📄 ঈসা -এর উপদেশ
৩৪১. ঈসা আল মুরাদি থেকে বর্ণিত আছে, ঈসা ইবনু মারিয়াম তাঁর সঙ্গীসাথিদের বলেছেন, “যদি তোমরা প্রকৃতপক্ষেই আমার সঙ্গীসাথি হয়ে থাকো, তাহলে মানুষের শত্রুতা ও বিদ্বেষের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে নাও। যদি সেটা না পারো, তাহলে তোমরা আমার ভাই নও। আমি তোমাদের যা কিছু শেখাই, আমল করার জন্য শেখাই। স্রেফ জানানো আর অবাক করে দেওয়ার জন্য নয়। অপছন্দনীয় বিষয়ে ধৈর্যধারণ এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পরিত্যাগ করা ছাড়া কখনোই কাঙ্ক্ষিত স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না।
কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থেকো, কেননা তা অন্তরে প্রবৃত্তির লালসা তৈরি করে। ফিতনায় পড়ার জন্য এই কুদৃষ্টি একাই যথেষ্ট। যার চোখ তার অন্তরে স্থাপিত, অন্তরটা চোখে স্থাপিত নয়, তার জন্য সুসংবাদ। যা গত হয়ে গেছে, তা কতইনা দূরবর্তী। আর যা সামনে আসবে, তা কতইনা নিকটবর্তী। দুনিয়াদারের জন্য দুর্ভোগ! সে কীভাবে মৃত্যুবরণ করবে? সে তো দুনিয়ার ওপর আস্থা রেখে বসে আছে, অথচ দুনিয়া তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। দুনিয়াকে সে নিরাপদ মনে করে, অথচ দুনিয়া তার সাথে ষড়যন্ত্র করছে। ধোঁকাগ্রস্তদের জন্য দুর্ভোগ! তারা যা অপছন্দ করে, সেটাই তাদের কাছে দ্রুতগতিতে চলে এসেছে। তাদের যে বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটা এসে গেছে। তারা যে লম্বা লম্বা রাত এবং দিন পছন্দ করে, সেটা থেকে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে।
দুনিয়া যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর পাপাচার যার কাজকর্ম ছিল, তার সর্বনাশ। আগামীকাল নিজ প্রতিপালকের সামনে তাকে কতইনা অপদস্থ হতে হবে। বেশি বেশি আল্লাহর যিকর করবে। যিকর ছাড়া সাধারণ কথাবার্তা বেশি বলবে না। অন্যথায় তোমাদের নরম অন্তরও পাষাণ হয়ে যাবে। পাষাণ অন্তরের স্থান আল্লাহর থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু তোমরা তো তা জানো না। অন্যের পাপকে মুনিবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখো না। নিজেদের পাপাচারের প্রতি এমনভাবে তাকাও, যেন তোমরা গোলাম।
মানুষ হয় সুস্থ, নাহলে বিপদগ্রস্ত। এর বাইরে আর কিছু নেই। সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকলে আল্লাহর প্রশংসা করবে। আর অন্য কেউ অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত হলে তার প্রতি দয়া করবে। আকাশ থেকে পাহাড়ের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হলেও তো সেই শক্ত পাহাড় নরম হয়ে যায়। কিন্তু দেখো, কত দীর্ঘকাল যাবত তোমরা হিকমাহ চর্চা করছো কিন্তু এতে তোমাদের অন্তর নরম হচ্ছে না। অন্যের প্রতি যতটা বিনয়ী হবে, তোমাদের প্রতি ততই অনুগ্রহ করা হবে। যেমন চাষাবাদ করবে, তেমনই শস্য পাবে।
উলামায়ে সু (মন্দাচারী আলিম) হলো দাফলি বৃক্ষের মতো। দেখতে অনেক সুন্দর, কিন্তু খেলেই মৃত্যু। তোমাদের কথাবার্তা ওষুধের মতো। পক্ষান্তরে তোমাদের কাজকর্ম রোগের মতো, যার কোনো ওষুধ নেই। গুরুদের তোমরা নিজেদের পায়ের তলে নিয়ে রেখে দিয়েছ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যেন তারা তোমাদের চাকর-বাকর। আমি তোমাদের সত্য কথাই বলছি। আসলে এসব কথা তোমাদের কাজে আসবে? তোমাদের মুখ থেকেই তো এ ধরনের হিকমাহপূর্ণ কথা বের হয়। কিন্তু সেগুলো তোমাদের কানে প্রবেশ করে না। অথচ মুখ আর কানের মাঝে মাত্র চার আঙ্গুলের দূরত্ব। তোমাদের অন্তরেও যায় না কথাগুলো। মানুষ এখন স্বাধীন হলেও সম্ভ্রান্ত নেই। দাস শ্রেণির লোকেরাও আর মুত্তাকী নেই.”
📄 মূসা -এর যুহদ
৩৫০. সুলাইমান ইবনু ইসহাক ইবনু আবী সুলাইমান বলেন, মূসা যখন দুনিয়ার প্রতি বিরাগী হয়ে উঠে নিজেকে সম্বোধন করে বলেন: “হে নফস! তুমি যখনই কোনো বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হয়েছ, আমি অবশ্যই তার বিরোধিতা করেছি.”
৩৫১. আহমাদ ইবনু আবীল হাওয়ারি থেকে বর্ণিত, মাদা ইবনু ঈসা আল কালায়ি বলেন, “আল্লাহর সাথে কথা হওয়ার পর মূসা নারীসঙ্গ ও মাংস আহার ছেড়ে দেন। এই সংবাদ তাঁর ভাই হারুন -এর কাছে পৌঁছলে একই কাজ করেন তিনিও। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই তিনি বিয়ে করেন এবং মাংস খাওয়া শুরু করেন। এ সংবাদ মূসা -কে জানানো হলে তিনি বলেন, “আল্লাহর জন্য যা ছেড়ে দিয়েছি, তা আর কখনোই গ্রহণ করা সম্ভব না আমার পক্ষে.”
📄 যৌনক্ষুধা দমন কঠিনতর
৩৫২. আহমাদ ইবনু আবীল হাওয়ারি বলেন, "জর্দানের এক সন্ন্যাসীকে বলি, 'যদি কারও ঘুমানোর ইচ্ছা হয় আর সে মনের ইচ্ছা পূরণ করতে চায়, তাহলে কি সে যাহিদ (দুনিয়াবিমুখ) হতে পারবে? তিনি বলেন, 'না। যে ব্যক্তি মনের চাহিদা অনুযায়ী ঘুমায় এবং খায়-দায়, সে যাহিদ হতে পারে না। নারীসঙ্গ-লাভের প্রতি প্রবৃত্তির যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেওয়া বেশ কঠিন। এর চাইতে কঠিন কিছু আমাদের শাস্ত্রে রয়েছে বলে আমরা জানি না। কেননা, আল্লাহ তাআলা মানুষের রগ, রেশা ও রক্তে নারীর চাহিদা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাই এ চাহিদা দমন করা অত্যন্ত কঠিন। পক্ষান্তরে খাবারের চাহিদা দমন করা অত্যন্ত সহজ.”
📄 যুহদের বিপরীত নফস
৩৫৩. জাফর ইবনু বুরকান জানতে পেরেছেন যে, ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন: “দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহযোগী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নাম দুনিয়া-বিমুখতা। আর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বিষয় হলো প্রবৃত্তির অনুসরণ। প্রবৃত্তির অনুসরণের ফলে দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। দুনিয়ার আগ্রহ থেকেই অন্তরে সৃষ্টি হয় ধন-সম্পদ এবং মর্যাদার মোহ। আর ধন-সম্পদ ও মর্যাদা লাভ করতে গিয়েই মানুষ হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম বানিয়ে ফেলে। এতে আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত হন। আর আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত হয়ে যাওয়াটা এমন এক আযাব, যার একমাত্র সমাধান আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এমন উত্তম সমাধান যে, কোনো সমস্যাই এরপর ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে না। তাই ব্যক্তি তার প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করতে চায়, সে যেন নফসকে অসন্তুষ্ট করে। যে ব্যক্তি নফসকে অসন্তুষ্ট করতে পারে না, সে তার প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করতে পারে না। যে বিষয়টা পরিত্যাগ করা সবচেয়ে কঠিন, মানুষ চেষ্টা করলেই তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে পারে."
৩৫৪. জামে ইবনু আহমাদ আল খাররাফ বলেন, "আমি ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলতে শুনেছি: 'যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের জন্য নিজের নফসকে শাস্তি প্রদান করে, সে-ই বুদ্ধিমান। কেননা, এ শাস্তি প্রদানই পরকালের শাস্তি থেকে তার মুক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নফসকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে রাখে, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই তার ধ্বংসের কারণ বনে যেতে পারে."