📄 যাদের তাৎক্ষণিক রাগ চলে আসে তাদের করণীয়
- তুচ্ছ বিষয়ের জন্য অনেক বেশি রেগে যেয়ো না এবং উত্তেজিত হোয়ো না। রাগের সময় কী করণীয়, তা জেনে আমল করবে এবং সব সময় রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে।
- রাগ পরিপূর্ণ স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ অন্য দিকে ফেরানোর চেষ্টা করবে।
- রাগের অবস্থাকে কোনো উপকারী কাজে ব্যয় করবে। যেমন: শারীরিক ব্যায়াম করা, ঘরের আসবাবপত্র গোছানো, জামাকাপড় সেলাই করা কিংবা যেকোনো কষ্টসাধ্য কাজ করা।
- দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ করবে। যখন কাউকে অপছন্দ করবে বা কারও প্রতি ক্রোধান্বিত হবে, তখন তার মাঝে এমন কোনো কারণ খুঁজে বের করবে, যা তোমাকে বিস্মিত এবং সন্তুষ্ট করতে পারবে। তাহলে তার প্রতি রাগ-ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ
'আর মানুষকে তাদের পণ্যে কম দিয়ো না।'১৩৮
- যদি কখনো নিজের মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখার পর নিজের প্রতিই রাগ চেপে বসে, তাহলে তোমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা, আল্লাহর দেওয়া দান-অনুদান ও সৌন্দর্য খুঁজে বের করো। যেগুলো তোমার কাছে তোমার মূল্য আরও বৃদ্ধি করবে। অতঃপর ত্রুটির অনুভূতি কেটে যাবে।
- রাগের সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে। বরং ক্রোধ প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অতঃপর ঠান্ডা মস্তিষ্কে পুনর্বিবেচনা করবে।
- যেসব কাজ করলে বা যেসব স্থানে গমন করলে রাগ আসে, সেগুলো থেকে দূরে থাকবে।
- কখনো রাগের কারণে কান্না এলে অশ্রু আটকে রেখো না। তবে কান্নায় অতিরঞ্জিতও কোরো না। এর ফলে অন্তরে প্রশান্তি আসবে এবং রাগ প্রশমিত হবে।
গড়িয়ে পড়া অশ্রুর সাথে হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত কষ্টগুলো উড়ে যাবে। কিন্তু অশ্রুগুলো ভেতরে রেখে দিলে নানা রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
- আল্লাহর প্রতি ইমান ও আস্থা বৃদ্ধি করো এবং মনকে বোঝাও-
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا - إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
'সুতরাং কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।'১৩৯
টিকাঃ
১৩৮. সুরা আল-আরাফ, ৭:৮৫।
১৩৯. সুরা আশ-শারহ, ৯৪ : ৫-৬।
📄 বৈবাহিক জীবনে কিছু যৌথ দায়িত্ব
এখানে কিছু দায়িত্বের কথা তুলে ধরব। যেগুলো স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্যই পালনীয়।
- সন্তানকে ইসলামি কালচারের ওপর লালনপালন করা স্বামী-স্ত্রী দুজনের যৌথ দায়িত্ব। বিশেষ করে ছোটবেলায় এই দায়িত্বের বড় একটি অংশ স্ত্রীর ওপর রয়ে যায়। তবে স্বামীকে অবশ্যই এ কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করতে হবে। অতঃপর যখন কিছুটা বড় হয়ে যাবে, তখন পরিপূর্ণভাবে সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তাবে।
- উভয়ে উভয়ের এবং সন্তানের আত্মসম্মানের প্রতি যত্নবান হতে হবে। তবে তা হতে হবে আল্লাহর বিধানকে আঁকড়ে ধরে। তিনি ইরশাদ করেন :
وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا
'...যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও জিকিরকারী নারী—তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।'১৪০
এ জন্যই স্বামীর অনুমতি ছাড়া কিছুতেই স্ত্রী কাউকে ঘরে প্রবেশ করাতে পারবে না। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কেউ তাদের বিছানায় বসতে পারবে না, তার অনুমতি ছাড়া কোনো পুরুষকে স্বাগত জানানো যাবে না—তবে যদি বিশেষ কোনো প্রয়োজনে স্বামী অনুমতি দেয়, তখন পরিপূর্ণ ইসলামি বিধান মেনে স্বাগত জানানো যাবে।
সহিহ বুখারিতে আছে, রাসুল ﷺ বলেছেন :
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ» فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الحَمْوَ؟ قَالَ: «الحَمْوُ المَوْتُ»
'তোমরা অবশ্যই (গাইরে মাহরাম) মহিলাদের কাছে (একাকী) প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকবে।' জনৈক আনসার বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, الحَمْرُ। (দেবর)-এর ব্যাপারে কী বলেন?' তিনি বললেন, الحَمْرُ (দেবর) হচ্ছে মৃত্যুতুল্য। ১৪১
স্বামীর নিকটাত্মীয়দের (ألحَمْوُ) বলে। যেমন: তার ভাই, ভাতিজা, চাচা ইত্যাদি। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর সাথে এদের ওঠাবসা ও চলাফেরা করাকে রাসুল মৃত্যুর সাথে তুলনা দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَم
'মাহরামের বিনা উপস্থিতিতে কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে সাক্ষাৎ করবে না। ১৪২
- স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই একে অপরের জন্য সাজ-সৌন্দর্য গ্রহণ করতে হবে। ইবনে আব্বাস বলেন, 'যেমনিভাবে আমার জন্য আমার স্ত্রী সজ্জিত হয়ে থাকাকে আমি পছন্দ করি, তেমনই তার জন্যও আমি নিজেকে সজ্জিত রাখাকে পছন্দ করি।'
- যদি স্ত্রীর দায়িত্ব হয়, তার কাছে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত দ্বারা স্বামীকে খুশি করা, তাহলে স্বামীরও দায়িত্ব হলো, স্ত্রীকে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত দ্বারা শান্তি দেওয়া। কেউ যেন কাউকে কষ্ট না দেয়।
- যদি আল্লাহর অবাধ্যতা ছাড়া অন্য সকল বিষয়ে স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্য করতে হয়, তাহলে স্বামীকেও শরিয়াহর সীমায় থেকে এবং পরিবারের জন্য উপকারী বিষয়ে স্ত্রীর কথা শুনতে হবে। কারণ, দুজনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো, দুজনের প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহকে সন্তুষ্ট রেখে পারিবারিক জীবনে সৌভাগ্য লাভ করা। যেন দুজনেরই লক্ষ্য, কর্মপন্থা ও চিন্তাচেতনা এক। তাদের দৃষ্টান্ত একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া-বিবাদ ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে তখন, যখন কেউ একজন আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে। অতএব এ ধরনের বিবাদ থেকে বাঁচতে হলে খুব দ্রুত প্রবৃত্তিপূজা ছেড়ে আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
- যদি স্বামী কাজেকর্মে আল্লাহকে ভয় করে, তাহলে সেটা হবে তার জন্য উত্তম ও হালাল রিজিক। যদি বিনোদন ও আনন্দের মুহূর্তে সুন্নাহর অনুসরণ করে, তবে তা হবে তার সৌভাগ্য। যা হৃদয়কে উন্মোচন করে।
- স্বামীর সম্পদ পাহারা দিয়ে রাখা স্ত্রীর কর্তব্য। কেননা, স্বামীর সম্পদের মধ্যে তার ও পুরো পরিবারের রিজিক রয়েছে। সম্পদ হিফাজত করা যেমন ফরজ, তেমনই অপচয় করাও হারাম। একইভাবে স্বামীর কর্তব্য হলো, স্ত্রীর সম্পদের হিফাজত করা। তা থেকে খরচ করতে হলে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজে এবং পরিবারের জন্য খরচ করতে হবে। কোনোভাবে তাদের থেকে উদাসীন হওয়া যাবে না। তাদের কোনো দায়িত্বে অবহেলা করা যাবে না।
- স্বামী যখন দুঃখিত বা বিষণ্ণ থাকবে, তখন তার সামনে স্ত্রী আনন্দ-উল্লাস করা থেকে বিরত থাকা এবং যখন হাসিখুশি বা আনন্দিত থাকবে, তখন তার সামনে বিষণ্ণ হয়ে না থাকা ভালো। একইভাবে স্বামীর জন্যও স্ত্রীর আনন্দের সময় বিষণ্ণ থাকা বা বিষণ্ণতার সময়ে আনন্দ প্রকাশ করা কোনোভাবেই উচিত নয়।
- স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই হিংসা ও বেশি বেশি নিন্দা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে স্বামীকে অবশ্যই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, সে আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে স্ত্রীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। .
- স্বামীর জন্য একজন স্ত্রীকে যেমনিভাবে স্ত্রী ও মায়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনিভাবে স্বামীকেও স্ত্রীর জন্য স্বামী এবং বাবার দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, একজন স্বামী তার স্ত্রীর ভবিষ্যৎ। তার চোখে সে-ই সবকিছু এবং পুরো পরিবারের পরিচালক।
- স্ত্রী যেভাবে স্বামীকে পরিবার পরিচালনায় এবং কাজেকর্মে আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে সতর্ক করিয়ে দেবে, তেমনিভাবে স্বামীও স্ত্রীকে আল্লাহর আনুগত্য ও পরিবারের দেখাশুনার ব্যাপারে তাঁর বিধিনিষেধের প্রতি তাগিদ দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'আপনি আপনার পরিবারের লোকদের নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিজিক চাই না। আমি আপনাকে রিজিক দিই এবং আল্লাহভীরুতার পরিণাম শুভ।'১৪৩
– দুজনকেই দুজনের একান্ত গোপন আলাপ অন্য কারও কাছে ফাঁস করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, এগুলো উভয়ের কাছে উভয়ের আমানত এবং তা প্রকাশ করে দেওয়া খিয়ানত। রাসুল ইরশাদ করেন :
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
'কিয়ামত দিবসে সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। '১৪৪
- স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই জানতে হবে, সব সময় সুখে থাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপাদান হলো, উত্তম সাহচর্য ও বন্ধুত্ব। অর্থাৎ উভয়ে কাছাকাছি থাকা এবং দুজন দুজনার কথাগুলো শেয়ার করা। অতঃপর প্রত্যেকে প্রত্যেকের আবেগ-অনুভূতি, রুচি, স্বাদ, স্বভাব ও মতামতের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। উন্নত চরিত্র গ্রহণ করতে হবে এবং একে অপরের জন্য প্রাণ-উৎসর্গ হতে হবে।
অংশীদারত্ব দুজনকে সবচেয়ে বেশি কাছে টেনে আনে; হোক তা সুখ-দুঃখের কথার অংশীদারত্ব বা খাবারদাবারের অংশীদারত্ব।
টিকাঃ
১৪০. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ : ৩৫।
১৪১. সহিহুল বুখারি: ৫২৩২।
১৪২. সহিহুল বুখারি: ৫২৩৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৪১।
১৪৩. সুরা তহা, ২০: ১৩২।
১৪৪. সহিহু মুসলিম: ১৪৩৭।