📄 মৃত্যুর আলোচনার প্রভাব
৫১৭. বিশর ইবনু হারিস “ইবনু সিরিন -এর সামনে মৃত্যুর কথা আলোচনা করা হলে মনে হতো যেন তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই মৃত্যুবরণ করছে.”
৫১৮. মুহাম্মাদ ইবনু হিশাম ইবনু বুখতারি বলেন, “আমি এক শাইখকে বলতে শুনেছি, তিনি বিশর ইবনু হারিসকে বলতে শুনেছেন: 'আফসোস, আগামীকাল অপরাধীরা কবর থেকে বের হবে কীভাবে? যালিমরা আল্লাহর হাত থেকে পালাবে কীভাবে?”
৫১৯. আবদুল্লাহ ইবনুল জাওযী আল আসাদি থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনুস সিমাক বলেছেন: “বসরার এক ব্যক্তির সাথে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। বসরায় গিয়ে তাকে বলি, 'তোমাদের মধ্যে যারা ইবাদাতগুজার, আমাকে তাদের দেখিয়ে দাও.' সে আমাকে পশমের পোশাক পরা এক লোকের কাছে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় নীরব থাকতেন তিনি। কারও দিকে মাথা তুলে তাকাতেন না। আমি তার সাথে কথা বলতে চাই। কিন্তু কথাও বললেন না। তারপর আমি তার কাছ থেকে চলে আসি।
আমার সঙ্গী তখন আমাকে বলে, 'এখানে এক বয়োবৃদ্ধার এক ছেলে আছে.' আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে বৃদ্ধা বলেন, 'সাবধান! আমার ছেলের সামনে জান্নাত-জাহান্নামের কোনো কিছুই আলোচনা করবেন না। করলে তাকে মেরেই ফেলবেন আপনারা। এই ছেলেটি ছাড়া আমার আর কেউ নেই.' আমরা তখন সে যুবকের কাছে যাই। তার এবং তার সঙ্গীর একই ধরনের পোশাক। তিনিও মাথা নিচু করে রাখতেন। কথাবার্তা বলতেন না। আমাদের আগমন টের পেয়ে মাথা উঠিয়ে আমাদের দেখে বলেন, 'নিশ্চয়ই মানুষকে একদিন দাঁড়াতে হবে.' আমি বলি, 'যিনি আপনার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন তার সামনে?' যুবকটি তখন এক চিৎকার দিয়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
তখন সেই বৃদ্ধা এসে বলে, 'তোমরা আমার সন্তানকে মেরে ফেললে!' আমি সেই যুবকটির জানাযায় অংশগ্রহণ করেছিলাম.”
৫২০. আবুল আহওয়াস বলেন, আমার এক সাথি আমাকে বলেছেন, “মুরাদ গোত্রের এক লোক উয়াইস আল কারনির কাছে গিয়ে তাকে সালাম দেয়। তিনি উত্তরে বলেন, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম.'
লোকটি এরপর বলে, 'কেমন আছেন, উয়াইস?' 'আলহামদুলিল্লাহ.' 'আপনার দিনকাল কেমন যাচ্ছে?'
'যে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকলে পরদিন সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করে না, সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা রাখে না, তার দিনকালের খবর জিজ্ঞেস করে আর কী হবে? মুরাদি ভাই! মৃত্যু মুমিনের জন্য কোনো আনন্দ বাকি রাখেনি। মুমিন আল্লাহ তাআলার হকের যে পরিচয় লাভ করেছে, তার জন্য সেটা স্বর্ণ-রূপা কিছুই বাকি রাখেনি। মুমিন আল্লাহ তাআলার অধিকার পালন করায় তার কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই। কিন্তু জেনে রাখো, আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করব, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করব। এ কারণে মানুষ আমাদের শত্রু বানিয়ে ফেলবে। ফাসিক লোকদের তারা এক্ষেত্রে সহযোগী পেয়ে যাবে। আল্লাহর কসম! এমনকি তারা আমাকে বিরাট বিরাট অপবাদ দেবে। কিন্তু আল্লাহর কসম! তাদের এসবের কোনো কিছুই হক কথা বলা থেকে আমাকে বিরত করতে পারবে না.”
৫২১. কাবিসা বলেন, “সুফিয়ান সাওরির যত মজলিসে বসেছি, তার প্রত্যেকটাতে তাকে মৃত্যুর কথা আলোচনা করতে শুনেছি। আর কাউকে তার চেয়ে বেশি মৃত্যুর কথা আলোচনা করতে দেখিনি.”
টিকাঃ
[৩৬১] সিফাতুস সাফওয়া, ৪/২০。
[৩৬২] ইবনু সাদ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ৬/১৬৪, ১৬৫。
📄 মরে গিয়ে বেঁচে যাওয়া
৫২২. হাম্মাদ ইবনু সালামা বলেন, “সুফিয়ান সাওরি তখন আমাদের সাথে বসরায় ছিলেন। তাকে প্রায় সময়ই বলতে দেখেছি, 'ইশ্, যদি আমার মৃত্যু হয়ে যেত! যদি আমি কোনো শান্তি পেতাম! হায়, যদি আমি কবরে যেতে পারতাম!' তখন হাম্মাদ ইবনু সালামা বলেন, 'আবূ আবদিল্লাহ, আপনি এত বেশি মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করছেন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা তো আপনাকে কুরআন এবং অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান প্রদান করেছেন.' সুফিয়ান তখন হাম্মাদ ইবনু সালামাকে বলেন, 'বেঁচে থাকলে যদি কোনো বিদআতে জড়িয়ে পড়ি? যদি এমন কোনো কাজে জড়িয়ে পড়ি, যা আমার জন্য বৈধ নয়? যদি কোনো ফিতনায় পড়ে যাই! মৃত্যু হয়ে গেলে তো এসব থেকে বেঁচে গেলাম.”
📄 মৃত্যুর স্মরণে অন্তর পরিষ্কার রাখা
৫২৩. মালিক ইবনু মিগওয়াল থেকে বর্ণিত, রবি ইবনু আবী রাশিদকে বলা হয়েছিল, “আমাদের কিছু আলোচনা শোনান.” তিনি তখন বলেন, “মুহূর্তের জন্যও যদি আমার অন্তর মৃত্যুর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে যায়, তাহলে আমার অন্তর নোংরা হয়ে যাবে.”
মালিক বলেন, "তার চেয়ে অধিক দুঃখ প্রকাশকারী আমরা আর কাউকে দেখিনি.”
টিকাঃ
[৩৬৩] আল মারিফাতু ওয়াত তারিখ, ২/৪১৭。
📄 কুশল বিনিময়ে মৃত্যুর স্মরণ
৫২৪. ইমরান ইবনু খালিদ আল খুযায়ি বলেন, "হাসসান ইবনু আবী সিনান এবং হাওশাবকে একবার সাক্ষাৎ করতে দেখেছিলাম। হাওশাব তখন হাসসানকে বলেছিলেন, 'কী অবস্থা, আবূ আব্দিল্লাহ?' তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'যে একসময় মারা যাবে, এরপর তাকে পুনরুজ্জীবিত করে তার হিসাব নেওয়া হবে, তার অবস্থা আর কেমন হবে!”
৫২৫. ইমরান ইবনু খালিদ আল খুযায়ি বলেন, "আমি হাসসান ইবনু আবী সিনান এবং হাওশাবকে একবার সাক্ষাৎ করতে দেখেছিলাম। হাওশাব তখন হাসসানকে বলেন, 'আজকের সকালটা কেমন লাগল, আবূ আব্দিল্লাহ?' তিনি বলেন, 'আমি এমন অবস্থায় সকাল অতিবাহিত করেছি, যখন মৃত্যু ছিল নিকটবর্তী, স্বপ্নগুলো ছিল দূরবর্তী আর আমলের অবস্থা ছিল খারাপ.”
৫২৬. হিশাম ইবনু হাসসান থেকে বর্ণিত, আবূ দুরাইস উমারা ইবনু হারবকে বলা হয়েছিল, “সকালটা কেমন কাটল, আবূ দুরাইস?” তিনি উত্তরে বলেন, "যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যাই, তাহলেই আমি সফল.”
৫২৭. আযরাক বলেন, "হাসানকে জিজ্ঞেস করলাম, 'সকালটা কেমন কাটল, আবূ সাঈদ? আপনার অবস্থা কেমন?' তিনি উত্তরে বলেন, 'অনেক করুণ। যে মৃত্যুর অপেক্ষা করে সকাল-সন্ধ্যা অতিবাহিত করে, তার অবস্থা আর কেমন হবে! সে জানে না, আল্লাহ তাআলা তার সাথে কী আচরণ করবেন.'”
৫২৮. আবূ ইয়াসুফ আল কারি বলেন, "ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলতে শুনেছি : 'দুনিয়া হলো ব্যস্ততার ঘর আর পরকাল হলো ভীতিকর। মানুষ এ ব্যস্ততা আর ভয়ভীতির মধ্যে দিয়েই একসময় জান্নাতে কিংবা জাহান্নামে গিয়ে চিরস্থায়ী কোনো ঠিকানা লাভ করবে.”
৫২৯. সালিম ইবনু বশির থেকে বর্ণিত আছে, আবূ হুরায়রা মৃত্যুশয্যায় কাঁদছিলেন। কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, "আমার পথ অনেক লম্বা, কিন্তু পাথেয় অনেক কম। একেকটা দিন এমনভাবে কাটিয়েছি যে, আমার সামনে ছিল ওপরে উঠার এবং নিচে নামার সিঁড়ি। একটি দিয়ে জান্নাতে যাওয়া যায়, আরেকটি জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। জানি না, আমাকে কোন সিঁড়ি দিয়ে চলতে হবে.”
৫৩০. উমার ইবনু জর থেকে বর্ণিত, রবী ইবনু খাইসামকে জিজ্ঞেস করা হয়, "দিনকাল কেমন যায়, আবূ ইয়াযিদ?” তিনি উত্তরে বলেন, “অত্যন্ত দুর্বল এবং পাপিষ্ঠ অবস্থায়। আল্লাহ আমাদের জন্য যে রিযক বরাদ্দ রেখেছেন, তা খাচ্ছি আর মৃত্যুর অপেক্ষা করছি.”
৫৩১. মুফাজ্জল ইবনু ইউনুস থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি উমার ইবনু আবদিল আযীযকে জিজ্ঞেস করেন, "আমিরুল মুমিনীন, দিনকাল কেমন কাটে?” তিনি বলেন, “মন্থর-গতি সম্পন্ন অতিভোজী এবং পাপাচারে মাখামাখি অবস্থায়। আল্লাহর কাছে এখন মৃত্যু কামনা করছি.”
৫৩২. জাফর ইবনু সুলাইমান বলেন, “ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরিকে বলতে শুনেছি, একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'দিনটা কেমন কাটল?' তিনি উত্তরে বলেন, 'এমন অবস্থায়-যখন আমার বয়স কমে যাচ্ছিল, যা আমল করছি তা সংরক্ষিত হয়ে যাচ্ছিল, মৃত্যু ছিল আমার ঘাড়ের ওপর। কিয়ামাত ছিল আমার পেছনে। জানিও না যে, আল্লাহ তাআলা আমার সাথে কেমন আচরণ করবেন."
৫৩৩. মুযানি বলেন, “ইমাম শাফিয়ি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি তাঁকে দেখতে যাই। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, 'দিনটা কেমন যাচ্ছে, আবূ আব্দিল্লাহ?' তিনি বলেন, 'দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া, বন্ধু-বান্ধবদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, মন্দ কর্মের কারণে শাস্তির সম্মুখীন হওয়া, আল্লাহর নিকট উপনীত হওয়া এবং মৃত্যুর পেয়ালা পানরত অবস্থায়। আল্লাহর কসম, জানি না আমার আত্মা কি জান্নাতে গিয়ে অভিবাদন পাবে, নাকি জাহান্নামে। আর এ কারণে এখন আমাকেও তাকে সমবেদনা জানাতে হবে!'”
৫৩৪. হিশাম বলেন, "মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসির সাথে সাক্ষাৎ হলে তাকে বলি, 'সকাল কেমন গেল?' তিনি বলেন, 'এমন অবস্থায়, যখন আমার আমল ছিল মন্দ, মৃত্যু ছিল নিকটবর্তী আর স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল দূরবর্তী.”
৫৩৫. উতবি থেকে বর্ণিত, আবূ তামিমা আল হুজাইমিকে জিজ্ঞেস করা হয়, "দিন কেমন কাটল?” তিনি বলেন, "দুটি নিয়ামাতের মধ্য দিয়ে। প্রথমত, আমার গুনাহ আল্লাহ তাআলা গোপন রেখেছেন। দ্বিতীয়ত, আমার আমলের কথা যারা জেনেছে, তারা আমার প্রশংসা করেছে.”
৫৩৬. উকবা আল আসাম বলেন, "আমরা আবূ তামিমা আল হুজাইমির কাছে ছিলাম। তখন বকর ইবনু আবদিল্লাহ এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, 'দিন কেমন কাটল, আবূ তামিমা?' তিনি বলেন, দুটি নিয়ামাতের মধ্যে। আমি জানি না, সে দুটির কোনটি বেশি উত্তম। একটা হলো, আল্লাহ তাআলা আমার গুনাহ ঢেকে রেখেছেন। ফলে এখন কেউ আমাকে সে গুনাহের কারণে অপবাদ দিতে পারবে না। অপরটি হলো, যাদের কাছে আমার আমলের সংবাদ পৌঁছেছে, তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মান তৈরি করে দিয়েছেন."
৫৩৭. যাহহাক ইবনু মুযাহিম থেকে বর্ণিত, ইবনু মাসউদ বলেছেন: "আজ সকালেই এমন অবস্থায় ঘুম থেকে উঠেছে, যখন সে ছিল মেহমান এবং তার অর্থ- সম্পদ হলো ঋণ। এই মেহমানকে অবশ্যই বিদায় নিতে হবে আর ঋণগুলোও পরিশোধ করে দিতে হবে.”
টিকাঃ
[৩৬৪] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আয যুহদ, ২৬২。
[৩৬৫] আবূ আবদির রহমান আস সুলামি, তাবাকাতুস সুফিয়া, ১১০。
[৩৬৬] ইবনু সাদ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ৪/৩৩৯。
[৩৬৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১০৯。
[৩৬৮] আল মারিফাতু ওয়াত তারিখ, ৫৮৫。
[৩৬৯] আল মুসান্নাফ ফি মানাকিবিশ শাফিয়ি, ২/২৯৩, ২৯৪。
[৩৭০] ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ, ১৩/২২৯。