📄 আল্লাহ-প্রেমিকের পরিচয়
৬৭. আবূ উসমান আল হান্নাত বলেন, “আমি যুননুন-কে বলতে শুনেছি : '(আধ্যাত্মিকতার এ জগত থেকে) যারা ফিরে এসেছে, তারা রাস্তা থেকেই ফিরে এসেছে। যদি তারা আল্লাহ তাআলা পর্যন্ত পৌঁছত তাহলে আর ফিরে আসত না। তাই হে আমার ভাই, দুনিয়াবিরাগী হয়ে যাও, তাহলে আশ্চর্যকর সব বিষয় দেখতে পাবে।' যুননুন বলেন, 'একদলের মতে যাহিদ হলো, যে আল্লাহর ভালোবাসায় দুনিয়াকে পরিত্যাগ করে থাকে.”
৬৮. আবূ উসমান আল হান্নাত বলেন, "আমি যুননুন-কে বলতে শুনেছি: 'জেনে রাখ, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য আপন স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া তার নিকট কঠিন কিছু মনে হয় না। কেননা তার চোখে আল্লাহই সবচেয়ে বড়, তাঁর চেয়ে বড় কিছুই নেই। তাই যারা আল্লাহ-প্রেমিক হতে চায়, তাদের মধ্যে অবশ্যই দুনিয়া-বিমুখতার নিদর্শন পরিলক্ষিত হওয়া উচিত। কারণ, যে অন্তরে দুনিয়ার মোহ রয়েছে, তাতে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা স্থান লাভ করে না। যারা আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়, তারা দুনিয়ার প্রতি ফিরেও তাকায় না। আল্লাহ ছাড়া কারও প্রতি কোনো প্রয়োজনও থাকে না তাদের.”
৬৯. আবূ উসমান আল হান্নাত বলেন, “আমি যুননুন-কে বলতে শুনেছি : 'যেসব বিষয় মানুষকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়, তার সবকিছু পরিত্যাগ করাটাই আল্লাহ-প্রেমিকের নিদর্শন। এমনকি তার সকল কিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে.”
৭০. আবু উসমান আল হান্নাত বলেন, “আমি যুননুন-কে বলতে শুনেছি : 'আল্লাহ-প্রেমিকের আলামত হলো, সে আল্লাহ তাআলা ছাড়া বাকি সব কিছুর কথা ভুলে যাবে। আল্লাহর প্রতি কখনো কোনোরূপ ভীতি অনুভব করবে না সে। কেননা, আল্লাহর ভালোবাসা অন্তরে স্থান করে নেওয়ায় আল্লাহর সাথেই তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবে। তবে কেউ পার্থিব কোনো কারণে আল্লাহকে ভালোবাসলে আল্লাহ কখনো তার অন্তরে স্থান করে নেন না.”
৭১. আবূ উসমান আল হান্নাত বলেন, “আমি যুননুন-কে বলতে শুনেছি: 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে, সে নিজ আমলে এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য লাভ করে."
টিকাঃ
[৭৬] ইবনু মানযুর, মুখতাসারু তারিখি দিমাশক, ৮/২৫২。
[৭৭] ইবনু মানযুর, মুখতাসারু তারিখি দিমাশক, ৮/২৫২。
📄 আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব
৭২. আবু উসমান আল হান্নাত বলেন, “মুমিনের গুণাবলির ব্যাপারে যুননুন-কে বলতে শুনেছি : 'আল্লাহ তাআলার কিছু নির্বাচিত বন্ধু রয়েছে।' তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আবুল ফয়েজ! তাদের আলামত কী?' তিনি বলেন,
‘তারা সুখ-শান্তি পরিত্যাগ করে থাকে, অত্যন্ত মুজাহাদার সাথে আল্লাহর ইবাদত করে, সমাজের চোখে অবমূল্যায়িত থাকতেই তারা ভালোবাসে।’
তাকে বলা হলো, 'বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার মনোনিবেশের আলামত কী?' তিনি বলেন, 'যখন দেখবে সে বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করে, নিয়ামাতের কৃতজ্ঞতা আদায় করে, আল্লাহর যিকরে মত্ত থাকে, তখন বুঝে নিবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি মনোনিবেশ করেছেন।' এরপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তাহলে কারও প্রতি আল্লাহ তাআলা বিমুখ হয়ে যাওয়ার আলামত কী?' তিনি বলেন, 'যখন দেখবে সে আল্লাহর স্মরণ ছেড়ে দিয়েছে, খেলাধুলায় মত্ত রয়েছে, আল্লাহর যিকর করে না, তখন বুঝবে আল্লাহ তার থেকে বিমুখ হয়ে গেছেন.'
বলা হলো, 'আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপিত হওয়ার আলামত কী?' তিনি বলেন, 'যখন দেখবে মানুষের সাথে তিনি তোমার সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছেন, তখন বুঝে নিবে তিনি তোমাকে নিজের প্রতি টেনে নিচ্ছেন। আর যদি দেখ সৃষ্টিজীবের প্রতি তিনি তোমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছেন, তখন বুঝে নিবে, তিনি তোমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন.”
📄 যুহদের ব্যাপারে মণীষীদের বুঝ
৭৩. আব্বাস ইবনু ইউসুফ আশ শিকলি বলেন, "আমি ইয়াকুব ইবনুল ফারজিকে বলতে শুনেছি : 'যুহদের (দুনিয়া-বিমুখতা) ব্যাপারে লোকজন বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছে। একদলের মতে যুহদ হলো, উচ্চ আশা-আকাঙ্ক্ষা না রাখা। এটা সুফিয়ান সাওরি, আহমাদ ইবনু হাম্বল এবং ঈসা ইবনু ইউনুস প্রমুখ মনীষীদের মতামত। আরেক দলের মতে যুহদ হলো দরিদ্রতা পছন্দ করার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা রাখা। এটা আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, শাকিক এবং ইউসুফ ইবনু আসবাত-এর মত। আরেক দলের মতে যুহদ হলো, দিনার দিরহাম পরিত্যাগ করা। এটা আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যাইদের মত। আরেক দলের মতে দুনিয়ার যা না হলেও চলে, এমন অতিরিক্ত বিষয় পরিত্যাগ করা। আরেক দলের মতে, যে সকল জিনিস মানুষকে আল্লাহ তাআলা থেকে উদাসীন করে দেয়, তার সবগুলো পরিত্যাগ করা। এটা দারানি-এর মত। আরেক দলের মতে, যুহد হলো নফসের সাথে সকল ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলা। আরেক দলের মতে, ইলমের যাবতীয় দলিল এবং ইয়াকীনের সকল সাক্ষ্য অনুযায়ী আমল করা। আরেক দলের মতে, কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই দুনিয়ার প্রতি অন্তরে অনীহা তৈরি হওয়া। এই মত ব্যক্ত করেছেন হারিসা। আরেক দলের মতে, নিয়ামাত লাভ করে কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা। এটা ইবনু উয়াইনার মত। আরেক দলের মতে, যে ব্যক্তি সকল হালাল কাজে কৃতজ্ঞতা আদায় করে এবং হারাম কাজ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে সে হলো যাহিদ। এটা যুহরি-এর মত.”
৭৪. মুয়াবিয়া ইবনু আবদিল করীম বলেন, “হাসান বাসরি -এর সামনে একবার যুহদের পরিচয় সম্পর্কে আলোচনা উঠে। কেউ বলে, যুহদের সম্পর্ক পোশাক-আশাকের সাথে। আরেকজন বলে খাবার-দাবারের সাথে। আরেকদল ভিন্ন আরেক মত পোষণ করে। হাসান বাসরি তখন বলেন, তোমাদের কারও কথাই সঠিক নয়। বরং যাহিদ হলো ঐ ব্যক্তি, কাউকে (কোনো মুসলিমকে) দেখলেই যে বলে—সে তো আমার চেয়ে উত্তম.”
টিকাঃ
[৭৮] ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ, ১৪/৫১。
📄 যাহিদের বিস্তারিত পরিচয়
৭৫. আমি আবূ আবদুর রহমান আস সুলামির নিকট পড়েছি, ইয়াহিয়া ইবনু মুয়াযকে জিজ্ঞেস করা হলো, “যাহিদের লক্ষণ কী?” তিনি বলেন, “যা জুটে যাবে, সে তা-ই গ্রহণ করবে। যেখানেই সুযোগ হবে, সেখানেই থাকবে। যা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে যায়, সেটাকেই পোশাক হিসেবে গ্রহণ করে নিবে। দুনিয়া হবে তার কারাগার। দারিদ্র্য হবে তার সদা সঙ্গী। নিঃসঙ্গতা হবে তার বৈঠকের সাথি। শয়তান হবে তার শত্রু। কুরআন হবে তার বন্ধু। আল্লাহ তাআলা হবেন তার উদ্দেশ্য। যিকর হবে তার সাথি। দুনিয়াবিমুখতা হবে তার একান্ত বন্ধু। প্রজ্ঞা হবে তার প্রিয় খাবার। নীরবতা হবে তার কথা। শিক্ষা হবে তার চিন্তার বিষয়। জ্ঞান হবে তার পরিচালক। ধৈর্য হবে তার বালিশ। তাওবা হবে তার বিছানা। ইয়াকীন হবে তার সঙ্গী। নসীহত হবে তার ক্ষুধা। সিদ্দিকগণ হবেন তার ভাই। বিবেক হবে তার পথপ্রদর্শক। তাওয়াক্কুল হবে তার রিযক। আমল হবে তার ব্যস্ততা। ইবাদাত হবে তার পেশা। তাকওয়া হবে তার পাথেয়। কল্যাণকর কাজ হবে তার বাহন। প্রজ্ঞা হবে তার উযির। তাওফিক হবে তার সঙ্গী। জীবন হবে তার সফর। দিনগুলো হবে তার সফরের একেকটি স্টেশন। জান্নাত হবে তার ঠিকানা। আল্লাহ তাআলা হবেন তার আশ্রয়স্থল.”