📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 ইখলাসের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 ইখলাসের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


ইখলাস ও রিয়া অর্থাৎ একনিষ্ঠতা ও লৌকিকতা দুটো ভিন্ন জিনিস। একটি আরেকটির সাথে কখনো মিলিত হয় না। মুখলিস বা একনিষ্ঠ ব্যক্তি সর্বদা তার প্রতিপালকের প্রতি আস্থা রাখে। নিজের কথা ও কাজে সত্যতার প্রমাণ দেয়। সে জানে, সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। তাই তার কাছে মানুষের প্রশংসা বা দুর্নাম এবং ক্ষতি ও উপকার দুটোই সমান। যতদিন বেঁচে থাকে, প্রতিপালককে খুশি করে এবং তাঁর আনুগত্য করেই বেঁচে থাকে।
ইখলাসের একটি দৃষ্টান্ত হলো, একসময় মুসলিম সেনাবাহিনী শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য একটি দুর্গকে কয়েক মাস অবরোধ করে রেখেছিল। এক রাতে একজন সৈন্য সেনাপ্রধানের কাছে এসে বলল, 'আমি তো দেয়ালে একটি ছিদ্র করেছি। সেখান দিয়ে শহরের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে। তাই আমার সাথে এমন কাউকে পাঠান, যে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমরা ভেতরে ঢুকে যখন দরজা খুলে দেবো, সাথে সাথে আমাদের পুরো সেনাবাহিনী প্রবেশ করতে পারবে।' তার কথা শুনে সেনাপতি কয়েকজন সৈন্য পাঠাল। তারা ভেতরে ঢুকে দরজা খুলে দিল। অতঃপর সেনাপ্রধানসহ সকলেই শহরে প্রবেশ করল এবং রাতের মধ্যেই শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।
দ্বিতীয় দিন দেয়ালে ছিদ্রকারী সৈন্যকে ডাকা হলো তার বীরত্বের পুরস্কার দেওয়ার জন্য। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। তৃতীয় দিন তাকে ডাকা হলো, কোনো পুরস্কারের ঘোষণা ছাড়াই। কিন্তু কেউই সাড়া দিল না। চতুর্থ দিন যখন ডাকা হলো, তখন এক সৈনিক সেনাপ্রধানের কাছে এসে বলল, 'আমি আপনাকে ছিদ্রকারীর কাছে নিয়ে যাব।' সেনাপ্রধান বললেন, 'কোথায় সে?' সৈনিক বলল, 'আপনাকে তার কাছে যেতে হলে তার দেওয়া তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।' সেনাপ্রধান বললেন, 'ঠিক আছে, তার শর্ত মানব। কী কী শর্ত বলো।' সে বলল, 'তার শর্ত তিনটি হলো : তাকে তার কর্মের জন্য কোনো পুরস্কার দিতে পারবেন না, কাউকে তার কথা বলতে পারবেন না এবং দ্বিতীয়বার তাকে তলব করতে পারবেন না।' সেনাপ্রধান বললেন, 'আচ্ছা ঠিক আছে, মেনে নিলাম শর্ত।' অতঃপর সৈনিক বলল, 'আমিই ছিদ্রকারী। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই ছিদ্র করেছিলাম।' অতঃপর সে চলে গেল। সেনাপ্রধান হতবাক হয়ে গেলেন তার আচরণে। অতঃপর তিনি যখনই সালাত আদায় করতেন, ছিদ্রকারীর সাথে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করতেন।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 সত্যবাদিতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 সত্যবাদিতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


সত্যবাদিতা শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান মাধ্যম। যে ব্যক্তি সত্যবাদিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তার সিফাতের মধ্যে পূর্ণতা আসে, চরিত্রে উন্নতি সাধিত হয় এবং সাথে সাথে সৌভাগ্যও লাভ করতে সক্ষম হয় সে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
'এটি সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য উদ্যান রয়েছে, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। '৭৩
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে,
أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا عَمَلُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: «الصَّدْقُ، وَإِذَا صَدَقَ الْعَبْدُ بَرَّ، وَإِذَا بَرَّ آمَنَ، وَإِذَا آمَنَ دَخَلَ الجَنَّةَ»، قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا عَمَلُ النَّارِ؟ قَالَ: «الْكَذِبُ إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ فَجَرَ، وَإِذَا فَجَرَ كَفَرَ، وَإِذَا كَفَرَ دَخَلَ يَعْنِي النَّارَ
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, জান্নাতে যাওয়ার আমল কী?' তিনি বললেন, 'সত্যবাদিতা। বান্দা যখন সত্য কথা বলে, তখন সৎ হয়ে যায়। যখন সে সৎ হয়, তখন তার ইমান পূর্ণ হয়। আর ইমান পূর্ণ হলে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কী কাজ করলে জাহান্নামে যেতে হয়?' তিনি বললেন, 'মিথ্যা। বান্দা যখন মিথ্যা বলে, তখন পাপী হয়। আর সে পাপী হলে কুফুরি করে এবং কুফুরি করলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। ৭৪
জনৈক দার্শনিকের মতে, 'মিথ্যা হলো সকল পাপের সমন্বয়কারী এবং সকল অন্যায়ের প্রধান কারণ। কেননা, মিথ্যা পরনিন্দা ডেকে আনে এবং পরনিন্দা পরস্পরের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আর বিদ্বেষ থেকেই তৈরি হয় একের সাথে অন্যের শত্রুতা। আর কারও মাঝে শত্রুতা তৈরি হয়ে গেলে সেখানে কোনো নিরাপত্তা ও সুখ থাকে না।'
এক বেদুইন তার ছেলেকে মিথ্যা বলতে দেখে বলল, 'হে বৎস, মিথ্যা রবের কাছ থেকে শাস্তি ডেকে আনে। যদি সে সত্যও বলে, কেউ সত্যায়ন করে না তার কথাকে। যদি সে ভালো কিছুর ইচ্ছা করে, তা বাস্তবায়ন করার মতো তাওফিক হয় না। তার থেকে কোনো সত্য পাওয়া গেলেও তা অন্যের দিকে নিসবত করা হয় এবং অন্যের থেকে কোনো মিথ্যা প্রকাশ পেলেও তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়।'
অনেকে রসিকতা করে মিথ্যা বলাকে খুবই স্বাভাবিক মনে করে। তারা মনে করে, হেলাখেলা ও মজার ছলে মিথ্যা বলার মাঝে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলাম বিনোদনের অনুমোদন দিলেও মিথ্যার মাধ্যমে বিনোদনের অনুমোদন দেয়নি। বরং বিনোদন হতে হবে সত্যের গণ্ডির ভেতরে।
রাসূল ইরশাদ করেন:
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ بِالحَدِيثِ لِيُضْحِكَ بِهِ القَوْمَ فَيَكْذِبُ، وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
'ধ্বংস হোক সেই লোক, যে লোকদের হাসানোর জন্য কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।' ৭৫
তিনি আরও বলেন:
لَا يُؤْمِنُ الْعَبْدُ الْإِيمَانَ كُلَّهُ حَتَّى يَتْرُكَ الْكَذِبَ فِي الْمُزَاحِ، وَالْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ صَادِقًا
'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না মজার ক্ষেত্রে মিথ্যা পরিহার করবে এবং নিজে সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও তর্কবিতর্ক পরিহার করবে।' ৭৬

টিকাঃ
৭৩. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১১৯।
৭৪. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৪১।
৭৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৩১৫।
৭৬. মুসনাদু আহমাদ: ৮৭৬৬।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 লজ্জাবোধের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 লজ্জাবোধের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


বিবেক যা কিছুকে মন্দ হিসেবে গ্রহণ করে এবং খালিক ও মাখলুক যেসব কাজকে অপছন্দ করে, সেসব থেকে লজ্জা মানুষকে বাধা প্রদান করে। লজ্জাবোধ মানুষের উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক। যা মানুষকে খারাপ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ করে। পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। সুতরাং যে ব্যক্তি লজ্জাহীন হয়ে পড়বে, সে লাঞ্ছিত এবং সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে।
আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ
'যে কেউ নিজের সংশোধন করে, সে সংশোধন করে স্বীয় কল্যাণের জন্যই। আর আল্লাহর নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।' ৭৭
রাসুল ইরশাদ করেন:
الْحَيَاءُ مِنَ الإِيمَانِ، وَالإِيمَانُ فِي الجَنَّةِ، وَالبَذَاءُ مِنَ الجَفَاءِ، وَالجَفَاءُ فِي النَّارِ
'লজ্জা ইমানের অঙ্গ। আর ইমানের স্থান জান্নাতে। অশ্লীলতা দুর্ব্যবহারের অঙ্গ। আর দুর্ব্যবহারের স্থান জাহান্নামে।'৭৮
জনৈক বিজ্ঞজন বলেছিলেন, 'লজ্জা যে ব্যক্তির পোশাকে পরিণত হয়েছে, মানুষ কখনো তার কোনো দোষ-ত্রুটি দেখতে পাবে না।'
অপর একজন বলেন, 'শিশুর মাঝে লজ্জাবোধ থাকা ভয়ভীতি থাকার চেয়েও উত্তম। কেননা, লজ্জাবোধ বিবেক জাগ্রত করে আর ভয়ভীতি ভীরুতা শেখায়।'

টিকাঃ
৭৭. সুরা ফাতির, ৩৫: ১৮।
৭৮. মুসনাদু আহমাদ: ১০৫১২, সুনানুত তিরমিজি: ২০০৯।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 সহনশীলতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 সহনশীলতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


মানুষের ওপর যখন ক্রোধ চেপে বসে (الْحِلْمُ)। তথা সহনশীলতা তখন আত্মনিয়ন্ত্রণের কাজ করে। বহু মানুষকে দেখি, সামান্য ও তুচ্ছ কারণে ক্রোধান্বিত হয়। নিজের এবং অন্যের জীবনকে জাহান্নামে পরিণত করে! যদি তারা জানত, (الْحِلْمُ) বা সহনশীলতা হচ্ছে সর্বোচ্চ চরিত্রের পরিচায়ক, এর দ্বারা ব্যক্তি উন্নত ও সুন্দর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়, ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে তোলে এবং মানুষের কাছে তার সম্মান বৃদ্ধি করে, তাহলে কোনোভাবেই তারা রাগ করত না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
'আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহিলদের থেকে দূরে সরে থাকো।'৭৯
রাসুল বলেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيْنِ سَهْلٍ
'আমি কি তোমাদের বলে দেবো না, কে জাহান্নামের জন্য হারাম অথবা কার ওপর জাহান্নام হারাম? (জাহান্নাম হারাম) প্রত্যেক এমন ব্যক্তির ওপর, যে মানুষের নিকটবর্তী ও সহজ-সরল।'৮০
এক জনপ্রিয় ব্যক্তিকে গালি দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর সে বলল, 'যেমনটা তুমি বললে, যদি আমি সত্যি তেমনই হয়ে থাকি, তাহলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আর যদি তেমন না হই, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।'
একদা আয়িশা সিদ্দিকা তাঁর এক খাদিমের ওপর ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লেন। অতঃপর আত্মনিয়ন্ত্রণ করে বললেন, 'তাকওয়া কতই না মহান বিষয়! রাগান্বিত ব্যক্তির জন্য কোনো দুঃখ রাখেনি।'
জনৈক ব্যক্তি বলেন, 'যদি তুমি মূর্খের কথায় চুপ থাকো, তাহলে তার কথায় প্রশস্ততার সাথে উত্তর দিলে এবং তাকে শাস্তি দিলে।'
অপর একজন বলেন, 'তোমাকে উপেক্ষা করার মাঝে তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের শান্তি রয়েছে।'

টিকাঃ
৭৯. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৯৯।
৮০. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00