📄 সংখ্যাধিক্য মানেই উৎকৃষ্টতা নয়
১৯৭. আবদুল্লাহ ইবনু উমার থেকে বর্ণিত, নবি বলেন:
الناس كالإبل المائة لا يجد فيها راحلة
"মানুষ হলো শত উটের মতো, যাদের মাঝে একটা বাহনও খুঁজে পাওয়া যায় না.”
আযহারী উতাইবি থেকে বর্ণনা করে বলেন, “নবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বংশের ক্ষেত্রে সকল মানুষই সমান। এক্ষেত্রে কারোর ওপর কারও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তবে তারা শত উটের মতো, যাদের মাঝে একটাও বাহন হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়.” আযহারী বলেন, "আমার মতে আল্লাহ তাআলা এতে দুনিয়ার নিন্দা করেছেন। দুনিয়াতে জড়িয়ে পড়া থেকে মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। উপদেশ গ্রহণের জন্য তাদের সামনে দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
إِنَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاء أَنزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالأَنْعَامُ حَتَّى إِذَا أَخَذَتِ الْأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلاً أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَن لَّمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
'পার্থিব জীবনের উদাহরণ তেমনি, যেমন আমি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করলাম। পরে তা সংমিশ্রিত হয়ে জমিনের উদ্ভিদ বেরিয়ে আসে, যা মানুষ ও জীব-জন্তুরা খেয়ে থাকে। এমনকি জমিন যখন তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে উঠে এবং জমিনের মালিকেরা ভাবতে থাকে, তারা এর পূর্ণ অধিকারী, তখন রাতে কিংবা দিনে তার ওপর আমার নির্দেশ চলে আসে। তখন আমি সেগুলোকে এমনভাবে কর্তিত করে দিই, যেন কালও তার অস্তিত্ব ছিল না। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য আমি এভাবেই নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করে থাকি.
এই ধরনের আয়াতে তিনি বিভিন্ন দৃষ্টান্ত এবং উপমা পেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা যে বিষয় থেকে মানুষকে সতর্ক করেছেন, নবি ﷺ সেগুলো থেকেই মানুষকে বিরত থাকতে বলতেন। যেমন তিনি বলেছেন, আমার পরের লোকজনকে দেখবে তাদের অবস্থা হয়ে গেছে শত উটের মতো, যাতে তুমি একটাও বাহন পাবে না। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দুনিয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিমুখ এবং পরকালের প্রতি অধীর আগ্রহী মানুষের সংখ্যা খুবই কম.”
আবূ সুলাইমান আল খাত্তাবি উভয় অর্থ উল্লেখ করে বলেন, “বিষয়টাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, একটা হচ্ছে, ধর্মের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে লোকজন সকলেই সমান। শত উটের মধ্যে যেমন কোনো ভেদাভেদ নেই, তাতে যেমন আরোহণের মতো কোনো বাহন পাওয়া যায় না, তেমনি মানুষের মধ্যেও কোনো ভেদাভেদ নেই। সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান কারও শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, অধিকাংশ মানুষই ভুল-ত্রুটি এবং মূর্খতার মধ্যে রয়েছে। তাই তাদের সাথে অধিক সময় অবস্থান করা যাবে না। তাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যাবে না। তবে যারা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, তাদের বিষয়টি ভিন্ন। যেমনভাবে উটের মধ্যে বাহনের সংখ্যা কম, তেমনি এই শ্রেণির লোকদের সংখ্যাও নিতান্তই কম। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
'কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না.
وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
'কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না.
وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ
'কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ.”
যা-ই হোক, পূর্ববর্তী মনীষীগণ এই হাদীসটিকে মানুষের নিন্দা এবং জনসমাগম ছেড়ে নির্জনতা অবলম্বনের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। যার মাধ্যমে বুঝে আসে, আমাদের উল্লিখিত দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হাদীসের উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
[১৫۲] মুসলিম, আস সহীহ, ২৫৪৭。
[১৫۳] সুরা ইউনুস, ১০: ২৪。
[১৫۴] সূরা আরাফ, ৭: ১৮৭。
[১৫۵] সূরা আনআম, ৬:৩৭。
[১৫۶] সূরা আনআম, ৬:১১১。
📄 পূর্ববর্তীদের তুলনায় পরবর্তীদের নিকৃষ্টতা
১৯৮. মিরদাস আল আসলামি থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:
يَذْهَبُ الصَّالِحُونَ الأَوَّلُ فالأوَّلُ، ويَبْقَى حُفالَةٌ كَحُفَالَةِ الشَّعِيرِ، أَوِ التَّمْرِ، لا يُبالِيهِمُ اللهُ بالا
“সৎকর্মশীল লোকেরা বিদায় নিয়ে চলে যাবে। প্রথমে যাবে প্রথম সারির লোকেরা, এরপর তার পরের সারির লোকেরা। পরে যব ও খেজুরের আবর্জনার মতো বাকি রয়ে যাবে কেবল কিছু আবর্জনা। আল্লাহর নিকট কোনো গুরুত্বই থাকবে না তাদের.”
১৯৯. আমাশ থেকে বর্ণিত আছে, আবু ওয়ায়িল বলেছেন: “বর্তমান সময়ের কারীদের দৃষ্টান্ত হলো সেই শীর্ণকায় মেষের মতো, যা ছোলা ও পানি খেয়ে মোটাসোটা হয়ে উঠে। এরপর তা কারও পাশ দিয়ে গেলে সে আশ্চর্য হয়ে তা দেখা শুরু করে। কিন্তু একটি মেষের গায়ে হাত বুলিয়েই দেখতে পায় তাতে কোনো মগজ নেই। এরপর সে আরেকটার গায়ে হাত দেয়, দেখে একই অবস্থা। এরপর সে বলে উঠে, 'আসলে এগুলোর একটাও ভালো নয়.”
২০০. আমাশ বলেন, “সম্ভবত শাকিক আবূ ওয়ায়িল আমাকে বলেছেন : 'হাল যামানার লোকদেরকে আমার কাছে দিরহাম মনে হয়। তুমি তাদের যে কাউকে ঘষা দিলেই দেখবে, লালিমা বের হয়ে এসেছে.”
টিকাঃ
[১৫۷] বুখারি, আস সহিহ, ৬৪৩৪。
[১৫۸] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/১০৪, ১০৫。
📄 পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় পরবর্তী যুগের নিকৃষ্টতা
২০১. উরওয়া থেকে বর্ণিত আছে, আয়িশা কবি লাবিদের একটি কবিতা আবৃত্তি করেছেন :
ذَهَبَ الَّذِينَ يُعَاشُ في أكنافهم * وَبَقيتُ فِي خَلَفٍ كَجِلدِ الْأَجْرَبِ
يتحدثون مخافة وملامة * وَيُعَابُ قَائِلُهُم وَإِن لَم يَسْغَبِ
“ছায়া হয়ে ছিলেন যারা, সব হয়েছেন গত।
আমরা শুধুই বেঁচে আছি শীর্ণ উটের মতো।
ভয়ে ভয়ে যদিও বা কিছু বলা হয়,
মিলবে শুধুই দুয়োধ্বনি, আর তো কিছুই নয়.”
বর্ণনাকারী বলেন, “আয়িশা এরপর বলেছেন, 'লাবিদ যদি আমাদের সময়কার লোকদের দেখতেন, তাহলে কী যে বলতেন!' ইমাম যুহরি আয়িশা-এর এ মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, 'আয়িশা যদি আমাদের যুগের লোকদের দেখতেন, তাহলে কী যে বলতেন!' মামার ও ইমাম যুহরি-এর এ মন্তব্যগুলো উল্লেখ করে বলেছেন, 'ইমাম যুহরি যদি আমাদের সময়কার লোকদের দেখতেন, তাহলে কী যে বলতেন!' আবদুর রাযযাক এরপর বলেছেন, 'মামার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন যুহরি থেকে, যুহরি বর্ণনা করেছেন উরওয়া থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন আয়িশা থেকে। এরপর তিনি বিষয়টি যুহরির সূত্রে সরাসরি আয়িশা থেকেই বর্ণনা করতেন.”
২০২. হিশাম ইবনু উরওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি আপন পিতা থেকে বর্ণনা করেন, "আয়িশা অধিকাংশ সময় ওপরের পঙক্তি দুটি আবৃত্তি করতেন। তবে লাবিদের কবিতায় বলা হয়েছিল : 'আমরা রয়েছি পরবর্তীদের মধ্যে'; আয়িশা তার শব্দটি পরিবর্তন করে বলতেন : 'আমরা রয়েছি এমন এক প্রজন্মে.' তিনি বলেছেন, 'যারা মানুষের ভয় এবং তিরস্কারেই শেষ হয়ে যেতেন.' এরপর আয়িশা বলতেন, 'হায়রে লাবিদ ইবনু রবিয়া! যদি সে এখনো জীবিত থাকত, তাহলে যে কী বলত!” বর্ণনাকারী বলেন,
“আমার পিতা এরপর বলেছেন, ‘আয়িশা যদি আমাদের যুগ পর্যন্ত জীবিত থাকতেন, তাহলে কী যে বলতেন!”
২০৩. উরওয়া থেকে বর্ণিত, আয়িশা লাবিদের কবিতা আবৃত্তি করে বলছেন:
ذَهَبَ الَّذِينَ يُعَاشُ في أكنافهم . و غبرت في خلف كجلد الأجرب
يتعاورون خيانة وملامة * وَيُعَابُ قَائِلُهُم وَإِن لَم يَسْغَبٍ
“যাদের ছায়াতলে থেকে বসবাস করা যায় তারা তো চলে গেছেন।
এখন আমি পরবর্তীদের মধ্যে পাঁচরাযুক্ত উটের মতো জীবনযাপন করছি।
যারা একের পর এক আত্মসাৎ এবং ঘৃণিত কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে।
তাদের মধ্যে যারা কথা বলে তাদের দোষ ধরা হয়, যদিও হট্টগোল করা হয় না.”
আয়িশা এরপর বলতেন, “আমি এখন যাদের মাঝে বসবাস করছি, লাবিদ যদি তাদের দেখত তাহলে কী যে বলত!” বর্ণনাকারী বলেন, “আমরা আয়িশা -এর এই মন্তব্য উল্লেখ করে বলতাম, ‘আয়িশা যদি আমাদের অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী বলতেন!”
২০৪. ইবনু আবী মুলাইকা থেকে বর্ণিত আছে, আবূ হুরায়রা বলেছেন: “মানুষ (নাস) তো চলে যাচ্ছে, এখন কেবল বাকি আছে নাসনাস.” তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “নাসনাস কী জিনিস?” তিনি বলেন, “যারা (স্বভাব-আচরণে) মানুষ নয় কিন্তু (সুরত ও আকৃতিতে) মানুষের ভান ধরে.”
২০৫. আবদুর রহমান ইবনু আবী কাতাদা আল আনসারি বলেন, “আমরা একদিন মামুনের দরজায় বসে কথাবার্তা বলছিলাম। তখন আবুল মাহলুল বলেন, ‘যামানা তো কেবল পাত্র। এই পাত্রে যারাই বসবাস করেছে, তারাই নষ্ট হয়ে গেছে.”
টিকাঃ
[১৫৯] আবদুর রাযযাক সানআনি, আল মুসান্নাফ, ১১/২৪৬-২৪৭。
[১৬۰] ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ, ৮/৭০১。
[১৬۱] ইবনু হাজার, আল মাতালিবুল আলিয়া, ২/৪০০১。
[১৬۲] সাখাবি, আল মাকাসিদুল হাসানা, ৩৫৬。
📄 হয় অসংযত, নাহয় পাপাচার
২০৩. মুগীরা থেকে বর্ণিত আছে, ইবরাহীম বলেছেন : “এমন এক যুগ আসবে, যাকে আখ্যা দেওয়া হবে হিংস্র যুগ বলা। সে সময় যে ব্যাক্তি কুকুরের মতো হিংস্র না হতে পারবে, অন্যরা তাকে খেয়ে ফেলবে.”
২০৪. ইমাম আবু বকর বাইহাকি <sup>রহ.</sup> বলেন, “আমরা এক কিতাবে নবি <sup>সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম</sup> থেকে বর্ণনা করেছি, তিনি বলেছেন:
سَيَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يُخَيَّرُ الرَّجُلُ بَيْنَ الْعَجْزِ وَالْفُجُورِ، فَمَنْ أَدْرَكَ ذلِكَ، فَلْيَخْتَرْ الْعَجْزَ عَلَى الْفُجُورِ.
“শীঘ্রই এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষকে কোনটাঁসা অবস্থান এবং পাপাচারে মাঝে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। কেউ এমন যুগ পেলে সে যেন পাপাচারে পরিবর্তে কোনটাঁসা অবস্থানে গ্রহণ করে নেয়.”
তাই যারা আখিরাত পেতে চায়, তারা যেন কোনটাঁসা হয়ে থাকাকেই বেছে নেয়। এমনকি তাকে আত্মসাৎ করে খেয়ে ফেলা হলেও যেন অন্যেরটা আত্মসাৎ করার জন্য কুকুর না হয়ে যায় সে.”
২০৫. আবূ হুরায়রা <sup>রা.</sup> থেকে বর্ণিত, নবি <sup>সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম</sup> বলেছেন :
سَيَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يُخَيَّرُ الرَّجُلُ بَيْنَ الْعَجْزِ وَالْفُجُورِ، فَمَنْ أَدْرَكَ ذلِكَ، فَلْيَخْتَرْ الْعَجْزَ عَلَى الْفُجُورِ.
“শীঘ্রই এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষকে অপারগতা এবং পাপাচারে মাঝে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলা হবে। কেউ এমন যুগ পেলে সে যেন পাপাচারে পরিবর্তে অক্ষমতাকেই গ্রহণ করে নেয়.”
টিকাঃ
[১৮۰] তাবাকাতুশ শাফিয়্যীয়া আল কুবরা, ২/৩২০১
[১৮۱] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৯৭৬৭১
[১৮۲] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৯৭৬৭১