📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 কাজের মধ্যে সৌভাগ্য রয়েছে; সম্পদের মধ্যে নয়

📄 কাজের মধ্যে সৌভাগ্য রয়েছে; সম্পদের মধ্যে নয়


কাজে মনোনিবেশ করা সৌভাগ্যের অন্যতম মাধ্যম। ফলপ্রসূ আমল ব্যক্তিকে অবসরতার ভয়াল থাবা এবং ভ্রষ্টতার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে। যে লোক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ থেকে কাজকে ভালোবাসে, সে বাস্তবিকভাবেই সুখী হতে পারে। আর অনিচ্ছায় কাজ করলে কষ্ট ও বোঝা মনে হয়।
(অবসর থাকতে থাকতে) যারা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, অধিকাংশই কাজকে বোঝা ও কষ্টদায়ক মনে করার কারণে এমন হয়েছে। তাই অবসরতা শরীরের ওপর যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনই মানসিকতার ওপরও অনেক খারাপ প্রভাব ফেলে। তবে মানসিকতায় প্রভাবের মাত্রাটাই বেশি হয়ে থাকে।
কর্মের দ্বারা মানুষের সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায়, যদি না কর্মকে কেবলই অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে পরিণত করে। কিন্তু যদি অর্থই তার লক্ষ্য হয়, তবে নিজেকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিল এবং সময়ের সাথে সাথে সম্পদের গোলামে পরিণত হলো! সুতরাং সম্পদের আধিক্য বা স্বল্পতার বিবেচনা করে সৌভাগ্য লাভ করা যায় না; বরং সম্পদ দ্বারা কী ধরনের কাজ করা হয়, তদনুযায়ী সৌভাগ্য অর্জিত হয়ে থাকে।
সুখী হতে হলে সম্পদ থাকা জরুরি নয়; বরং সম্পদ জমা করার দ্বারা তুমি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারো, এগুলো খরচ করতে কষ্ট সহ্য করতে হবে, রক্ষণাবেক্ষণ ও বৃদ্ধি করার চিন্তায় সংকীর্ণতায় পড়ে যাবে। সুতরাং সম্পদ জমা করতে হবে জীবন বাঁচানোর জন্য এবং জীবন বাঁচাতে হবে সুখ উপভোগ করার জন্য। অতএব, সম্পদের লালসায় জীবনের প্রকৃত স্বাদ হারিয়ে ফেলো না।
দার্শনিকদের গবেষণা অনুযায়ী দুঃখ-দুর্দশার মূল কারণ হচ্ছে অবসরতা। এর ব্যাধি থেকে উত্তরণের মাধ্যম হচ্ছে পরিশ্রম বা ব্যস্ততা। শুধু তা-ই নয়; বরং কঠিন পরিশ্রম করতে করতে যেন ক্লান্তি পেয়ে বসে। কেননা, সৌভাগ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে ক্লান্তি।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 পেশার দাসে পরিণত হয়ো না

📄 পেশার দাসে পরিণত হয়ো না


ব্যক্তিগত পেশায় আত্মনিয়োগ করার মাঝেই কেবল সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে— এমনটি যেন কেউ না ভাবে। সৌভাগ্য লাভের অন্য কিছু মাধ্যম রয়েছে। সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। নচেৎ তার দৃষ্টান্ত এমন অবিবাহিত ব্যক্তির মতো হবে, যে জীবনভর পেশার গোলামি করেছে, দোকানে বসে বসে ব্যবসা করা ছাড়া জীবনের আর কোনো অর্থই তার বুঝে আসেনি। প্রতিদিন সকালে দোকানে গমন করে, আর গভীর রাতে ঘরে ফিরেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। অতঃপর যখন নতুন করে সকাল আসে, দৈনন্দিনের মতো কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা দোকানের দিকে হাঁটা শুরু করে। এভাবেই জীবনের প্রতিটি দিন সে পার করতে থাকে। অবশেষে যখন (বেশ কিছু সম্পদ জমা করার পর) মৃত্যুর ডাক আসে, তখন প্রতিবেশী কেউ কবরের ওপর একটি স্মারক ফলক ঝুলিয়ে দেয়। যেখানে লেখা থাকে 'জন্মেছিল মানুষ হয়ে... মারা গেল দোকানি হয়ে।'
এমন বহু মানুষ আছে। একেকজন একেক পেশার দাসত্ব বরণ করে মারা যায়। জন্মে মানুষ হয়ে, মারা যায় ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ইত্যাদি পেশাদারিত্বের লকব নিয়ে। খুব কম মানুষই আছে, যারা পেশার দাসত্ব না করে মারা যায়।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 তুমি কী করতে চাও, তা জানার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 তুমি কী করতে চাও, তা জানার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


বিজ্ঞদের মতে, দুনিয়াতে তুমি কী করতে চাও এবং দুনিয়া থেকে কী কী পেতে চাও, তা জেনে অর্জন করে নেওয়ার মধ্যে সুখ রয়েছে। কেননা, বহু মানুষ জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসীন। জীবনকে কী কাজে ব্যয় করতে চায়, নিজেও জানে না। এ ধরনের মানুষগুলোকে ছোট বাচ্চাদের সাথেই তুলনা করতে হয়। বাচ্চারা খেলনার দোকানে ঢুকার পর হরেক রকম খেলনা দেখে হঠাৎ একটা খেলনা হাতে নিয়ে নেয়। একটু পর হাতের খেলনার চেয়েও উজ্জ্বল ও সুন্দর আরেকটি খেলনা দেখতে পেয়ে হাতেরটি ফেলে সেটি ধরে। এভাবে একের পর এক খেলনা পালটাপালটি করতেই থাকে। অবশেষে কখনো খালি হাতেই বের হতে হয় আবার কখনো খুবই নিম্নমানের কোনো খেলনা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। এমনই বাচ্চাদের অবস্থা।
১৯২৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ইস্কান্দার মাকারিউস বলেন, 'অস্থির ও উৎকণ্ঠ চিত্তের মানুষগুলোর মাঝে এমনই পরিলক্ষিত হয়। প্রবৃত্তির হাজারো চাহিদা এসে তাদের মাথায় ভিড় করে। খেয়ালিপনার তীব্র বাতাসে এবং ভোগবিলাসের গোপনগর্তে তাদের বুদ্ধি হারিয়ে যায়। কখনো এরা গাড়ির নেশায় প্রলুব্ধ হয়। কখনো জুয়ার টেবিলে সময় কাটায়। মাঝে মাঝে কামনাবাসনা আর লালসা মেটাতে দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। এ ধরনের মানুষগুলো রাত জেগে কামনাবাসনা পূরণ ও দিনের বেলায় ঘুমের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
এরা একেকবার একেক পেশা ধরে। আজ এই কাজ কাল ওই কাজ। এভাবেই পালটাপালটি করতে থাকে। অন্য নারীকে বিয়ে করার জন্য স্ত্রীকে তালাক দেয়, আবার কাউকে তালাক দেওয়ার জন্য বিয়ে করে। পুরোনো ভালোবাসা পেছনে ফেলে নতুন ভালোবাসা খোঁজে। তবুও তাদের আরও চাই... আরও চাই...! তাদের ধারণামতে প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানোর মাঝে প্রকৃত স্বাদ এবং সুখ।
অথচ প্রবৃত্তির তাড়নায় বারবার পালটাপালটি খাওয়া এবং অমনোযোগীদের উদাসীনতার মাঝে শান্তি ও সৌভাগ্য নেই। এরা কোনো দিন তুষ্টও হতে পারে না, সুখীও হতে পারে না। কেননা, তারা নিজেরাই জানে না, নিজেরা কী চায়! কোনো কিছু চাইলেও তাতে স্থির থাকতে পারে না।
সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, সর্বপ্রথম তোমাকে নির্ধারণ করতে হবে, তুমি কী চাও। অতঃপর যা চাও, তা গ্রহণ করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে এবং অন্তরে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, অবশ্যই আমি সুখী হব। তবেই তুমি সুখী হতে পারবে। অতএব, দুনিয়ার বিপদাপদকে কিছুতেই তোমার ওপর বিজয়ী হতে দেবে না। তবে কখনো বিপদে পড়ে গেলেও অশ্রুসাগরে ভাসা যাবে না। বরং বিপদ-প্রতিবন্ধকতার সাথে ময়দানে লড়াই করে যাও, যতক্ষণ না বিজয়ীবেশে ফিরে আসো। ১৮

টিকাঃ
১৮. আল-আরুসাহ, ৯/১২/১৯২৮ ইসায়ি। ইস্কান্দার মাকারিউস।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 সুস্থতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 সুস্থতার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


সুস্থতা সৌভাগ্যের অন্যতম অংশ। সম্পদ, সম্মান, দাপট, রাজত্ব কিছুতেই সুখ নেই, যদি সুস্থতা না থাকে। সবকিছুর পূর্বে পূর্ণ সুস্থতা থাকতে হবে। সবকিছু থেকেও যদি সব সময় অসুস্থতা ও বিপদের মোকাবিলা করে যেতে হয়, তবে এসবের মাঝে সুখ কীসের?!
কথিত আছে, জনৈক দরবেশ হজের উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহর পথে রওয়ানা করল। পথিমধ্যে তার জুতো ক্ষয় হয়ে যায়। তাই মরুপথে হাঁটতে হাঁটতে প্রচণ্ড উত্তাপে তার পাদুটো আঙ্গারপ্রায়। অবশেষে বাকি পথ মনের মধ্যে এই দুঃখ লালন করেই অতিক্রম করল যে, মরুর উত্তপ্ত বালি থেকে বাঁচতে বাহনে আরোহণ করার মতো সম্পদও নেই আমার কাছে! অতঃপর ভাবতে ভাবতে যখন মক্কায় গিয়ে পৌছুল, তখন এক জায়গায় এক অসুস্থ ভিক্ষুককে দেখে চমকে গেল। তার দুটো পা নেই। এই অবস্থা দেখে সে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইল এবং বুঝতে পারল যে, সে জুতো ছাড়া পা-বিহীন ওই অসুস্থ ব্যক্তির চেয়ে অনেক সুখে আছে। অথচ কিছু মানুষ পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তাদের অভিযোগ আর অসন্তুষ্টির শেষ নেই। এদের এত এত অনুযোগ দেখে অসুস্থ এবং দরিদ্ররা পর্যন্ত বিস্মিত হয়।
পরিপূর্ণ সুস্থতা ও পর্যাপ্ত সম্পদ কখনো সৌভাগ্যের মূল উপাদান নয়। বরং এগুলো সৌভাগ্যের দুটি শর্ত। অন্যভাবে বললে, এই দুটি সৌভাগ্য নিশ্চিত করে না এবং কেউ সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে এই দুটির মুখাপেক্ষীও নয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মুমিনের চূড়ান্ত আশা হচ্ছে দুনিয়াতে সুস্থতার সাথে জীবনযাপন এবং পরকালে ক্ষমা লাভ।
রাসুল ইরশাদ করেন:
إِلَيْكَ انْتَهَتِ الْأَمَانِيُّ، يَا صَاحِبَ الْعَافِيَةِ
'হে সুস্থতার মালিক, আপনার নিকটই আমার আশা শেষ হয়।'১৯
তিনি আরও বলেন:
اسْأَلُوا اللهَ العَفْوَ وَالعَافِيَةَ، فَإِنَّ أَحَدًا لَمْ يُعْطَ بَعْدَ اليَقِينِ خَيْرًا مِنَ العَافِيَةِ
'তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সুস্থতা কামনা করো। কেননা, দৃঢ় বিশ্বাসের পর তোমাদের কাউকে সুস্থতার চেয়ে বেশি উত্তম আর কিছুই দেওয়া হয়নি।'২০
আলি বিন আবু তালিব বলেছেন, 'কঠিন বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য দুআ করা যতখানি প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন সুস্থ ব্যক্তির জন্য যে যেকোনো সময় বিপদে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'

টিকাঃ
১৯. আল-মুজামুল আওসাত: ৬৬৯৪।
২০. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৫৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00