📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 আত্মার প্রশান্তির মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 আত্মার প্রশান্তির মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


নিঃসন্দেহে আত্মার প্রশান্তি সুখী হওয়ার প্রথম উৎস। জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তারা, যারা ইমান ও বিশ্বাসের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত।
এই প্রশান্তি আল্লাহর দেওয়া রহমত ও নুর। যেখানে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হলে আশ্রয় নেয়, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সময় প্রশান্তি পায়, দুঃখ-দুর্দশার সময় সান্ত্বনা নেয়, ক্লান্ত ব্যক্তি আরামবোধ করে, দুর্বলরা শক্তি গ্রহণ করে এবং দিশেহারা পথভ্রষ্ট মানুষেরা পথের দিশা পায়।
ন্যায়সংগত দৃষ্টির অধিকারীরা জানে, আত্মার প্রশান্তি অর্জনের জন্য সর্বাধিক বিশুদ্ধ, নিরাপদ, উপযোগী ও সঠিক পন্থা হচ্ছে নিষ্কলুষ ঐশী পথ। ধ্বংসাত্মক সন্দেহ, ভীতিকর দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এই পথে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَاسْتَمْسِكْ بِالَّذِي أُوحِيَ إِلَيْكَ إِنَّكَ عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
'অতএব, আপনার প্রতি যে ওহি নাজিল করা হয়, তা দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সরল পথে রয়েছেন।'৩৮
মানুষ বিশ্বাস করে, আমি স্পষ্ট সত্যের ওপর রয়েছি, সিরাতের মুসতাকিমের ওপর অটল রয়েছি। কেবল এই বিশ্বাস দ্বারা আল্লাহর ওহিকে অস্বীকারকারীদের ওপর বিজয়ী হওয়া যাবে না।
ইয়াকিন তথা বিশ্বাসের স্তরে পৌঁছার একমাত্র ও একক পথ হচ্ছে ওহি। ওহি ছাড়া কখনো ইয়াকিন অর্জিত হয় না। ইয়াকিন ছাড়া শান্তি আসে না এবং শান্তি অর্জন করা ছাড়া সৌভাগ্য অর্জিত হয় না।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'আমি বাস্তবে জান্নাত ও জাহান্নام দেখেছি!' অতঃপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'এটা কীভাবে সম্ভব? আপনি দুনিয়াতেই আছেন, তো দেখেছেন কীভাবে?!' তিনি বললেন, 'মূলত রাসুল জান্নাত-জাহান্নাম সরাসরি দেখেছেন। আর আমি তাঁর চোখ দ্বারাই দেখেছি। আমার দৃষ্টি তো সীমালঙ্ঘন করতে পারে বা বিভ্রাট হওয়ার সুযোগ আছে; কিন্তু রাসুল-এর দৃষ্টি তো কখনো সীমালঙ্ঘনও করেনি, বিভ্রাটও হয়নি।'
এমন সন্তোষজনক ইমান দ্বারা মুমিন ব্যক্তি বড় অস্তিত্বের রহস্য অনুধাবন করতে পারে। যখন সে নিজের সূচনা ও সমাপ্তি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারে, তখনই অন্তর থেকে সকল সন্দেহ-সংশয়ের গিট খুলে যায়। জীবন থেকে নানা প্রশ্ন দূর হয়ে যায়।
পক্ষান্তরে বেইমানদের চিন্তাজগৎকে দুনিয়ার বহু চিন্তা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে যায়, অসংখ্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তাদের মাথায় সব সময় ভিড় করে। নিজেকে এবং সমাজকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় ঘুরপাক খেতে থাকে! কিন্তু মুমিন ব্যক্তি এ ধরনের ঝামেলা থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত। নানা ধরনের লক্ষ্য নিয়ে চিন্তা না করে একটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই চেষ্টা করে যায় তারা। তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে গিয়ে মানুষের সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সময় তাদের নেই।
মুমিনদের চিন্তা একটাই। তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সঠিক পথ খুঁজে বের করা। )اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ(”৩৯ বলে প্রত্যেক নামাজে মুমিন আল্লাহর কাছে সেই দুআই করে যাচ্ছে। সঠিক পথ একটাই। যাতে কোনো বক্রতার স্থান নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ sَبِيلِهِ
'তোমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।'৪০
মুমিনের কাছে সুদৃঢ়, সঠিক ও সৃষ্টিগত মাপকাঠি একটাই। তা হলো প্রকৃত শান্তি হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর আনুগত্যের মাঝে। তাঁর নিষেধকৃত বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকার মধ্যে। মুমিন বিশ্বাস করে, এতেই রয়েছে দুনিয়া-আখিরাতের এমনকি গোটা মানবজাতির কল্যাণ।
মুমিনের হৃদয়ের চেয়ে প্রশস্ত হৃদয় আর কারও নেই। যেই মহান সত্তা দৃশ্য ও অদৃশ্যের সবকিছুকে প্রশস্ত করেছেন, তিনি মুমিনের হৃদয়কে প্রশস্ত করেছেন। আল্লাহর অস্তিত্বে সন্দেহ পোষণকারী এবং অবিশ্বাসীর হৃদয়ের চেয়ে সংকীর্ণ আর কোনো হৃদয় নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى - وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا
'তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে।'৪১
সুতরাং আল্লাহর হিদায়াত থেকে বিমুখ মানুষগুলোকে যখন দেখবে, দুনিয়ার বস্তুগত ভোগবিলাসে ডুবে আছে, তখন তাদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বেমালুম হয়ে ধোঁকায় পড়ো না। কেননা, তাদের অন্তরের মধ্যে সংকীর্ণতা ঘাপটি মেরে বসে আছে। আর অন্তর সংকীর্ণ হয়ে গেলে জীবনও সংকীর্ণ হয়ে যায়। অন্তর প্রশস্ত হলে জীবনও প্রশস্ত হয়।
বিপদ ও কষ্টের সময়ে, প্রতিকূলতার কঠিন মুহূর্তে যখন মুমিনরা রবের কাছে আশ্রয় চায় আর দুআ করতে থাকে, তখন মনের মধ্যে কীরূপ প্রশান্তি অনুভব করে! বিপদকালে রাসুল যেভাবে দুআ করতেন, মুমিনরাও সেভাবেই দুআ করে। রাসুল এই দুআ পড়তেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ وَرَبَّ الْأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، رَبَّنَا وَرَبَّ كُلَّ شَيْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذُ بِنَاصِيَتِهِ ، اللهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ، وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
'হে আল্লাহ, আপনি আসমানমণ্ডলীর রব, জমিনের রব, মহান আরশের রব। আমাদের পালনকর্তা এবং সবকিছুর পালনকর্তা। আপনি শস্য ও বীজের সৃষ্টিকর্তা; আপনি তাওরাত, ইনজিল ও কুরআন অবতরণকারী। আমি আপনার নিকট সকল বিষয়ের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই, আপনিই যার নিয়ন্ত্রক। হে আল্লাহ, আপনিই আদি, আপনার আগে আর কিছুই নেই; আপনিই অন্ত, আপনার পরে আর কিছুই নেই; আপনিই প্রকাশ্য, আপনার থেকে প্রকাশ্য আর কিছুই নেই; আপনিই অপ্রকাশ্য, আপনার চেয়ে গোপন আর কিছুই নেই। আমাদের ঋণকে আদায় করে দিন এবং অভাব থেকে আমাদের সচ্ছলতা দান করুন। '৪২
মহানবি মুহাম্মাদ যেদিন রক্তাক্ত কদমে, তায়িফবাসীর আচরণে ব্যথিত ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে তায়িফ থেকে ফিরে এলেন, সেদিন কী এমন প্রশান্তি তাঁর হৃদয়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছে?! হ্যাঁ, তিনি হাতদুটো আকাশের দিকে তুলে ধরেছিলেন। এমন কিছু আবেগাপ্লুত কথামালা দ্বারা আল্লাহকে আহ্বান করছিলেন, যেগুলো আসমানের দুয়ারে কড়া নাড়ছিল। তাই তাঁর হৃদয় প্রশান্ত ও স্থির ছিল। তিনি বলেছেন:
اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي، وَقِلَّةَ حِيلَتِي، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ، أَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، إِلَى مَنْ تَكِلُنِي، إِلَى عَدُوٌّ يَتَجَهَّمُنِي أَوْ إِلَى قَرِيبٍ مَلَكْتَهُ أَمْرِي، إِنْ لَمْ تَكُنْ غَضْبَانَ عَلَيَّ فَلَا أُبَالِي، غَيْرَ أَنَّ عَافِيَتَكَ أَوْسَعُ لِي، أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ، وَصَلَحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، أَنْ تُنْزِلَ بِي غَضَبَكَ أَوْ تُحِلَّ عَلَيْسَخَطَكَ، لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
'হে আল্লাহ, আপনারই নিকট আমি নিজের দুর্বলতা, কৌশল অবলম্বনে অক্ষমতা ও লোকসমাজে অবহেলিত হওয়ার অভিযোগ পেশ করছি। ইয়া আরহামার রাহিমিন, আপনিই সর্বশেষ্ঠ দয়ালু। আপনি আমাকে কার নিকট সোপর্দ করছেন? এমন শত্রুর নিকট-যে আমার প্রতি ভ্রুকুটি করে, নাকি এমন কাছের কারও নিকট-যাকে আপনি আমার ওপর আধিপত্য করার শক্তি দিয়েছেন! যদি আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, তাহলে আমি কারও পরোয়া করি না। তবে যদি আপনার পক্ষ থেকে আমি নিরাপত্তা লাভ করি, তাহলে তা হবে আমার জন্য অধিকতর আনন্দদায়ক। আমি আপনার চেহারার নুর-যার কারণে সকল অন্ধকার আলোকিত হয়েছে এবং যার দ্বারা দুনিয়া-আখিরাতের সকল কার্য সমাধা হয়-সেই নুরের অসিলায় আপনার নিকট পানাহ চাচ্ছি, যেন আপনি আমার ওপর কোনো গজব পতিত না করেন কিংবা আপনি আমার ওপর আপনার ক্রোধ প্রয়োগ না করেন। আপনাকে সন্তুষ্টি করা জরুরি, যতক্ষণ না আপনি সন্তুষ্ট হন। আপনার তাওফিক ব্যতীত না কেউ গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে, আর না নেক কাজে শক্তি অর্জন করতে পারে।'৪৩
দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, অতীত নিয়ে আফসোস করা, বর্তমানের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকা। এগুলো মানুষের মন থেকে শান্তি ও সুখ হরণ করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও প্রধান মাধ্যম। কিছু কিছু মানুষ আছে, কখনো কয়েক মাস বা বছর ধরে বিপদে পড়ে থাকলে দুঃখ-কষ্টগুলোকে বা পুরোনো স্মৃতিগুলোকে বারবার স্মরণ করে আর বলে, 'হায়, যদি এমনটা না করতাম! যদি অমুক কাজটা এভাবে করতাম!'
তাই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মোটিভেশনাল স্পিকারদের পরামর্শ হলো, গতকালকের কষ্টগুলো ভুলে যেতে হবে, আজকের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কারণ, অতিবাহিত সময়গুলো কিছুতেই ফিরে আসবে না।
আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এই বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ছাত্রদের সামনে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমাদের মধ্যে কতজন কাঠ কাটার চেষ্টা করেছ?' এ কথা বলায় অনেক ছাত্রই হাত তুলেছে। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমাদের মধ্যে কতজন কাঠের গুঁড়া কাটার চেষ্টা করেছ? উত্তরে কেউ আর হাত তুলল না। এবার প্রফেসর বললেন, 'স্বভাবতই কারও পক্ষে কাঠের গুঁড়া কাটা সম্ভব নয়। সেগুলো এমনিতেই করাত দ্বারা কর্তিত থাকে। অতীতের সাথে বর্তমানের সম্পর্ক এমনই। তাই যখন অতীতের কোনো ঘটনা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করবে, তখন মনে রেখো, তোমরা কাঠের গুঁড়াকে কাটার চেষ্টা করছ।
ডেল কার্নেগি তার 'দুশ্চিন্তা ছাড়ো' নামক বইয়ে বিভিন্নজনের মতামত উল্লেখ করার পাশাপাশি এই কথাটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি এটাই পেয়েছি যে, যেমনিভাবে চূর্ণ করা আটা-ময়দা চূর্ণ করলে এবং কাঠের গুঁড়িকে নতুন করে কর্তন করার দ্বারা কোনো লাভ হয় না। তেমনই অতীত নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দ্বারা কোনো উপকারই হবে না। তবে দুশ্চিন্তা তোমাকে যা কিছু দেবে, তা হলো ভাঁজ পড়ে যাওয়া একটি চেহারা এবং খাওয়া-দাওয়ার প্রতি অনীহা! ৪৪
মুমিনের জীবনে অনেকগুলো কারণে দুশ্চিন্তা স্থান পায় না। প্রধান কারণ হলো, আল্লাহর ওপর মুমিনের ভরসা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে দেয় না। আল্লাহ তাআলা যতটুকু বণ্টন করে রেখেছেন এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য যা ফয়সালা করেছেন, তাতে মুমিন পুরোপুরি সন্তুষ্ট। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই ন্যায়বিচারক। এ জন্যই সৌভাগ্য, সুখ ও শান্তি হরণকারী দুশ্চিন্তা প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই মুমিনের হৃদয়ে।
আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা লালন করা এবং তাঁর যেকোনো সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা ইত্যাদি থেকেই মুমিনের সৌভাগ্যের উৎপত্তি হয়। এটি এমন এক ভালোবাসা, যা চোখে দেখার সাথে বা নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়; বরং কেবল অন্তরেই অনুভব করা যায়। যার শুরু আছে-নেই কোনো শেষ।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা লালন করা এবং আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসার দ্বারা মুমিনের হৃদয়ে যেই সৌভাগ্যের সৃষ্টি হয়, তা খুব গভীরে প্রোথিত হয়। যার পরে আর কোনো গভীরতা থাকতে পারে না। সত্যবাদী মুমিনরা এই ভালোবাসা ও সৌভাগ্যের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। এর বিনিময় হয় না।
রাসুল ইরশাদ করেন :
ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
'যার মাঝে তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে, সে ইমানের স্বাদ অনুভব করবে : এক. আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সবকিছু থেকে তার কাছে প্রিয় হওয়া। দুই. কাউকে কেবল আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। তিন. কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে সে এমনভাবে ঘৃণা করে, যেমনটা ঘৃণা করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে। '৪৫
উসতাজ নাশআত আল-মিশরি (التي باسما) বইয়ে বলেন:
মুত্তাকিদের ব্যাপারে যে কথাটি বহুল প্রচারিত তা হলো, (অনেকেই বলে থাকে) অমুকের চেহারায় কেমন যেন নূর চমকাচ্ছে। এই নূর আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির অনুভূতির ও চেহারার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা মুচকি হাসির ফলাফল। যেসব দুশ্চিন্তা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষগুলোকে সত্য পথ থেকে দূরে রেখেছে, মুমিনরা সেসবের ঊর্ধ্বে। সেগুলো মুমিনদের আঘাত করতে পারে না। আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের দ্বারা তারা যেকোনো সমস্যার মোকাবিলা করে। নিজের প্রতি বা অন্যের প্রতি জুলুম করে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয় না। তাই তো মুমিনরা সব সময় নিজের প্রতি এবং অন্যদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর নৈকট্য লাভের প্রতি খুবই আগ্রহী থাকে। ৪৬

টিকাঃ
৩৮. সুরা আজ-জুখরুফ, ৪৩: ৪৩।
৩৯. 'আমাদেরকে সরল পথ দেখান।' (সুরা আল-ফাতিহা, ১ : ৬)
৪০. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৫৩।
৪১. সুরা তহা, ২০: ১২৩-১২৪।
৪২. সহিহু মুসলিম: ২৭১৩।
৪৩. আদ-দুআ লিত তাবারানি: ১০৩৬।
৪৪. আল-ইমান ওয়াল হায়াত, ড. ইউসুফ কারজাবি: ৯৩।
৪৫. সহিহুল বুখারি: ১৬, সহিহু মুসলিম: ৪৩।
৪৬. আন-নাবিইয়ু বাসিমান, উসতাজ নাশআত আল-মিশরি।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 সন্তুষ্টির মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 সন্তুষ্টির মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


সবরের চেয়েও সন্তুষ্টির স্তর ওপরে। কেবল তারা এই স্তরে উন্নীত হতে পারে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ ইমান ও সুন্দর ধৈর্যশক্তি দান করেছেন। দেখবে, যারা সর্বদা সন্তুষ্ট থাকে, তারা সব সময় খুশি থাকে এবং রোগব্যাধি, দারিদ্র্য বা বিপদে যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকে। কারণ তারা পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে, যা কিছুই ঘটুক না কেন, তা কেবলই আল্লাহর ইচ্ছায়। এই বিশ্বাসের ফলে তারা যেকোনো কিছুকে নিজেদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত বলে মেনে নেয়।
এ জন্যই রাসুল সর্বদা এই দুআ করতেন: (أَسْأَلُكَ الرِّضَا بَعْدَ الْقَضَاءِ) 'আপনার কাছে আপনার ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার নিয়ামত কামনা করছি।' ৪৭
জাইনুল আবিদিন বলেছেন, 'আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা বিশ্বাসের সর্বোচ্চ স্তর।'
রাসুল আমাদের সন্তুষ্ট লোকদের ব্যাপারে বলেছেন :
وَلَأَحَدُهُمْ أَشَدُّ فَرَحًا بِالْبَلَاءِ مِنْ أَحَدِكُمْ بِالْعَطَاءِ
'তোমাদের কেউ পুরস্কার পেয়ে যতটুকু সন্তুষ্ট হয়, তাদের কেউ বিপদে পড়েও তার চেয়ে বেশি খুশি থাকে।'৪৮
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস-এর দৃষ্টিশক্তি ছিল না। তিনি ছিলেন মুসতাজাবুদ দাওয়া। অর্থাৎ দুআ করার সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করতেন। মানুষজন তাঁর কাছে এসে দুআ করার ফরিয়াদ জানাত। অতঃপর তিনি তাদের জন্য দুআ করলে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করতেন। একদা তাঁকে এক ব্যক্তি বলল, 'হে চাচা, আপনি তো মানুষের জন্য দুআ করেন। সুতরাং যদি আপনার জন্য দুআ করতেন, তাহলে তো আল্লাহ তাআলা আপনার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতেন!' এ কথা শুনে তিনি বলেন, 'হে বৎস, আমার দৃষ্টিশক্তির চেয়েও আমার ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত অধিক চমৎকার ও সুন্দর।'
'একদা সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাসুল-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “কারা সবচেয়ে বেশি বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়?" রাসুল বললেন:
الْأَنْبِيَاءُ، ثُمَّ الْأَمْثَلُ، فَالْأَمْثَلُ، فَيُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبٍ دِينِهِ، فَإِنْ كَانَ رَقِيقَ الدِّينِ ابْتُلِي عَلَى حَسَبٍ ذَاكَ، وَإِنْ كَانَ صُلْبَ الدِّينِ ابْتُلِيَ عَلَى حَسَبٍ ذَاكَ، قَالَ: فَمَا تَزَالُ الْبَلايَا بِالرَّجُلِ حَتَّى يَمْشِيَ فِي الْأَرْضِ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ
"নবিগণ; তারপর যারা নেককার তারা, এরপর যারা নেكকার তারা। মানুষকে তার দ্বীনদারির অনুপাতে পরীক্ষা করা হয়। যদি কেউ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে, তাহলে তাকে সে মোতাবিক পরীক্ষা করা হয়; আর যদি কেউ বেশি ধার্মিক হয়, তাহলে তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। বস্তুত বান্দার ওপর বিপদাপদ লেগেই থাকে, অবশেষে সে এমন অবস্থায় উপনীত হয় যে, সে জমিনে চলাফেরা করে; অথচ তার কোনো গুনাহই বাকি থাকে না। ৪৯
জনৈক বুজুর্গ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। দৃষ্টিশক্তিও চলে যায়। ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ওষুধেও কাজ হচ্ছিল না। এ সময় তারই এক ছাত্র আগমন করল। ছাত্র এসে দেখল, তিনি কান্না করছেন। তাই সে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল এবং ধৈর্য ধরতে বলছিল। ছাত্রের কথা শুনে বুজুর্গ বললেন, 'আমি তো ব্যথার আঘাতে কান্না করছি না; বরং আমি এই খুশিতে কান্না করছি যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে পরীক্ষা করার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন!'
রাসুল বলেন:
مَنِ التَمَسَ رِضَاءَ اللهِ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ، وَمَنِ التَمَسَ رِضَاءَ النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَى النَّاسِ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে-তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও-মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করে-আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে হলেও-আল্লাহ তাআলা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন।৫০
অসন্তুষ্ট ও অভিযোগকারীরা কখনো সুখ ও আনন্দের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না। তাদের পুরো জীবনজুড়ে ঘন কালো অন্ধকারের ছড়াছড়ি। ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট ব্যক্তি সর্বদা বিষণ্ণতা, অবসাদ, সংকীর্ণতা ও দুঃখ-কষ্টের মাঝে ডুবে থাকে। নিজের প্রতি ও আশেপাশের মানুষের প্রতি সংকীর্ণতা অনুভব করে।
আর প্রকৃত মুমিনরা সব সময় নিজের প্রতি এবং মহান প্রতিপালকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। সে বিশ্বাস করে, নিজেই নিজের দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে আল্লাহ তাআলা তাকে যেভাবে পরিচালনা করেন, সেটাই সর্বোত্তম এবং বাবা-মায়ের চেয়েও তার প্রতি আল্লাহ তাআলার রহমত অনেক বেশি। তিনি বলেন, )بيدك الخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ( 'আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল। '৫১
অসন্তুষ্ট ব্যক্তিরা সন্তুষ্টির স্বাদ আস্বাদন থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বরং তারা যে আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত নিয়ামতের মাঝে ডুবে আছে, সেই অনুভূতিই তাদের থাকে না। খুব সহজেই নিয়ামতগুলো পেয়ে যায় তারা। তাই নিয়ামত পেতে পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবুও সব সময় এ কথাই বলে, আমার এই এই জিনিস নেই, আমি এটা এটা করতে চাই। কিন্তু কখনো এটা বলে না, আমার এই এই জিনিস আছে!
পক্ষান্তরে মুমিন ব্যক্তি চতুষ্পার্শ্বের সবকিছুর মাঝে আল্লাহর নিয়ামত খুঁজে পায়। আসমান-জমিনের প্রতিটি অণুর মাঝে রব্বে কারিমের অনুগ্রহ দেখতে পায়। প্রতিটি মুহূর্তে মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।

টিকাঃ
৪৭. আল-আদাব লিল বাইহাকি: ৭৬৯।
৪৮. আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫১০, আল-আদাব লিল বাইহাকি: ৭২৯।
৪৯. মুসনাদু আহমাদ: ১৪৯৪, সুনানুত তিরমিজি: ২৩৯৮।
৫০. সুনানুত তিরমিজি: ২৪১৪।
৫১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ২৬।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 পরিস্থিতি ও আল্লাহভীরুতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 পরিস্থিতি ও আল্লাহভীরুতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


মানুষের স্বভাবের সাথে দুনিয়া ও আসবাবের প্রেম জড়িয়ে আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَابِ
'মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তানসন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ- রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি ও খেত-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। '৫২
দুনিয়া কিছু মানুষের বিবেক বুদ্ধি চুষে খেয়ে ফেলেছে। ফলে তারা দুনিয়া অর্জনের লালসায় সর্বদা তৎপর। তাদের আগ্রহের সবটুকু শক্তি শুধু দুনিয়ারই জন্য। যেমনটি রাসুল বলেছেন:
لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لَا بْتَغَى ثَالِثًا، وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ
'যদি আদম-সন্তানের সম্পদের দুটি উপত্যকা থাকে, তাহলে সে তৃতীয় আরেকটি কামনা করতে থাকবে। বস্তুত মাটি ছাড়া আদম-সন্তানের পেট কখনোই পরিপূর্ণ হবে না। আর যে তাওবা করবে, আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করবেন।৫৩
আবার কিছু মানুষ দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টির জন্যই আমল করে। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার জীবনে যতখানি রিজিক দান করেছেন, ততটুকুই ভোগ করে এবং এতেই সন্তুষ্ট থাকে। একজন মুমিনের জীবন এমনই হওয়া উচিত। এটাই পরিতুষ্টি ও প্রশংসনীয় জীবন।
কিছু মানুষ দুনিয়ার ভোগবিলাস ও চাকচিক্য পেয়েও এগুলোকে সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী মনে করে। তাই দুনিয়া থেকে কেবল ততটুকুই গ্রহণ করে, যা না হলে নয় এবং হালাল পন্থায় ততটুকু উপার্জন করে, যতটুকু জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট।
আর কিছু মানুষ আল্লাহভীরুতার এমন উচ্চ স্তরে উন্নীত হয়, যেখানে খুব কম মানুষই পৌঁছতে পারে। এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ স্তর।
জনৈক আলিম তার স্ত্রীর হাতে বুনন করা জামা পরিধান করত। একদিন স্ত্রীর হাতে বানানো নতুন জামা পরিধান করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শরীরে খুব চুলকানি অনুভব করল। তাই জামা খুলে ফেলার জন্য স্ত্রীকে খুব পীড়াপীড়ি করল। অতঃপর জিজ্ঞাসা করল, 'এই জামাটি কীভাবে বানালে?' জবাবে স্ত্রী বলল, 'এই জামার কিছু অংশ আমি সড়কের আলো দিয়ে বুনন করেছি।' এ কথা শুনে আলিম জামাটি সদাকা করে দিল।
এক মহিলা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর কাছে এসে জানতে চাইল, 'আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মশাল নিয়ে রাতে টহল দেওয়া হয়। আমাদের বাড়ির সামনে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়েও থাকে। তাই আমার জন্য তাদের আলো দ্বারা কাপড় বুনন করা ঠিক হবে কি?' ইমাম আহমাদ বললেন, 'কে তুমি?' মহিলা বলল, 'আমি বিশর আল-হাফির বোন।' ইমাম আহমাদ বললেন, 'তোমাদের বাড়ি থেকে তাকওয়া উঠে গেছে। এ কাজ কিছুতেই তোমার জন্য বৈধ হবে না।'
ইমাম আবু হানিফা বাগদাদের এক ব্যক্তির কাছে কিছু ঋণের অর্থ পাওনা ছিলেন। তাই তিনি কয়েকজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে দ্বিপ্রহরে তার কাছে গেলেন। প্রচণ্ড গরম ছিল। আবু হানিফা ঋণগ্রহীতার দরজায় করাঘাত করে দরজা থেকে খানিক দূরে এসে দাঁড়ালেন। কারণ, দরজার সামনে গরমের উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য ওপরে ছাদ ছিল। এই অবস্থা দেখে এক ছাত্র জিজ্ঞাসা করল, 'আমরা কেন ছাদের ছায়া ছেড়ে রোদের মধ্যে এসে দাঁড়ালাম?' উত্তরে তিনি বললেন, 'এই ছাদের মালিক আমার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে; তাই তার ছাদের নিচে দাঁড়ানো ঋণ দিয়ে ফায়দা গ্রহণের সমতুল্য। এটি সুদের সাথে সাদৃশ্য রাখে!'
জনৈক ধনী ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। তিনি তাসবিহ-পাঠে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় এক ভিক্ষুক তার কাছে এসে কিছু অর্থ চাইল। কিন্তু তিনি তাসবিহ-পাঠে মনোযোগী থাকায় ভিক্ষুকের প্রতি লক্ষ করেননি। কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো, কেউ একজন তার কাছে কিছু চেয়েছিল। সাথে সাথে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। অতঃপর দেখলেন, লোকটি বসে বসে রুটির টুকরো খাচ্ছে। অতঃপর ভিক্ষুকের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে অর্থ দিতে চাইলে সে নিচ্ছিল না। সে বলল, 'এখন আমার প্রতিপালক আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে দিয়েছেন। আবার প্রয়োজন হলে তোমার কাছে চাইব!'
একদা কাবা-চত্বরে খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক সালিম বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর-কে বললেন, 'আমার কাছে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিস চাও।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তাঁর ঘরের পাশে বসে তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে চাইতে লজ্জাবোধ করি।' অতঃপর মসজিদে হারাম থেকে বের হওয়ার পর আবার বললেন, 'এখন তো বাইতুল্লাহ থেকে বেরিয়েছ, এবার চাও।' তিনি বললেন, 'দুনিয়ার প্রয়োজন চাইব নাকি আখিরাতের?' খলিফা বললেন, 'দুনিয়ার প্রয়োজনের কথা বলো।' এ কথা শুনে সালিম বললেন, 'যে সেগুলোর মালিক, কেবল তার কাছেই চাইব; কিন্তু যে এগুলোর মালিকই নয়, তার কাছে কীভাবে চাইব!'৫৪
হাতিম আল-আসাম্ম তার সন্তানদের বলল, 'আমি হজ করতে চাই।' সন্তানরা কান্না করতে করতে বলল, 'তাহলে আমাদের কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?' তাদের এই অবস্থা দেখে বড় মেয়ে বলল, 'বাবাকে যেতে দাও। তিনি তো রিজিকদাতা নন।' অতঃপর হাতিম হজের সফরে বেরিয়ে পড়ল। ঘরে খাওয়ার কিছুই ছিল না। সকলেই ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে রাত্রিযাপন করছিল আর বড় মেয়েকে ভর্ৎসনা করছিল। তাই বড় মেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করল, 'হে আল্লাহ, তাদের কাছে আমাকে অপমানিত করবেন না।'
সেদিন তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে দেশের গভর্নর যাচ্ছিলেন। বাড়িতে ঢুকে পানি পান করতে চাইলেন। হাতিমের সন্তানরা একটি নতুন জগে করে তাকে ঠান্ডা পানি পান করালো। গভর্নর পান করে বললেন, 'এটা কার বাড়ি?' তারা বলল, 'এটা হাতিম আল-আসাম্মের বাড়ি।' অতঃপর তিনি বাড়ির দিকে একটি স্বর্ণের মালা ছুড়ে মারলেন এবং সঙ্গীদের বললেন, 'তোমাদের যারা আমাকে ভালোবাসে, তারা যেন আমার মতোই এই কাজটি করে।' এ কথা শুনে সকলেই স্বর্ণের মালা ছুড়তে শুরু করল। পরিস্থিতি দেখে বড় মেয়ে কান্না করতে করতে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে। তার মা বলল, 'তুমি কেন কান্না করছ? আল্লাহ তো আমাদের প্রশস্ততা দান করছেন।' উত্তরে মেয়ে বলল, 'একজন মাখলুক আমাদের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়ায় আমরা ধনী হয়ে গেছি। যদি খালিক আমাদের দিকে তাকাতেন, তাহলে কী অবস্থাই না হতো আমাদের?!'
ইমাম তাবারি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উমর বিন আব্দুল আজিজ খিলাফতের দায়িত্বে থাকাকালে এক ব্যক্তিকে আট দিরহাম দিয়ে একটি পোশাক কিনতে পাঠালেন। লোকটি পোশাক কিনে উমর বিন আব্দুল আজিজের নিকট নিয়ে এলো। তিনি পোশাকের ওপর হাত রেখে বললেন, 'কত সুন্দর ও নরম পোশাক এটি!' এ কথা শুনে লোকটি মুচকি হাসল। উমর বিন আব্দুল আজিজ তাকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আমার হাসির কারণ হলো, আপনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে একদিন আমাকে রেশম ও পশমের তৈরি এক ধরনের বিশেষ কাপড় ক্রয় করতে বলেছেন। অতঃপর আমি এক হাজার দিরহাম দিয়ে সেটি ক্রয় করে এনেছি। তখন আপনি কাপড়টির ওপর হাত রেখে বলেছেন, "এটি অনেক শক্ত!” অথচ আজ আপনি মাত্র আট দিরহাম দ্বারা কাপড় ক্রয় করছেন!' লোকটির কথা শুনে উমর বিন আব্দুল আজিজ বললেন, 'আমি মনে করি, যে লোক এক হাজার দিরহাম দিয়ে কাপড় ক্রয় করে, সে আল্লাহকে ভয় করতে পারে না। শোনো...! আমার একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হৃদয় আছে। যখন আমি কোনো অবস্থান অর্জন করি, তখন তার চেয়ে উন্নত অবস্থানের আশা করতে থাকি। একসময় আমি ইমারতের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। তারপর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। আবার খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার হৃদয় সবচেয়ে বড় স্থানটি অর্জন করতে উদগ্রীব হয়ে আছে। তা হলো জান্নাত!'
কিছু মানুষ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত কল্যাণের চেয়েও অল্পে তুষ্ট থাকতে চায়। কারণ, তারা অন্যদের জন্য কল্যাণের একটি অংশ রেখে যেতে চায়; যাতে তাদের মতো অন্যরাও কল্যাণ পায়।
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস তাঁর ছেলেকে বলেছেন, 'হে বৎস, ধনাঢ্যতা চাইলে পরিতুষ্টি সহকারে চাও। কেননা, যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে পরিতুষ্টি না দেন, তাহলে কোনো সম্পদই তোমাকে ধনী করতে পারবে না।'
রাসুল কতই না চমৎকার বলেছেন! তিনি ইরশাদ করেন :
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيرَتْ لَهُ الدُّنْيَا
'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকালে উপনীত হয় এবং তার নিকট একদিনের খাবার আছে, তবে তার জন্য যেন গোটা দুনিয়াটাই একত্র করা হলো।'৫৫
সুতরাং যাদেরকে আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দেন এবং নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দেন, তারা কতই না সৌভাগ্যবান!
সুখী সে নয়, যে যা চায় তা-ই পায়। বরং সবচেয়ে বেশি সুখী সে, যে তার কাছে যা আছে, তাতে সন্তুষ্ট থাকে।
মানুষ (القناعة) তথা 'পরিতুষ্টি' কথাটির সাথে জুলুম করেছে। ড. ইউসুফ কারজাবি (مشكلة الفقر وكيف عالجها الإسلام) নামক গ্রন্থে এমনটিই বলেছেন। তারা (القناعة) দ্বারা না পাওয়া ও লাঞ্ছনার জীবনের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং সবকিছুতে সর্বোচ্চ অবস্থান অর্জনের প্রতি দুর্বল মানসিকতাকে বোঝায়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অধিকার বঞ্চিত হওয়া ও দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পড়ে থাকাকে তারা (القناعة) মনে করে! এ সবই স্পষ্ট ভুল ধারণা। মানুষের মাঝে স্বভাবতই দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ ও লোভ-লালসা থাকে। দ্বীন মানুষকে ধনাঢ্যতা অর্জনের পথে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে শেখায় এবং এমন সব বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখে, যেগুলো দেহ ও মন দুটোর জন্যই ক্ষতিকর।
রাসুল ইরশাদ করেছেন:
أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا اللهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ، فَإِنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَوْفِيَ رِزْقَهَا وَإِنْ أَبْطَأَ عَنْهَا، فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ، خُذُوا مَا حَلَّ، وَدَعُوا مَا حَرُمَ
'হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। কেননা, কোনো ব্যক্তিই তার জন্য নির্ধারিত রিজিক পূর্ণরূপে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না; যদিও তার রিজিক প্রাপ্তিতে কিছু বিলম্ব হয়। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল, তা-ই গ্রহণ করো এবং যা হারাম, তা বর্জন করো। '৫৬
(القناعة)-এর একটি অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যা কিছু দান করেছেন এবং যেগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তাতে সন্তুষ্ট থাকা। সুতরাং যা কিছু অর্জন করা সহজ ও সম্ভব নয়, তা পাওয়ার আশা নিয়ে যেন কেউ সময় না কাটায়। এমন কিছু যেন আশা না করে, যা অন্যকে দেওয়া হয়েছে; অথচ তাকে দেওয়া হয়নি। এমন আশা করা সেই বৃদ্ধের মতো, যে বুড়ো বয়সে যৌবনের শক্তি পেতে চায় এবং সেই ছোট যুবকের মতো, যে লম্বা মানুষকে দেখে নিজে খাটো হওয়ার কারণে আফসোস করে!
সালিহিনদের কেউ একজন বলেছিলেন, 'হে আদম-সন্তান, যতদিন আল্লাহর ধনভান্ডার থাকবে, ততদিন রিজিকের সংকীর্ণতার চিন্তা কোরো না। আর আল্লাহর ভান্ডার তো কখনো ফুরাবে না। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে আশ্রয় গ্রহণ কোরো না। যদি তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে আশ্রয় গ্রহণ করো, তাহলে পুরো কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলে। আল্লাহ তোমার ভাগে যা কিছু বণ্টন করে রেখেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো। তাহলে দেহ-মনে শান্তি পাবে। আল্লাহর কাছে আগামী দিনের রিজিক চেয়ো না-যেমনিভাবে তিনি তোমার কাছে আগামী দিনের আমল কামনা করেন না। কেননা, তিনি তো ভুলে যান না, কে তাঁর অবাধ্যতা করেছে। সুতরাং যে তাঁর আনুগত্য করেছে, তার কথা কীভাবে ভুলবেন?! তা ছাড়া তিনি তো সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।'

টিকাঃ
৫২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৪।
৫৩. সহিহুল বুখারি: ৬৪৩৬।
৫৪. মিন কুনুজিল ইসলাম, ড. মুহাম্মাদ ফায়িজ আল-মাত্ত।
৫৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৬।
৫৬. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২১৪৪।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 নেক আমলের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 নেক আমলের মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


যাদের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে এবং তারা নেক আমল করে, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে উত্তম জীবনযাপনের ওয়াদা দিয়েছেন। আর পরকালে আমলের চমৎকার প্রতিদান দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ইমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরস্কার দেবো, যা তারা করত। '৫৭
উক্ত আয়াতে আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ(-এর মধ্যে জীবনের সব ধরনের শান্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ( দ্বারা উত্তম ও হালাল রিজিককে বোঝানো হয়েছে।
আলি )حَيَاةُ طَيِّبة(-এর দ্বারা )القَنَاعَة( বা পরিতুষ্টি বুঝিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস-এর মতে, এটি হলো )السَّعَادَة( বা সৌভাগ্য।
জাহহাক-এর মতে )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ( হলো, দুনিয়াতে হালাল রিজিক অন্বেষণ করা এবং ইবাদত করা।
তবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতামত হলো, )حَيَاةُ طَيِّبَةٌ(-এর মধ্যে এই সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত আছে। ৫৮

টিকাঃ
৫৭. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৯৭।
৫৮. তাফসিরু ইবনি কাসির।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00