📄 তাওবার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
যেকোনো গোলামের জন্য তার মালিকের দাসত্ব করা এবং অবাধ্যতা না করা প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য।
উমর বিন আব্দুল আজিজের এক গোলাম তার অবাধ্যতা করায় তিনি গোলামকে প্রহার করার জন্য বেঁধে রেখেছেন। গোলাম বলল, 'হে মনিব, কেন মারছেন আমাকে?' তিনি বললেন, 'কারণ, তুমি অমুক অপরাধ করেছ।' গোলাম বলল, 'আপনি কি কখনো এমন কোনো পাপ করেছেন; যার ফলে আপনার মনিবের রাগ চেপে বসতে পারে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ করেছি।' গোলাম বলল, 'তিনি কি আপনাকে তাৎক্ষণিক শাস্তি দিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'না।' গোলাম বলল, 'তাহলে আমাকে কেন দ্রুত শাস্তি দিচ্ছেন; অথচ তিনি আপনাকে দ্রুত শাস্তি দেননি?' উমর বললেন, 'দাঁড়াও, যাও তুমি আজ থেকে মুক্ত।' এরপর উমর বিন আব্দুল আজিজ তাওবা করে নিলেন।
বলা হয়ে থাকে, বিশর আল-হাফি এক রাতে তার প্রাসাদে অবস্থান করছিলেন। দরজায় তার এক গোলাম নিয়োজিত ছিল। সে পাপী ছিল। রাতে তার দরজায় এক লোক এসে গোলামকে বলল, 'এই প্রাসাদের মালিক স্বাধীন নাকি গোলাম?' গোলাম বলল, 'আমার মুনিব তো একজন স্বাধীন মানুষ।' লোকটি বলল, 'তুমি সত্য বলেছ। যদি গোলামই হতো, তাহলে দাসত্বের জায়গাটা রক্ষা করত। কিন্তু সে আল্লাহর অবাধ্যতা করে কেন?'
বিশর কথাটি শুনতে পেয়ে খালি পায়ে হেঁটে তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কী যেন বলেছিলে?' লোকটি পুনরায় কথাটি উপস্থাপন করল। অতঃপর বিশর তাওবা করতে করতে ফিরে গেল এবং ইলম অন্বেষণ ও ইবাদতে আত্মনিয়োগ করল এবং সততার সাথে পথ চলতে শুরু করল। এরপর সারা জীবন খালি পায়েই অতিবাহিত করল। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি জুতো পরিধান করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমার রব আমাকে যখন সৎ বানিয়েছিলেন, তখন আমি খালি পায়ে ছিলাম। তাই সারা জীবন আমি খালি পায়েই কাটাব!'
হাসান বলেছেন, 'একটি জাতি ক্ষমা পাওয়ার আশায় উদাসীন চলাফেরা করত। এমনকি তারা তাওবা না করেই দুনিয়া ত্যাগ করল। তাদের একজন বলত, "আমি তো আমার রবের প্রতি সুধারণা রাখি।" কিন্তু সে মিথ্যা বলত। যদি সুধারণাই রাখত, তাহলে অবশ্যই নেক আমল করত।'
📄 ইখলাসের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
ইখলাস ও রিয়া অর্থাৎ একনিষ্ঠতা ও লৌকিকতা দুটো ভিন্ন জিনিস। একটি আরেকটির সাথে কখনো মিলিত হয় না। মুখলিস বা একনিষ্ঠ ব্যক্তি সর্বদা তার প্রতিপালকের প্রতি আস্থা রাখে। নিজের কথা ও কাজে সত্যতার প্রমাণ দেয়। সে জানে, সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। তাই তার কাছে মানুষের প্রশংসা বা দুর্নাম এবং ক্ষতি ও উপকার দুটোই সমান। যতদিন বেঁচে থাকে, প্রতিপালককে খুশি করে এবং তাঁর আনুগত্য করেই বেঁচে থাকে।
ইখলাসের একটি দৃষ্টান্ত হলো, একসময় মুসলিম সেনাবাহিনী শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য একটি দুর্গকে কয়েক মাস অবরোধ করে রেখেছিল। এক রাতে একজন সৈন্য সেনাপ্রধানের কাছে এসে বলল, 'আমি তো দেয়ালে একটি ছিদ্র করেছি। সেখান দিয়ে শহরের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে। তাই আমার সাথে এমন কাউকে পাঠান, যে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমরা ভেতরে ঢুকে যখন দরজা খুলে দেবো, সাথে সাথে আমাদের পুরো সেনাবাহিনী প্রবেশ করতে পারবে।' তার কথা শুনে সেনাপতি কয়েকজন সৈন্য পাঠাল। তারা ভেতরে ঢুকে দরজা খুলে দিল। অতঃপর সেনাপ্রধানসহ সকলেই শহরে প্রবেশ করল এবং রাতের মধ্যেই শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।
দ্বিতীয় দিন দেয়ালে ছিদ্রকারী সৈন্যকে ডাকা হলো তার বীরত্বের পুরস্কার দেওয়ার জন্য। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। তৃতীয় দিন তাকে ডাকা হলো, কোনো পুরস্কারের ঘোষণা ছাড়াই। কিন্তু কেউই সাড়া দিল না। চতুর্থ দিন যখন ডাকা হলো, তখন এক সৈনিক সেনাপ্রধানের কাছে এসে বলল, 'আমি আপনাকে ছিদ্রকারীর কাছে নিয়ে যাব।' সেনাপ্রধান বললেন, 'কোথায় সে?' সৈনিক বলল, 'আপনাকে তার কাছে যেতে হলে তার দেওয়া তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।' সেনাপ্রধান বললেন, 'ঠিক আছে, তার শর্ত মানব। কী কী শর্ত বলো।' সে বলল, 'তার শর্ত তিনটি হলো : তাকে তার কর্মের জন্য কোনো পুরস্কার দিতে পারবেন না, কাউকে তার কথা বলতে পারবেন না এবং দ্বিতীয়বার তাকে তলব করতে পারবেন না।' সেনাপ্রধান বললেন, 'আচ্ছা ঠিক আছে, মেনে নিলাম শর্ত।' অতঃপর সৈনিক বলল, 'আমিই ছিদ্রকারী। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই ছিদ্র করেছিলাম।' অতঃপর সে চলে গেল। সেনাপ্রধান হতবাক হয়ে গেলেন তার আচরণে। অতঃপর তিনি যখনই সালাত আদায় করতেন, ছিদ্রকারীর সাথে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করতেন।
📄 সত্যবাদিতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
সত্যবাদিতা শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান মাধ্যম। যে ব্যক্তি সত্যবাদিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তার সিফাতের মধ্যে পূর্ণতা আসে, চরিত্রে উন্নতি সাধিত হয় এবং সাথে সাথে সৌভাগ্যও লাভ করতে সক্ষম হয় সে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
'এটি সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য উদ্যান রয়েছে, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। '৭৩
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে,
أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا عَمَلُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: «الصَّدْقُ، وَإِذَا صَدَقَ الْعَبْدُ بَرَّ، وَإِذَا بَرَّ آمَنَ، وَإِذَا آمَنَ دَخَلَ الجَنَّةَ»، قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا عَمَلُ النَّارِ؟ قَالَ: «الْكَذِبُ إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ فَجَرَ، وَإِذَا فَجَرَ كَفَرَ، وَإِذَا كَفَرَ دَخَلَ يَعْنِي النَّارَ
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, জান্নাতে যাওয়ার আমল কী?' তিনি বললেন, 'সত্যবাদিতা। বান্দা যখন সত্য কথা বলে, তখন সৎ হয়ে যায়। যখন সে সৎ হয়, তখন তার ইমান পূর্ণ হয়। আর ইমান পূর্ণ হলে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কী কাজ করলে জাহান্নামে যেতে হয়?' তিনি বললেন, 'মিথ্যা। বান্দা যখন মিথ্যা বলে, তখন পাপী হয়। আর সে পাপী হলে কুফুরি করে এবং কুফুরি করলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। ৭৪
জনৈক দার্শনিকের মতে, 'মিথ্যা হলো সকল পাপের সমন্বয়কারী এবং সকল অন্যায়ের প্রধান কারণ। কেননা, মিথ্যা পরনিন্দা ডেকে আনে এবং পরনিন্দা পরস্পরের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আর বিদ্বেষ থেকেই তৈরি হয় একের সাথে অন্যের শত্রুতা। আর কারও মাঝে শত্রুতা তৈরি হয়ে গেলে সেখানে কোনো নিরাপত্তা ও সুখ থাকে না।'
এক বেদুইন তার ছেলেকে মিথ্যা বলতে দেখে বলল, 'হে বৎস, মিথ্যা রবের কাছ থেকে শাস্তি ডেকে আনে। যদি সে সত্যও বলে, কেউ সত্যায়ন করে না তার কথাকে। যদি সে ভালো কিছুর ইচ্ছা করে, তা বাস্তবায়ন করার মতো তাওফিক হয় না। তার থেকে কোনো সত্য পাওয়া গেলেও তা অন্যের দিকে নিসবত করা হয় এবং অন্যের থেকে কোনো মিথ্যা প্রকাশ পেলেও তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়।'
অনেকে রসিকতা করে মিথ্যা বলাকে খুবই স্বাভাবিক মনে করে। তারা মনে করে, হেলাখেলা ও মজার ছলে মিথ্যা বলার মাঝে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলাম বিনোদনের অনুমোদন দিলেও মিথ্যার মাধ্যমে বিনোদনের অনুমোদন দেয়নি। বরং বিনোদন হতে হবে সত্যের গণ্ডির ভেতরে।
রাসূল ইরশাদ করেন:
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ بِالحَدِيثِ لِيُضْحِكَ بِهِ القَوْمَ فَيَكْذِبُ، وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
'ধ্বংস হোক সেই লোক, যে লোকদের হাসানোর জন্য কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।' ৭৫
তিনি আরও বলেন:
لَا يُؤْمِنُ الْعَبْدُ الْإِيمَانَ كُلَّهُ حَتَّى يَتْرُكَ الْكَذِبَ فِي الْمُزَاحِ، وَالْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ صَادِقًا
'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না মজার ক্ষেত্রে মিথ্যা পরিহার করবে এবং নিজে সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও তর্কবিতর্ক পরিহার করবে।' ৭৬
টিকাঃ
৭৩. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১১৯।
৭৪. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৪১।
৭৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৩১৫।
৭৬. মুসনাদু আহমাদ: ৮৭৬৬।
📄 লজ্জাবোধের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
বিবেক যা কিছুকে মন্দ হিসেবে গ্রহণ করে এবং খালিক ও মাখলুক যেসব কাজকে অপছন্দ করে, সেসব থেকে লজ্জা মানুষকে বাধা প্রদান করে। লজ্জাবোধ মানুষের উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক। যা মানুষকে খারাপ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ করে। পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। সুতরাং যে ব্যক্তি লজ্জাহীন হয়ে পড়বে, সে লাঞ্ছিত এবং সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে।
আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ
'যে কেউ নিজের সংশোধন করে, সে সংশোধন করে স্বীয় কল্যাণের জন্যই। আর আল্লাহর নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।' ৭৭
রাসুল ইরশাদ করেন:
الْحَيَاءُ مِنَ الإِيمَانِ، وَالإِيمَانُ فِي الجَنَّةِ، وَالبَذَاءُ مِنَ الجَفَاءِ، وَالجَفَاءُ فِي النَّارِ
'লজ্জা ইমানের অঙ্গ। আর ইমানের স্থান জান্নাতে। অশ্লীলতা দুর্ব্যবহারের অঙ্গ। আর দুর্ব্যবহারের স্থান জাহান্নামে।'৭৮
জনৈক বিজ্ঞজন বলেছিলেন, 'লজ্জা যে ব্যক্তির পোশাকে পরিণত হয়েছে, মানুষ কখনো তার কোনো দোষ-ত্রুটি দেখতে পাবে না।'
অপর একজন বলেন, 'শিশুর মাঝে লজ্জাবোধ থাকা ভয়ভীতি থাকার চেয়েও উত্তম। কেননা, লজ্জাবোধ বিবেক জাগ্রত করে আর ভয়ভীতি ভীরুতা শেখায়।'
টিকাঃ
৭৭. সুরা ফাতির, ৩৫: ১৮।
৭৮. মুসনাদু আহমাদ: ১০৫১২, সুনানুত তিরমিজি: ২০০৯।