📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 পরিস্থিতি ও আল্লাহভীরুতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 পরিস্থিতি ও আল্লাহভীরুতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


মানুষের স্বভাবের সাথে দুনিয়া ও আসবাবের প্রেম জড়িয়ে আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَابِ
'মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তানসন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ- রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি ও খেত-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। '৫২
দুনিয়া কিছু মানুষের বিবেক বুদ্ধি চুষে খেয়ে ফেলেছে। ফলে তারা দুনিয়া অর্জনের লালসায় সর্বদা তৎপর। তাদের আগ্রহের সবটুকু শক্তি শুধু দুনিয়ারই জন্য। যেমনটি রাসুল বলেছেন:
لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لَا بْتَغَى ثَالِثًا، وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ
'যদি আদম-সন্তানের সম্পদের দুটি উপত্যকা থাকে, তাহলে সে তৃতীয় আরেকটি কামনা করতে থাকবে। বস্তুত মাটি ছাড়া আদম-সন্তানের পেট কখনোই পরিপূর্ণ হবে না। আর যে তাওবা করবে, আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করবেন।৫৩
আবার কিছু মানুষ দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টির জন্যই আমল করে। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার জীবনে যতখানি রিজিক দান করেছেন, ততটুকুই ভোগ করে এবং এতেই সন্তুষ্ট থাকে। একজন মুমিনের জীবন এমনই হওয়া উচিত। এটাই পরিতুষ্টি ও প্রশংসনীয় জীবন।
কিছু মানুষ দুনিয়ার ভোগবিলাস ও চাকচিক্য পেয়েও এগুলোকে সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী মনে করে। তাই দুনিয়া থেকে কেবল ততটুকুই গ্রহণ করে, যা না হলে নয় এবং হালাল পন্থায় ততটুকু উপার্জন করে, যতটুকু জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট।
আর কিছু মানুষ আল্লাহভীরুতার এমন উচ্চ স্তরে উন্নীত হয়, যেখানে খুব কম মানুষই পৌঁছতে পারে। এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ স্তর।
জনৈক আলিম তার স্ত্রীর হাতে বুনন করা জামা পরিধান করত। একদিন স্ত্রীর হাতে বানানো নতুন জামা পরিধান করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শরীরে খুব চুলকানি অনুভব করল। তাই জামা খুলে ফেলার জন্য স্ত্রীকে খুব পীড়াপীড়ি করল। অতঃপর জিজ্ঞাসা করল, 'এই জামাটি কীভাবে বানালে?' জবাবে স্ত্রী বলল, 'এই জামার কিছু অংশ আমি সড়কের আলো দিয়ে বুনন করেছি।' এ কথা শুনে আলিম জামাটি সদাকা করে দিল।
এক মহিলা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর কাছে এসে জানতে চাইল, 'আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মশাল নিয়ে রাতে টহল দেওয়া হয়। আমাদের বাড়ির সামনে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়েও থাকে। তাই আমার জন্য তাদের আলো দ্বারা কাপড় বুনন করা ঠিক হবে কি?' ইমাম আহমাদ বললেন, 'কে তুমি?' মহিলা বলল, 'আমি বিশর আল-হাফির বোন।' ইমাম আহমাদ বললেন, 'তোমাদের বাড়ি থেকে তাকওয়া উঠে গেছে। এ কাজ কিছুতেই তোমার জন্য বৈধ হবে না।'
ইমাম আবু হানিফা বাগদাদের এক ব্যক্তির কাছে কিছু ঋণের অর্থ পাওনা ছিলেন। তাই তিনি কয়েকজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে দ্বিপ্রহরে তার কাছে গেলেন। প্রচণ্ড গরম ছিল। আবু হানিফা ঋণগ্রহীতার দরজায় করাঘাত করে দরজা থেকে খানিক দূরে এসে দাঁড়ালেন। কারণ, দরজার সামনে গরমের উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য ওপরে ছাদ ছিল। এই অবস্থা দেখে এক ছাত্র জিজ্ঞাসা করল, 'আমরা কেন ছাদের ছায়া ছেড়ে রোদের মধ্যে এসে দাঁড়ালাম?' উত্তরে তিনি বললেন, 'এই ছাদের মালিক আমার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে; তাই তার ছাদের নিচে দাঁড়ানো ঋণ দিয়ে ফায়দা গ্রহণের সমতুল্য। এটি সুদের সাথে সাদৃশ্য রাখে!'
জনৈক ধনী ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। তিনি তাসবিহ-পাঠে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় এক ভিক্ষুক তার কাছে এসে কিছু অর্থ চাইল। কিন্তু তিনি তাসবিহ-পাঠে মনোযোগী থাকায় ভিক্ষুকের প্রতি লক্ষ করেননি। কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো, কেউ একজন তার কাছে কিছু চেয়েছিল। সাথে সাথে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। অতঃপর দেখলেন, লোকটি বসে বসে রুটির টুকরো খাচ্ছে। অতঃপর ভিক্ষুকের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে অর্থ দিতে চাইলে সে নিচ্ছিল না। সে বলল, 'এখন আমার প্রতিপালক আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে দিয়েছেন। আবার প্রয়োজন হলে তোমার কাছে চাইব!'
একদা কাবা-চত্বরে খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক সালিম বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর-কে বললেন, 'আমার কাছে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিস চাও।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তাঁর ঘরের পাশে বসে তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে চাইতে লজ্জাবোধ করি।' অতঃপর মসজিদে হারাম থেকে বের হওয়ার পর আবার বললেন, 'এখন তো বাইতুল্লাহ থেকে বেরিয়েছ, এবার চাও।' তিনি বললেন, 'দুনিয়ার প্রয়োজন চাইব নাকি আখিরাতের?' খলিফা বললেন, 'দুনিয়ার প্রয়োজনের কথা বলো।' এ কথা শুনে সালিম বললেন, 'যে সেগুলোর মালিক, কেবল তার কাছেই চাইব; কিন্তু যে এগুলোর মালিকই নয়, তার কাছে কীভাবে চাইব!'৫৪
হাতিম আল-আসাম্ম তার সন্তানদের বলল, 'আমি হজ করতে চাই।' সন্তানরা কান্না করতে করতে বলল, 'তাহলে আমাদের কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?' তাদের এই অবস্থা দেখে বড় মেয়ে বলল, 'বাবাকে যেতে দাও। তিনি তো রিজিকদাতা নন।' অতঃপর হাতিম হজের সফরে বেরিয়ে পড়ল। ঘরে খাওয়ার কিছুই ছিল না। সকলেই ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে রাত্রিযাপন করছিল আর বড় মেয়েকে ভর্ৎসনা করছিল। তাই বড় মেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করল, 'হে আল্লাহ, তাদের কাছে আমাকে অপমানিত করবেন না।'
সেদিন তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে দেশের গভর্নর যাচ্ছিলেন। বাড়িতে ঢুকে পানি পান করতে চাইলেন। হাতিমের সন্তানরা একটি নতুন জগে করে তাকে ঠান্ডা পানি পান করালো। গভর্নর পান করে বললেন, 'এটা কার বাড়ি?' তারা বলল, 'এটা হাতিম আল-আসাম্মের বাড়ি।' অতঃপর তিনি বাড়ির দিকে একটি স্বর্ণের মালা ছুড়ে মারলেন এবং সঙ্গীদের বললেন, 'তোমাদের যারা আমাকে ভালোবাসে, তারা যেন আমার মতোই এই কাজটি করে।' এ কথা শুনে সকলেই স্বর্ণের মালা ছুড়তে শুরু করল। পরিস্থিতি দেখে বড় মেয়ে কান্না করতে করতে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে। তার মা বলল, 'তুমি কেন কান্না করছ? আল্লাহ তো আমাদের প্রশস্ততা দান করছেন।' উত্তরে মেয়ে বলল, 'একজন মাখলুক আমাদের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়ায় আমরা ধনী হয়ে গেছি। যদি খালিক আমাদের দিকে তাকাতেন, তাহলে কী অবস্থাই না হতো আমাদের?!'
ইমাম তাবারি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উমর বিন আব্দুল আজিজ খিলাফতের দায়িত্বে থাকাকালে এক ব্যক্তিকে আট দিরহাম দিয়ে একটি পোশাক কিনতে পাঠালেন। লোকটি পোশাক কিনে উমর বিন আব্দুল আজিজের নিকট নিয়ে এলো। তিনি পোশাকের ওপর হাত রেখে বললেন, 'কত সুন্দর ও নরম পোশাক এটি!' এ কথা শুনে লোকটি মুচকি হাসল। উমর বিন আব্দুল আজিজ তাকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আমার হাসির কারণ হলো, আপনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে একদিন আমাকে রেশম ও পশমের তৈরি এক ধরনের বিশেষ কাপড় ক্রয় করতে বলেছেন। অতঃপর আমি এক হাজার দিরহাম দিয়ে সেটি ক্রয় করে এনেছি। তখন আপনি কাপড়টির ওপর হাত রেখে বলেছেন, "এটি অনেক শক্ত!” অথচ আজ আপনি মাত্র আট দিরহাম দ্বারা কাপড় ক্রয় করছেন!' লোকটির কথা শুনে উমর বিন আব্দুল আজিজ বললেন, 'আমি মনে করি, যে লোক এক হাজার দিরহাম দিয়ে কাপড় ক্রয় করে, সে আল্লাহকে ভয় করতে পারে না। শোনো...! আমার একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হৃদয় আছে। যখন আমি কোনো অবস্থান অর্জন করি, তখন তার চেয়ে উন্নত অবস্থানের আশা করতে থাকি। একসময় আমি ইমারতের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। তারপর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। আবার খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার হৃদয় সবচেয়ে বড় স্থানটি অর্জন করতে উদগ্রীব হয়ে আছে। তা হলো জান্নাত!'
কিছু মানুষ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত কল্যাণের চেয়েও অল্পে তুষ্ট থাকতে চায়। কারণ, তারা অন্যদের জন্য কল্যাণের একটি অংশ রেখে যেতে চায়; যাতে তাদের মতো অন্যরাও কল্যাণ পায়।
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস তাঁর ছেলেকে বলেছেন, 'হে বৎস, ধনাঢ্যতা চাইলে পরিতুষ্টি সহকারে চাও। কেননা, যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে পরিতুষ্টি না দেন, তাহলে কোনো সম্পদই তোমাকে ধনী করতে পারবে না।'
রাসুল কতই না চমৎকার বলেছেন! তিনি ইরশাদ করেন :
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيرَتْ لَهُ الدُّنْيَا
'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকালে উপনীত হয় এবং তার নিকট একদিনের খাবার আছে, তবে তার জন্য যেন গোটা দুনিয়াটাই একত্র করা হলো।'৫৫
সুতরাং যাদেরকে আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দেন এবং নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দেন, তারা কতই না সৌভাগ্যবান!
সুখী সে নয়, যে যা চায় তা-ই পায়। বরং সবচেয়ে বেশি সুখী সে, যে তার কাছে যা আছে, তাতে সন্তুষ্ট থাকে।
মানুষ (القناعة) তথা 'পরিতুষ্টি' কথাটির সাথে জুলুম করেছে। ড. ইউসুফ কারজাবি (مشكلة الفقر وكيف عالجها الإسلام) নামক গ্রন্থে এমনটিই বলেছেন। তারা (القناعة) দ্বারা না পাওয়া ও লাঞ্ছনার জীবনের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং সবকিছুতে সর্বোচ্চ অবস্থান অর্জনের প্রতি দুর্বল মানসিকতাকে বোঝায়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অধিকার বঞ্চিত হওয়া ও দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পড়ে থাকাকে তারা (القناعة) মনে করে! এ সবই স্পষ্ট ভুল ধারণা। মানুষের মাঝে স্বভাবতই দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ ও লোভ-লালসা থাকে। দ্বীন মানুষকে ধনাঢ্যতা অর্জনের পথে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে শেখায় এবং এমন সব বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখে, যেগুলো দেহ ও মন দুটোর জন্যই ক্ষতিকর।
রাসুল ইরশাদ করেছেন:
أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا اللهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ، فَإِنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَوْفِيَ رِزْقَهَا وَإِنْ أَبْطَأَ عَنْهَا، فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ، خُذُوا مَا حَلَّ، وَدَعُوا مَا حَرُمَ
'হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। কেননা, কোনো ব্যক্তিই তার জন্য নির্ধারিত রিজিক পূর্ণরূপে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না; যদিও তার রিজিক প্রাপ্তিতে কিছু বিলম্ব হয়। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল, তা-ই গ্রহণ করো এবং যা হারাম, তা বর্জন করো। '৫৬
(القناعة)-এর একটি অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যা কিছু দান করেছেন এবং যেগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তাতে সন্তুষ্ট থাকা। সুতরাং যা কিছু অর্জন করা সহজ ও সম্ভব নয়, তা পাওয়ার আশা নিয়ে যেন কেউ সময় না কাটায়। এমন কিছু যেন আশা না করে, যা অন্যকে দেওয়া হয়েছে; অথচ তাকে দেওয়া হয়নি। এমন আশা করা সেই বৃদ্ধের মতো, যে বুড়ো বয়সে যৌবনের শক্তি পেতে চায় এবং সেই ছোট যুবকের মতো, যে লম্বা মানুষকে দেখে নিজে খাটো হওয়ার কারণে আফসোস করে!
সালিহিনদের কেউ একজন বলেছিলেন, 'হে আদম-সন্তান, যতদিন আল্লাহর ধনভান্ডার থাকবে, ততদিন রিজিকের সংকীর্ণতার চিন্তা কোরো না। আর আল্লাহর ভান্ডার তো কখনো ফুরাবে না। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে আশ্রয় গ্রহণ কোরো না। যদি তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে আশ্রয় গ্রহণ করো, তাহলে পুরো কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলে। আল্লাহ তোমার ভাগে যা কিছু বণ্টন করে রেখেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো। তাহলে দেহ-মনে শান্তি পাবে। আল্লাহর কাছে আগামী দিনের রিজিক চেয়ো না-যেমনিভাবে তিনি তোমার কাছে আগামী দিনের আমল কামনা করেন না। কেননা, তিনি তো ভুলে যান না, কে তাঁর অবাধ্যতা করেছে। সুতরাং যে তাঁর আনুগত্য করেছে, তার কথা কীভাবে ভুলবেন?! তা ছাড়া তিনি তো সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।'

টিকাঃ
৫২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৪।
৫৩. সহিহুল বুখারি: ৬৪৩৬।
৫৪. মিন কুনুজিল ইসলাম, ড. মুহাম্মাদ ফায়িজ আল-মাত্ত।
৫৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৬।
৫৬. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২১৪৪।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 নেক আমলের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 নেক আমলের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


যাদের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে এবং তারা নেক আমল করে, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে উত্তম জীবনযাপনের ওয়াদা দিয়েছেন। আর পরকালে আমলের চমৎকার প্রতিদান দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ইমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরস্কার দেবো, যা তারা করত। '৫৭
উক্ত আয়াতে আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ(-এর মধ্যে জীবনের সব ধরনের শান্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ( দ্বারা উত্তম ও হালাল রিজিককে বোঝানো হয়েছে।
আলি )حَيَاةُ طَيِّبة(-এর দ্বারা )القَنَاعَة( বা পরিতুষ্টি বুঝিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস-এর মতে, এটি হলো )السَّعَادَة( বা সৌভাগ্য।
জাহহাক-এর মতে )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ( হলো, দুনিয়াতে হালাল রিজিক অন্বেষণ করা এবং ইবাদত করা।
তবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতামত হলো, )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ(-এর মধ্যে এই সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত আছে। ৫৮

টিকাঃ
৫৭. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৯৭।
৫৮. তাফসিরু ইবনি কাসির।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 আল্লাহর স্মরণের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 আল্লাহর স্মরণের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


ড. মুস্তফা আস-সিবায়ি বলেন, 'যদি নফস গুনাহ করতে চায়, তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দাও। তাতে যদি ফিরে না আসে, তাহলে মানুষের চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দাও। যদি এতেও বিরত না থাকে, তাহলে মানুষের মাঝে জানাজানি হওয়ার পর লজ্জাজনক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দাও। যদি তাতেও বিরত না থাকে, তাহলে মনে রেখো, তুমি সেই মুহূর্তে হায়াওয়ানের কাতারে গিয়ে পৌঁছেছ।'৫৯

টিকাঃ
৫৯. হাকাজা আল্লামাতনিল হায়াত, ড. মুস্তফা আস-সিবায়ি।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 নিয়ামতদাতার কৃতজ্ঞতা আদায়ের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 নিয়ামতদাতার কৃতজ্ঞতা আদায়ের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


অধিকাংশ মানুষ ধারণা করে, আমাদের ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত হলো সম্পদ। অথচ যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে অবশ্যই দেখতে পাব, ধনী-গরিব নির্বিশেষে আমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কোনো হিসেব নেই। অগণিত নিয়ামত তিনি আমাদের দিয়ে রেখেছেন। দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি, বিবেক, পরিবার, সন্তানসন্ততি, সুস্থতা, আলো, বাতাস, পানি ইত্যাদি অসংখ্য নিয়ামত আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করে যাচ্ছি। এগুলো তো কিছু মাত্র। তিনি বলেন:
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
'যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। '৬০
হাসান বলেন, 'যে ব্যক্তি খাবারদাবার ও পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়া তার প্রতি আল্লাহর আর কোনো নিয়ামত চোখে দেখে না, তার জ্ঞানে সীমাবদ্ধতা আছে এবং সে উপস্থিত শাস্তির মধ্যে আছে।'
নিয়ামত হারিয়ে যাওয়ার আগে নিয়ামতের অনুভূতি না থাকা আমাদের জঘন্য উদাসীনতা। অথচ আমরা ঠিকই জানি, কৃতজ্ঞতার দ্বারা নিয়ামত দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর অকৃতজ্ঞতার দ্বারা নিয়ামত দূর হয়ে যায়। তিনি ইরশাদ করেন :
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
'যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, “যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে তোমাদের আরও দেবো; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয় আমার শাস্তি হবে কঠোর।"৬১
আবু হাজিম বলেন, 'যেসব নিয়ামত বান্দাকে আল্লাহর নিকটে পৌঁছায় না, সেগুলো তার জন্য পরীক্ষা।'
তিনি আরও বলেন, 'যখন দেখবে, তোমার অবাধ্যতা সত্ত্বেও আল্লাহ নিয়ামত দিয়েই যাচ্ছেন, তখন তার প্রতি সতর্ক থেকো।'
(سَنَسْتَدرجهم مِنْ حَيْثُ لا يَعْلَمُونَ)৬২ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুফিয়ান বলেন, 'এর উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাদের ভরপুর নিয়ামত দান করেন; অথচ কৃতজ্ঞতা আদায়ের তাওফিক দেন না।'
অবাধ্যতা কল্যাণ ছিনিয়ে নেয় এবং নিয়ামত দূর করে দেয়। আলি বলেন, 'কোনো বিপদ আসলে কোনো না কোনো গুনাহের কারণেই আসে। আর কেবল তাওবার মাধ্যমেই তা উঠিয়ে নেওয়া হয়।' আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ
'তোমাদের ওপর যেসব বিপদাপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।'৬৩
তিনি আরও বলেন:
ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
'তার কারণ এই যে, আল্লাহ কখনো পরিবর্তন করেন না, সেসব নিয়ামত, যা তিনি কোনো জাতিকে দান করেছিলেন, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেই পরিবর্তিত করে দেয় নিজের জন্য নির্ধারিত বিষয়। বস্তুত আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ৬৪

টিকাঃ
৬০. সুরা আন-নাহল, ১৬: ১৮।
৬১. সুরা ইবরাহিম, ১৪:৭।
৬২. 'আমি তাদের ক্রমান্বয়ে পাকড়াও করব এমন জায়গা থেকে, যার সম্পর্কে তাদের ধারণাও হবে না।' (সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৮২)
৬৩. সুরা আশ-শুরা, ৪২: ৩০।
৬৪. সুরা আল-আনফাল, ৮:৫৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00