📄 দ্বীন হচ্ছে মুআমালা
যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে, ইসলাম তার ব্যাপারে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। তার ব্যাপারে রাসুল বলেন:
وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ قِيلَ: وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»
'আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়; আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়; আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়। বলা হলো, "সে কে ইয়া রাসুলাল্লাহ?' রাসুল বললেন, 'যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না। '৯৩
কিছু মানুষ খুব সহজেই ইবাদতগুলো পালন করে এবং সমাজে ব্যাপকভাবে তা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। তারাই আবার এমন এমন কাজ করে, যা উত্তম চরিত্র ও পরিপূর্ণ ইমানের পরিপন্থী।
এ বিষয়ে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে,
قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ فُلَانَةَ يُذْكَرُ مِنْ كَثْرَةِ صَلَاتِهَا، وَصِيَامِهَا، وَصَدَقَتِهَا، غَيْرَ أَنَّهَا تُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا، قَالَ: «هِيَ فِي النَّارِ»، قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، فَإِنَّ فُلَانَةَ يُذْكَرُ مِنْ قِلَّةِ صِيَامِهَا، وَصَدَقَتِهَا، وَصَلَاتِهَا، وَإِنَّهَا تَصَدَّقُ بِالْأَنْوَارِ مِنَ الْأَقِطِ، وَلَا تُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا، قَالَ: «هِيَ فِي الْجَنَّةِ»
'এক ব্যক্তি বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, অমুক মহিলার ব্যাপারে জানি যে, সে বেশি বেশি সালাত আদায় করে, রোজা রাখে এবং সদাকা করে; কিন্তু সে কথার দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়।” রাসুল বললেন, “সে জাহান্নামি।" অতঃপর লোকটি বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, অমুক মহিলার ব্যাপারে জানি যে, সে খুব কম রোজা রাখে, অল্প দান-খয়রাত করে এবং কম সালাত আদায় করে আর সে সামান্য পনির সদাকা করে; কিন্তু সে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না।" রাসুল বললেন, "সে জান্নাতি। ৯৪
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুল-কে বলতে শুনেছি :
«أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي تَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، قَالَ الْقَوْمُ: نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: أَحْسَنُكُمْ خُلُقًا»
"আমি কি তোমাদের বলে দেবো না যে, তোমাদের মধ্যে কে আমার অধিক প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে?" এ কথা তিনি দুই বা তিনবার বলেছেন। অতঃপর লোকেরা বলল, "জি, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল!” তারপর তিনি বললেন, "তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি উত্তম চরিত্রের অধিকারী।"৯৪
আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য স্পষ্ট করে দিতে চান, পরিশুদ্ধ আত্মা ও পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের সুদৃঢ় সম্পর্ক এবং সুন্দর আচরণ ও সুন্দর জীবনাচারের মজবুত যোগসূত্র। তাই তো তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, তার ব্যাপক বরকত মুমিনদের ওপর নিরাপত্তা হয়ে বর্ষিত হয় এবং মুত্তাকি ও মুহসিনদের ওপর অনুগ্রহ ও সদাচার হয়ে নাজিল হয়। তিনি বলেন:
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقُوا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
'আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং পরহেজগারি অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। ৯৬
টিকাঃ
৯৩. সহিহুল বুখারি: ৬০১৬।
৯৪. মুসনাদু আহমাদ: ৯৬৭৫।
৯৫. মুসনাদু আহমাদ: ৬৭৩৫।
৯৬. সুরা আল-আরাফ, ৭: ৯৬।
📄 ভালো কাজ মন্দ কাজকে দূর করে দেয়
পবিত্র কুরআনে একটি মহান আয়াত আছে। যেখানে একই সঙ্গে দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও চমৎকার ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে। ভুলত্রুটি বহু মানুষের পদদ্বয়কে রক্তাক্ত করেছে, তাদের সুখ ও সৌভাগ্যকে পিষে দিয়েছে এবং সহজ ও সাবলীল জীবনধারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে কোনো ভুল বা পাপ করে না?! না, এমন কাউকে পাওয়া যাবে না। কিন্তু যখন মানুষ খারাপ কাজ করার পরপরই কোনো ভালো কাজ করে নেবে, তখন আল্লাহ তাআলা তা মুছে দেবেন। আমাদের সামাজিক জীবনে ও মিলবন্ধনে আল্লাহ তাআলার এই ঐশী হিদায়াতটি প্রয়োগ করা খুবই প্রয়োজন। প্রতিনিয়ত মানুষ একে অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে। সহপাঠীর সাথে কোনো না কোনো ভুল আচরণ করছে, স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করছে, বন্ধুবান্ধবের সাথে অন্যায় করছে, সন্তানের সাথে রূঢ় আচরণ দেখাচ্ছে, প্রতিবেশীকে কষ্ট দিচ্ছে ইত্যাদি এমন আরও বহু খারাপ আচরণ প্রকাশ পাচ্ছে। কখনো আমাদের মেজাজ খারাপ থাকে, কখনো শিরাগুলো স্থির থাকে না, আবার কখনো ভুল বোঝাবুঝি হয়, মাঝে মাঝে শয়তান প্রভাব বিস্তার করে, কিংবা অজান্তেই মুখ দিয়ে অপ্রীতিকর কথা বেরিয়ে আসে, কখনো কারও চিন্তায় হৃদয়টা সংকীর্ণ হয়ে রয় ইত্যাদি বহু কারণে আমরা অজান্তেই অন্যের সাথে এমন আচরণ করে বসি, যার উপযুক্ত সে নয়।
এ ধরনের আচরণ প্রকাশ পাওয়া কখনোই উচিত নয়। কিন্তু তবুও প্রকাশ পেয়েই যায়। তবে এর মহৌষধ হচ্ছে, খারাপ আচরণের পরপরই কোনো ভালো আচরণ করা। তাহলেই খারাপটা মুছে যাবে। তবে তা হতে হবে উত্তম বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে, সুন্দর চেহারা দিয়ে, অন্তর থেকে বেরিয়ে আসা সৌহার্দ্য দিয়ে, হাস্যোজ্জ্বলভাবে, উদারতার সাথে, সত্য প্রশংসার মাধ্যমে, একনিষ্ঠতার সাথে অপারগতা প্রকাশ করার মাধ্যমে এবং অন্যদের আপত্তিগুলো অনুভব করার মাধ্যমে। কারণ, তারাও তো আমাদের মতোই মানুষ। যেভাবে আমরা ভুল করি, তারাও তো ভুল করে থাকে। কখনো তারা এমন পরিস্থিতির শিকার হয়, যা আমরা জানিই না। যেসব পরিস্থিতির কারণে তারা টেনশনে থাকে। সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ সে, যে অন্যের কাছে নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা প্রকাশ করে। এ ধরনের মানুষ জীবনে সুখী হতে পারে। অসম্ভব কিছু তালাশ করে জীবনকে কুড়ে কুড়ে শেষ করে না।
যদি কখনো তুমি ভুল করো, তাহলে হা-হুতাশ ও আক্ষেপ করেই সময় ব্যয় করো না। বরং এমনভাবে অনুতপ্ত হও, যার ফলে ভুল থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাও এবং উপকৃত হতে পারো। কিন্তু কখনো 'যদি এমন হতো...' ইত্যাদি কথা বোলো না। কারণ, এমন কথায় শয়তান সুযোগ পায়। রাসুল ﷺ-এর নির্দেশনা হলো, খারাপ কোনো কাজ করে ফেললে এর পরপরই ভালো কাজ করে নাও। তাহলে অচিরেই ভুল দূর হয়ে যাবে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সামনেই সৌভাগ্য দেখতে পাবে। তিনি বলেন:
اتَّقِ اللهِ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَن
'যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো। মন্দ কাজের পরপরই ভালো কাজ করো—তাতে মন্দ দূরীভূত হয়ে যাবে। আর মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো। ৯৭
টিকাঃ
৯৭. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৮৭।
📄 পিতামাতাকে সুখে রাখো
এমন কোনো মানুষ নেই, যে পিতামাতার প্রতি সন্তানের সুন্দর ব্যবহারের আবশ্যকীয়তার কথা জানে না। পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখার পেছনে একমাত্র মাধ্যম তারা দুজনই। তারা সন্তানকে সাধ্যের সবটুকু চেষ্টা বিলীন করে লালনপালন করেছেন। সন্তানের সুখ-শান্তির জন্য জীবনভর কাজ করে গেছেন। সুতরাং তাদের সম্মান করা, তাদের সাথে সদাচরণ করা বিশেষ করে বার্ধক্যে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার ও খিদমত করা সন্তানের জন্য আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا - وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلُّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের "উহ” শব্দটিও বোলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও আর বলো, "হে আমার পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালনপালন করেছেন।৯৮
রাসুল বলেছেন:
بَرُّوا آبَاءَكُمْ تَبَرُّكُمْ أَبْنَاؤُكُمْ
'তোমরা তোমাদের পিতামাতার সাথে সদাচরণ করো। তাহলে তোমাদের সন্তানরাও তোমাদের সাথে সদাচরণ করবে।'৯৯
তিনি আরও বলেন:
مَنْ بَرَّ وَالِدَيْهِ طُوبَى لَهُ، زَادَ اللَّهُ فِي عُمُرِهِ
'যে ব্যক্তি পিতামাতার সাথে সদাচরণ করবে, তার জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ তাআলা তার হায়াত বাড়িয়ে দেবেন।'১০০
একদিন ইবনে উমর এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার মাকে কাঁধে নিয়ে কাবা ঘর তাওয়াফ করছে। তাই সে বলল, 'হে ইবনে উমর, আপনি কি দেখছেন না, আমি তার প্রতিদান দিয়ে দিচ্ছি?' তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'না, না; বরং তুমি তার সাথে সুন্দর আচরণ করছ। আর আল্লাহ তাআলা তোমাকে এই সামান্য সুন্দর আচরণের কারণে অনেক বেশি পুরস্কার দেবেন।'
টিকাঃ
৯৮. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ২৩-২৪।
৯৯. আল-মুজামুল আওসাত: ১০০২।
১০০. আল-মুজামুল কাবির লিত-তাবারানি: ৪৪৭, মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭২৫৭।
📄 নিকটাত্মীয়দের সুখী করো
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নিকটাত্মীয়দের মাঝে সৌহার্দ্য, সহানুভূতি ও ভালোবাসার বন্ধনকে মজবুত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। সুতরাং যারা এসব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার দুঃসাহস করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কে ফাটল ধরায়, তারা আল্লাহর নীতির সীমালঙ্ঘন করল। যা-ই করুক না কেন, পরিশেষে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
'হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (হক) চেয়ে থাকো এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।'১০১
রাসুল বলেছেন:
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
'যে ব্যক্তি চায় যে, তাকে তার রিজিকের প্রশস্ততা বা জীবন (বরকতময় হয়ে) দীর্ঘ হওয়া আনন্দিত করুক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে। '১০২
তিনি আরও বলেন :
صِلَةُ الرَّحِمِ، وَحُsْنُ الْخُلُقُ يُعَمِّرْنَ الدَّيَارَ وَيَزِدْنَ فِي الْأَعْمَارِ
'আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা ও উত্তম চরিত্র অবলম্বন করা দেশকে আবাদ রাখে এবং আয়ু বৃদ্ধি করে।'১০৩
টিকাঃ
১০১. সুরা আন-নিসা, ৪: ১।
১০২. সহিহুল বুখারি : ২০৬৭।
১০৩. শুআবুল ইমান: ৭৫৯৯।