📄 বিপদে ধৈর্যধারণের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
দুনিয়াতে বিপদ, মুসিবত আর পরীক্ষার অভাব নেই। মুমিন ভালো করেই জানে, দুনিয়া হলো পরীক্ষার জায়গা। যেকোনো মুহূর্তে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। তবে যারা এসব বিপদ ও পরীক্ষায় আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক আচরণ করে, তারাই সফল হয়।
শুরাইহ বলেন, 'আমি কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি।
- এর চেয়েও আরও বড় কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হয়নি বলে একবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করি।
– আল্লাহ তাআলা আমাকে বিপদে সবর করার শক্তি দিয়েছেন বলে দ্বিতীয়বার কৃতজ্ঞতা আদায় করি।
- বিপদে পড়ে )إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ(৬৭ বলে আল্লাহর কাছে আশ্রিত হওয়ার তাওফিক দেওয়ায় তৃতীয়বার কৃতজ্ঞতা আদায় করি।
- আমার দ্বীনি কোনো বিষয়ে বিপদ দেননি বিধায় চতুর্থবার শুকরিয়া আদায় করি।'
মুমিন ব্যক্তি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাআলা ক্ষতি করার জন্য কোনো বিপদের সম্মুখীন করেন না এবং বিপদে ফেলার জন্য তার দ্বারা ভুল করান না। তিনি ইরশাদ করেন :
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ - لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
'পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে, আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য বলা হয়, যাতে তোমরা যা হারাও, তজ্জন্যে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তজ্জন্যে উল্লসিত না হও। আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না। '৬৮
আমাদের চেয়েও কঠিন বিপদ ও পরীক্ষার শিকার হয়েছেন আম্বিয়া এবং সালিহিনগণ। এমনকি সৃষ্টির সেরা মানব মুহাম্মাদ -ও এর থেকে বাদ পড়েননি। সবকিছু সত্ত্বেও তাঁরা ধৈর্যধারণ করেছেন এবং আল্লাহর কাছেই আশ্রয় খুঁজেছেন।
মুমিনরা যেন অন্তরে এ কথা গেঁথে নেয়, তার প্রতিটি বিষয় তার জন্য কল্যাণকর। রাসুল ইরশাদ করেন:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
'মুমিনের বিষয়টাই আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর। এটা মুমিন ব্যতীত আর কারও জন্য নয়। তার সুখ এলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে; ফলে এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আবার বিপদের সম্মুখীন হলে সে ধৈর্যধারণ করে; ফলে এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। '৬৯
দ্বীনের মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত মানবহৃদয় কখনো আল্লাহর কাছে আশ্রিত না হয়ে প্রশান্ত হয় না। তিনি ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।'৭০
দুআ, ইসতিগফার, সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নিতে হয়। আমরা যেন সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত না হই, যারা কেবল দারিদ্র্য, অসুস্থতা বা পরীক্ষার সময়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় খোঁজে। অতঃপর বিপদ বা দারিদ্র্য কেটে গেলে কিংবা সুস্থ হয়ে গেলে নিয়ামতের কথা ভুলে যায়। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِهِ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّ كَأَنْ لَمْ يَدْعُنَا إِلَى ضُرَّ مَسَّهُ كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, তখন শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দিই, সে কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয় কখনো কোনো কষ্টেরই সম্মুখীন হয়ে যেন আমাকে ডাকেইনি। এমনিভাবে মনঃপূত হয়েছে নির্ভয় লোকদের যা তারা করেছে। '৭১
টিকাঃ
৬৭. 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।' (সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫৬)
৬৮. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ২২-২৩।
৬৯. সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯।
৭০. সুরা আর-রাদ, ১৩: ২৮।
৭১. সুরা ইউনুস, ১০: ১২।
📄 প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
যে ব্যক্তি প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রবৃত্তি কখনো তার ওপর প্রভাব খাটাতে গেলে উলটো সে প্রবৃত্তির ওপর প্রভাব খাটায়, সে-ই প্রকৃত বুদ্ধিমান এবং প্রবৃত্তির ওপর প্রভাব বিস্তারকারী। দুনিয়া ও আখিরাতে সে সৌভাগ্যবান হতে পারবে।
এক শাসক তার সময়ের একজন দুনিয়াবিরাগী আলিমের কাছে গমন করল। তার গৃহে প্রবেশ করেই সালাম দিল। আলিম তার প্রতি কোনো মনোযোগ না দিয়ে বেখেয়ালিভাবেই সালামের উত্তর দিয়েছেন। এই দেখে বাদশাহ রেগে গিয়ে বলল, 'আপনি আমার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন না কেন?! আমি তো এই রাজ্যের রাজা।' আলিম মৃদু হেসে বললেন, 'যেখানে আমার গোলামরা তোমার বাদশাহ হয়ে বসে আছে, সেখানে আবার তুমি আমার বাদশাহ হও কীভাবে?!' রাজা বলল, 'তারা কারা?' আলিম বললেন, 'তারা হলো কুপ্রবৃত্তি। কুপ্রবৃত্তি তোমার রাজা; কিন্তু আমার গোলাম।'
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রবৃত্তির নিন্দা করেছেন এবং প্রবৃত্তির অনুসরণকে প্রবৃত্তির ইবাদত বলে ঘোষণা করেছেন। কেননা, কারও ওপর প্রবৃত্তি চেপে বসলে তা তার পুরো সময়কে নিয়ে নেয়, চিন্তা ও মস্তিষ্ককে তার কাজেই ব্যস্ত করে রাখে; ফলে বান্দা আল্লাহকে ভুলে যায়, শরিয়তের কথা তার মনে থাকে না এবং প্রবৃত্তির কামনাবাসনা চরিতার্থ করার জন্য হালাল-হারাম যেকোনো কাজ করে বসে। তাই তো আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا
'আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার জিম্মাদার হবেন?'৭২
টিকাঃ
৭২. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৪৩।
📄 তাওবার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
যেকোনো গোলামের জন্য তার মালিকের দাসত্ব করা এবং অবাধ্যতা না করা প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য।
উমর বিন আব্দুল আজিজের এক গোলাম তার অবাধ্যতা করায় তিনি গোলামকে প্রহার করার জন্য বেঁধে রেখেছেন। গোলাম বলল, 'হে মনিব, কেন মারছেন আমাকে?' তিনি বললেন, 'কারণ, তুমি অমুক অপরাধ করেছ।' গোলাম বলল, 'আপনি কি কখনো এমন কোনো পাপ করেছেন; যার ফলে আপনার মনিবের রাগ চেপে বসতে পারে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ করেছি।' গোলাম বলল, 'তিনি কি আপনাকে তাৎক্ষণিক শাস্তি দিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'না।' গোলাম বলল, 'তাহলে আমাকে কেন দ্রুত শাস্তি দিচ্ছেন; অথচ তিনি আপনাকে দ্রুত শাস্তি দেননি?' উমর বললেন, 'দাঁড়াও, যাও তুমি আজ থেকে মুক্ত।' এরপর উমর বিন আব্দুল আজিজ তাওবা করে নিলেন।
বলা হয়ে থাকে, বিশর আল-হাফি এক রাতে তার প্রাসাদে অবস্থান করছিলেন। দরজায় তার এক গোলাম নিয়োজিত ছিল। সে পাপী ছিল। রাতে তার দরজায় এক লোক এসে গোলামকে বলল, 'এই প্রাসাদের মালিক স্বাধীন নাকি গোলাম?' গোলাম বলল, 'আমার মুনিব তো একজন স্বাধীন মানুষ।' লোকটি বলল, 'তুমি সত্য বলেছ। যদি গোলামই হতো, তাহলে দাসত্বের জায়গাটা রক্ষা করত। কিন্তু সে আল্লাহর অবাধ্যতা করে কেন?'
বিশর কথাটি শুনতে পেয়ে খালি পায়ে হেঁটে তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কী যেন বলেছিলে?' লোকটি পুনরায় কথাটি উপস্থাপন করল। অতঃপর বিশর তাওবা করতে করতে ফিরে গেল এবং ইলম অন্বেষণ ও ইবাদতে আত্মনিয়োগ করল এবং সততার সাথে পথ চলতে শুরু করল। এরপর সারা জীবন খালি পায়েই অতিবাহিত করল। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি জুতো পরিধান করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমার রব আমাকে যখন সৎ বানিয়েছিলেন, তখন আমি খালি পায়ে ছিলাম। তাই সারা জীবন আমি খালি পায়েই কাটাব!'
হাসান বলেছেন, 'একটি জাতি ক্ষমা পাওয়ার আশায় উদাসীন চলাফেরা করত। এমনকি তারা তাওবা না করেই দুনিয়া ত্যাগ করল। তাদের একজন বলত, "আমি তো আমার রবের প্রতি সুধারণা রাখি।" কিন্তু সে মিথ্যা বলত। যদি সুধারণাই রাখত, তাহলে অবশ্যই নেক আমল করত।'
📄 ইখলাসের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে
ইখলাস ও রিয়া অর্থাৎ একনিষ্ঠতা ও লৌকিকতা দুটো ভিন্ন জিনিস। একটি আরেকটির সাথে কখনো মিলিত হয় না। মুখলিস বা একনিষ্ঠ ব্যক্তি সর্বদা তার প্রতিপালকের প্রতি আস্থা রাখে। নিজের কথা ও কাজে সত্যতার প্রমাণ দেয়। সে জানে, সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। তাই তার কাছে মানুষের প্রশংসা বা দুর্নাম এবং ক্ষতি ও উপকার দুটোই সমান। যতদিন বেঁচে থাকে, প্রতিপালককে খুশি করে এবং তাঁর আনুগত্য করেই বেঁচে থাকে।
ইখলাসের একটি দৃষ্টান্ত হলো, একসময় মুসলিম সেনাবাহিনী শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য একটি দুর্গকে কয়েক মাস অবরোধ করে রেখেছিল। এক রাতে একজন সৈন্য সেনাপ্রধানের কাছে এসে বলল, 'আমি তো দেয়ালে একটি ছিদ্র করেছি। সেখান দিয়ে শহরের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে। তাই আমার সাথে এমন কাউকে পাঠান, যে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমরা ভেতরে ঢুকে যখন দরজা খুলে দেবো, সাথে সাথে আমাদের পুরো সেনাবাহিনী প্রবেশ করতে পারবে।' তার কথা শুনে সেনাপতি কয়েকজন সৈন্য পাঠাল। তারা ভেতরে ঢুকে দরজা খুলে দিল। অতঃপর সেনাপ্রধানসহ সকলেই শহরে প্রবেশ করল এবং রাতের মধ্যেই শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।
দ্বিতীয় দিন দেয়ালে ছিদ্রকারী সৈন্যকে ডাকা হলো তার বীরত্বের পুরস্কার দেওয়ার জন্য। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। তৃতীয় দিন তাকে ডাকা হলো, কোনো পুরস্কারের ঘোষণা ছাড়াই। কিন্তু কেউই সাড়া দিল না। চতুর্থ দিন যখন ডাকা হলো, তখন এক সৈনিক সেনাপ্রধানের কাছে এসে বলল, 'আমি আপনাকে ছিদ্রকারীর কাছে নিয়ে যাব।' সেনাপ্রধান বললেন, 'কোথায় সে?' সৈনিক বলল, 'আপনাকে তার কাছে যেতে হলে তার দেওয়া তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।' সেনাপ্রধান বললেন, 'ঠিক আছে, তার শর্ত মানব। কী কী শর্ত বলো।' সে বলল, 'তার শর্ত তিনটি হলো : তাকে তার কর্মের জন্য কোনো পুরস্কার দিতে পারবেন না, কাউকে তার কথা বলতে পারবেন না এবং দ্বিতীয়বার তাকে তলব করতে পারবেন না।' সেনাপ্রধান বললেন, 'আচ্ছা ঠিক আছে, মেনে নিলাম শর্ত।' অতঃপর সৈনিক বলল, 'আমিই ছিদ্রকারী। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই ছিদ্র করেছিলাম।' অতঃপর সে চলে গেল। সেনাপ্রধান হতবাক হয়ে গেলেন তার আচরণে। অতঃপর তিনি যখনই সালাত আদায় করতেন, ছিদ্রকারীর সাথে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করতেন।