর ওপরই তারা নির্ভর করে। তাঁর সাথেই তাদের বন্ধুত্ব। তারা তাঁরই ওপর ভরসা করে। ক্ষুধা হলো তাদের খাবার। দুনিয়াবিমুখতা তাদের ফল। উত্তম চরিত্র তাদের পোশাক। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা তাদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। বদান্যতা তাদের পেশা। উত্তম আচরণ তাদের সংশ্রব। জ্ঞান তাদের পরিচালক।' ধৈর্য তাদের চালনাকারী। হিদায়াত তাদের বাহন। কুরআন তাদের আলোচনা। কৃতজ্ঞতা তাদের ভূষণ। যিকর তাদের কাছে লোভনীয় বিষয়। (আল্লাহর) সন্তুষ্টি তাদের প্রশান্তি। অল্পে তুষ্টতা তাদের সম্পদ। ইবাদাত-বন্দেগী তাদের উপার্জন। শয়তান তাদের শত্রু। দুনিয়া তাদের ডাস্টবিন। লজ্জা তাদের জামা। আল্লাহভীতি তাদের স্বভাব। দিনগুলো তাদের জন্য শিক্ষা। রাত তাদের চিন্তার কারণ। প্রজ্ঞা তাদের তরবারি। সত্য তাদের পাহারাদার। জীবন তাদের সফরের স্তর। মৃত্যু তাদের গন্তব্য। কবর তাদের দুর্গ। জান্নাত তাদের বাড়ি। রব্বুল আলামীনের প্রতি দৃষ্টিপাত তাদের পরম আকাঙ্ক্ষা। তারাই হলো আল্লাহ তাআলার সেই বিশেষ বান্দা, যাদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
'রহমানের বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।” [৪৪৯]
৬৫0. আবূ উমার আল আনমাতি বলেন, "আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি: “যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছু তোমার মনিব থাকবে, ততক্ষণ আল্লাহর বান্দা হতে পারবে না। যতক্ষণ তোমার ওপর দাসত্বের কোনো শৃঙ্খল বাকি থাকবে, ততক্ষণ প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে না। আর যখন কেবল আল্লাহর দাস হবে, তখন অন্য সবার থেকে স্বাধীন বলে গণ্য হবে। [৪৪৮]
৬৫১. আবুল হাসান আল ফারিসি বলেন, “আবূ আবদিল্লাহ আস সাওয়ানিতিকে বসরা শহরে এক ব্যক্তি বলেছিল, 'আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' আমি তাকে এর উত্তরে বলতে শুনেছি: 'উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের ভিত্তি কয়েকটি। সম্মান, লজ্জা, ভয়-ভীতি, আশা, ভালোবাসা ও গাম্ভীর্য। আল্লাহ তাআলার তাজিমের আলোচনার মাধ্যমে অন্তরে ইখলাস তৈরি হয়। লজ্জার আলোচনার মাধ্যমে মানুষ তার অন্তরের বিপদাপদের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে উঠে। আল্লাহ তাআলার ভয়ভীতির আলোচনার মাধ্যমে বান্দা গুনাহ থেকে তাওবা করে থাকে। আল্লাহর রহমতের আলোচনার মাধ্যমে বান্দা আনুগত্যের দিকে দ্রুত ধাবিত হয়। তাঁর ভালোবাসার আলোচনার মাধ্যমে আমল তাঁর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে উঠে। তাঁর গাম্ভীর্যের আলোচনার মাধ্যমে অন্তর থেকে বস্তুর মালিকানা এবং স্বেচ্ছাচারিতার অনুভূতি দূর হয়ে যায়।”
৬৫২. মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন বলেন, “আমি আমার দাদা আবু আমরকে বলতে শুনেছি: 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রকৃত পরিচয় লাভ করতে চায়, সে যেন ইবাদাতের সময় আল্লাহর গাম্ভীর্যের প্রতি লক্ষ রাখে'।”[৪৪৯]
আরও বলতে শুনেছি, 'নির্দেশদাতার পরিচয় জানা না থাকার কারণেই নির্দেশ পালনে শৈথিল্য দেখা দেয়'।”[৪৫০]
টিকাঃ
[৪৪৯] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩。
[৪৪৮] আবূ আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, পৃ. ১৫৮。
[৪৪৯] আবূ আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, পৃ. ৪৫৫。
[৪৫০] আবু আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, পৃ. ৪৫৬。
📄 সুফি ও তাসাউফের পরিচয়
৬৫৩. সাঈদ ইবনু মুহাম্মাদ আল মুতাওয়িয়ি থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আবূ বকর শিবলিকে জিজ্ঞেস করে, “ওই লোকদের সুফি বলা হয় কেন?” তিনি উত্তরে বলেন, “হকের মাধ্যমে তারা যেই মুসাফাত (নির্মলতা) লাভ করেন, তার ফলে তাদের চরিত্র সফা (নির্মল) হয়ে উঠে। আর যার চরিত্র সফা হয়ে উঠে, তাকেই বলা হয় সুফি (নির্মল ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী)।”
৬৫৪. আবূ আবদির রহমান আস সুলামি থেকে বর্ণিত, ইমাম আবূ সাহাল মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "তাসাউফ কী জিনিস?” তিনি উত্তরে বলেছেন, "আপত্তিজনক বিষয় থেকে দূরে থাকা।”
৬৫৫. হাকিম আবূ আবদিল্লাহ আল হাফিয বলেন, “আমি আবুল হাসান আল বুশানজিকে বলতে শুনেছি : 'আমার কাছে তাসাউফ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে অন্তর মুক্ত থাকা। রিক্তহস্ত থাকা এবং দ্বীন পালনের পথে আসা বিপদাপদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা。
আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল কিছু থেকে অন্তর মুক্ত থাকার ব্যাপারে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে:
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِمْ
এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজেদের বাস্তুভিটা থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে।[৪৫১]
রিক্তহস্ত থাকার ব্যাপারে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে :
الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُم بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً
যারা নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে।[৪৫২]
দ্বীন পালনের পথে আসা বিপদাপদের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীনতার ব্যাপারে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে:
وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ
কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে তারা ভয় করে না।”[৪৫৩]
টিকাঃ
[৪৫১] সূরা হাশর, ৫৯: ৮。
[৪৫২] সূরা বাকারাহ, ২: ২৭৪。
[৪৫৩] সূরা মায়িদা, ৫: ৫৪。
📄 আনুগত্য ও অবাধ্যতা
৬৫৬. ইউসুফ ইবনু হুসাইন বলেন, “আমি আবুল হাসান ইয়াহইয়া ইবনু হুসাইন আল কাহিরিকে বলতে শুনেছি: ‘মিশর এসে আমি যুননুনের মজলিসে উপস্থিত হই। আমার মধ্যে তখন উপস্থিত লোকদের প্রতি এক ধরনের অহংকার কাজ করছিল। যুননুন আমার এই অবস্থা দেখে বলেন, ‘এমন কোরো না। কেননা আল্লাহ তাআলা তিন ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গোপন রাখেন: কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করলে নিজের রাগ গোপন রাখেন। যারা তাঁর আনুগত্য করে, তাদের প্রতি তিনি নিজ সন্তুষ্টিকে গোপন রাখেন। আর বান্দাদের মধ্যে তিনি নিজ কর্তৃত্বের বহিঃপ্রকাশ গোপন রাখেন। তাই আল্লাহর অবাধ্যতাকে ছোট মনে কোরো না, কেননা এতে তাঁর ক্রোধ হতে পারে। আর আনুগত্যের কোনো কিছুকে তুচ্ছ মনে কোরো না। কেননা, তাতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত থাকতে পারে। তেমনি আল্লাহর সৃষ্টির কাউকে হেয় জ্ঞান কোরো না। কেননা, হতে পারে সে আল্লাহর ওলি।”
৬৫৭. হামীদ আল লাফাফ বলেন, “এক ব্যক্তি হাতিম আল আসামকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার কি কোনো কিছুর ইচ্ছা আছে?’ তিনি বলেন, ‘আমি রাত পর্যন্ত পূর্ণ একদিনের সুস্থতা চাই।’ শুনে আমি তাকে বলি, ‘আপনি তো প্রতিদিন সুস্থই আছেন!’ তিনি উত্তর বলেন, ‘কোনো দিন তো তখনই সুস্থ ও নিরাপদ হিসেবে কাটবে, যখন আমি তাতে আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা করব না।'”[৪৫৪]
৬৫৮. আবুল হাসান আল মহল্লি বলেন, "আমি জুনাইদ বাগদাদিকে এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুনেছি: 'সকল পূণ্যের সমষ্টি রয়েছে তিন বিষয়ে। প্রথমত, দিনকে নিজের উপকারে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলে সেটা নিজের ক্ষতির কাজে ব্যয় কোরো না। দ্বিতীয়ত, ভালো মানুষের সাথে মিশতে না পারলে অন্তত মন্দ মানুষকে বন্ধু বানিয়ো না। তৃতীয়ত, আল্লাহর সন্তুষ্টিতে নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে না পারহলে কমপক্ষে তাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে ব্যয় কোরো না।'”
টিকাঃ
[৪৫৪] আবূ আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, পৃ. ৯৬।
📄 মর্যাদার মাপকাঠি বংশ নয়, দ্বীন ও সৎকর্ম
৬৫৯. খালিদ ইবনু খিদাশ বলেন, “ফুযাইল ইবনু ইয়ায একদিন জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কোন গোত্রের?' আমি বললাম, 'মুহাল্লাব।' তিনি তখন বলেন, 'যদি ভালো মানুষ হয়ে থাকো, তাহলে তো তুমি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত। আর যদি মন্দ হয়ে থাকো, তাহলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।”
৬৬০. আমর বিন কায়স থেকে বর্ণিত, সালমানকে জিজ্ঞেস করা হয়, “কোন জিনিস আপনার জন্য যথেষ্ট?” তিনি বলেন, “আমার ধর্মই আমার মর্যাদার বিষয়। মাটিই আমার জন্য যথেষ্ট। মাটি থেকে আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং মাটিতেই আমি ফিরে যাব। এরপর একদিন আমাকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। তখন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে আমাকে। যদি আমার পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়, তাহলে আমার জন্য যথেষ্ট হওয়া মাটি কতই না মর্যাদাবান! আমার রব তাহলে আমাকে কী মহান সম্মান-ই না দেবেন! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন তিনি। আর যদি পাল্লা হালকা হয়ে যায়, তাহলে সেই একই মাটি আমার জন্য কতইনা যন্ত্রণাদায়ক হবে! আমার রবের সামনে তখন আমাকে কতটা লাঞ্ছিত হতে হবে! তিনি তখন আমাকে শাস্তি দেবেন। তবে তিনি চাইলে আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে পারেন এবং আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিতে পারেন। "[৪৫৫]
৬৬১. আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
مَن نفَّسَ عن أخيه كربة من كُرَبِ الدُّنيا نفَّسَ اللهُ عنهُ كُربةً من كُرَبِ يوم القيامة، ومن ستر مسلما ستره الله في الدُّنيا والآخرة، ومن يسر على مُعسر يسر الله عليه في الدُّنيا والآخرة، والله في عون العبد ما كان العبد في عون أخيه، ومن سلك طريقا يلتمس فيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ طريقا إلى الجنَّة، وما قعد قوم في مسجد يتلون كتاب الله ويتدارسونه بينهم، إلا نزلت عليهِمُ السَّكينة، وغشيتهم الرحمة، وحفتهم الملائكة، ومن أبطاً بِهِ عملُهُ لم يُسْرِعْ بِهِ نَسبُهُ
“যে ব্যক্তি নিজ ভাইয়ের পার্থিব কোনো বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাত দিবসে তার বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুসলিমের দুস্থতা দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুস্থতা দূর করবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতা করে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো রাস্তা দিয়ে চলে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোনো সম্প্রদায় মাসজিদে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়ন করে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তাআলা নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে তার আমল পেছনে ফেলে দিবে, তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করতে পারবে না। [৪৫৬]
৬৬২. আতা থেকে বর্ণিত, আবূ হুরায়রা বলেছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা বলবেন:
إِنِّي جَعَلْتُ نَسَبًا وَجَعَلْتُمْ نَسَبًا فَجَعَلْتُ أَكْرَمَكُمْ أَتْقَاكُمْ وَأَنْتُمْ تَقُولُونَ أَنَا فُلَانُ بْنُ فُلَانٍ وَأَنَا أَكْرَمُ مِنْكَ ، وَأَنَا الْيَوْمَ أَرْفَعُ نَسَبِي وَأَضَعُ نَسَبَكُمْ ، أَيْنَ الْمُتَّقُونَ؟
“হে লোকসকল, আমি মর্যাদার এক ধরনের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছি। আর তোমরা নিজেরা আরেক ধরনের মাপকাঠি বানিয়ে নিয়েছ। যারা সবচেয়ে আল্লাহভীরু, আমি তাদের সবচেয়ে সম্মানিত করেছি। কিন্তু তোমরা বলো যে, অমুকের পুত্র অমুক অমুকের চেয়ে অধিক সম্মানিত। আজ আমি আমার মাপকাঠিকে উঁচু করব আর তোমাদের মাপকাঠিকে নিচু করে দেব! মুত্তাকীরা কোথায়?”
টিকাঃ
[৪৫৫] ইবনু আসাকির, তাহযিবু তারিখি দিমাশক, ৬/ ২০০-এ এর মর্মার্থ রয়েছে。
[৪৫৬] মুসলিম, আস সহীহ, ২৬৯৯。