📄 সহনশীলতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
মানুষের ওপর যখন ক্রোধ চেপে বসে (الْحِلْمُ)। তথা সহনশীলতা তখন আত্মনিয়ন্ত্রণের কাজ করে। বহু মানুষকে দেখি, সামান্য ও তুচ্ছ কারণে ক্রোধান্বিত হয়। নিজের এবং অন্যের জীবনকে জাহান্নামে পরিণত করে! যদি তারা জানত, (الْحِلْمُ) বা সহনশীলতা হচ্ছে সর্বোচ্চ চরিত্রের পরিচায়ক, এর দ্বারা ব্যক্তি উন্নত ও সুন্দর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়, ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে তোলে এবং মানুষের কাছে তার সম্মান বৃদ্ধি করে, তাহলে কোনোভাবেই তারা রাগ করত না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
'আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহিলদের থেকে দূরে সরে থাকো।'৭৯
রাসুল বলেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيْنِ سَهْلٍ
'আমি কি তোমাদের বলে দেবো না, কে জাহান্নামের জন্য হারাম অথবা কার ওপর জাহান্নام হারাম? (জাহান্নাম হারাম) প্রত্যেক এমন ব্যক্তির ওপর, যে মানুষের নিকটবর্তী ও সহজ-সরল।'৮০
এক জনপ্রিয় ব্যক্তিকে গালি দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর সে বলল, 'যেমনটা তুমি বললে, যদি আমি সত্যি তেমনই হয়ে থাকি, তাহলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আর যদি তেমন না হই, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।'
একদা আয়িশা সিদ্দিকা তাঁর এক খাদিমের ওপর ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লেন। অতঃপর আত্মনিয়ন্ত্রণ করে বললেন, 'তাকওয়া কতই না মহান বিষয়! রাগান্বিত ব্যক্তির জন্য কোনো দুঃখ রাখেনি।'
জনৈক ব্যক্তি বলেন, 'যদি তুমি মূর্খের কথায় চুপ থাকো, তাহলে তার কথায় প্রশস্ততার সাথে উত্তর দিলে এবং তাকে শাস্তি দিলে।'
অপর একজন বলেন, 'তোমাকে উপেক্ষা করার মাঝে তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের শান্তি রয়েছে।'
টিকাঃ
৭৯. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৯৯।
৮০. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮৮।
📄 বিনয়ের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
(تواضع) বা 'বিনয়' একটি প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য। যা মানুষের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে, আত্মাকে পবিত্রতার পোশাক পরিধান করায় এবং সুরুচি দান করে। বিনয় বহু জাতিকে ওপরে উঠিয়ে নিয়েছে; ফলে তারা হয়েছে সফল। আবার অহংকার বহু মানুষকে তলিয়ে দিয়েছে; ফলে তাদের ওপর পতিত হয়েছে দয়াময় প্রভুর শাস্তি এবং স্পষ্ট ক্ষতি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, "সালাম।"'৮১
তিনি আরও বলেন:
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
'এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম আল্লাহভীরুদের জন্য।'৮২
রাসুল ইরশাদ করেন:
وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'যে কেউ আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদাশীল করেন।'৮৩
টিকাঃ
৮১. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৩।
৮২. সুরা আল-কাসাস, ২৮: ৮৩।
৮৩. সহিহু মুসলিম: ২৫৮৮।
📄 মধ্যপন্থার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
কার্পণ্য ও অপচয়ের মাঝে সমতা করাকে (اِقْتِصَاد ) বলে। সুতরাং তোমার চেয়েও যে ব্যক্তি অধিক ধনী, বিলাসিতা, আড়ম্বরতা ও খরচের ক্ষেত্রে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলো না। এমনটি করলে ঋণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে। ফলে যে-ই দেখবে, তোমাকে দূরে ঠেলে দেবে। আবার এমনিভাবে নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য খরচ করতে অধিক কৃপণতাও করবে না। দুস্থ, নিঃস্ব ও অসহায়দের সহায়তা করতে কার্পণ্য দেখিয়ো না। তাহলে তার আশা ও প্রয়োজনগুলো অপূরণীয়ই থেকে যাবে এবং অশান্তি আর অনিশ্চয়তার মাঝে দিনাতিপাত করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةٌ إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا محسورا
'তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।'৮৪
সাইদ বিন জুবাইর বলেছেন, 'খারাপ কাজে ভালো সম্পদ ব্যয় করা অপচয়।'
ইবনে জিয়াদকে বলা হলো, 'তুমি কেন দিরহামকে ভালোবাসো; অথচ এই দিরহাম তোমাকে দুনিয়ার খুব কাছে নিয়ে যায়?' সে বলল, 'দিরহাম আমাকে দুনিয়ার কাছে নিলেও দুনিয়া থেকে বিমুখ রাখে।'
টিকাঃ
৮৪. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ২৯।
📄 ন্যায়পরায়ণতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
জীবনের প্রতিটি বিষয়ে সত্য পথকে আঁকড়ে ধরে রাখা এবং ইনসাফের পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে জুলুম করা থেকে বিরত থাকাকে ন্যায়পরায়ণতা বা (الْعَدْلُ) বলে। জুলুমের পথ খুবই দুর্গম এবং পিচ্ছিল। খুব কম মানুষই এই রাস্তায় সফল হতে পারে। এ পথের পথিকরা মানুষের হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর ক্রোধান্বিত হন। যেসব জালিমরা প্রশান্তি আর সুখ বলতে কিছুই চিনে না, তাদের পাপের ও শাস্তির জঘন্যতা অনুমান করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর ক্রোধান্বিত হয়ে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ
'জালিমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না, তাদেরকে তো ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফোরিত হবে। '৮৫
রাসুল বলেন:
اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا تُحْمَلُ عَلَى الْغَمَامِ يَقُولُ اللَّهُ جَلَّ جَلَالُهُ: وَعِزَّتِي وَجَلَا لِي لَأَنْصُرَنَّكَ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ
'তোমরা মাজলুমের বদ-দুআ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, তা মেঘমালার ওপরে উঠে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার ইজ্জত ও প্রতাপের কসম, কিছুক্ষণ পরে হলেও আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব।""৮৬
তিনি আরও বলেন:
مَا مِنْ أَحَدٍ يَكُونُ عَلَى شَيْءٍ مِنْ أُمُورِ هَذِهِ الْأُمَّةِ قَلَّتْ أَمْ كَثُرَتْ فَلَا يَعْدِلُ فِيهِمْ إِلَّا كَبَّهُ اللَّهُ فِي النَّارِ
'যে কেউ এই উম্মতের কম-বেশি যেকোনো দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যদি তাদের মাঝে ইনসাফ না করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। '৮৭
উমর বিন আব্দুল আজিজ তাঁর এক কর্মকর্তার কাছে এই মর্মে চিঠি লিখেছেন, 'যখন তোমার সক্ষমতা তোমাকে মানুষের ওপর জুলুম করার প্রতি আহ্বান করবে, তখন তোমার ওপর আল্লাহর সক্ষমতার কথা চিন্তা করবে।'
টিকাঃ
৮৫. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৮৬. আল-মুজামুল কাবির লিত-তাবারানি: ৩৭১৮।
৮৭. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭০১৪।