📄 সত্যবাদিতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
সত্যবাদিতা শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান মাধ্যম। যে ব্যক্তি সত্যবাদিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তার সিফাতের মধ্যে পূর্ণতা আসে, চরিত্রে উন্নতি সাধিত হয় এবং সাথে সাথে সৌভাগ্যও লাভ করতে সক্ষম হয় সে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
'এটি সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য উদ্যান রয়েছে, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। '৭৩
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে,
أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا عَمَلُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: «الصَّدْقُ، وَإِذَا صَدَقَ الْعَبْدُ بَرَّ، وَإِذَا بَرَّ آمَنَ، وَإِذَا آمَنَ دَخَلَ الجَنَّةَ»، قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا عَمَلُ النَّارِ؟ قَالَ: «الْكَذِبُ إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ فَجَرَ، وَإِذَا فَجَرَ كَفَرَ، وَإِذَا كَفَرَ دَخَلَ يَعْنِي النَّارَ
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, জান্নাতে যাওয়ার আমল কী?' তিনি বললেন, 'সত্যবাদিতা। বান্দা যখন সত্য কথা বলে, তখন সৎ হয়ে যায়। যখন সে সৎ হয়, তখন তার ইমান পূর্ণ হয়। আর ইমান পূর্ণ হলে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কী কাজ করলে জাহান্নামে যেতে হয়?' তিনি বললেন, 'মিথ্যা। বান্দা যখন মিথ্যা বলে, তখন পাপী হয়। আর সে পাপী হলে কুফুরি করে এবং কুফুরি করলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। ৭৪
জনৈক দার্শনিকের মতে, 'মিথ্যা হলো সকল পাপের সমন্বয়কারী এবং সকল অন্যায়ের প্রধান কারণ। কেননা, মিথ্যা পরনিন্দা ডেকে আনে এবং পরনিন্দা পরস্পরের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আর বিদ্বেষ থেকেই তৈরি হয় একের সাথে অন্যের শত্রুতা। আর কারও মাঝে শত্রুতা তৈরি হয়ে গেলে সেখানে কোনো নিরাপত্তা ও সুখ থাকে না।'
এক বেদুইন তার ছেলেকে মিথ্যা বলতে দেখে বলল, 'হে বৎস, মিথ্যা রবের কাছ থেকে শাস্তি ডেকে আনে। যদি সে সত্যও বলে, কেউ সত্যায়ন করে না তার কথাকে। যদি সে ভালো কিছুর ইচ্ছা করে, তা বাস্তবায়ন করার মতো তাওফিক হয় না। তার থেকে কোনো সত্য পাওয়া গেলেও তা অন্যের দিকে নিসবত করা হয় এবং অন্যের থেকে কোনো মিথ্যা প্রকাশ পেলেও তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়।'
অনেকে রসিকতা করে মিথ্যা বলাকে খুবই স্বাভাবিক মনে করে। তারা মনে করে, হেলাখেলা ও মজার ছলে মিথ্যা বলার মাঝে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলাম বিনোদনের অনুমোদন দিলেও মিথ্যার মাধ্যমে বিনোদনের অনুমোদন দেয়নি। বরং বিনোদন হতে হবে সত্যের গণ্ডির ভেতরে।
রাসূল ইরশাদ করেন:
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ بِالحَدِيثِ لِيُضْحِكَ بِهِ القَوْمَ فَيَكْذِبُ، وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
'ধ্বংস হোক সেই লোক, যে লোকদের হাসানোর জন্য কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।' ৭৫
তিনি আরও বলেন:
لَا يُؤْمِنُ الْعَبْدُ الْإِيمَانَ كُلَّهُ حَتَّى يَتْرُكَ الْكَذِبَ فِي الْمُزَاحِ، وَالْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ صَادِقًا
'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না মজার ক্ষেত্রে মিথ্যা পরিহার করবে এবং নিজে সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও তর্কবিতর্ক পরিহার করবে।' ৭৬
টিকাঃ
৭৩. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১১৯।
৭৪. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৪১।
৭৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৩১৫।
৭৬. মুসনাদু আহমাদ: ৮৭৬৬।
📄 লজ্জাবোধের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
বিবেক যা কিছুকে মন্দ হিসেবে গ্রহণ করে এবং খালিক ও মাখলুক যেসব কাজকে অপছন্দ করে, সেসব থেকে লজ্জা মানুষকে বাধা প্রদান করে। লজ্জাবোধ মানুষের উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক। যা মানুষকে খারাপ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ করে। পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। সুতরাং যে ব্যক্তি লজ্জাহীন হয়ে পড়বে, সে লাঞ্ছিত এবং সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে।
আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ
'যে কেউ নিজের সংশোধন করে, সে সংশোধন করে স্বীয় কল্যাণের জন্যই। আর আল্লাহর নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।' ৭৭
রাসুল ইরশাদ করেন:
الْحَيَاءُ مِنَ الإِيمَانِ، وَالإِيمَانُ فِي الجَنَّةِ، وَالبَذَاءُ مِنَ الجَفَاءِ، وَالجَفَاءُ فِي النَّارِ
'লজ্জা ইমানের অঙ্গ। আর ইমানের স্থান জান্নাতে। অশ্লীলতা দুর্ব্যবহারের অঙ্গ। আর দুর্ব্যবহারের স্থান জাহান্নামে।'৭৮
জনৈক বিজ্ঞজন বলেছিলেন, 'লজ্জা যে ব্যক্তির পোশাকে পরিণত হয়েছে, মানুষ কখনো তার কোনো দোষ-ত্রুটি দেখতে পাবে না।'
অপর একজন বলেন, 'শিশুর মাঝে লজ্জাবোধ থাকা ভয়ভীতি থাকার চেয়েও উত্তম। কেননা, লজ্জাবোধ বিবেক জাগ্রত করে আর ভয়ভীতি ভীরুতা শেখায়।'
টিকাঃ
৭৭. সুরা ফাতির, ৩৫: ১৮।
৭৮. মুসনাদু আহমাদ: ১০৫১২, সুনানুত তিরমিজি: ২০০৯।
📄 সহনশীলতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
মানুষের ওপর যখন ক্রোধ চেপে বসে (الْحِلْمُ)। তথা সহনশীলতা তখন আত্মনিয়ন্ত্রণের কাজ করে। বহু মানুষকে দেখি, সামান্য ও তুচ্ছ কারণে ক্রোধান্বিত হয়। নিজের এবং অন্যের জীবনকে জাহান্নামে পরিণত করে! যদি তারা জানত, (الْحِلْمُ) বা সহনশীলতা হচ্ছে সর্বোচ্চ চরিত্রের পরিচায়ক, এর দ্বারা ব্যক্তি উন্নত ও সুন্দর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়, ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে তোলে এবং মানুষের কাছে তার সম্মান বৃদ্ধি করে, তাহলে কোনোভাবেই তারা রাগ করত না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
'আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহিলদের থেকে দূরে সরে থাকো।'৭৯
রাসুল বলেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيْنِ سَهْلٍ
'আমি কি তোমাদের বলে দেবো না, কে জাহান্নামের জন্য হারাম অথবা কার ওপর জাহান্নام হারাম? (জাহান্নাম হারাম) প্রত্যেক এমন ব্যক্তির ওপর, যে মানুষের নিকটবর্তী ও সহজ-সরল।'৮০
এক জনপ্রিয় ব্যক্তিকে গালি দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর সে বলল, 'যেমনটা তুমি বললে, যদি আমি সত্যি তেমনই হয়ে থাকি, তাহলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আর যদি তেমন না হই, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।'
একদা আয়িশা সিদ্দিকা তাঁর এক খাদিমের ওপর ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লেন। অতঃপর আত্মনিয়ন্ত্রণ করে বললেন, 'তাকওয়া কতই না মহান বিষয়! রাগান্বিত ব্যক্তির জন্য কোনো দুঃখ রাখেনি।'
জনৈক ব্যক্তি বলেন, 'যদি তুমি মূর্খের কথায় চুপ থাকো, তাহলে তার কথায় প্রশস্ততার সাথে উত্তর দিলে এবং তাকে শাস্তি দিলে।'
অপর একজন বলেন, 'তোমাকে উপেক্ষা করার মাঝে তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের শান্তি রয়েছে।'
টিকাঃ
৭৯. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৯৯।
৮০. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮৮।
📄 বিনয়ের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
(تواضع) বা 'বিনয়' একটি প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য। যা মানুষের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে, আত্মাকে পবিত্রতার পোশাক পরিধান করায় এবং সুরুচি দান করে। বিনয় বহু জাতিকে ওপরে উঠিয়ে নিয়েছে; ফলে তারা হয়েছে সফল। আবার অহংকার বহু মানুষকে তলিয়ে দিয়েছে; ফলে তাদের ওপর পতিত হয়েছে দয়াময় প্রভুর শাস্তি এবং স্পষ্ট ক্ষতি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, "সালাম।"'৮১
তিনি আরও বলেন:
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
'এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম আল্লাহভীরুদের জন্য।'৮২
রাসুল ইরশাদ করেন:
وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'যে কেউ আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদাশীল করেন।'৮৩
টিকাঃ
৮১. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৬৩।
৮২. সুরা আল-কাসাস, ২৮: ৮৩।
৮৩. সহিহু মুসলিম: ২৫৮৮।