📄 হতাশা ও বিমর্ষতার উৎপত্তি
যদি হতাশা, একাকিত্ব বা বিষণ্ণতা অনুভব করো, সুখ খুঁজে না পাও এবং হতাশা এসে বারবার আঘাত হানে, তাহলে সুদূর অতীতে ফিরে যাও। হয়তো দেখতে পাবে, অতীতে তোমার সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া আজকের ব্যর্থতার কারণ। বারবার সুখী হতে যেয়েও সুখ খুঁজে পাও না; তাই মানুষকে কষ্ট দেওয়া বা মানুষ থেকে আলাদা থাকাকে পছন্দ করছ।
এই অবস্থার সবচেয়ে উত্তম চিকিৎসা হচ্ছে, মনকে এ কথা বোঝানো যে, আমি তো কোনো উপেক্ষিত মানুষ নই। অন্যদের মতো আমার জীবনের একটি লক্ষ্য আছে। এই সমাজের আমাকে খুব প্রয়োজন। সমাজ যেমন অন্যদের মুখাপেক্ষী, তেমনই আমারও মুখাপেক্ষী এবং দিনদিন এই মুখাপেক্ষিতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখন মনের গভীরে এ কথাগুলো বেশি বেশি ভাবতে থাকবে, দেখবে ধীরে ধীরে সেখানে আনন্দের জোয়ার আসবে। অতঃপর এই আনন্দ তোমাকে ছাড়িয়ে অন্যদের মাঝেও বিরাজ করবে।
কানকে অবশ্যই মনের এমন কথা শোনা থেকে বিরত রাখবে যে, তুমি একজন ব্যর্থ মানুষ। তোমার অস্তিত্ব কারও কোনো কাজেই আসে না। সঙ্গীসাথিরা তোমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ, যোগ্য ও মেধাবী। সকলে তো তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে। এসব শোনা থেকে একেবারে বিরত থাকবে।
একজন বিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর মতে, পোলক্রেস্টের মতো জটিলতা সৌভাগ্যের সবচেয়ে বড় বাধা।
পোলক্রেস্ট ছিল একজন স্বৈরাচারী শাসক। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে তার শাসন ছিল। সাফল্য, সম্পদ, সম্মান, প্রতিপত্তি ও প্রতাপ কোনো কিছুতে তার কমতি ছিল না। কিন্তু সে সব সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় করত।... তার দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার সুযোগে শত্রুরা তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং তার সিংহাসন ভেঙে চুরমার করে দেয়।
এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, 'পোলক্রেস্টের মতো অনেক মানুষ আছে। এদের কাছে সুখের উপকরণ কোনোদিক থেকেই কম নেই। কিন্তু তবুও কখনো সুখ, শান্তি ও প্রশান্তির চেহারা দেখে না তারা। কারণ, তারা সব সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করে এবং তাদের কাছে যা কিছু আছে, তা হারিয়ে ফেলার ভয় করে। ফলে মনের মধ্যে কষ্ট অনুভব করে, নির্ঘুম রাত কাটায়, মাথাব্যথা ও বদহজম শুরু হয় তাদের। এভাবে আরও বহু রোগের সৃষ্টি হয়। তাই তারা কখনো সুখী হতে পারে না।'
📄 বিমর্ষতা থেকে মুক্তির উপায়
বিষণ্ণতা একট বিস্তৃত ব্যাধি। প্রতি ২৫ জনের মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত। কিছু কিছু পরিসংখ্যান সংস্থা তো বলে, 'প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত।'
(الاكتئاب) বা 'বিষণ্নতা' অর্থ হচ্ছে, দুঃখ, কষ্ট, একাকিত্ব, অসন্তুষ্টি এবং বিষাদগ্রস্ততা অনুভব করা।
মানুষ যখন জীবনে কোনো কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়, অথবা যখন তার মনে হয়, আমি তো অমুক ভুলের ওপর আছি, তখনই এ ধরনের মানসিকতা চেপে বসে। নিজেকে অসুখী ও হতাশ মনে হয়। প্রিয় কিছু হারালে মানুষ সবচেয়ে বেশি এই পরিস্থিতির শিকার হয়।
যখন তোমার মাঝে এসব মানসিকতা শক্তভাবে ভর করবে এবং দীর্ঘ সময় থাকবে, তখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডাক্তার তোমাকে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সর্বোত্তম কিছু কৌশল বলে দেবেন। কিছুক্ষণ কথা বললেই তোমার সমস্যা অনুধাবন করতে পারবেন তিনি।
বিষণ্ণ ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে খারাপ কাজ হচ্ছে, মানুষ ও সমাজ থেকে দূরে গিয়ে একাকী পড়ে থাকা। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের থেকে আলাদা হওয়া বা ঘরে একা পড়ে থাকা দুঃখ-দুশ্চিন্তা আরও বৃদ্ধি করে। তবে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হলো, এই সময়গুলোতে একাকী সময় না কাটিয়ে দেহ-মনকে কোনো ভালো কাজে ব্যস্ত রাখা।
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ এই সমস্যার শিকার। কেউ এর থেকে মুক্ত নয়।
(الاكتئاب) বা 'বিষণ্নতা'র আরেকটি প্রকার হচ্ছে, Clinical depression। এতক্ষণ যা আলোচনা করেছি, এটি তার বিপরীত। এই প্রকারের বিষণ্ণতা কোনো ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিপদের পর আসে না। বরং এটি একটি অসুস্থাবস্থা। যা জীবনে বারবার যেকোনো সময় আসতে পারে। কোনো প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেলে, ব্যর্থতার কারণে বা জীবনে কোনো কঠিন পরিস্থিতির শিকার হলে যা হয়, এটি তার বিপরীত।
তবে Clinical depression-এর সাথে পূর্বের আলোচিত বিষয়ের সাথে কিছুটা মিল থাকতে পারে। তবুও এটি আগেরটির চেয়েও অনেক শক্তিশালী ও কষ্টদায়ক।
Clinical depression-এ আক্রান্ত ব্যক্তি প্রচণ্ড দুঃখ ও তিক্ত কষ্ট অনুভব করে। যা তার জীবনের প্রতিটি অংশে প্রভাব ফেলে। আত্মমূল্যায়ন থেকে শুরু করে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যেও প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তি কোনো সুখের ঘটনা চিন্তাই করতে পারে না। ভবিষ্যৎ জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। নিজেকে সে খুবই মূল্যহীন মনে করে, কোনো স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে। তার জীবনের লক্ষ্যগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। হতাশা, নিরাশা আর ব্যর্থতা তাকে কাবু করে ফেলে।
এই রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী হয়তো জীবনে ঘটে যাওয়া এমন নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা খুঁজতে থাকে, যে ঘটনার কারণে আজ সে এমন বিষণ্ণতার শিকার। অনেকে আবার এমন ঘটনা খুঁজেও পায়। তবে বাস্তবতা হলো, বিষণ্ণ মানুষগুলো নিজেদের দোষী অনুভব করে। তাই যেকোনো ছোট-বড় কারণে নিজেরাই নিজেদের তিরস্কার করে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং মনে করে, তারা কোনো কাজ করতে বা সমাজকে কিছু দিতে সক্ষম নয়। এরই সাথে যোগ হয় ক্লান্তি, দুর্বলতা ও কঠিন অক্ষমতা। ফলে তারা নিজেদের শারীরিকভাবেও রোগাক্রান্ত ভাবে।
প্রতিদিন সকালে এসব ভাবনা মাথায় চেপে বসে। ফলে ঘুম আর খাওয়াদাওয়ার কোনো খবরই থাকে না। অনেকে কোনো খাবারেই স্বাদ পায় না।
অতীতে যেসব বিষয়ে খুব মজা পেত এবং মনভরে উপভোগ করত, সেগুলোতে অসুস্থ হওয়ার পর আর আগ্রহ জাগে না।
Clinical depression-এর কয়েকটি স্তর রয়েছে। কখনো কখনো এটি হালকা হয়। তেমন মারাত্মক আকার ধারণ করে না। এই অবস্থায় রোগী কিছুটা স্বাভাবিক ও ভালো জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। আবার অনেকেরটা কঠিন হয়ে যায়। যা খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থায় অনেকেই জীবনের প্রতি আগ্রহবোধ হারিয়ে ফেলে। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষকে জানতে হবে, বিষণ্ণতা একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ। এই রোগ চিকিৎসায় ভালো হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এমনকি কঠিন পরিস্থিতির দিকে গড়ালেও সঠিক ও উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসা গ্রহণের দ্বারা আরোগ্য পাওয়া যায়।
সুতরাং যখন কেউ এই রোগে আক্রান্ত হবে, অবশ্যই তাকে মনে রাখতে হবে, এই রোগের চিকিৎসা খুব কঠিন নয়। এমন বহু ধরনের ওষুধ আছে, যেগুলো উক্ত রোগকে লাঘব করতে সক্ষম। এই ওষুধগুলো মস্তিষ্কে ক্রিয়া করে এবং সমস্যার জায়গাগুলোতে পৌঁছে সমাধান করে।
অনেক সময় কঠিন শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে বিষণ্ণতা কিছুটা হালকা হয়। কঠিন শারীরিক পরিশ্রম মস্তিষ্ককে হালকা করে এবং মেজাজ কিছুটা ফুরফুরে করে।
অনেক সময় এই রোগের প্রভাব পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মাঝে এবং বন্ধুদের মাঝেও পড়ে। তাই তারা তোমাকে কিছুটা উদ্যমী হতে, তোমার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার আবেদন করবে এবং রোগের সমাধানের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলবে। তাই এ কথা স্পষ্ট যে, Clinical depression রোগটি শারীরিক রোগ। এর কারণে অনেক রোগের উৎপত্তি হয়। এটি মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক ব্যাধি থেকে সৃষ্ট। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো দোষ নেই। তাই পরিবারের সদস্যরা এবং আশপাশের বন্ধুব্ধব যেন তাকে তিরস্কার না করে। কেননা, রোগের ওপর তার কোনো কর্তৃত্ব নেই। তার কাছে পরিবর্তন করার মতো কোনো শক্তি নেই।
📄 মজবুত ঈমানের ভূমিকা
বিষণ্ণতার সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী ওষুধ হচ্ছে মজবুত ইমান। এর অনিষ্টতা থেকে বাঁচার সবচেয়ে সুন্দর রক্ষাকবচ এটি। জার্মানি মনোবিজ্ঞানী ড. ফ্রাঙ্ক লোবাখ বলেন, 'তোমার যতই একাকিত্বের অনুভূতি সৃষ্টি হোক, মনে রেখো, তুমি কখনোই একা নও। যখন একাকী রাস্তায় বা কোথাও হাঁটাচলা করতে থাকবে, তখন মনে রাখবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমার সাথে আছেন।'
এক পশ্চিমা সাহিত্যিক বলেছেন, 'বর্ষবরণের এক রাতে আমি দরজায় দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে বললাম, "আমাকে একটু আলো দাও। রাস্তার অন্ধকারে তোমার আলো দিয়ে পথ চলব।" সে বলল, "তোমার হাত আল্লাহর হাতে রাখো। তিনি তোমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেবেন।"
যে ব্যক্তি কুরআনে কারিমে আল্লাহর এই বাণী পাঠ করে, সে কীভাবে নিজেকে একাকী ভাবে?! তিনি বলেন:
وَلِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাবে, সেটা আল্লাহরই দিক। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ। '১৪৫
তিনি আরও বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, অতঃপর আরশের ওপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন, জমিনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আকাশ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন। '১৪৬
মুসা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন যে, তাঁর সাথে মহান আল্লাহ তাআলা রয়েছেন। তাই তো তিনি বনি ইসরাইলকে বলেছেন )كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ( 'কক্ষনো নয়; নিশ্চয় আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। শীঘ্রই তিনি আমাকে পথ-নির্দেশ করবেন। '১৪৭
রাসুল যখন হিজরতের সময় হেরাগুহায় আশ্রয় নিয়েছেন, তখন আবু বকর -কে বলেছেন, )لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا( 'বিষণ্ণ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। '১৪৮
টিকাঃ
১৪৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ১১৫。
১৪৬. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭:৪。
১৪৭. সুরা আশ-শুআরা, ২৬: ৬২。
১৪৮. সূরা আত-তাওবা, ৯: ৪০。