📄 বার্ধক্যের কল্যাণ
৫৭৮. আবদুল মুনয়িম ইবনু ইদরীস তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ওয়াহহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন: “তাওরাতে পড়েছি, প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি ঘোষণা দিয়ে থাকে, 'হে চল্লিশোর্ধ্বরা, ফসল কাটার সময় হয়ে গেছে। হে পঞ্চাশোর্ধ্বরা, হিসাবের জন্য প্রস্তুত হও। তোমরা আখিরাতের জন্য কী পাঠিয়েছ আর দুনিয়াতে কী রেখে গেছ? হে ষাটোর্ধ্বরা, তোমাদের আর কোনো অজুহাত বাকি নেই। হে সত্তরোর্ধ্বরা, নিজেদের মৃত মনে করো।”[৩৯৮]
৫৭৯. আবূ রযিন থেকে বর্ণিত, নিম্নের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস বলেছেন:
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতর অবয়বে।[৩৯৯]
ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ অতঃপর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি নীচ থেকে নীচে। [৪০০]
ইবনু আব্বাস বলেন, "এখানে অত্যাধিক বয়সের কথা বলা হয়েছে।”
إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرُ غَيْرُ مَمْنُونٍ কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার।[৪০১]
ইবনু আব্বাস বলেন, “ঈমানদার ও সৎকর্মশীলরা বার্ধক্যে উপনীত হয়েও যে আমল করেন, সে কারণে (আখিরাতে) তাদের পাকড়াও করা হবে না।”[৪০২]
৫৮০. আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعِزَّتِي وَجَلالِي وَجَوْدِي وَ فَاقَةَ خَلْقِي إِلَى وَارْتِفَاعِي فِي مَكَانِي إِنِّي لَأَسْتَحْيِ مِنْ عَبْدِي وَ أُمَتِي أَنْ يَشِيْبَا فِي الإِسْلَامِ ثُمَّ أَعَذِّبُهُمَا
“আমার সম্মান, মর্যাদা, দান, আমার প্রতি সৃষ্টজীবের প্রয়োজন এবং আমার স্থানে আমার মর্যাদার শপথ! আমার যেসব বান্দা ও বান্দী ইসলামে (মুসলিম থাকা অবস্থায়) বুড়ো হয়, তাদের শাস্তি দিতে আমার লজ্জাবোধ হয়।”
বর্ণনাকারী বলেন, “এরপর আমি নবি-কে কাঁদতে দেখি। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'কেন কাঁদছেন?' তিনি বলেন, 'আল্লাহ যে কারণে লজ্জাবোধ করেন কিন্তু মানুষেরা লজ্জাবোধ করে না, সে কারণে কাঁদছি।”[৪০৩]
৫৮১. আনাস থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা বলেন, 'বান্দার গুনাহ গোপন করার চেয়ে তা ক্ষমা করতেই আমি অধিক পছন্দ করি। গোপন করার পর আমি তাকে অপমান করতে পারি না। তাই সে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকলে আমি তাকে মাফ করে দিতে থাকি।'
বর্ণনাকারী বলেন, নবি বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার যে বান্দা মুসলিম অবস্থায় বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে, মুসলিম অবস্থায় তার চুল দাড়ি পেকেছে, আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করি।”[৪০৪]
৫৮২, আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
ما من عبد يُعَمِّرُ في الإسلام أربعينَ سَنَةً إلا صرف الله عنه أنواعًا من البلاء: الجنون والجذام والبرص ، فإذا بلغ خمسينَ سَنَةٌ لَيْنَ اللهُ لَهُ الحساب ، فإذا بلغ ستين رزقه الله الإنابة إليه بما يُحِبُّ ، فإذا بلغ سبعين غفر الله له ما تقدَّم من ذنبه وما تأخَّرَ ، وسُمِّيَ أسيرَ اللهِ وَأَحَبَّهُ أهل السماء فإذا بلغ الثمانين تَقَبَّلَ الله منه حسناته وتجاوز عن سيئاته ، فإذا بلغ التسعين غفر الله له ما تقدَّم من ذنبه وما تأخَّرَ ، وسُمِّيَ أسير الله في أرضه ، وشُفَعَ في أهل بيته.
“যে ব্যক্তি চল্লিশ বছর হায়াত লাভ করে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে তিন ধরনের বিপদ দূর করে দেন: পাগলামি, কুষ্ঠ এবং ধবল রোগ। যখন সে পঞ্চাশ বছর বয়সে উপনীত হয়, আল্লাহ তাআলা তার হিসাব সহজ করে দেন। ষাট বছর বয়সে উপনীত হলে আল্লাহ তাআলা এমন বিষয়ের প্রতি তার মনোযোগ ফিরিয়ে দেন, যা তার পছন্দ হয় এবং তিনি সন্তুষ্ট হন। সত্তর বছর বয়সে উপনীত হলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসতে থাকে। আশি বছর বয়সে উপনীত হলে আল্লাহ তাআলা তার সব উত্তম আমল কবুল করে নেন আর তার মন্দ কাজগুলো এড়িয়ে যান। নব্বই বছর বয়সে উপনীত হলে আল্লাহ তাআলা তার সামনের ও পেছনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তাকে তখন নাম দেওয়া হয় পৃথিবীতে আল্লাহর বন্দি। পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তার শাফাআত কবুল করা হবে।”[৪০৫]
৫৮৩. উসমান ইবনু আফফান থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
إِذَا اسْتَكْمَلَ الْعَبْدُ أَرْبَعِينَ سَنَةً وَطَعَنَ فِي الْخَمْسِينَ أَمِنَ الدَّاءَ الثَلاثَةَ : الْجُذَامُ ، وَالْجُنُونُ ، وَالْبَرَصُ ، فَإِذَا بَلَغَ خَمْسِينَ سَنَةٌ حُوسِبَ حِسَابًا يَسِيرًا ، وَابْنُ السِّتِّينَ يُعْطَى الإِنَابَةُ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ ، وَابْنُ السَّبْعِينَ تُحِبُّهُ مَلائِكَةُ السَّمَاءِ ، وَابْنُ الثَّمَانِينَ تُكْتَبُ حَسَنَاتُهُ وَلَا تُكْتَبُ سَيِّئَاتُهُ ، وَابْنُ التَّسْعِينَ يُغْفَرُ لَهُ مَا سَلَفَ مِنْ ذُنُوبِهِ وَيُشَفَعُ فِي سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ وَتَكْتُبُهُ مَلَائِكَةُ سَمَاءِ الدُّنْيَا أَسِيرًا لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ
“বান্দা যখন পূর্ণ চল্লিশ বছর বয়স পূর্ণ করে পঞ্চাশের ঘরে পা রাখে, তখন সে তিনটি ব্যাধি থেকে নিরাপদ হয়ে যায়। কুষ্ঠ, পাগলামি এবং ধবল রোগ। পঞ্চাশ বছর বয়সে উপনীত হলে তার হিসাবের ফায়সালা সহজ করে দেওয়া হয়। ষাট বছর বয়সে উপনীত হলে আল্লাহর প্রতি তার মন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর সত্তর বছর বয়সে উপনীত হলে আসমানের ফেরেশতারা তাকে ভালবাসতে থাকে। আশি বছর বয়সে উপনীত হলে কেবল তার উত্তম আমলই লিপিবদ্ধ করা হতে থাকে। মন্দ কাজ আর লিপিবদ্ধ করা হয় না। নব্বই বছর বয়সে উপনীত হলে তার আগের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তার পরিবার-পরিজনের সত্তর জনের ব্যাপারে তার শাফাআত গ্রহণ করা হবে। দুনিয়ার (নিকটবর্তী) আসমানের ফেরেশতারা পৃথিবীতে 'আল্লাহর বন্দি' হিসেবে তার নাম লিখে নেন।”[৪০৬]
৫৮৪. সাঈদ ইবনু আবদির রহমান ইবনু হাসসান ইবনু সাবিত তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, হাসসান ইবনু সাবিত একশ চার বছর আয়ু পেয়েছিলেন। তার পিতা সাবিত, দাদা মুনযির, পিতার দাদা হারাম – প্রত্যেকেই একশ চার বছর হায়াত লাভ করেছেন। আবদুর রহমান ইবনু হাসান এ বিষয়টি বর্ণনার সময় ঘাড় উঁচু করে ফেলতেন। তিনি নিজে চুরাশি বছর বেঁচে ছিলেন। [৪০৭]
৫৮৫. উমার ইবনু আলি আল মুকাদ্দামি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, "আমি স্বপ্নে একবার হারুন বিন রিআবকে দেখে জিজ্ঞেস করি, 'আপনার প্রতিপালক আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?' তিনি বলেন, 'আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমার প্রতি রহম করেছেন। আমাকে তাঁর নৈকট্যশীল বানিয়েছেন এবং আমার সাথে উত্তম আচরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা তিরাশি বছর বয়সী মানুষের সাথে এমন করে থাকি।”
টিকাঃ
[৩৯৮] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৩৩।
[৩৯৯] সূরা তীন, ৯৫: ৪।
[৪০০] সূরা তীন, ৯৫ : ৫।
[৪০১] সূরা তীন, ৯৫: ৬।
[৪০২] আলি মুত্তাকি আল হিন্দি, কানযুল উম্মাল, ৮/৫৫৬।
[৪০৩] আলি মুত্তাকি আল হিন্দি, কানযুল উম্মাল, ১৫/৬৭৩; হাদীসটির সনদ সহীহ নয়।
[৪০৪] আলি মুত্তাকি আল হিন্দি, কানযুল উম্মাল, ১৫/৬৭৪ হাদীসটির সনদ সহীহ নয়।
[৪০৫] মুসনাদু আবী ইয়ালা, ৭/২৪২, ২৪২, ২৪৩, ২৪৪; হাদীসটির সনদ সহীহ নয়।
[৪০৬] নুরুদ্দিন হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ায়িবদ, ১০/২০৫; হাদীসটির সনদ যঈফ।
[৪০৭] আল মারিফাতু ওয়াত তারিখ, ১/২৩৫।
📄 মনের স্বচ্ছলতা
৫৮৬. আসমায়ি থেকে বর্ণিত, এক বেদুঈন এক লোককে নসীহত করে বলে : "অর্থ-সম্পদের সচ্ছলতার চেয়ে মনের স্বচ্ছলতাই উত্তম। তাই যাকে সম্পদ দেওয়া হয়নি, সে যেন তাকওয়া থেকেও বঞ্চিত না হয়ে যায়। বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের মাধ্যমে উদরপূর্তি করা বহু মানুষ এমন রয়েছে, যারা দ্বীন এবং মহানুভবতার ক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষুধার্ত। মুমিন সবসময় কল্যাণের মধ্যেই থাকে। এরইমধ্যে ভূপৃষ্ঠ একসময় তাকে অভিবাদন জানায়। আকাশ থেকে সুসংবাদ দেওয়া হয় তাকে। সে যদি ভূপৃষ্ঠে উত্তম কাজ করে যায়, তাহলে ভূগর্ভে কখনোই তার প্রতি মন্দ আচরণ করা হয় না। বার্ধক্য যেমনভাবে যুবকদের ওপর চেপে বসে, মৃত্যুও তেমনিভাবে বৃদ্ধদের গ্রাস করে নেয়। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে দুনিয়ার স্বচ্ছলতা দ্বারা আনন্দিত হয় না। এর বিপদাপদে হা-হুতাশ করে না।”
📄 নিকটজনের মৃত্যুতে শোক
৫৮৭. হাফস ইবনু গিয়াস থেকে বর্ণিত, আমাশকে মুসলিম আন নাহাতের মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া হলে তিনি বলেন, “কারও সমবয়সী মারা যাওয়া যেন ব্যক্তির নিজেরই মারা যাওয়া।”
৫৮৮. আবদুস সামাদ ইবনু নুমান থেকে বর্ণিত, কাযী আবূ ইউসুফ বলেছেন: "সমবয়সীদের মৃত্যু আমাকে যতটা দুর্বল করে ফেলে, অন্য কোনো কিছুই আমাকে ততটা দুর্বল করতে পারে না।”
৫৮৯. সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, আইয়ুব বলেছেন: “পরিচিত কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলে আমার মনে হয় যেন, আমার শরীরের কোনো একটি অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।”
৫৯০. ইবরাহীম ইবনু আবদিল মালিক থেকে বর্ণিত, আবু মুসহির আদ দিমাশকি বলেছেন: “একদিন আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের জন্য সকালের নাস্তা আনা হলে তিনি খাদিমকে জিজ্ঞেস করেন, 'খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আসিদ কোথায়?' খাদিম উত্তরে বলেন, 'আমিরুল মুমিনীন, তিনি তো মারা গেছেন।'
আবদুল মালিক এরপর জিজ্ঞেস করেন, 'উমাইয়া ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু খালিদ ইবনু আসিদ কোথায়?'
'আমিরুল মুমিনীন, তিনিও মারা গেছেন।'
'খালিদ ইবনু ইয়াযিদ ইবনু মুয়াবিয়া?'
‘তিনিও মারা গেছেন।’ এরপর আরেক ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করলে খাদিম বলে, ‘আমিরুল মুমিনীন, তিনিও মারা গেছেন।’ আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান তখন খাদিমকে বলেন, ‘এই নাস্তা নিয়ে যাও।’ এরপর তিনি আবৃত্তি করেন:
ذَهَبَتْ لِذَاتِي وَانْقَضَتْ آجَالُهُم وَغَبَرْتُ بَعْدَهُمْ وَلَسْتُ بِغَابِرِ ‘আমি যাদের নিকট আশ্রয় নিয়েছিলাম তারা চলে গেছে হায়াত শেষ হয়ে গেছে তাদের; তাদের পর এখন বাকি রয়ে গেছি আমি কিন্তু আমি তো আর বাকি থাকার নই!”
📄 আল্লাহর প্রতি ভয়, আগ্রহ ও আশা
৫৯১. আলি ইবনু মুআফফাক আল বাগদাদি থেকে বর্ণিত, তিনি আহমাদ ইবনু আসিম আল আন্তাকিকে বলতে শুনেছেন, “এক আবিদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার প্রমাণ কী, বলুন।’ তিনি বলেন, ‘সর্বদা সতর্ক থাকা।’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তাহলে আল্লাহর প্রতি আগ্রহের দলিল কী?’ তিনি বলেন, ‘সবসময় তাঁর তালাশে থাকা।’ জিজ্ঞেস করি, ‘আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা আকাঙ্ক্ষার দলিল কী?’ তিনি বলেন, ‘আমল করে যাওয়া।’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। বলুন তো, এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে দুর্বলতা চলে আসে কীভাবে?’ তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহ তাআলা যে সহনশীলতা দেখান এবং গুনাহ গোপন রাখেন, তোমরা এর ওপর আস্থাশীল হয়ে পড়েছ।”