📄 চতুষ্পদ জন্তুর মতো জীবন
৫৫৮. হামযা আয যাইয়াত থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদিল আযীয আবৃত্তি করতেন :
نَهارُكَ يَا مَغْرُورُ سَهْرُ وَغَفْلَةٌ . وَلَيْلُكَ نَوْمُ وَالرَّدَى لَكَ لَأَزِمُ
وَشُغْلُكَ فِيمَا سَوْفَ تَكْرَهُ غِبَّهُ . كَذَلِكَ فِي الدُّنْهَا تَعِيْشُ الْبَهَائِمُ
“ওহে ধোঁকাগ্রস্ত! তোমার দিন কাটে ভুল, বিচ্যুতি এবং উদাসীনতায়।
রাত কাটে ঘুমে। এখন ধ্বংসই তোমার জন্য অনিবার্য।
তুমি এমন বিষয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছ, যার পরিণতি তোমার অপছন্দনীয়।
আসলে চতুষ্পদ জন্তুরা দুনিয়াতে এভাবেই বসবাস করে থাকে.”
টিকাঃ
[৩৮৩] ইবনুল জাওযী, সীরাতু উমার ইবনু আবদিল আযীয, ২৫৭, ২৬১。
📄 দীর্ঘ আশার অসারতা
৫৫৯. আবূ আমর মুহাম্মাদ ইবনু আশআছ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনু ফুলান একবার হাজ্জে যেতে চাইলেন। স্ত্রীকে বলেন, "আমি তো হাজ্জের ইচ্ছা করেছি.” স্ত্রী বলেন, “আল্লাহ তাআলার সাথে ইসতিখারা করে নিন.” লোকটি জিজ্ঞেস করে, “এখন তোমাদের জন্য কী পরিমাণ খরচাপাতি রেখে যাব, বলো.” স্ত্রী বলেন, “আমার জীবিত থাকার যে পরিমাণ গ্যারান্টি দিয়ে যাবেন, সে পরিমাণ খরচপাতি দিয়ে যান.”
৫৬০. আব্বাস ইবনু আতা বলেন, “সকল কাজের মূল বিষয় হলো আগ্রহ। আর আগ্রহের বিষয় হলো উচ্চ আশা-আকাঙ্ক্ষা.”
৫৬১. আব্বাস ইবনু হামযা বলেছেন, “যদি আমার দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষারা দেখতে পেত মৃত্যু আমার কতটা নিকটে, তাহলে লজ্জা পেয়ে যেত.”
৫৬২. মুহাম্মাদ ইবনু ফাযলাওয়াইহ বলেন, "আমি আবদুল্লাহ ইবনু মুনাযিলকে বলতে শুনেছি : 'মানুষ মৃত্যুর সময় কর্মপরিকল্পনার ছাড়া আর কিছু রেখে যায় না.”
৫৬৩. আহমাদ ইবনু ইউসুফ বলেন, "ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলতে শুনেছি : 'বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে, ততক্ষণ সে অবহেলা করতেই থাকে.”
৫৬৪. ইসমাইল থেকে বর্ণিত, হাসান বলেছেন: "আদম যখন জান্নাতে ছিলেন, তখন থেকেই তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল এক্কেবারে সামনে আর মৃত্যু ছিল তাঁর পেছনে (চিন্তার বাইরে).”
৫৬৫. হুমাইদ থেকে বর্ণিত, আবু উসমান বলেছেন, “আমার বয়স এখন একশ ত্রিশ বছর হয়ে গেছে। দেখি যে, জীবনের সব কিছুই এখন ফ্যাকাসে। কিন্তু আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নগুলোকে আগে যেমন দেখতাম, এখনো তেমনই চিরসবুজ.”
৫৬৬. আউন থেকে বর্ণিত, মালিক ইবনু দিনার বলেছেন, "আগেকার যুগের এক ব্যক্তি পাঁচশ বছর হায়াত লাভ করেছিল। একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'মৃত্যুকে ভালোবাসেন?' তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'হায় আফসোস! এমন কে আছে, যে এই জীবনটা ছেড়ে চলে যেতে চায়?”
৫৬৭. আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবনু হামদাওয়াইহ ইবনু সানজান বলেন, “আলি ইবনু হাজারকে বলতে শুনেছি: 'তেত্রিশ বছর বয়সে আমি ইরাক থেকে বের হয়েছিলাম। তখনো আমার আকাঙ্ক্ষা হচ্ছিল, যদি আরও তেত্রিশ বছর এখানে থাকতে পারতাম! এরপর আরও তেত্রিশ বছর হায়াত লাভ করেছি ঠিকই, কিন্তু (বর্তমানের দ্বিগুণ হায়াত পাওয়ার) ওই আকাঙ্ক্ষা এখনও রয়ে গেছে.”
টিকাঃ
[৩৮৪] ইবনু আসাকির, তাহযিবু তারিখি দিমাশক, ৬/২২৫。
[৩৮৫] আবূ আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, ৩৬৮。
[৩৮৬] আবূ আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, ১১১。
[৩৮৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আয যুহদ, ৪৮。
📄 দীর্ঘ আয়ুর কল্যাণ
৫৬৮. ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, “ষাট বছর আয়ুপ্রাপ্ত লোকদের কিয়ামাতের দিন ডাকা হবে। [৩৮৮] আর এই বয়সের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেছেন:
أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ
আমি কি তোমাদের এতটা বয়স দিইনি যে, কেউ চাইলে এর মধ্যেই সতর্ক হতে পারতে?”[৩৮৯]
৫৬৯. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
لا تتمنوا الموت، فإنَّ هول المطلع شديد، وإنَّ من السعادة أن يطول عُمرُ العبد، ويرزقه الله الإنابة
“মৃত্যু কামনা কোরো না। কেননা, মৃত্যুর বিভীষিকা অত্যন্ত কঠিন। কারও দীর্ঘ হায়াত লাভ করা এবং আল্লাহ তাকে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ প্রদান করাটা (তার জন্য) সৌভাগ্যের বিষয়।”[৩৯০]
৫৭০. আবূ বাকরা থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি এসে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বোত্তম লোক কে?” তিনি বলেন,
مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ
"যে লম্বা হায়াত পায় এবং তার আমল উত্তম হয়।”
লোকটি এরপর জিজ্ঞেস করে, “আর নিকৃষ্ট মানুষ?” নবি বলেন,
مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَ سَاءَ عَمَلُهُ
“যে লম্বা হায়াত পায় কিন্তু তার আমল হয় মন্দ।”[৩৯১]
৫৭১. আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেন,
ألا أخْبِرُكُمْ بِخِيارِكُمْ؟ قَالُوا بَلَى يَا رَسُوْلَ الله، قَالَ أَطْوَلُكُم أَعْماراً وَ أَحْسَنُكُم أعمالاً
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তির ব্যাপারে শুনতে চাও?” সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, অবশ্যই।” তিনি বলেন, “সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো যে সবচেয়ে লম্বা হায়াত পায় আর তার আমলও হয় সর্বোত্তম।”[৩৯২]
৫৭২. আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
إذا أراد الله بقوم خيرا عهد لهم في العمر، والْهَمَهُم الشكر
"আল্লাহ তাআলা যখন কোনো সম্প্রদায়ের কল্যাণ চান, তখন তাদের হায়াত দীর্ঘায়িত করেন, তাদের অন্তরে তাঁর কৃতজ্ঞতা ঢেলে দেন।”[৩৯৩]
৫৭৩. আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
لا يتمنى أحدكم الموت ولا يدعو به قبل أن يأتيه إنَّه إذا مات انقطع عمله وإنه لا يزيد المؤمنَ عُمُرُه إِلَّا خيرًا
"মৃত্যু আসার আগেই মৃত্যু কামনা কোরো এবং সে জন্য দুআও কোরো না। কেননা, মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। (নেক) হায়াত মুমিনের কল্যাণই বৃদ্ধি করে।”[৩৯৪]
৫৭৪. তালহা ইবনু উবায়দিল্লাহ বলেন, “কুযাআ গোত্রের বিলা এলাকার এক ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করে। এর এক বছর পর আরেক ব্যক্তি মারা যায়। একদিন স্বপ্ন দেখি জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। ওই দুজনেরর মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির আগেই জান্নাতে ঢুকছে। এ অবস্থা দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাই। বিষয়টি সকালে অন্যদের বলি আমি। এক সময় তা নবি -এর কানেও যায়। তিনি আমাকে বলেন, 'দ্বিতীয় লোকটা প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর পরও রমাদানের সাওম রেখেছে না? ছয় হাজার রাকাআত এবং আরও সুন্নাত সালাত আদায় করেছে না?'”[৩৯৫]
৫৭৫. উবাইদ ইবনু খালিদ আস সুলামি বলেন, "দুই লোকের মাঝে নবি ভ্রাতৃত্ব তৈরি করে দিয়েছিলেন। তাদের একজন আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে যায়। আরেকজন পরে একসময় মৃত্যুবরণ করে। নবি জিজ্ঞেস করেন, 'তাদের ব্যাপারে তোমাদের কী মত?' আমরা তখন বললাম, 'হে আল্লাহ, আপনি তাকে (দ্বিতীয় লোক) ক্ষমা করে দিন। তাকে তার সাথির সাথে একত্র করে দিন।' নবি তখন বলেন,
فَأَيْنَ صَلَاتُهُ بَعْدَ صَلَاتِهِ وَ صِيامُهُ بَعْدَ صِيَامِهِ، بَيْنَهُمَا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ والأَرْضِ 'ওই (প্রথম) লোকটি মৃত্যুবরণ করার পর সে (দ্বিতীয় লোক) যে সালাত আদায় করেছে এবং যে সাওমগুলো রেখেছে, সেগুলো কোথায় যাবে? আসমান ও জমিনের মাঝে যেমন ব্যবধান রয়েছে, তাদের উভয়ের মাঝে তেমন ব্যবধান রয়েছে।”[৩৯৬]
৫৭৬. মুহাম্মাদ ইবনু সিনান আল বাহিলি বলেন, "আমি রবী ইবনু বাযযাকে বলতে শুনেছি: 'আয়ু যার জন্য গানীমাত হয়ে উঠে এবং সে অধিক পরিমাণে আমল করতে পারে, সে-ই কেবল বেঁচে থাকাকে পছন্দ করতে পারে। পক্ষান্তরে জীবন যার সাথে প্রতারণা করে, প্রবৃত্তি যাকে পথভ্রষ্ট করে দেয়, লম্বা হায়াতে তার কোনো কল্যাণ নিহিত নেই।”[৩৯৭]
৭১১. আয়িশা বলেন, "নবি চাইতেন, যেন মৃত্যুর সময়ও তাঁর আমলে ত্রুটি না আসে। যেন তিনি আগের চেয়ে বেশি আমল করে যেতে পারেন।”
টিকাঃ
[৩৮৮] নুরুদ্দিন হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৭/৯৭; এই হাদীসের সনদ দুর্বল।
[৩৮৯] সূরা ফাতির, ৩৫: ৩৭।
[৩৯০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৩/৩৩২; এর সনদ হাসান ও জাইয়িদ।
[৩৯১] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৫/৪০; হাদীসটির সনদ হাসান ও জাইয়িদ।
[৩৯২] ইবনু হিব্বান, আস সহীহ, ১/৩৫২; এর সনদ হাসান।
[৩৯৩] আলি মুত্তাকি আল হিন্দি, কানযুল উম্মাল, ৩/২৫৪।
[৩৯৪] মুসলিম, আস সহীহ, অধ্যায়: যিকর, দুআ, তাওবা ও ইসতিগফার, পরিচ্ছেদ: আপতিত বিপর্যয়ের কারণে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করা মাকরুহ।
[৩৯৫] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ২/৩৩৩; এর সনদ হাসান। তবে মুরসাল ও মুনকাতি।
[৩৯৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৩/৫০০।
[৩৯৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৬/৩০০।
📄 রবের আনুগত্যে অতিবাহিত অংশটিই প্রকৃত জীবন
৫৭৭. জাফর ইবনু হারব বলেন, "ইবনু উয়াইনাকে বলতে শুনেছি: 'যদি কেউ আমাকে বলে, আপনার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় কী? তাহলে আমি বলব, সেই অন্তর যে তার প্রতিপালককে চিনতে পেরেও তাঁর অবাধ্যতা করেছে।”
ইবনু উয়াইনা বলেন, "বলা হয়, যতটুকু সময় আল্লাহর আনুগত্য করেছো, সেটাকেই জীবন বলে গণ্য করো। আর যে অংশে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছো, সেটাকে জীবনের অংশ বলেই গণ্য কোরো না।”