📄 অনুবাদকের কথা
যুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা এক অতিপরিচিত শব্দ। তবে এর পরিচিতির ধরন নিয়ে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। সবার কাছে তা সমান মাত্রায় পরিচিত নয়। খুব সম্ভব সাম্প্রতিক সময়ে শব্দটা অনেক বেশি যুলুমের শিকার হয়েছে। অথচ বিশ্বমানবতা যখন পুঁজিবাদের থাবায় বিধ্বস্ত, তখন এর সঠিক চিত্র সবার সামনে হাজির থাকা ছিল এক আবশ্যক বিষয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা আর হয়নি, বরং কোনো কোনো মহল থেকে এর প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দেওয়া হয়েছে।
আসলে মুসলিম উম্মাহর সুদীর্ঘ ইতিহাসে যাহিদদের অবদান কতটুকু বা উম্মাহর অধঃপতনে তারা আদৌ দায়ী কি না—তা আলাপের জায়গা এটা নয়। তবে এখানে এটা বলা প্রাসঙ্গিক যে, যুহদ মূলত ইসলামেরই এক অনুষঙ্গ। ইসলাম দুনিয়ার মোহ দূর করার যে বয়ান প্রদান করে থাকে, তার নাম-ই যুহদ। একজন নবি হিসেবে মুহাম্মাদ ﷺ নিজে সর্বপ্রথম ইসলামের সে বয়ানকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন।
বাকি এটা স্বীকার করতে হবে যে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এক্ষেত্রেও কিছুটা বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, একশ্রেণির মানুষের মাধ্যমে। কিন্তু এ কারণে তো যুহদের মৌলিক কনসেপ্ট আর ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়নি। বরং লক্ষ করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে যুহদ-ই ইনাবাত ইলাল্লাহ তথা আল্লাহ তাআলার সাথে সুসম্পর্ক গড়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। পাঠকদের জন্য বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণ রাখা ভালো হবে—যুহদ অবলম্বন করতে হলে দুনিয়া কতটুকু রাখা যাবে বা কতটুকু বিসর্জন দিতে হবে, ইসলাম তার নির্দিষ্ট কোনো সীমা বলে দেয়নি; বরং এটা নির্ভর করে প্রত্যেকের অন্তরের অবস্থার ওপর। এই কারণে আমাদের আলোচ্য কিতাবে দেখা যাবে সালাফগণ এর একেকরকম সংজ্ঞা দিচ্ছেন।
ইমাম বাইহাকি এক্ষেত্রে অবশ্য কোনো সংজ্ঞাকে প্রাধান্য দেননি। তেমনিভাবে তিনি যুহদের সামগ্রিক কোনো চিত্রও হাজির করেননি; বরং এ বিষয়ক নানা মাত্রিক বয়ান হাজির করে বিষয়টিকে তিনি পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। একজন পাঠককে এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। যুহদের যে সংজ্ঞা ও চিত্র তাকওয়া ও সংযমশীলতার সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল হবে, তিনি সেটা গ্রহণ করবেন।
যুহদ বিষয়ে ইমাম বাইহাকি-এর এ কিতাবটি অতুলনীয়। তিনি যেভাবে যুহদের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ থেকে শুরু করে এ বিষয়ক খুটিনাটি আলাপ করেছেন, তার নজির মেলা ভার। আলহামদুলিল্লাহ, এমন একটি অনবদ্য গ্রন্থ এখন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের সামনে হাজির হতে যাচ্ছে। একে ভাষান্তরের ক্ষেত্রে মূলানুগ থেকে যথাসাধ্য সাবলীল করার চেষ্টা করেছি আমরা। বইয়ের বক্তব্যের নির্ভুল উপস্থাপনে চেষ্টার কমতি করা হয়নি। তবুও কোনো ভুলত্রুটি নজরে পড়লে তা অবহিত করার সবিনয় অনুরোধ রইল।
মুজাহিদুল ইসলাম মাইমুন
কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা।
📄 সম্পাদকীয়
الْحَمْدُ الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ، فَتَبَارَكَ الله أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ ، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله سيد المرسلين وإمام المتقين، اللهم صل على محمد وعلى آله وصحبه والتابعين لهم أجمعين. أما بعد:
**যুহদ কী?**
যুহদ আরবি শব্দ। 'যুহদ' অর্থ অনাসক্তি, অনাগ্রহ, নির্লিপ্ততা, নির্মোহ ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে দুনিয়াবিমুখতাকেই যুহদ বলা হয়। আর ব্যাপকভাবে বলতে গেলে কিয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশের ভয়ে দুনিয়া ও তার চাকচিক্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, নির্লিপ্ত থাকা, অনাগ্রহ প্রকাশ করা ও তা পরিত্যাগ করাকে যুহদ বলে।
কেউ কেউ বলেন, যুহদ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন হিসাব হওয়ার ভয়ে হালাল ও জায়িয বিষয়াদি পর্যন্ত পরিত্যাগ করা এবং কিয়ামতের দিন শাস্তি পাওয়ার ভয়ে হারাম ও নাজায়িয বিষয়াদি পরিত্যাগ করা।
আবার অনেকেই বলে থাকেন, দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ ও মজা পরিত্যাগ করে এবং দুনিয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করে তা থেকে বিমুখ হয়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে মনোনিবেশ করা।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম-এর মতে,
'পরহেযগারিতা ও যুহদের মাঝে পার্থক্য - যুহদ হলো আখিরাতে যা উপকারে আসবে না, তা পরিত্যাগ করা; এবং পরহেযগারিতা হলো আখিরাতে যা ক্ষতির কারণ হবে, তা পরিত্যাগ করা।
ইমাম ইবনু কুদামা বলেন,
'(দুনিয়ার) কোনোকিছুর আসক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে তারচেয়ে উত্তম কিছুর দিকে মনোনিবেশ করাই যুহদ।
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ -কে জিজ্ঞেস করা হলো- 'যুহদ' কী? উত্তরে তিনি বলেন,
'তাকে নিয়ামাত দেওয়া হলে শুকরিয়া আদায় করে, আর বালা-মুসিবত দ্বারা পরীক্ষা করা হলে সবর করে, আর এটাই যুহদ।
তিনি আরও বলেন,
'যুহদ হচ্ছে সবর করা এবং মৃত্যুর ব্যাপারে সজাগ থাকা।
ইমাম সুফিয়ান আস সাওরি বলেন,
'শক্ত খাবার খাওয়া ও মোটা কাপড় পরিধানের নাম যুহদ নয়। বরং দুনিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হওয়া এবং মৃত্যুর ব্যাপারে সজাগ থাকার নামই যুহদ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন,
'দুনিয়াকে (দুনিয়ার ভালবাসাকে) অন্তরে ঠাঁই দিয়ে তোমার সামনে যা আছে তা (বাহ্যিকভাবে) পরিত্যাগ করা যুহদ নয়। মূলত দুনিয়াকে (দুনিয়ার ভালবাসাকে) অন্তর থেকে বাদ দিয়ে তোমার হাতের সামনে যা আছে তা পরিত্যাগ করাই হলো যুহদ।
মূলত আখিরাতের জীবনকে দুনিয়ার জীবনের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার নামই যুহদ। কেননা, দুনিয়ার জীবন তো ক্ষণস্থায়ী; আর আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। চিরস্থায়ী জীবনের চিন্তা ছেড়ে ক্ষণস্থায়ী জীবনের পিছনে ছুটে বেড়ানো চরম মূর্খতা বৈ আর কী হতে পারে! আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন,
وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعُ
"আর তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট; অথচ পার্থিব জীবন আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগ মাত্র।"
সূরা আ'লার ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন,
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
“বরং তারা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে, অথচ আখিরাতের জীবন হলো স্থায়ী।'
সূরা ত্ব-হা'র ১৩১ নং আয়াতে তিনি আরও বলেন,
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى
“আর তুমি কখনো প্রসারিত কোরো না তোমার দু'চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিযক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী।"
আমরা দুনিয়াকে আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসিতার একমাত্র ক্ষেত্র বানিয়ে নিয়েছি। অথচ মুমিনের জন্য এই দুনিয়া আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের গন্তব্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র মাত্র। এখানে আমরা মুসাফিরের মতো রয়েছি, এই দুনিয়া আমাদের আসল ঠিকানা নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত,
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ
'দুনিয়াতে অচেনা, দরিদ্র অথবা মুসাফিরের মতো থাকো। '
রাসূলুল্লাহ বলেন,
أَلَا إِنَّ الدُّنْيَا مَلْعُونَةُ مَلْعُونُ مَا فِيهَا إِلَّا ذِكْرَ اللَّهِ وَمَا وَالاهُ وَعَالِمًا أَوْ مُتَعَلَّمًا
'দুনিয়া অভিশপ্ত এবং অভিশপ্ত তার মাঝে থাকা সকল বস্তু। তবে আল্লাহর যিকর ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়, এবং আলিম (উলামা) ও তালিবুল ইলম (ইলম অন্বেষণকারী) নয়।
রাসূলুল্লাহ আরও বলেন,
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ
'দুনিয়া হচ্ছে মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত সমতুল্য!
রাসূলুল্লাহ থেকে সরাসরি যুহদ শব্দেও হাদীস বর্ণিত হয়েছে,
ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبَّكَ اللهُ وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ يُحِبُّوكَ
'তুমি দুনিয়ার প্রতি যুহদ (অনাসক্তি) অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন; এবং মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি নিরাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে।
অনুরূপভাবে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -ও যাহিদ হওয়ার জন্য দুআ করতেন,
اللهم وسع علي في الدنيا وزهدني فيها، ولا تُزْوها عني وترغبني فيها.
'হে আল্লাহ! দুনিয়া আমার জন্য সুপ্রশস্ত করে দিন, ও দুনিয়ার প্রতি আমাকে যাহিদ বানিয়ে দিন (তথা নিরাসক্ত করে দিন); এবং দুনিয়ার প্রতি আমার আসক্তি ও মন লাগিয়ে দিয়েন না। '
**নবিজি -এর যুহদের ধরন ও প্রকৃতি যেমন ছিল :**
একদা সাহাবায়ে কেরাম দেখতে পেলেন রাসূল চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন। এমন কি তার শরীরে চাটাইয়ের দাগ বসে গেল। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি আপনার জন্য নরম বিছানার ব্যাবস্থা করে দেব না? তখন তিনি বললেন, দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? আমি তো কেবল মাত্র একজন আরোহী, যে একটা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিল, আবার কিছুক্ষণ পর তার গন্তব্যে চলে যাবে।
আরেকবার উমার রাসূলুল্লাহ -এর কামরায় প্রবেশ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, এ সময় তিনি একটা চাটাইয়ের ওপর শুয়ে ছিলেন। চাটাই এবং রাসূলুল্লাহ -এর মাঝে আর কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ এবং পায়ের কাছে ছিল সল্ম বৃক্ষের পাতার একটি স্তূপ ও মাথার ওপর লটকানো ছিল চামড়ার একটি মশক।
আমি রাসূলুল্লাহ -এর একপার্শ্বে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললে তিনি বললেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, কিসরা ও কায়সার পার্থিব ভোগবিলাসের মধ্যে ডুবে আছে, অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, তুমি কি পছন্দ করো না যে, তারা দুনিয়া লাভ করুক, আর আমরা আখিরাত লাভ করি?
আমি রাসূলুল্লাহ -এর কাছে প্রবেশ করলাম। সে সময় তিনি খেজুর পাতায় নির্মিত একটি চাটাইয়ের ওপর কাত হয়ে শোয়া ছিলেন।
একই বিষয়ে সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে,
আমি সেখানে বসে পড়লাম। তিনি তার চাঁদরখানি তার শরীরের ওপর টেনে দিলেন। তখন এটি ছাড়া তার পরনে অন্য কোনো কাপড় ছিল না। আর বাহুতে চটাইয়ের দাগ বসে গিয়েছিল। এরপর আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ -এর সামানাদির দিকে তাকালাম। আমি সেখানে একটি পাত্রে এক সা' (আড়াই কেজি পরিমাণ) এর কাছাকাছি কয়েক মুঠো যব দেখতে পেলাম। অনুরূপ বাবলা জাতীয় গাছের কিছু পাতা (যা দিয়ে চামড়ায় রং করা হয়) কামরার এক কোণায় পড়ে আছে দেখলাম। আরও দেখতে পেলাম ঝুলন্ত একখানি চামড়া যা পাকানো ছিল না। তখন তিনি বলেন, এসব দেখে আমার দু' চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। তিনি বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র, কীসে তোমার কান্না পেয়েছে?
আমি বললাম, হে আল্লাহর নবি, কেন অমি কাদব না? এই যে চাটাই আপনার শরীরের পার্শ্বদেশে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। আর এই হচ্ছে আপনার কোষাগার। এখানে সামান্য কিছু যা দেখলাম তা ছাড়া তো আর কিছুই নেই। পক্ষান্তরে ঐ যে রোমক বাদশাহ ও পারস্য সম্রাট, কত বিলাস ব্যসনে ফলমূল ও ঝরনায় পরিবেষ্টিত হয়ে আড়ম্বরপূর্ণ জীবন-যাপন করছে। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল এবং তার মনোনীত ব্যক্তি। আর আপনার কোষাগার হচ্ছে এই! তখন তিনি বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি কি এতে পরিতুষ্ট নও যে, আমাদের জন্য রয়েছে আখিরাত আর তাদের জন্য দুনিয়া (পার্থিব ভোগবিলাস)। আমি বললাম, নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট।
সাহল ইবনু সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مَاءٍ দুনিয়ার মূল্য যদি আল্লাহর নিকট মশার ডানা পরিমাণও হতো, তাহলে তিনি কাফিরদের এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।
জাবির ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ আলিয়াহ অঞ্চল থেকে মদীনায় আসার পথে এক বাজার দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উভয় পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কান বিশিষ্ট একটি মৃত বকরীর বাচ্চার পাশ দিয়ে যেতে তার কাছে গিয়ে এর কান ধরে বললেন, তোমাদের কেউ কি এক দিরহাম দিয়ে এটা ক্রয় করতে আগ্রহী? তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, কোনোকিছুর বদৌলতে আমরা এটা নিতে আগ্রহী নই এবং এটি নিয়ে আমরা কী করব?
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, বিনা পয়সায় তোমরা কি সেটা নিতে আগ্রহী? তারা বললেন, এ যদি জীবিত হত তবুও তো এটা ত্রুটিযুক্ত ছিল। কেননা এর কান হচ্ছে ছোট ছোট। আর এখন তো সেটা মৃত, আমরা কীভাবে তা গ্রহণ করব? অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! এই বকরীর বাচ্চা তোমাদের কাছে যতটা নগণ্য, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর তুলনায় আরও বেশি নগণ্য।
**যুহদের স্তর**
যুহদ ও দুনিয়াবিমুখতার কয়েকটি স্তর রয়েছে:
১. হারাম থেকে বিমুখতা: এই বিমুখতা অত্যাবশ্যক।
২. মাকরুহাত ও অপছন্দনীয় কার্যাদী থেকে বিমুখতা : এই বিমুখতা পছন্দনীয়।
৩. বৈধ কাজে সীমাতিরিক্ত ব্যাস্ত হওয়া থেকে বিমুখতা : যেমন, অসার- অনর্থক কথাবার্তা, অধিকহারে প্রশ্ন করা থেকে বিমুখ হওয়া। এরকম বিমুখতা মানুষের একটি বিশেষ পরিপূরক গুণ।
৪. মহান আল্লাহ ব্যাতীত অন্য সব কিছু এবং আল্লাহ থেকে বিমুখকারী সব কিছু থেকে বিমুখ হওয়া; আর এটাই পরিপূর্ণ যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা)।
উল্লেখ্য যে, যুহদের অন্তরালে শরীয়াতের সাথে সম্পৃক্ত কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কেননা যুহদের অন্তরালেও শারীয়াতের অনেক বিধানাবলীর ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি হয়ে থাকে।
**তাসাউফ কী?**
'তাসাউফ' ও 'সুফি' শব্দটির উৎপত্তিস্থল নিয়ে আহলে ইলমদের থেকে অনেক মত পাওয়া যায়। কেননা তাসাউফ শব্দটি 'যুহদ' ও 'যাহিদ' শব্দের মতো ইসলামের প্রথম যুগ থেকে প্রচলিত ও ব্যবহৃত নয়। যার কারণে অনেকে অনেকভাবে একে ব্যাখ্যা করেছেন। কারও কারও মতে বকরির পশম বিশিষ্ট কাপড় পরিধান করার কারণে একদল যাহিদদের সুফি বলা হত। কেউ কেউ বলে থাকে, আসহাবে সুফফার সাহাবিদের গুণাবলী ও নামের সাথে মিল রেখে তাসাউফ ও সুফি নামকরণ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন অন্তরের সাফাই, নির্মলতা ও সচ্ছতাকে তাসাউফ বলা হয়।
তাসাউফ ও সুফি এই দু'টি দু'শত হিজরির পূর্বে প্রসিদ্ধ হতে থাকে। যেমনটি ইমাম কুশাইরী থেকে বর্ণিত। এবং আবূ হাশিম আস সুফিকে সর্বপ্রথম 'সুফি' নামে নামকরণ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। যিনি ১৫০ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন।
আহমাদ ইবনু আলি আল মুক্বরী বলেন, 'সুফি শব্দটি আরবি ভাষায় নতুন সৃষ্টি। মূল আরবি ভাষার সাথে এর কোনো সাদৃশ্য নেই এবং আরবি ভাষায় এর কোনো উৎসও নেই।'
ইমাম কুশাইরী-ও অনুরূপ বলেন এবং তিনি 'সুফি' শব্দটি লক্কব হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছেন।
ইমাম ইবনু খালদুন-এর মতে, সূফ তথা পশমী পোশাক পরিধানের কারণে তাদের সুফি বলা হত।
ইমাম যাকারিয়া আল আনসারী বলেন, তাসাউফ এমন এক ইলম যার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, চরিত্র ও নৈতিকতার পরিশুদ্ধির বিভিন্ন উপায় সমন্ধে জানা যায়। এছাড়াও চিরস্থায়ী সৌভাগ্য লাভের আশায় বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ অবস্থার উন্নতি সাধন সম্পর্কেও জানা যায়।
ইমাম আবুল হাসান আশ শাযিলী বলেন, 'তাসাউফ হচ্ছে আল্লাহর উবুদিয়াত ও বন্দেগির ক্ষেত্রে অন্তরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের বিধানাবলীর ওপর প্রতিক্রিয়াশীল হয়।'
ইমাম আহমাদ ইবনু আজীবাহ বলেন, 'তাসাউফ হচ্ছে এমন এক ইলম যার মাধ্যমে জানা যায় রাজাধিরাজ আল্লাহ পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছাতে হবে, কীভাবে অন্তরের পঙ্কিলতা পরিষ্কার করবে এবং কীভাবে সব ধরনের ভালো গুণাবলী দিয়ে অন্তরকে সাজাবে। তাসাউফের শুরুর অংশ হচ্ছে- ইলম, এর মাঝের অংশ হচ্ছে- (নেক) আমল এবং শেষ ও চূড়ান্ত অংশ হচ্ছে- সফলতা।'
ইমাম মারুফ কারখী বলেন,
'তাসাউফ হচ্ছে হাকীকাতসমূহকে গ্রহণ করা আর সৃষ্টির কাছে বিদ্যমান বস্তুসমূহে অনাসক্তি থাকা।
তাসাউফকে অনেকেই ইহসানের অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন।
ইহসানের স্তর বুঝাতে নবিজি বলেন, أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ 'ইহসান হলো, এমনভাবে তুমি আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছ। যদি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করবে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।
আল্লামা আহমাদ ইবনু আজীবাহ বলেন,
'সুফিদের মাযহাব হচ্ছে, আমল যখন শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে তখন তাকে বলা হয় ইসলামের স্তর। আর সেই আমলই যখন মুজাহাদা ও রিয়াযতের মাধ্যমে অন্তরের সচ্ছতার কাজে স্থানান্তরিত হয় তাকে ঈমানের স্তর বলে। এবং হাকীকাত ভেদ যখন বান্দার সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে তখন তাকে ইহসানের স্তর বলে।
অর্থাৎ তাসাউফ হচ্ছে বাহ্যিক অভ্যন্তরীণ কুফর, শিরক, নিফাক, রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত), হাসাদ (হিংসা), কিবর (অহংকার), নাফরমানী (অবাধ্যতা), ফাহশাত (অশ্লীলতা)-সহ সকল কু-প্রবৃত্তি দূর করে ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা। কুরআন কারীমে যাকে 'তাযকিয়াতুন নফস', হাদীসে যাকে 'ইহসান' ও পরবর্তী যামানার নেককার সালিহীনরা যাকে 'তাসাউফ' নামে আখ্যায়িত করেছেন।
কুরআন কারীমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা তাযকিয়াতুন নফস তথা আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে বলেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
'নিঃসন্দেহে সে সফলকাম হয়েছে, যে তার নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে। এবং সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা (নফস)-কে কলুষিত করেছে'।
তিনি আরও বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى
'নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে, যে পরিশুদ্ধ হয়'।
আল্লাহ তাবারকা ওয়া তাআলা আরও বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُونَ أَنفُسَهُمْ بَلِ الله يُزَكِّي مَن يَشَاء وَلَا يُظْلَمُونَ فَتِيلاً
'তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা নিজেদেরকে পূত-পবিত্র বলে থাকে অথচ পবিত্র করেন আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকেই। বস্তুতঃ তাদের ওপর সুতা পরিমাণ অন্যায়ও হবে না'।
তাসাউফ, তাযকিয়াতুন নফস ও আত্মশুদ্ধির উপাদান ৩ টি :
১. ঈমান ও তাওহীদের ওপর অবিচল থাকা।
২. শারীয়াতের ফরয এবং ওয়াজিবসমূহের যথাযথ পাবন্দি করা।
৩. ইত্তেবায়ে সুন্নাত তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ- এর সুন্নাতের অনুসরণ।
এর বিপরীতে যুহদ ও তাসাউফ চর্চা জায়েয নেই। সমাজে এক শ্রেণির লোক যুহদ, তাসাউফের নামে নানা রকম শারীয়াতবিরোধী কর্মকাণ্ডে এবং ভণ্ডামিতে লিপ্ত। সুতরাং যুহদ ও তাসাউফের কোনো বিষয় যদি কুরআন-সুন্নাহ তথা শারীয়াত ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের গ্রহনযোগ্য আলিমদের নিক্তিতে উত্তীর্ণ না হয় তবে তা বর্জনীয়।
কেননা শারীয়াত-বিরোধী আমলে লিপ্ত এবং কুফরি ও ভ্রান্ত আকীদা পোষণকারী কেউ আল্লাহর ওলি হতে পারে না; যদিও সে অনেক ইবাদাতগুযার ও ভালো কর্মের অধিকারী হয়ে থাকে!
সুফিকুল শিরোমণি ইমাম জুনাইদ আল বাগদাদী বলেন,
'আমাদের এই ইলম (ইলমুত তাসাউফ) কুরআন ও সুন্নাহর সাথেই সম্পৃক্ত (অর্থাৎ এগুলোর ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহ)। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেনি তার অনুসরণ করা যাবে না।
ইমামুল আওলিয়া সাহল ইবনু আবদিল্লাহ তুসতারী বলেন, তাসাউফের ক্ষেত্রে আমাদের মূলনীতি ছয়টি:
১. কুরআনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা।
২. রাসূলুল্লাহ- এর সুন্নাতের অনুসরণ করা।
৩. হালাল খাওয়া।
৪. কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৫. সব ধরনের গুনাহ থেকে সংযত থাকা ও (অসতর্কতাবশতঃ গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে) তাওবা করা। এবং
৬. হুকুক (আল্লাহ ও বান্দার হকসমূহ) আদায় করা।
শাইখুল মাশায়েখ আবদুল কাদীর জীলানী বলেন,
'সকল আওলিয়ায়ে কেরাম শুধু কুরআন ও হাদীস থেকেই শারীয়াতের বিধানাবলী) আহরণ করেন এবং কুরআন ও হাদীসের যাহের মুতাবেকই আমল করে থাকেন।
সুতরাং যুহদ ও তাসাউফের নামে যদি কোন ফাসিক ও ফাজির থেকে কোনো প্রকার অলৌকিক বিষয় সংঘটিতও হয়, তাহলে তা আল্লাহর ওলিদের এবং প্রকৃত যাহিদ ও সুফিদের কারামতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। বরং তা 'ইস্তিদরাজ' ও ভেল্কিবাজি হিসেবে পরিগণিত হবে।
উকবা ইবনু আমের থেকে মারফু সূত্রে হাদীস বর্ণিত, যখন দেখবে আল্লাহ তাআলা কোনো গুনাহগার বান্দাকে গুনাহে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায়ও দুনিয়ার কোনো এমন কিছু সম্মান ও নিয়ামাত দিচ্ছেন যা সেই বান্দা পছন্দ করে, তখন জেনে নিয়ো সেটি 'ইস্তিযরাজ'।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সূরা আনআমের ৪৪ নং আয়াত তিলাওয়াত করেন।
ইমাম শাফিয়ি বলেন,
'যখন কাউকে পানির ওপর হাটতে দেখবে কিংবা হাওয়ায় উড়তে দেখবে তখন সাথে সাথেই তার ব্যাপারে ধোকায় পড়ে যেয়ো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার কার্যকলাপকে কুরআন ও সুন্নাহর কষ্টিপাথরে পরখ করে নাও।
সুফিকূল শিরোমণি আবূ ইয়াযীদ আল বিসতামী (প্রসিদ্ধঃ বায়েযীদ বুস্তামী) বলেন,
'আল্লাহর কিছু বান্দা আছে যারা পানির ওপর হাটে, কিন্তু তাদের কোনো মূল্যই আল্লাহর নিকট নেই। যদি তোমরা এমন ব্যক্তিকে দেখ যাকে আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে আসমানে উড়ার ক্ষমতা প্রদান করেছেন তাদের দ্বারাও ধোকা খেয়ো না। যতক্ষণ না তোমরা তাকে দেখবে আল্লাহর বিধি-নিষেধ কতটুকু পালন করছে, আল্লাহর নির্ধারিত শারীয়াতের সীমানা কতটুকু সংরক্ষণ করছে এবং কতটুকু শারীয়াত মুতাবিক চলছে।
আবূ মুহাম্মাদ আল মুরতাইশ কে জিজ্ঞেস করা হলো- فلان يمشي على الماء! অমুককে দেখা যায় যে, পানিতে হাটে! প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, عندي أن من مكنه الله من مخالفة هواه فهو أعظم ممن يمشي على الماء! 'আমার নিকট যাকে আল্লাহ তার প্রবৃত্তির বিরোধিতা করার তাওফীক দান করেছেন তিনি ঐ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম ও মর্যাদাবান যে পানির ওপর হাটে। (অথচ সে প্রবৃত্তি দ্বারা কলুষিত)!
ইমাম শাতিবি-এর মতেও যেসব ব্যক্তি শরীয়াত-বিরোধী কাজে লিপ্ত তাদের থেকে এমন অলৌকিক বিষয় প্রকাশ পেলে তা শয়তানের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখতে হবে, এরপর তিনি শাইখ আবদুল কাদির আল জীলানী-এর বিখ্যাত ঘটনা উল্লেখ করেন যেখানে শয়তান তাকে গাইবি আওয়াজে বলেছিল- আমিই তোমার রব, তোমার জন্য সব হারামকে হালাল বানিয়ে দিলাম! তখন শাইখ আবদুল কাদির জীলানী তাকে বললেন, হে অভিশপ্ত, এখান থেকে ভাগো!
ইমাম জুরজানী, তাফতাযানী, বসাফফারিনী, সুয়ূতি ও মুল্লা আলি কারী-সহ অন্যান্য ইমামগণ ওলিদের পরিচয় বলতে গিয়ে বলেন,
ওলি হচ্ছেন তিনি, যিনি আল্লাহর (সত্ত্বা ও গুনাবলীর) পরিচয় লাভ করেছেন। আর তাঁর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার সাধ্যানুযায়ী (আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের) অনুগত হবে এবং সকল প্রকার গুনাহ বিরত থাকে এবং দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ, কু-প্রবৃত্তি ও খাহেশাতে মশগুল হয় না।
অতএব যুহদ ও তাসাউফ চর্চার ক্ষেত্রে এসব মূলনীতিসমূহের দিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।
বক্ষমাণ এই কিতাবটিতে ইমাম বাইহাকি মূলত ইসলামের সোনালী যুগের মনীষাদের দুনিয়া-ত্যাগের নমুনা সম্পর্কে নিজ সনদে বিভিন্ন ঘটনাবলী ও অমীয় বাণী নকল করেছেন। কিতাবে উল্লেখিত সকল বর্ণনাই সঠিক নয়, আবার এমন অনেক বর্ণনা রয়েছে যা সঠিক হলেও সকলের জন্য অবাধে আমল করা বৈধও নয়। তবে সার্বিকভাবে এই কিতাবটি ও তার বিষয়বস্তু আমাদের সকলের জন্যই বেশ উপকারী ও প্রয়োজনীয়।
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এও জানিয়ে রাখা উচিৎ যে, মূল গ্রন্থ তথা 'আয-যুহদুল কাবীর'- এর অনুবাদ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো অবলম্বন করা হয়েছে তা হচ্ছে,
১. অনুবাদ সহজ ও প্রাঞ্জল করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
২. যেসব বর্ণনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে তা বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩. মূল গ্রন্থের অনেক আবইয়াত ও পঙক্তি অনুবাদের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
৪. কতিপয় ইস্তেলাহা ও পরিভাষার আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়নি। প্রয়োজন মনে হলে তার নিচে টীকা যুক্ত করা হয়েছে।
৫. বুখারি ও মুসলিমের বর্ণিত হাদীস ব্যতীত অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসসমূহের মান সংক্ষিপ্তভাবে পর্যালোচনা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা এই কিতাবের সাথে সংশ্লিষ্ট আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন। আমীন।
এত কিছুর পরেও মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাই এই বইয়ের সম্পাদনার ক্ষেত্রে যা কিছু সঠিক ও উপকারী বিষয় বিবেচিত হবে তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং যেসব ভুল হবে তার দায়ভার আমার ও শয়তানের দিকে সম্পৃক্ত হবে!
আহক্বারুল ই'বাদ
আবদুল্লাহ আল মামুন (উ'ফিয়া আনহু)
২৯ নভেম্বর ২০২১
টিকাঃ
[১] আল ফাওয়ায়িদ, ১৮১; মাদারিজুস সালিকীন, ২/১২।
[২] মুখতাসারু মিনহাজিল কসিদীন, ইবনু কুদামা, ৩৪৬।
[৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৪৬৮।
[৪] আয-যুহদুল কাবীর, বাইহাকি, ৬৫; তাহযীবুল কামাল, ১১/১০৯; তারীখুল ইসলাম, ১৩/২০০; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৪৬২।
[৫] সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/২৪৩; আয-যুহদ, ইবনু আবিদ দুনইয়া, ৬৩; হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৬/৪৮৬; আয-যুহদুল কাবীর, বাইহাকি, ১৯৪; আল জারহু ওয়াত তা'দীল, ১/১০১।
[৬] ত্বরিকুল হিজরাতাইন, ৪৫৪।
[৭] সূরা র'দ, ১৩: ২৬।
[৮] বুখারি, ৬৪১৬, ৬৪৯২।
[৯] তিরমিযি, ২৩২২; ইবনু মাজাহ, ৪১১২; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি, ১৭০৮- হাদীসটির সনদ হাসান।
[১০] মুসলিম, ২৯৫৬।
[১১] ইবনু মাজাহ, ৪১০২- হাদীসটির সনদ হাসান, কতিপয় মুহাদ্দিসদের নিকট এর সনদ যঈফ।
[১২] তারীখু মাদীনাতি দিমাশক, ইবনু আসাকীর, ১৪/২৬৪।
[১৩] তিরমিযি, ২৩৭৭; ইবনু মাজাহ, ৪১০৯; মুসনাদু আহমাদ, ৩৭০৯।
[১৪] বুখারি, ৪৯১৩; মুসলিম, ১৪৭৯, ৩৫৮৩।
[১৫] তিরমিযি, ২৩২০।
[১৬] মুসলিম, ২৯৫৭।
[১৭] আস সিহাহ, জাওহারী ৪/১৩৮৮; মু'জামু মাকাইসিল লুগাহ, আবুল হাসান আহমাদ ইবনু ফারিস ৩/৩২২; তিসআতু কুতুব ফী উসূলিত তাসাউফ পৃ.৩৬৫; মিসবাহুল মুনীর, আহমাদ ইবনু আলি আল মুকরী ১/৪৮১।
[১৮] কাশফুয যুনূন আন আসমায়িল কুতুবি ওয়াল ফুনূন, হাজী খলীফা ১/৪১৪; আল ইনতিসার লি ত্বরিকিস সূফিয়্যাহ, পৃ.১৭-১৮।
[১৯] মিসবাহুল মুনীর, ১/৪৮১।
[২০] রিসালাতুল কুশাইরিয়া, ২/৫৫০ (দারুল কুতুবিল হাদীসিয়া, কায়রো)।
[২১] মুকাদ্দামাতু ইবনি খালদুন, পৃ. ৪৬৭।
[২২] রিসালাতুল কুশাইরিয়া, পৃ.৭।
[২৩] আল ফুতুহাতুল ইলাহিয়া ফি নুসরাতিত তাসাউফ, পৃ. ১৬; নুরুত তাহকীক পৃ. ৯৩।
[২৪] মি'রাজুত তাশাওউফ ইলা হাক্বায়িকিত তাসাউফ, ইবনু আজীবাহ, পৃ.৪।
[২৫] রিসালাতুল কুশাইরিয়া, পৃ.১২৭; আওয়ারিফুল মাআরিফ, সোহরাওয়ার্দী, পৃ.৬২।
[২৬] বুখারি, ৫০; মুসলিম, ৯।
[২৭] সরীহুল ইবারাহ ওয়া বাহিরুল ইশারাহ, আবদুস সালাম আল ইমরানী আল খালিদী, ৪/১৪৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া।
[২৮] সূরা শামস: ৯-১০।
[২৯] সূরা আ'লা: ১৪।
[৩০] সুরা নিসা: ৪৯।
[৩১] সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/১৫৪; তারীখুল ইসলাম, ২২/৭২।
[৩২] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১০/১৯০; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৩/৩৩০; শাযারাতুয যাহাব, ২/১৮২; ত্ববাকাতুশ শা'রানী, ১/৬৬।
[৩৩] রুহুল মাআনী, ১৬/১৯।
[৩৪] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৮২; সূরা কলম, ৬৮: ৪৪; তাফসীরে ত্ববারী, ১৩/২৮৯; তাফসীরে কবীর, রাযী ২১/৮১; তালবীসে ইবলীস, পৃ. ২৮৫; তাফসীরে কুরত্ববী, ৭/৩২৯; লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফফারীনি ১/২৯৪; আত তাম্বীহাতিল লাতীফাহ, সা'দী, পৃ. ৯৭; নিবরাস, আবদুল আযীয পুরহারভী, পৃ. ৪৩০।
[৩৫] মুসনাদে আহমাদ ২৮/৫৪৭ হাঃ১৭৩১১; মু'জামুল আওসাত্ব, ত্ববারানী ৯/১১০; মু'জামুল কাবীর, ত্ববারানী ১৭/৩৩০- ইমাম ইরাকী এর সনদকে 'হাসান' বলেছেন (তাখরীজে এহইয়া ৪/১৬২); মিশকাতুল মাসাবীহঃ৫২০১।
[৩৬] শারহুল আক্বীদাতিত ত্বহাবীয়া ২/৭৬৯; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৩/২৫৩।
[৩৭] হিলইয়াতুল আওলিয়া ১০/৪০।
[৩৮] সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৫/২৩১।
[৩৯] আল মুয়াফাক্বাত ২/২৭৫-২৭৬।
[৪০] আত তারীফাত, জুরজানী ১/২৫৪; শরহুল মাক্বাসিদ ফী ইলমিল কালাম, তাফতাযানী ২/২০৩; লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফফারিনী ২/৩৯২; ইতমামুদ দিরায়া, সুয়ূত্বী পৃ.৭; শারহু ফিকহিল আকবার পৃ. ৮৯; তাফসীরে খাযেন ২/৪৫১।