📄 স্ত্রী কীভাবে স্বামীকে খুশি করবে?
(হে বোন,) তোমার স্বামী ও সন্তানদের খুশি করা তোমার কর্তব্য। মনে রেখো, তোমার প্রতি স্বামীর সন্তুষ্টি তোমার জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। রাসুল ﷺ বলেছেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ، دَخَلَتِ الْجَنَّةَ
'কোনো মহিলা যদি এমতাবস্থায় মারা যায় যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ১২৪
– স্বামীর সাধ্যের বাইরে তার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়ো না। আল্লাহ তাআলা বলেন : )لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না।'১২৫ সুতরাং তোমার ইচ্ছা, আগ্রহ ও প্রয়োজনগুলো জমিয়ে রেখে একত্রে তার কাছে প্রকাশ কোরো না; যাতে স্বামীর কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয় এবং তোমার আশাগুলোও অপূরণীয় থেকে না যায়। যদি তুমি তোমার সবগুলো ইচ্ছা একত্রে পূরণ করার জন্য জিদ ধরো, তাহলে সে কোনোরূপ পরিতাপ ছাড়াই তোমাকে ও তোমার ইচ্ছাগুলো একত্রে প্রত্যাখ্যান করবে।
উমর বিন আব্দুল আজিজ-এর কথাটি স্মরণ রেখো! তিনি তার সন্তানকে বলেছেন, 'আমার ভয় হয়, না যেন আমি মানুষকে একযোগে হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে বলি এবং তারাও একযোগে হককে প্রত্যাখ্যান করে।'
তার মাঝে যেসব সিফাত ও গুণাবলি থাকাকে তুমি পছন্দ করো, সবগুলো একত্রে গ্রহণ করার জন্য তাকে চাপাচাপি কোরো না। একজন মানুষের মধ্যে সকল সিফাত একত্রিত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।
তোমার সৌন্দর্য, লাবণ্য, স্বাস্থ্যের সতেজতা, চলাফেরার কমনীয়তা, কথার মিষ্টতা ইত্যাদির প্রতি যত্নবান হও। কর্কশ স্বরে কথা বোলো না। অশ্লীল কথা বোলো না। এমন কথা বোলো না, যা সে অপছন্দ করে। কুরুচিপূর্ণ পদ্ধতিতে ঢেকুর তুলো না। যদি এসব নারীসুলভ গুণাবলি তোমার মাঝে না থাকে অথবা এগুলোকে অবহেলা করো, তাহলে স্বামীর কাছে তোমার সৌন্দর্যের পতন ঘটবে এবং একজন পুরুষ একজন নারীর মধ্যে যেসব চমৎকার গুণাবলি পেতে চায়, সেগুলো থেকে দূরে সরে যাবে।
রাসুল সৎ নারীর সিফাত বর্ণনা করে বলেন:
إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ
'আর যখন সে তার স্ত্রীর দিকে তাকায়, সে তাকে আনন্দিত করে। ১২৬
বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে দ্বীনের প্রতি যত্নবান হও। পরিপূর্ণ ইসলামি পর্দা মেনে চলো। কোনো চাকর, চালক বা অন্য কেউ তোমার অবহেলার কারণে যেন এক পলকের জন্যও শরীরের কোনো অংশ না দেখে। তোমার স্বামী চায় না, তোমাকে মাহরাম ছাড়া অন্য কেউ দেখুক।
এক ব্যক্তি এক মেয়েকে বিয়ে করার জন্য মোবাইলে কথা বলল। অতঃপর তার মধ্যে উদ্যম ও দ্বীনদারি দেখে সে খুবই অভিভূত হলো। তখন মেয়েটি তাকে বলল, (قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا) বলুন, "আল্লাহ আমাদের জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া আর কিছুই আমাদের আক্রান্ত করতে পারবে না।১২৭ সে তাকে বলল, 'সে সব সময় তাকে একটি উন্নত ও পবিত্র অবয়বে চিন্তা করে। যে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস লালন করে, তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, ইসলামের বিধিবিধান ভালোভাবে মেনে চলে এবং পবিত্র চিন্তা লালন করে।'
হে বোন, হয়তো তোমার স্বামীও তোমার ব্যাপারে এমন ধারণাই পোষণ করে। সুতরাং তার চিন্তায় আঁকা অবয়বকে ধ্বংস করে দিয়ো না।
সন্ধ্যায় স্বামী ঘরে ফেরার আগে সুসজ্জিত হয়ে থেকো। যাতে স্বামী এসেই তোমাকে খুব সুন্দর অবয়বে দেখতে পায়। পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় পোশাক পরিধান করো। তার পছন্দের পারফিউম ব্যবহার করো। তার দেওয়া কোনো উপহার শরীরে ঝুলিয়ে রাখো। কারণ, পুরুষ সব সময় তার দেওয়া গিফটগুলো ব্যবহার করতে দেখতে পছন্দ করে। কোনো বান্ধবী বা আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার সময় যেভাবে সাজগোছ করে বের হও, ঠিক সেভাবে সেজে থাকবে।
- স্বামীকে রেখে বাড়ির কাজে ব্যস্ত হয়ে থেকো না। যখন সে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে, তখন যেন তোমার রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও গোছগাছ করার কাজ না থাকে। সে এসে যেন তোমাকে রান্নাঘরে, জামাকাপড় ভাঁজ করতে বা অন্য কোনো কাজে না দেখে। বরং এগুলো সে যখন থাকবে না, তখন সেরে নিয়ো।
- ঘরকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখো। আসবাবপত্রের স্থানে মাঝে মাঝে পরিবর্তন আনো। তোমার হস্তশিল্প, পেইন্টিং ইত্যাদি ঘরে সাজিয়ে রেখো।
- বিয়ের আগে শিখায়িত আবেগ, উপচে পড়া ভালোবাসার অনুভূতি এবং যেসব দিবা স্বপ্নের মাঝে দিনাতিপাত করতে, সেগুলোর জন্য আফসোস কোরো না। বিয়ের পর সেগুলো প্রশমিত হয়ে যায় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ শান্তিময় অবস্থার সৃষ্টি হয়।
- যেসব চলাফেরার কারণে স্বামীর অনীহা বা রাগ চেপে বসে, সেগুলো পরিহার করো।
- বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি পুরুষ প্রথম প্রস্তাব দিয়ে থাকে, তাহলে বিবাহের ক্ষেত্রে সমতার দিকে লক্ষ রাখার দায়িত্ব তোমার। তুমি যতই জ্ঞান-বিজ্ঞান, বংশমর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারীই হও না কেন, বিয়ের পর তোমার জন্য কর্তব্য হলো, স্বামীর আনুগত্য স্বীকার করা, তার সাথে মতানৈক্য না করা এবং তার সাথে সুন্দরভাবে তোমার চিন্তাগুলো আদান-প্রদান করা। এতেই কল্যাণ রয়েছে।
- স্বামীর মনে এই অনুভূতি জাগ্রত করো যে, সে একটি আরামদায়ক ও শান্তশিষ্ট জান্নাতে বসবাস করছে। তাহলে সে শান্ত মেজাজে তোমার ও পরিবারের সবার জন্য কাজ করতে সক্ষম হবে। ফলে তোমাদের জীবন হয়ে উঠবে সুখময়।
তার সাথে উপকারী ও মিষ্টি কথা বলার চেষ্টা করো। তার সামনে উজ্জ্বল ও মুক্তা বিচ্ছুরণকারী প্রাণবন্ত হাসি দাও। এমনভাবে রসিকতা করো, যাতে সে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায়। উপভোগ্য ও প্রফুল্লতার হাসি ফুটাও মুখে। দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা, নিরর্থক ও বাজে কথা, বিষণ্ণতা ও মলিন মুখ এবং হতাশা ও অবসাদ থেকে দূরে থাকো।
স্বামীর জন্য তোমার সবটুকু দক্ষতা, যোগ্যতা, শ্রেষ্ঠত্ব ফুটিয়ে তোলো। স্বামীর কাছে নিজেকে সকল নারীর চেয়ে উত্তম হিসেবে প্রকাশ করো। তাহলে সে তোমাকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে, তোমাকে নিয়ে গর্ব করবে।
বান্ধবীদের সাথে মোবাইলে কথা বলে, ভালোবাসা আর প্রেমাবেগের উপন্যাস পড়ে এবং অপ্রয়োজনীয় ম্যাগাজিন পড়ে সময় নষ্ট কোরো না। যেগুলোতে শুধু নায়ক-নায়িকা ও গায়ক-গায়িকাদের অযথা খবরের ছড়াছড়ি। বর্তমানে এসব পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে বাজার সয়লাব। আমাদের নারীরাও এগুলোর পেছনে দিনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দেয়।
পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে যেগুলো তোমার জন্য উপকারী সেগুলো পড়ো। যেগুলো পড়লে জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে, অন্তরে প্রশান্তি আসবে এবং পরিবার ও সন্তানসন্ততি সামলানোর কৌশল শেখা যাবে, সেগুলো অধ্যয়ন করো।
টেলিভিশনের যেসব প্রোগ্রাম জ্ঞান-বিদ্যা, অভিজ্ঞতা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি শিক্ষা দেয়, সেগুলো দেখতে পারো। তবে বিভিন্ন ফিল্ম ও পারিবারিক সম্পর্ক বিনষ্টকারী সিরিয়াল দেখে সময় নষ্ট কোরো না।
স্বামীকে খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়ামে উদ্বুদ্ধ করো। সম্ভব হলে তুমিও তার সাথে ব্যায়াম করো। ছুটির দিনটিকে প্রাণবন্ত করতে তার সাথে হাঁটো এবং দুজনে মুক্ত বাতাস উপভোগ করো।
স্বামীকে বুঝাও, তার আবেগ-অনুভূতিতে, আনন্দ-প্রফুল্লতায়, ধ্বনি- প্রতিধ্বনিতে এবং অনুভবে-অনুরাগে শুধুই তুমি বিরাজ করছ।
পারিবারিক সমস্যাগুলোর মধ্যে যেগুলোর সমাধান করতে পারবে না, সেগুলো তার কাছে বলার জন্য এবং সমাধানের জন্য সকালে কাজে বের হওয়ার আগেই উপযুক্ত সময় বেছে নেবে। সন্ধ্যায় যখন সে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহ আর মলিন চেহারা নিয়ে ঘরে ফিরবে, তখন কোনো সমস্যার কথা না বলাই ভালো। বরং রাতের অন্য কোনো সময়ে যাবতীয় সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করলেই বেশি সুন্দর হবে। সন্তানদের সামনে তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বোলো না। তাদেরকে লালন পালনের কষ্ট যেন তারা বুঝতে না পারে। তাদের মনে যেন এমন ধারণা না আসে যে, তারা তোমাদের দুজনের জন্য অনেক ভারী বোঝা এবং তোমাদের মাঝে মতবিরোধ ও অনেক দ্বন্দ্বের কারণ তারা।
ঘরে প্রবেশের সাথে সাথে তড়িঘড়ি করে তুচ্ছ ও সাধারণ বিষয়ের অভিযোগ করা থেকে বিরত থেকো। যেমন: বাচ্চাদের চিল্লাপাল্লার অভিযোগ করা এবং বাবাকে তাদের সামনে পুলিশ বা বিচারক বানিয়ে তাদের মধ্যে যে অপরাধী তাকে শাস্তি দেওয়া ইত্যাদি। অবশ্যই এসব এড়িয়ে চলতে হবে।
সন্তানের সামনে স্বামীর চলাফেরার খুঁত খুঁজতে যেয়ো না। তাদের সামনে এমন কোনো শব্দে তাকে সম্বোধন কোরো না, যা অপ্রীতিকর এবং অনুপযুক্ত। কারণ, সন্তানও বাবা-মার আড়ালে এসব বলার চেষ্টা করতে পারে।
পড়ালেখার সময় বাচ্চারা অলসতা দেখালে কিছু কিছু মা তাদের বলে, 'তুই জীবনে কখনো সফল হতে পারবি না। কারণ, তুই তোর বাবার মতো অলস' ইত্যাদি। আবার কখনো যদি স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে, তার প্রতি খুবই কম গুরুত্ব দেয়। স্বামী তাকে কোনো গল্প শোনাতে গেলে 'উহ! এটা আগে শুনেছি' বলে কেটে পড়ে। এমন আরও বহু আচরণ করে, যেগুলো স্বামীর মনের মধ্যে অস্থিরতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এগুলো থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
গায়রত এবং তিরস্কারের ক্ষেত্রে কখনো বাড়াবাড়ি কোরো না। আব্দুল্লাহ বিন আবু তালিব তার ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বলেন, 'অবশ্যই গায়রত থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, এটি তালাকের চাবি। অবশ্যই অধিক তিরস্কার থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এর কারণে বিদ্বেষ তৈরি হয়।'
- বাবা-মায়ের প্রতি স্বামীর ভালোবাসার মধ্যে তোমার ঈর্ষা করা চলবে না। স্বামী তার বাবা-মাকে ভালোবাসবেই। কীভাবে আমরা একজন মুসলিম রমণীর কাছ থেকে এমন আচরণ সহ্য করতে পারি? এই ভালোবাসা তো সৃষ্টিগত। আল্লাহ তাআলা সকল মুসলিমের ওপর তা আবশ্যক করে দিয়েছেন। কাছে বা দূরে যেখানেই থাকুক না কেন, এই ভালোবাসা থাকবেই। কীভাবে আমরা একজন মুসলিম নারীর কাছ থেকে এমন ব্যবহার মেনে নেবো যে, সে তার স্বামীর সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা দিয়ে সম্পর্ক শুরু করবে?! একজন মুসলিম নারী কখনো স্বামীকে এমন কাজ করতে বাধ্য করতে পারে না যে, তুমি তোমার বাবা-মায়ের অবাধ্যতা করো, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো!
রাসুল মুসলিমদের চরিত্র ও অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
وَأَطَاعَ الرَّجُلُ زَوْجَتَهُ، وَعَقَ أُمَّهُ، وَبَرَّ صَدِيقَهُ، وَجَفَا أَبَاهُ
'(এমন সময় আসবে যে, তখন) পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে এবং তার মায়ের অবাধ্যতা করবে, বন্ধুদের সাথে ভালো ব্যবহার দেখাবে; কিন্তু বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে। ১২৮
ঘরের সমস্যার কথা তোমার বাবা-মায়ের কাছে জানাবে না। এতে তোমার স্বামীর প্রতি তাদের হৃদয়ে বক্রতা ও শত্রুতা সৃষ্টি হবে। বরং দুজনে বসে সহমর্মিতার সাথে সমাধান করে নেবে।
স্বামীর চেয়েও তুমি অধিক ধনবান, বংশমর্যাদা ও শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে থাকলেও তার ওপর বড়াই কোরো না। তাকে ছোট করে দেখা, অবমূল্যায়ন করা এবং তার ওপর বড়াই করা জায়িজ নয়। রাসুল ইরশাদ করেন:
لا يَنْظُرُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى امْرَأَةٍ لَا تَشْكُرُ لِزَوْجِهَا وَهِيَ لَا تَسْتَغْنِي عَنْهُ
'আল্লাহ তাআলা এমন নারীর দিকে তাকান না, যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে না; অথচ সে তার থেকে অমুখাপেক্ষী নয়। '১২৯
স্বামীকে শারীরিক মেলামেশা করতে বাধা প্রদান কোরো না। রাসুল বলেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ، فَلَمْ تَأْتِهِ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
'যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার বিছানায় ডাকা সত্ত্বেও সে না আসে এবং সে স্ত্রীর ওপর রাগান্বিত হয়ে রাত্রিযাপন করে, তাহলে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা এমন স্ত্রীর ওপর অভিশাপ দিতে থাকে। '১৩০
মনে রেখো, স্ত্রীর ওপর স্বামীর সর্বপ্রথম হক হচ্ছে আনুগত্য। রাসুল বলেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
'যদি আমি কাউকে (আল্লাহ ছাড়া) কারও প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। '১৩১
এমনকি রাসুল পর্যন্ত স্বামীর আনুগত্যকে জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন। এক মহিলা রাসুল-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার কাছে সকল নারীদের পক্ষ থেকে দূত হয়ে এসেছি। আল্লাহ তাআলা পুরুষদের জন্য জিহাদ ফরজ করেছেন। যদি তারা ময়দানে আক্রান্ত হয়, তাহলে প্রতিদান পায় আর শহিদ হলে আল্লাহর কাছে জীবিত থেকে রিজিকপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু আমরা নারীরা তো তাদের অধীনস্ত। আমাদের কী করণীয়?' অতঃপর রাসুল বলেন:
أَبْلِغِي مَنْ لَقِيتِ مِنَ النِّسَاءِ أَنَّ طَاعَةَ الزَّوْجِ وَاعْتِرَافًا بِحَقِّهِ يَعْدِلُ ذَلِكَ وَقَلِيلٌ مِنْكُنَّ مَنْ يَفْعَلُهُ
'তোমার সাথে যেই নারীর সাথেই সাক্ষাৎ হবে, তাকে বলে দেবে : মহিলারা স্বামীর আনুগত্য করা ও তার হকের স্বীকারোক্তি দেওয়া জিহাদের সমতুল্য। আর তোমাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই তা করে। ১৩২
তোমার ওপর স্বামীর অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না। রাসুল -এর ভাষ্যমতে মহিলারা স্বামীর অনুগ্রহের কথা ভুলে যাওয়া জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শুধু তা-ই নয়, তিনি এমন আচরণকে কুফুরি বলে অভিহিত করেছেন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন:
أُرِيتُ النَّارَ فَإِذَا أَكْثَرُ أَهْلِهَا النِّسَاءُ، يَكْفُرْنَ» قِيلَ: أَيَكْفُرْنَ بِاللَّهِ؟ قَالَ: يَكْفُرْنَ العَشِيرَ، وَيَكْفُرْنَ الإِحْسَانَ، لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَى إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ، ثُمَّ رَأَتْ مِنْكَ شَيْئًا، قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ مِنْكَ خَيْرًا قَطُّ
'আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়েছে। সেখানে দেখলাম, জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী নারী। তারা অস্বীকার করে।' বলা হলো, 'তারা কি আল্লাহকে অস্বীকার করে?' রাসুল বললেন, 'তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং ইহসান অস্বীকার করে। তুমি যদি তাদের কারও প্রতি যুগ যুগ ধরে ইহসান করে থাকো, অতঃপর সে তোমার কাছ থেকে সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, "আমি তো কখনো তোমার কাছ থেকে ভালো কিছু দেখিইনি।"’১৩৩
- স্বামীর সম্পদের হিফাজত করবে। অনুমতি ছাড়া এবং তার সন্তুষ্টির ব্যাপারে পরিপূর্ণ আস্থা অর্জন না করে তার কোনো সম্পদ ব্যবহার করবে না। রাসুল বলেছেন:
لَا تُنْفِقُ امْرَأَةُ شَيْئًا مِنْ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَا الطَّعَامُ؟ قَالَ: ذَاكَ أَفْضَلُ أَمْوَالِنَا
'কোনো মহিলা যেন স্বামীর অনুমতি না নিয়ে তার ঘর থেকে কিছু দান না করে।' বলা হলো, 'হে আল্লাহর রাসুল, খাবারও কি নয়?' তিনি বললেন, 'সেটা তো আমাদের উত্তম সম্পদ। ১৩৪
স্বামী যদি অসচ্ছল হয়, তাহলে তোমার সম্পদ থেকে তাকে কিছু দান করো। আর তোমারও যদি কোনো সম্পদ না থাকে, তাহলে তার সাথে কষ্ট করে ধৈর্যধারণ করো। হয়তো আল্লাহ তাআলা কষ্ট লাঘবের কোনো ব্যবস্থা করে দেবেন।
– স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রেখো না। রাসুল বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ، وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ،
'স্বামীর উপস্থিতিতে কোনো মহিলার জন্য তার অনুমতি ছাড়া (নফল) রোজা রাখা বৈধ নয় এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেবে না।'১৩৫
– আত্মীয়স্বজনের সাথে তোমার সম্পর্কে এবং তোমার পরিবারের লোকজনকে দেখতে যাওয়ায় যাতে কোনো সীমালঙ্ঘন না হয়।
- স্বামীকে তার পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে বাধা দিয়ো না। বরং তাকে এই কাজে উৎসাহ দেবে।
– যদি তুমি চাকুরিজীবী মা হয়ে থাকো, তাহলে কখনো ভেবো না, স্বামীর শুধু অর্থই প্রয়োজন। যদি এমনটা ভাবো, তবে তোমার মধ্যে মাতৃসুলভ আচরণের মাঝে ত্রুটি দেখা দেবে। তবে মনে রেখো, সন্তানের জন্য কখনো বাজারে বিক্রিত দুধ আর মায়ের প্রাকৃতিক দুধ, সেবিকার রান্না করা খাবার আর পরিচ্ছন্ন স্ত্রীর রান্না করা খাবার এবং অজ্ঞ চাকরানির লালনপালন আর আল্লাহভীরু মায়ের লালনপালন সমান হতে পারে না।
- কখনো স্বামীর কর্মের প্রতি বিরক্ত হবে না। কিছু মহিলা এমনটি করে থাকে। এভাবে স্বামীর কাজের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করা খুবই নিকৃষ্ট আচরণ। একেক সময় একেকভাবে বিরক্তি প্রকাশ করে। কখনো বদমেজাজ দেখিয়ে। কেউ কেউ স্বামীর কাজের প্রতি সব সময় অভিযোগের আঙুল তুলে বিরক্তি প্রকাশ করে। কিংবা তার প্রতি স্বামীর গুরুত্বহীনতার অপবাদ দিয়ে অথবা রাগান্বিত হয়ে বাবার বাড়িতে চলে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করে।
- মনে রেখো, যে ঘর হরেক রকম গোশত, মাছ ও সুস্বাদু খাবারে পরিপূর্ণ— অথচ সেখানে সারাক্ষণ ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে—সেই ঘরের চেয়েও যে ঘরে খাবার হিসেবে সামান্য কয়েক টুকরো রুটি আছে—তবে সেখানে ভালোবাসা, শান্তি, অন্তরঙ্গতা, সম্মানবোধ এবং পারস্পরিক মূলবোধে পরিপূর্ণ—তা অধিক উত্তম।
- যে স্বামী বিয়ের আগ পর্যন্ত দেখে এসেছে, প্রতিদিন সকালে মা সবার আগে ঘুম থেকে উঠে ঘরের সবাইকে জাগিয়ে দেয়, অতঃপর সকালের নাস্তা প্রস্তুত করে এবং ছোটদের স্কুলে যাওয়ার জন্য জামাকাপড় পরিয়ে প্রস্তুত করে দেয়, সেই স্বামী কখনো এমন স্ত্রী দেখে সন্তুষ্ট হবে না, যে সূর্য মাঝ আকাশে উঠে গেলে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়।
টিকাঃ
১২৪. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৮৫৪, সুনানুত তিরমিজি: ১১৬১।
১২৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৮৬।
১২৬. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৬৪।
১২৭. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ৫১।
১২৮. সুনানুত তিরমিজি: ২২১০।
১২৯. মুসনাদুল বাজ্জার: ২৩৪৯, মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৭৭১।
১৩০. সহিহুল বুখারি: ৩২৩৭, সহিহু মুসলিম: ১৪৩৬।
১৩১. সুনানুত তিরমিজি: ১১৫৯।
১৩২. মুসনাদুল বাজ্জার: ৫২০৯।
১৩৩. সহিহুল বুখারি: ২৯।
১৩৪. সুনানুত তিরমিজি: ৬৭০।
১৩৫. সহিহুল বুখারি: ৫১৯৫।
📄 স্বামী বদমেজাজি হলে করণীয়
- যদি স্বামী গরম প্রকৃতির, রাগী বা বদমেজাজি হয়, তাহলে তোমাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। তার গরম মেজাজের এবং রেগে যাওয়ার কারণ অন্বেষণ করো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশেষ ও কঠিন পরিস্থিতির কারণে এমনটা সৃষ্টি হয়। অথবা এমনটা হয়ে থাকে ছোটবেলায় খুব বেশি কষ্ট ও অশান্তিকর পরিবেশে জীবনযাপনের কারণে। তাই তোমাকে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। তার প্রতি তোমার ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য দেখাতে হবে। এ ধরনের পুরুষরা ছোটবেলাতেই মায়ামমতা ও প্রেমাবেগ হারিয়ে ফেলে।
স্বামীর মূল্য অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। মনে রেখো, সে তোমার জীবনের আলো। তবে তোমার নিজের ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য ভুলে গেলে চলবে না।
তার বদমেজাজ দেখে তুমি কখনো উত্তেজিত হয়ে যেয়ো না। সে যখন চেঁচামেচি করবে, তুমিও তার সাথে চেঁচামেচি করবে না। অবশ্যই মনে রাখবে যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো সম্মান ও ভালোবাসার।
মানুষের সামনে সে ভুল করলে তুমি তাকে ভুল বুঝো না। আবার তাকে ভুলের জন্য উৎসাহ কিন্তু দেওয়া যাবে না। বরং চুপ থাকার চেষ্টা করবে।
স্বামীর ছোটখাটো ভুলের কারণে হৃদয়ের মণিকোঠায় তার মান ক্ষুণ্ণ কোরো না। তাকে ছোট করে দেখো না।
উপযুক্ত সময় পেলে স্বামীর সাথে তার দোষ-ত্রুটি নিয়ে পর্যালোচনা করবে। তবে তার অনুভূতিতে আঘাত দিয়ো না। যখন তার কোনো দোষ ধরিয়ে দিতে চাইবে, তখন এভাবে কথা শুরু করতে পারো যে, 'আপনি যা করেছেন, তা ঠিক আছে—তবে এমন হলেও সুন্দর হতো।'... ইত্যাদি।
স্বামীর ত্রুটিগুলো প্রকাশ করার সময় তার প্রতি তোমার একনিষ্ঠতা, মেধা, বুদ্ধি ও ভালোবাসাকে কাজে লাগাবে এবং তাকে এক এক করে ধীরে ধীরে ত্রুটিগুলো থেকে মুক্ত হয়ে ভালো অভ্যাস গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দেবে।
স্বামীর এলোমেলো চলাফেরা ও অস্থিরতা দেখে তার প্রতি দুঃখ বা তিরস্কার ভাব প্রকাশ কোরো না। তোমার তিরস্কার তার কোনো উপকার করবে না। বরং এতে করে উদ্ভট চলাফেরার প্রবণতা ও বদমেজাজ আরও বৃদ্ধি পাবে।
তার আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বৃদ্ধি করার চেষ্টা করবে। তাকে তার শ্রেষ্ঠত্ব, তোমার বা পরিবারের জন্য তার অবদান এবং পরোপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। তাহলে আশা করা যায় তার বদমেজাজ কিছুটা কমবে এবং সুবুদ্ধির উদয় হবে।
সুন্দর জীবনযাপন ও আশাবাদী হওয়ার ক্ষেত্রে স্বামী ও সন্তানদের কাছে নিজেকে তুমি একটি আদর্শ হিসেবে ফুটিয়ে তোলো।
- যখন তার সাথে ঝগড়া বাধবে, বা সে তোমার ওপর রেগে যাবে, তখন দেরি না করে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে।
আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, (أَلَا أُخْبِرُكُمْ) بِنسَائِكُمْ في الجنة؟ 'আমি কি তোমাদের জান্নাতি নারীদের খবর দেবো না?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, বলুন।' তিনি বললেন:
كُل وَدُودٍ وَلُودٍ إِذَا غَضِبَتْ أَوْ أُسِيءَ إِلَيْهَا قَالَتْ : هَذِهِ يَدِي فِي يَدِكَ, لَا أَكْتَحِلُ بِغَمْضٍ حَتَّى تَرْضَى
'প্রত্যেক অতি সোহাগিনী অধিক সন্তান প্রসবকারিণী রমণী, যখন সে রাগ করে বা তার প্রতি তার স্বামী মনঃক্ষুণ্ণ হয়, তখন সে বলে, “এই আমার হাত আপনার হাতে; আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি নিদ্রা যাব না।" ১৩৬
রাসুল ﷺ আরও বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، أَنْ تَأْذَنَ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَهُوَ كَارِهُ، وَلَا تَخْرُجَ وَهُوَ كَارِهُ، وَلَا تُطِيعَ فِيهِ أَحَدًا، وَلَا تَخْشَنَ بِصَدْرِهِ، وَلَا تَعْتَزِلَ فِرَاشَهُ، وَلَا تَضْرِبَهُ، فَإِنْ كَانَ هُوَ أَظْلَمَ، فَلْتَأْتِهِ حَتَّى تُرْضِيَهُ، فَإِنْ كَانَ هُوَ قَبِلَ، فَبِهَا وَنِعْمَتْ، وَقَبِلَ اللَّهُ عُذْرَهَا، وَأَفْلَحَ حُجَّتَهَا، وَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ، وَإِنْ هُوَ أَبِي بِرِضَاهَا عَنْهَا، فَقَدْ أَبْلَغَتْ عِنْدَ اللَّهِ عُذْرَهَا
'আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এমন নারীর জন্য বৈধ নয় যে, তার স্বামীর অপছন্দ অবস্থায় কাউকে তার বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দেবে এবং তার স্বামীর অপছন্দ অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হবে; আর সে সেখানে অন্য লোকের আনুগত্য করবে না; স্বামীর বক্ষকে ক্রোধ দ্বারা ভরবে না, তার বিছানা থেকে পৃথক হবে না এবং সে স্বামীকে আঘাত করবে না-যদিও নাকি স্বামী স্ত্রী থেকে বেশি অত্যাচারী হয়—তবুও স্ত্রী স্বামীর কাছে আসবে, এমনকি তাকে সন্তুষ্ট করে তুলবে; আর যদি স্বামী স্ত্রীর ওজর কবুল করে, তবে তা-ই হবে এবং তা উত্তম হবে; আর আল্লাহও তার ওজর কবুল করবেন এবং তিনি তার (ওই স্ত্রীর ওজরের) দলিল প্রকাশ করবেন। এতে তার কোনো গুনাহ হবে না। আর যদি তার স্বামী তার থেকে সন্তুষ্ট হতে অস্বীকার করে, তবে সে (স্ত্রী) তো তার ওজর আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিয়েছে।'১৩৭
যদি কেউ কাউকে কোনো কাজের জন্য ভর্ৎসনা করতেই হয়, তাহলে মেজাজ স্বাভাবিক হওয়ার পর ভর্ৎসনা করা যেতে পারে। তবে তা হতে হবে আনন্দ, প্রফুল্লতা ও হাসিখুশির সাথে এবং উপযুক্ত সময়ে। কোনোরূপ হিংসা-বিদ্বেষ বা তিক্ততা দেখানো যাবে না।
টিকাঃ
১৩৬. আল-মুজামুল আওসাত: ১৭৪৩।
১৩৭. মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৭৭০।
📄 যাদের তাৎক্ষণিক রাগ চলে আসে তাদের করণীয়
- তুচ্ছ বিষয়ের জন্য অনেক বেশি রেগে যেয়ো না এবং উত্তেজিত হোয়ো না। রাগের সময় কী করণীয়, তা জেনে আমল করবে এবং সব সময় রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে।
- রাগ পরিপূর্ণ স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ অন্য দিকে ফেরানোর চেষ্টা করবে।
- রাগের অবস্থাকে কোনো উপকারী কাজে ব্যয় করবে। যেমন: শারীরিক ব্যায়াম করা, ঘরের আসবাবপত্র গোছানো, জামাকাপড় সেলাই করা কিংবা যেকোনো কষ্টসাধ্য কাজ করা।
- দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ করবে। যখন কাউকে অপছন্দ করবে বা কারও প্রতি ক্রোধান্বিত হবে, তখন তার মাঝে এমন কোনো কারণ খুঁজে বের করবে, যা তোমাকে বিস্মিত এবং সন্তুষ্ট করতে পারবে। তাহলে তার প্রতি রাগ-ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ
'আর মানুষকে তাদের পণ্যে কম দিয়ো না।'১৩৮
- যদি কখনো নিজের মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখার পর নিজের প্রতিই রাগ চেপে বসে, তাহলে তোমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা, আল্লাহর দেওয়া দান-অনুদান ও সৌন্দর্য খুঁজে বের করো। যেগুলো তোমার কাছে তোমার মূল্য আরও বৃদ্ধি করবে। অতঃপর ত্রুটির অনুভূতি কেটে যাবে।
- রাগের সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে। বরং ক্রোধ প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অতঃপর ঠান্ডা মস্তিষ্কে পুনর্বিবেচনা করবে।
- যেসব কাজ করলে বা যেসব স্থানে গমন করলে রাগ আসে, সেগুলো থেকে দূরে থাকবে।
- কখনো রাগের কারণে কান্না এলে অশ্রু আটকে রেখো না। তবে কান্নায় অতিরঞ্জিতও কোরো না। এর ফলে অন্তরে প্রশান্তি আসবে এবং রাগ প্রশমিত হবে।
গড়িয়ে পড়া অশ্রুর সাথে হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত কষ্টগুলো উড়ে যাবে। কিন্তু অশ্রুগুলো ভেতরে রেখে দিলে নানা রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
- আল্লাহর প্রতি ইমান ও আস্থা বৃদ্ধি করো এবং মনকে বোঝাও-
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا - إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
'সুতরাং কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।'১৩৯
টিকাঃ
১৩৮. সুরা আল-আরাফ, ৭:৮৫।
১৩৯. সুরা আশ-শারহ, ৯৪ : ৫-৬।
📄 বৈবাহিক জীবনে কিছু যৌথ দায়িত্ব
এখানে কিছু দায়িত্বের কথা তুলে ধরব। যেগুলো স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্যই পালনীয়।
- সন্তানকে ইসলামি কালচারের ওপর লালনপালন করা স্বামী-স্ত্রী দুজনের যৌথ দায়িত্ব। বিশেষ করে ছোটবেলায় এই দায়িত্বের বড় একটি অংশ স্ত্রীর ওপর রয়ে যায়। তবে স্বামীকে অবশ্যই এ কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করতে হবে। অতঃপর যখন কিছুটা বড় হয়ে যাবে, তখন পরিপূর্ণভাবে সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তাবে।
- উভয়ে উভয়ের এবং সন্তানের আত্মসম্মানের প্রতি যত্নবান হতে হবে। তবে তা হতে হবে আল্লাহর বিধানকে আঁকড়ে ধরে। তিনি ইরশাদ করেন :
وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا
'...যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও জিকিরকারী নারী—তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।'১৪০
এ জন্যই স্বামীর অনুমতি ছাড়া কিছুতেই স্ত্রী কাউকে ঘরে প্রবেশ করাতে পারবে না। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কেউ তাদের বিছানায় বসতে পারবে না, তার অনুমতি ছাড়া কোনো পুরুষকে স্বাগত জানানো যাবে না—তবে যদি বিশেষ কোনো প্রয়োজনে স্বামী অনুমতি দেয়, তখন পরিপূর্ণ ইসলামি বিধান মেনে স্বাগত জানানো যাবে।
সহিহ বুখারিতে আছে, রাসুল ﷺ বলেছেন :
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ» فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الحَمْوَ؟ قَالَ: «الحَمْوُ المَوْتُ»
'তোমরা অবশ্যই (গাইরে মাহরাম) মহিলাদের কাছে (একাকী) প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকবে।' জনৈক আনসার বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, الحَمْرُ। (দেবর)-এর ব্যাপারে কী বলেন?' তিনি বললেন, الحَمْرُ (দেবর) হচ্ছে মৃত্যুতুল্য। ১৪১
স্বামীর নিকটাত্মীয়দের (ألحَمْوُ) বলে। যেমন: তার ভাই, ভাতিজা, চাচা ইত্যাদি। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর সাথে এদের ওঠাবসা ও চলাফেরা করাকে রাসুল মৃত্যুর সাথে তুলনা দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَم
'মাহরামের বিনা উপস্থিতিতে কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে সাক্ষাৎ করবে না। ১৪২
- স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই একে অপরের জন্য সাজ-সৌন্দর্য গ্রহণ করতে হবে। ইবনে আব্বাস বলেন, 'যেমনিভাবে আমার জন্য আমার স্ত্রী সজ্জিত হয়ে থাকাকে আমি পছন্দ করি, তেমনই তার জন্যও আমি নিজেকে সজ্জিত রাখাকে পছন্দ করি।'
- যদি স্ত্রীর দায়িত্ব হয়, তার কাছে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত দ্বারা স্বামীকে খুশি করা, তাহলে স্বামীরও দায়িত্ব হলো, স্ত্রীকে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত দ্বারা শান্তি দেওয়া। কেউ যেন কাউকে কষ্ট না দেয়।
- যদি আল্লাহর অবাধ্যতা ছাড়া অন্য সকল বিষয়ে স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্য করতে হয়, তাহলে স্বামীকেও শরিয়াহর সীমায় থেকে এবং পরিবারের জন্য উপকারী বিষয়ে স্ত্রীর কথা শুনতে হবে। কারণ, দুজনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো, দুজনের প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহকে সন্তুষ্ট রেখে পারিবারিক জীবনে সৌভাগ্য লাভ করা। যেন দুজনেরই লক্ষ্য, কর্মপন্থা ও চিন্তাচেতনা এক। তাদের দৃষ্টান্ত একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া-বিবাদ ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে তখন, যখন কেউ একজন আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে। অতএব এ ধরনের বিবাদ থেকে বাঁচতে হলে খুব দ্রুত প্রবৃত্তিপূজা ছেড়ে আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
- যদি স্বামী কাজেকর্মে আল্লাহকে ভয় করে, তাহলে সেটা হবে তার জন্য উত্তম ও হালাল রিজিক। যদি বিনোদন ও আনন্দের মুহূর্তে সুন্নাহর অনুসরণ করে, তবে তা হবে তার সৌভাগ্য। যা হৃদয়কে উন্মোচন করে।
- স্বামীর সম্পদ পাহারা দিয়ে রাখা স্ত্রীর কর্তব্য। কেননা, স্বামীর সম্পদের মধ্যে তার ও পুরো পরিবারের রিজিক রয়েছে। সম্পদ হিফাজত করা যেমন ফরজ, তেমনই অপচয় করাও হারাম। একইভাবে স্বামীর কর্তব্য হলো, স্ত্রীর সম্পদের হিফাজত করা। তা থেকে খরচ করতে হলে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজে এবং পরিবারের জন্য খরচ করতে হবে। কোনোভাবে তাদের থেকে উদাসীন হওয়া যাবে না। তাদের কোনো দায়িত্বে অবহেলা করা যাবে না।
- স্বামী যখন দুঃখিত বা বিষণ্ণ থাকবে, তখন তার সামনে স্ত্রী আনন্দ-উল্লাস করা থেকে বিরত থাকা এবং যখন হাসিখুশি বা আনন্দিত থাকবে, তখন তার সামনে বিষণ্ণ হয়ে না থাকা ভালো। একইভাবে স্বামীর জন্যও স্ত্রীর আনন্দের সময় বিষণ্ণ থাকা বা বিষণ্ণতার সময়ে আনন্দ প্রকাশ করা কোনোভাবেই উচিত নয়।
- স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই হিংসা ও বেশি বেশি নিন্দা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে স্বামীকে অবশ্যই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, সে আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে স্ত্রীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। .
- স্বামীর জন্য একজন স্ত্রীকে যেমনিভাবে স্ত্রী ও মায়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনিভাবে স্বামীকেও স্ত্রীর জন্য স্বামী এবং বাবার দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, একজন স্বামী তার স্ত্রীর ভবিষ্যৎ। তার চোখে সে-ই সবকিছু এবং পুরো পরিবারের পরিচালক।
- স্ত্রী যেভাবে স্বামীকে পরিবার পরিচালনায় এবং কাজেকর্মে আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে সতর্ক করিয়ে দেবে, তেমনিভাবে স্বামীও স্ত্রীকে আল্লাহর আনুগত্য ও পরিবারের দেখাশুনার ব্যাপারে তাঁর বিধিনিষেধের প্রতি তাগিদ দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'আপনি আপনার পরিবারের লোকদের নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিজিক চাই না। আমি আপনাকে রিজিক দিই এবং আল্লাহভীরুতার পরিণাম শুভ।'১৪৩
– দুজনকেই দুজনের একান্ত গোপন আলাপ অন্য কারও কাছে ফাঁস করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, এগুলো উভয়ের কাছে উভয়ের আমানত এবং তা প্রকাশ করে দেওয়া খিয়ানত। রাসুল ইরশাদ করেন :
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
'কিয়ামত দিবসে সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। '১৪৪
- স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই জানতে হবে, সব সময় সুখে থাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপাদান হলো, উত্তম সাহচর্য ও বন্ধুত্ব। অর্থাৎ উভয়ে কাছাকাছি থাকা এবং দুজন দুজনার কথাগুলো শেয়ার করা। অতঃপর প্রত্যেকে প্রত্যেকের আবেগ-অনুভূতি, রুচি, স্বাদ, স্বভাব ও মতামতের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। উন্নত চরিত্র গ্রহণ করতে হবে এবং একে অপরের জন্য প্রাণ-উৎসর্গ হতে হবে।
অংশীদারত্ব দুজনকে সবচেয়ে বেশি কাছে টেনে আনে; হোক তা সুখ-দুঃখের কথার অংশীদারত্ব বা খাবারদাবারের অংশীদারত্ব।
টিকাঃ
১৪০. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ : ৩৫।
১৪১. সহিহুল বুখারি: ৫২৩২।
১৪২. সহিহুল বুখারি: ৫২৩৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৪১।
১৪৩. সুরা তহা, ২০: ১৩২।
১৪৪. সহিহু মুসলিম: ১৪৩৭।