📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 নারী ও সৌভাগ্য

📄 নারী ও সৌভাগ্য


প্রায়শ নারীরা নিজেদের জন্য সৌভাগ্যের উপকরণগুলো নির্ধারণ করে রাখে। একজন নারী সাধারণত যেগুলো চায়, সেগুলো হলো, শক্তিশালী একজন স্বামী, সন্তানসন্ততি, সুন্দর বাড়ি, ভালো অর্থনীতি ইত্যাদি। এই আশাগুলো সর্বদা নারীমনে ঘুরপাক খেতে থাকে। সে এগুলোর স্বপ্ন দেখে এবং জীবনে এগুলো পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করে।
অধিকাংশ নারীর চোখে একজন ভালো স্বামী হওয়া সাধারণ কোনো বিষয় নয়। অনেক পুরুষ আছে সবকিছুতে নারীর ওপরই নির্ভর করে থাকে এবং পারিবারিক যেকোনো বিষয়ে তার কোনো মূল্যায়নই থাকে না।
যেকোনো নারীই প্রত্যাশা করে, তার স্বামী যেন শক্তিশালী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সহানুভূতিশীল হয়। যেকোনো বিষয় অনুধাবনের ক্ষেত্রে যেন মহৎ হয়। উত্তম উপদেশদাতা, বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু, একনিষ্ঠ প্রেমিক হয় এবং স্বামী যেন এমন সুপুরুষ হয়, যার ওপর সারা জীবন ভরসা করা যায়।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 পুরুষ ও সৌভাগ্য

📄 পুরুষ ও সৌভাগ্য


পুরুষরা অধিক আশা ও প্রত্যাশা করে। তারা সম্পদ, শক্তি, দাপট ও ক্ষমতাকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখে। যদি তাদের আশাগুলো বাস্তবায়িত হয় এবং কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেয়ে যায়, তাহলে কি তারা প্রকৃত সুখ পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে?
যেসব পুরুষ মানুষের অর্থের দিকে না তাকিয়ে তাদের সম্মান পেয়ে লাভবান হতে চায়, এরা অধিকাংশই হতভাগা-দুর্ভাগা হয়। কেবল প্রসিদ্ধি ও পরিচিতি লাভের চেষ্টা করা আত্মিক প্রশান্তি ও সৌভাগ্য লাভের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। শুধু এগুলো সৌভাগ্য লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং কখনো কখনো এগুলো দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রী-সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, কর্মক্ষেত্রে সফল হয়, সুখে দুঃখে, গরম ও ঠান্ডায় সব সময় হাসিখুশি থাকে, সে-ই জীবনে সুখী হতে পারবে।
পক্ষান্তরে যদি স্বামী স্ত্রীকে ঘৃণা করে, সন্তানের প্রতি আস্থাবান না হয়, কাজকর্মকে বুকের মধ্যে চেপে বসা দুঃস্বপ্নের মতো মনে করে, দিন হলে রাত আসার অপেক্ষায় এবং রাত হলে দিনের আলো ফোটার আশায় থাকে, তাদের উচিত নিজেদের একটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং নিজেদের অবস্থাকে সংশোধন করা। অন্যথায় সব সময় দুর্ভাগ্য আর হতাশার মধ্যে কাটাতে হবে।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 স্বামী-স্ত্রীর মাঝে পার্থক্য

📄 স্বামী-স্ত্রীর মাঝে পার্থক্য


শুরুতেই উল্লেখ্য যে, স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ব্যক্তিগত অনেক পার্থক্য রয়েছে। যেমন : স্বামীর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো জন্মগতভাবে সে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। স্ত্রীর মাঝে সেগুলোর পরিবর্তে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।
পরিবেশগত পার্থক্য থাকতে পারে। হয়তো স্বামী যেই পরিবেশে বড় হয়েছে, স্ত্রী তেমন পরিবেশে বড় হয়নি। আবার স্ত্রী যেমন পরিবেশে বড় হয়েছে, স্বামী তেমন পরিবেশে বড় হয়নি। কেউ হয়তো দ্বীনদার পরিবারে লালিতপালিত হয়েছে, কেউ দুনিয়াদার পরিবারে। একেক জনের অভ্যাস একেক রকম হতে পারে। উভয়ের মাঝে সামাজিকতার দিক থেকে ভিন্নতা থাকতে পারে।
প্রত্যেকের মাঝে মানসিকতার পার্থক্য থাকতে পারে। হয়তো স্বামী কিছুটা রসিক, প্রাণবন্ত ও প্রফুল্ল; কিন্তু তার স্ত্রী তার বিপরীত।
আরও থাকতে পারে চারিত্রিক পার্থক্য। কেউ হয়তো উদার এবং ক্ষমাশীল। আর অপরজন কিছুটা বিপরীত। থাকতে পারে শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য। ইত্যাদি এমন আরও বহু পার্থক্য থাকতে পারে উভয়ের মাঝে।
কিন্তু এত এত অমিল ও পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয়ের মাঝে পারস্পরিক মিল হওয়ার অনেক বড় কিছু দিক রয়েছে। যেগুলো কাজে লাগিয়ে সকল অমিলকে পিছে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়; যাতে উভয়ের মাঝে সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় এবং শক্তিশালী হয়। পার্থক্য ও ভিন্নতা হাজারো পয়েন্টে থাকলেও মিল হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার একটি বাণীই যথেষ্ট। তিনি ইরশাদ করেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
'আর এক নিদর্শন این যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।'১১০
সুতরাং দুজনের মাঝে ভিন্নতা থাকলেও অবশ্যই দুজনকেই শান্তি ও পূর্ণতা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে। প্রত্যেককেই প্রত্যেকের মধ্যে থাকা কল্যাণকর গুণগুলো দ্বারা পরস্পরকে সহায়তা করতে হবে। যাতে তাদের মাঝে কোনো ত্রুটি ও ফাটল অনুপ্রবেশ করতে না পারে। একে অপরের জন্য ব্যক্তিগত কিছু অভ্যাস ও স্বভাবকে পরিবর্তন করতে হবে। যখন তোমার স্ত্রীর সুখের জন্য তোমার কিছু ব্যক্তিগত অভ্যাস ও আগ্রহ পরিবর্তন করার বিষয়টি সে জানতে পারবে, তাহলে সেও তোমার জন্য তার কিছু অভ্যাসকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবে, কিছু আগ্রহ ও ইচ্ছাকে কুরবান করবে।
উভয়ের মধ্যকার ভিন্নতাগুলোকে একে অপরকে আকর্ষণ করার কাজে লাগানো যায়। সুতরাং স্ত্রীর মাঝে কোনো ভিন্নতা দেখে নিজেকে দুশ্চিন্তায় ফেলো না। কেননা, তুমি তো এমন কোনো নারীকে বিয়ে করোনি, যে তোমার স্বভাবের সাথে পরিপূর্ণ মিল রাখে এবং এমন কোনো মেয়ে এনে ঘরে তোলোনি, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা তোমার সমান। এমনটা ভাবতে পারলে তবেই পারিবারিক জীবনে সুখী হতে পারবে। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পদ্ধতিগুলো সুখের পথ বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি বিষয় প্রত্যেকের জানা থাকা দরকার। সুখী পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই সেই সম্পর্ক তাকওয়া ও শরিয়াহর নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। যদি সম্পর্কগুলো শরিয়াহর মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, সেই সম্পর্ক যেকোনো মুহূর্তে নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
তাই তো রাসুল ইরশাদ করেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرُ بِذَاتِ الدِّينِ، تَرِبَتْ يَدَاكَ
'চারটি দিক বিবেচনা করে নারীকে বিয়ে করা হয়—তার সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি (দেখে)। সুতরাং তুমি দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দাও। অন্যথায় ধূলিধূসরিত হোক তোমার হস্তদ্বয়। ১১২
রাসুল আরও বলেন:
مَا اسْتَفَادَ الْمُؤْمِنُ بَعْدَ تَقْوَى اللهِ خَيْرًا لَهُ مِنْ زَوْجَةٍ صَالِحَةٍ، إِنْ أَمَرَهَا أَطَاعَتْهُ، وَإِنْ نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ، وَإِنْ أَقْسَمَ عَلَيْهَا أَبَرَّتْهُ، وَإِنْ غَابَ عَنْهَا نَصَحَتْهُ فِي نَفْسِهَا وَمَالِهِ
'কোনো মুমিন ব্যক্তি আল্লাহভীতির পর উত্তম যা লাভ করে, তা হলো পুণ্যময়ী স্ত্রী। স্বামী তাকে কোনো নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে; সে তার দিকে তাকালে (তার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্লতা) তাকে (স্বামীকে) আনন্দিত করে এবং সে তাকে শপথ করে কিছু বললে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার সম্ভ্রম ও স্বামীর সম্পদের হিফাজত করে। '১১৩

টিকাঃ
১১০. সুরা আর-রুম, ৩০: ২১।
১১১. কাইফা তুয়ামিলু জাওজাতাকা, উসতাজ ইউসুফ মিখাইল আসআদ।
১১২. সহিহুল বুখারি: ৫০৯০, সহিহু মুসলিম : ১৪৬৬।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৮৫৭।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 কীভাবে স্ত্রীকে সুখী রাখবে?

📄 কীভাবে স্ত্রীকে সুখী রাখবে?


- স্ত্রীকে কখনো হেয়জ্ঞান কোরো না। কারণ, নারীদের কখনো হেয় প্রতিপন্ন করলে বা ছোট করলে তাদের মেধা-মস্তিষ্কে খুব প্রভাব ফেলে। যেসব অবজ্ঞার কারণে তোমার স্ত্রী তোমাকে অন্তর থেকে ক্ষমা করতে পারবে না, সেসব অবজ্ঞার ব্যাপারে সতর্ক থেকো। অনেক সময় স্ত্রী মুখে ক্ষমা করলেও অন্তরে তা থেকেই যায়। কখনো তার গায়ে হাত তুলো না, তিরস্কার কোরো না, তার বাবা-মার নাম ধরে অভিশাপ দিয়ো না, তার সম্মানে আঘাত হেনো না এবং গালি দিয়ো না।
- স্ত্রীর সাথে সুন্দর ব্যবহার করো। তাহলে সেও তোমার সাথে সুন্দর ব্যবহার করবে। তার ভেতরে এই অনুভূতি জাগ্রত করো যে, তুমি তোমার চেয়েও তাকে বেশি প্রাধান্য দাও, তাকে সুখী করার জন্য খুবই আগ্রহী হয়ে থাকো, তার স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখো এবং কখনো যদি সে অসুস্থ হয়, তাহলে তার সুস্থতার জন্য তোমার সাধ্যের সবটুকু কুরবান করে দেওয়ার বিশ্বাস তার ভেতরে সৃষ্টি করো।
- তোমার ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো সমান গুরুত্বারোপ করার জন্য স্ত্রীকে চাপাচাপি কোরো না। যেমন: তুমি যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়ে থাকো, তাহলে নক্ষত্ররাজির প্রতি তোমার মতো গুরুত্ব তার কাছ থেকে আশা কোরো না!
- জীবনপথে অটল থাকো। দেখবে, সেও একদিন তোমার অনুকূলে চলে আসবে। রাসুল বলেছেন,)عِفُوا تَعِفُ نِسَاؤُكُمْ( 'তুমি পবিত্র থাকো, তাহলে তোমার স্ত্রীও পবিত্র থাকবে।'১১৪
কখনো অবৈধ কিছুর দিকে দৃষ্টি দিয়ো না; হোক তা রাস্তায় বা টেলিভিশনের পর্দায়। আজ অধিকাংশ পারিবারিক কলহ এসব টিভি-সিরিয়ালের কারণে ঘটছে।
- কখনো স্ত্রীর আত্মমর্যাদায় আঘাত দেবে না এবং কোনোভাবে তাকে ঈর্ষান্বিত করবে না। যেমন: তাকে বললে, 'আমি তো আরেকটি বিয়ে করতে যাচ্ছি' অথবা তার সামনে অন্য কোনো মহিলার প্রতি তোমার আকর্ষণের কথা প্রকাশ করা ইত্যাদি। এগুলো তার হৃদয়কে খুব গভীরভাবে দংশন করতে থাকে। অন্তর থেকে প্রশান্তি কেড়ে নেয়। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও সন্দেহের কারণে মন থেকে ভালোবাসা উড়ে যায়। অধিকাংশ সময় এসব অনুভূতি শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে এবং অসুস্থতার সৃষ্টি করে। তারপর তোমাকেই একেকবার একেক ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করা লাগবে তাকে নিয়ে।
- নির্দিষ্ট কোনো স্থানে প্রকাশ পাওয়া কোনো দোষ-ত্রুটি বা ভুলের কথা সেখানে যাওয়ার পর তাকে মনে করে দিয়ো না। বিশেষ করে অন্য কারও সামনে এমন কাজ কিছুতেই করবে না।
- স্ত্রীর স্বভাব-চরিত্র সংশোধন করার সময় তোমার নিজের স্বভাবগুলোও ঠিক করে নেবে। কেবল স্ত্রী তার আখলাক ও অভ্যাস ঠিক করবে আর তুমি তোমার অবস্থাতেই অটল থাকবে, তা কাম্য নয়; বরং তোমাকেও ঠিক হতে হবে।
- যেসব কারণে স্ত্রীর ক্রোধ চেপে বসে, সেগুলো থেকে দূরে থেকো। যদি তোমার কোনো মেজাজের কারণে এমনটা ঘটে, তাহলে সেটা সংশোধন করে নাও।
- তার ভালো গুণগুলো তোমার মাঝে গ্রহণ করার চেষ্টা করো। বহু পুরুষ স্ত্রীর দ্বীনের ওপর অবিচলতা ও মূল্যবোধ দেখে নিজেও দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
- সর্বদা শান্ত ও ফুরফুরে মেজাজে থাকার চেষ্টা করো। কখনো ক্রোধান্বিত হোয়ো না। যেমনটি রাসুল বলেছেন। পরস্পর বিদ্বেষ, ঘৃণা ও মতানৈক্যের প্রধান কারণ হলো রাগ। যদি স্ত্রীর সামনে কোনো ভুল করে থাকো, তাহলে তার কাছে ভুলের কথা স্বীকার করো। কোনো একটি দিন এমন অতিবাহিত কোরো না যে, তুমি তার ওপর রেগে আছ আর সে এই চিন্তায় কান্না করতে করতে চোখ ভিজিয়ে ফেলছে। মনে রেখো, অধিকাংশ সময় রাগের কারণগুলো খুবই তুচ্ছ নগণ্য হয়ে থাকে। যেগুলোর কারণে রাগ দেখানো এবং সুখময় জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা শোভা পায় না।
বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। ক্রোধকে প্রশমিত করো। মনে রেখো, সামান্য কারণে কিছু সময় স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করার চেয়েও তোমাদের মধ্যকার যেই প্রেম, ভালোবাসা ও সম্পর্ক রয়েছে, তা অধিক উত্তম এবং উন্নত।
- স্ত্রীকে তার নিজের প্রতি আস্থাশীল হওয়ার সুযোগ দাও। তোমার কৃতদাসী ও চাকরানি বানিয়ো না। বরং তাকে তার প্রকৃতি, কাঠামো, চিন্তাচেতনা ও নিজস্ব স্থিতিশীলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে সাহস জোগাও। তোমার যাবতীয় বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করো। সুন্দরভাবে তার সাথে পর্যালোচনা করো। যখন দেখবে, তার দেওয়া মতামতটি অধিকতর সঠিক, তখন সেটাকে প্রাধান্য দাও এবং সাথে সাথে তাকেও জানিয়ে দাও।
- স্ত্রী প্রশংসনীয় কোনো কাজ করলে তার ব্যাপারে প্রশংসা করো। রাসুল বলতেন:
مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ
'যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।'১১৫
- অবজ্ঞা ও নিন্দা করা থেকে বিরত থেকো। তোমার এমন কোনো আত্মীয়ের সাথে তাকে তুলনা কোরো না, যাদের দেখে সে বিস্মিত হয়। তাদের অনুসরণ করে তাকে চলতে বাধ্য কোরো না।
- তার জন্য সেসব উপকরণ পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করার চেষ্টা করো, যেগুলো তাকে অবিচলতা, অধ্যবসায় এবং উত্তম গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করবে। যদি সে বিদ্যাসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে সার্টিফিকেট নিতে চায়, তার জন্য তা সহজ করে দাও। তবে তার ইচ্ছা যেন কিছুতেই দ্বীনের সীমার বাইরে চলে না যায় এবং তার আসল পারিবারিক দায়িত্ব থেকে যেন দূরে সরিয়ে না দেয়।
- স্ত্রীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনো। এর ফলে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও মিথ্যাভাবগুলো দূর হয়ে যাবে। অনেক মহিলা আছে, কথা থেকে বিরত থাকতে পারে না। স্বামীর পরিবারের লোকদের বা প্রতিবেশীদের নিন্দার মুখে তার ভেতর থেকে সব কথা বেরিয়ে আসে। তাই এমন পরিস্থিতিতে তোমাকে অবশ্যই হিকমতের সাথে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
- স্ত্রীকে এ কথা বুঝাও যে, সে সব ধরনের ঝুঁকি ও বিপদ থেকে মুক্ত এবং তুমি কখনো তাকে ছেড়ে যাবে না, তার থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না।
- তার ভেতরে এই অনুভূতি জাগ্রত করো যে, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, তুমি তার অর্থনৈতিক ও যাবতীয় বিষয়ের জিম্মাদার। সে তার বাবার কাছ থেকে যেই সম্পত্তির মালিক হয়েছে, সেগুলোর প্রতি কোনো লোভ দেখাবে না। শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকেও তার মালিকানাধীন সম্পদে তোমার হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
তার সম্পদ আছে বলে তার প্রতি খরচ করতে কার্পণ্য কোরো না। সে যতই ধনী হোক না কেন, তার বিশ্বাস কিন্তু এটাই যে, এতদিন যেভাবে তার বাবা তাকে দেখাশুনা করেছে, এখন সেই স্থানে তুমি রয়েছ।
- নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকবে। সব ধরনের অবৈধ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকবে। এসব অবৈধ সম্পর্কগুলোর কারণে বহু বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয়।
মাহরাম ছাড়া তোমার ঘরে অন্য কোনো পুরুষকে প্রবেশ করার অনুমতি দেবে না; সে যে-ই হোক। রাসুল ﷺ বলেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ
'তোমরা (গাইরে মাহরাম) মহিলাদের কাছে (একাকী) প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকো।' ১১৬
- স্ত্রী, বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যদের প্রতি ভালোবাসার মাঝে সামঞ্জস্য রেখো। যে যতটুকু ভালোবাসার দাবিদার, তাকে ততটুকুই দিয়ো। কারও ভালোবাসা যেন কারও ওপর অতিরঞ্জিত না হয়। প্রত্যেককে তার হক যথাযথভাবে দিয়ে দেবে।
- তুমি তোমার স্ত্রীর হয়ে যাও, যেমনিভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সে তোমার হয়ে যেতে চায়। তুমি যেমন চাও, সে পরিপূর্ণভাবে তোমার হয়ে যাক— তেমনই সেও চায়, তুমি তার হয়ে যাও।
- মাঝে মাঝে স্ত্রীকে বাড়ির বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেয়ো। একটু বেশি আনন্দ ও প্রফুল্লতা দেওয়ার জন্য। বিশেষ করে সন্তান আসার পূর্বে। কেননা, তখন সন্তানকে নিয়েই ব্যস্ত থাকা লাগে।
- যেসব বিষয়ে তুমি তার আবেগ-অনুভূতির ভাগ নিতে চাও, সেসব বিষয়ে তার সাথে তোমার আবেগ-অনুভূতিগুলো শেয়ার করো। মাঝে মাঝে তার পরিবারের লোকদের গিয়ে দেখে এসো। এই বিষয়ে রাসুল ﷺ-এর জীবনীর প্রতি লক্ষ করতে পারো।
- প্রয়োজনের বাইরে তোমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকো না। এতে করে তার মাঝে ঈর্ষা জাগে। কাজের ফাঁকে তাকেও সময় দাও। সারাক্ষণ নিজের কাজেই ব্যস্ত পড়ে থেকো না। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছুটির দিনটিতে তাকে তোমার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত কোরো না। এই দিনে তাকে সময় দাও; হোক তা বাড়িতে বা বাইরে কোথাও। কিছুতেই যেন তার ভেতরে তোমার প্রতি বিরক্তি কাজ না করে।
- একগুঁয়েমি করে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অটল থেকো না; বরং তার সাথে পরামর্শ করো। তার মতামত জানার চেষ্টা করো। যদি সঠিক ও সুন্দর হয়, তাহলে তার মত গ্রহণ করো। আর যদি তার মতের বিপরীত সিদ্ধান্ত নিতে চাও, তাহলে কোমলতা ও বিচক্ষণতার সাথে তাকে তোমার মতের প্রতি সহনশীল করে নাও।
- ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মুচকি হাসি দিয়ে এবং দুআর আবেদন জানিয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নাও। আবার ঘরে ফেরার পর তোমার সাক্ষাতের জন্য সে প্রস্তুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাড়াহুড়ো কোরো না। স্ত্রীও যেন এমন কোনো অবস্থায় না থাকে, যে অবস্থায় তুমি তাকে এই মুহূর্তে দেখতে পছন্দ করো না। বিশেষ করে কোনো সফর থেকে ফেরার পর।
- দুজনেই ইসলামের আয়না দিয়ে জীবনের অলিগলিগুলো অবলোকন করো। তবে ভুলে যেয়ো না, তুমি যে তার চেয়ে শক্তিশালী। রাসুল বলেছেন, )ارْفُقْ بِالْقَوَارِيرِ( 'কাঁচের বোতলের সাথে (অর্থাৎ নারীদের) সদয় আচরণ করো। '১১৭
তিনি আরও বলেন:
إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ
'নারীরা তো পুরুষের সহোদরা। '১১৮
তিনি আরও বলেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلَا يُؤْذِي جَارَهُ، وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا،
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, যে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। ১১৯ মহিলাদের উত্তম উপদেশ দাও। '১২০
- ঘরের বিভিন্ন কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করার চেষ্টা করো। কেননা, রাসুল -এর উন্নত চরিত্রের একটি অংশ ছিল, তিনি ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহায়তা করতেন। আয়িশা সিদ্দিকা বলেন:
كَانَ يَكُونُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ - تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ - فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلَاةِ
রাসুল ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন। অতঃপর যখন সালাতের সময় হয়ে যেত, তখন সালাতের জন্য বেরিয়ে যেতেন। ১২১
- স্ত্রীর বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি দেখেও চোখ অবনত করে রাখার চেষ্টা করবে এবং এই দোষগুলোকে ভুলে থাকার জন্য তার উন্নত ও সুন্দর দিকগুলো নিয়ে ভাববে। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় রাসুল ইরশাদ করেন:
لَا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
'কোনো মুমিন যেন কোনো মুমিনাকে অবজ্ঞা না করে। যদি সে তার কোনো আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে। ১২২
- স্ত্রীর সাথে সদয় ব্যবহার করা এবং রসিকতা করা স্বামীর কর্তব্য। রাসুল বলেছেন:
فَهَلًا بِكْرًا تُلَاعِبُهَا وَتُلَاعِبُكَ
'কুমারী বিয়ে করলে না কেন? তুমি তার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করতে আর সেও তোমার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করত। ১২৩
উমর-এর মতো শক্ত দিলের মানুষও বলতেন, 'পুরুষের জন্য ঘরে শিশুর মতো থাকা উচিত।' অর্থাৎ সরলতা ও সহমর্মিতার ক্ষেত্রে। অতঃপর যখন জাতির সামনে যাবে, তখন বীরপুরুষের রূপ নেবে।
- যেকোনো মতামত বা কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে উদারতার সাথে স্ত্রীর কাছ থেকে সমালোচনাগুলো শোনো। কেননা, রাসুল -এর স্ত্রীগণ মতামতকে পুনঃপর্যালোচনা করতেন। এতে তিনি রাগান্বিত হতেন না।
- স্ত্রীর নির্বুদ্ধিতাসুলভ আচরণ বা কথাগুলো নিয়ে অথবা তার পরিবার, নিকটাত্মীয়দের সাথে শত্রুতা করে কিংবা বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সাথে বাড়াবাড়ি কোরো না।
- স্ত্রীকে পরিপূর্ণ হিসেবে ধরে নিয়ো না। তার কাছ থেকে সব সময় যেকোনো কাজ সঠিকভাবে হওয়ার আশা রেখো না। কেননা, সেও একজন মানুষ। আর মানুষমাত্রই ভুল হতে পারে।
- সৌন্দর্য, চলাফেরা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, অর্থ-সম্পদ অথবা পারিবারিক দিক থেকে কখনো স্ত্রীকে আশেপাশের বা নির্দিষ্ট কোনো মহিলার সাথে তুলনা করে তার ভেতরে কষ্ট জাগ্রত কোরো না। এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকা এগুলো বলার পর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম।
- কারও সামনে তার দোষ-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা কোরো না। কেননা, তুমি আর তোমার স্ত্রীর অবস্থান এক পাল্লাতে আর পুরো বিশ্ববাসীর অবস্থান আরেক পাল্লাতে।
- অর্থের লালসায় স্ত্রী, পরিবার ও সন্তানদের ছেড়ে প্রবাসে যেয়ো না। মনে রেখো, কোনো গরিব মানুষও শুধু রুটি খেয়ে বাঁচে না। দেশে থেকে অনাহারে থাকতে হবে না। আর হ্যাঁ, যারাই সন্তানসন্ততি ও স্ত্রী-পরিবার রেখে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে, বিপদের ঘণ্টা তাদের দরজায় সব সময় কড়া নেড়েছে।
স্ত্রীকে ছেড়ে বিদেশ না গিয়ে দেশে কোনো কাজ করো। এতেই কল্যাণ রয়েছে। মনে রেখো, তুমি পরিবার ছেড়ে দীর্ঘ বছর প্রবাসে থেকে যদি পুরো দুনিয়ার সব সম্পদ এনে তাদের সামনে দাও, তবুও তাদের কাছে তোমার নষ্ট হয়ে যাওয়া মূল্য আর ফিরে পাবে না। যত সম্পদ নিয়েই দেশে ফিরো, তাদের কাছে তুমি একজন নগণ্য মেহমান বৈ কিছু নও। যে কিছুক্ষণ পরেই আবার প্রবাসে ফিরে যাবে সবাইকে ছেড়ে।
- স্ত্রীর দোষারোপগুলোকে পরিবারের বা পরিবারের বাইরের কারও সাথে তুলনা কোরো না। অতঃপর না জেনে না বুঝে হুট করে তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ো না। বরং তোমার উচিত অপেক্ষা করা, বিষয়টি যাচাই বাছাই করে খতিয়ে দেখা এবং সঠিক তথ্য জানা। পবিত্র কুরআনে দুজন মহিলা একজন পুরুষের সমান হওয়ার ঘোষণা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো।

টিকাঃ
১১৪. আল-মুজামুল আওসাত: ৬২৯৫।
১১৫. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৫৫।
১১৬. সহিহুল বুখারি: ৫২৩২।
১১৭. মুসনাদু আহমাদ: ১২৭৬১।
১১৮. সুনানু আবি দাউদ: ২৩৬, মুসনাদু আহমাদ: ২৬১৯৫।
১১৯. সহিহুল বুখারি: ৫১৮৫।
১২০. সহিহুল বুখারি: ৫১৮৬।
১২১. সহিহুল বুখারি: ৬৭৬।
১২২. সহিহু মুসলিম: ১৪৬৯।
১২৩. সহিহুল বুখারি: ৫২৪৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00