📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 তোমার যা আছে, তা উপভোগ করার পদ্ধতি জানার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 তোমার যা আছে, তা উপভোগ করার পদ্ধতি জানার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


হৃদয়ের গভীর থেকে, মন-মেজাজ এবং চিন্তা-চেতনা থেকে সুখ ও সৌভাগ্যের উৎপত্তি ঘটে। জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি তোমার মনোভাব, নানান ঘটনাপ্রবাহের মুখোমুখি হওয়ার পর সমাধানের পদ্ধতির মাঝে এবং জীবনের সকল পাওয়া না-পাওয়ার ভাগ্যের ওপর সন্তুষ্ট থাকার মাঝে শান্তি রয়েছে। তোমার মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা ইত্যাদিই তোমার সুখ ও দুঃখের কারণ।
দুই ব্যক্তি বাগানে প্রবেশ করল। গাছের ডালে খুব সুন্দর একটি গোলাপ দেখতে পেয়ে তারা গোলাপটি পাড়তে গেল। একজন গোলাপটি পাড়তে গিয়ে হাতে কাঁটা বিঁধে গেল। অতঃপর সে বলল, 'ওহহহ! জীবনটা কত কঠিন! কত হতভাগা আমরা! এত সুন্দর একটি গোলাপ পাড়তে গেলাম, তাতেও কাঁটার আঘাত! একটু শান্তিও কি পাব না জীবনে?!' অথচ পাশের ব্যক্তি গোলাপটি পাড়তে গিয়ে একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে বলল, 'সুবহানাল্লাহ, তিনি কত মহান! গোলাপটি কতই না সুন্দর ও চমৎকার! সুন্দর গোলাপটির মাঝে কাঁটা পর্যন্ত দিয়ে রেখেছেন তিনি। তাঁর সৃষ্টি কতই না কারুকার্যময়!' একই বিষয়। কিন্তু দুজনের দুরকম ভাবনা।
দুজন ব্যক্তির হাতে আধা গ্লাস করে পানি দেওয়া হলো। অতঃপর সুখী লোকটি বলল, 'আমার গ্লাস অর্ধেকটা পূর্ণ আছে।' আর হতভাগা ও বক্র মানসিকতার লোকটি বলল, 'আহ! আমার গ্লাস অর্ধেকটা খালি।' একটি বিষয়কে দুজন দুভাবে নিয়েছে। এভাবেই জীবনের প্রতিটি বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
জীবনের সবকিছুতেই দুটো দিক রয়েছে। একটি সুন্দর আরেকটি অসুন্দর। তাই দুনিয়ার সুন্দর দিকটাই গ্রহণ করো। খারাপ দিকটা এড়িয়ে চলো।
সুতরাং এ কথা বলা চলে যে, প্রকৃত সুখ-শান্তি হলো, তোমার যা আছে, তা উপভোগ করার শিল্পের মাঝে, সুন্দর দিক দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার মাঝে, অসুন্দর দিক দ্বারা নয় এবং জীবনের যেকোনো বিষয়ে সুন্দর দিকটি উন্মোচন করতে পারার মাঝে। কেবল কোনো কিছুর মালিক হওয়ার মাঝেই সুখ নেই; বরং তার সুন্দর ব্যবহারের মাঝে সুখ রয়েছে।
যদি জীবন থেকে দুর্ভাগ্য দূর হয়ে যায়, তাহলে বলো না, 'আমি হতভাগ্য নই।' বরং বলো, 'আমি সুখী।' এ কথা বলো না, 'আমার জীবনের অর্ধেকটা জুড়ে অশান্তি রয়েছে।' বরং এ কথা বলো, 'আমার জীবনের অর্ধেকটা জুড়ে সুখ আর শান্তি রয়েছে।'১৭

টিকাঃ
১৭. ফালসাফাতুস সাআদাহ, ড. মুহাম্মাদ ফাতহি।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 কাজের মধ্যে সৌভাগ্য রয়েছে; সম্পদের মধ্যে নয়

📄 কাজের মধ্যে সৌভাগ্য রয়েছে; সম্পদের মধ্যে নয়


কাজে মনোনিবেশ করা সৌভাগ্যের অন্যতম মাধ্যম। ফলপ্রসূ আমল ব্যক্তিকে অবসরতার ভয়াল থাবা এবং ভ্রষ্টতার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে। যে লোক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ থেকে কাজকে ভালোবাসে, সে বাস্তবিকভাবেই সুখী হতে পারে। আর অনিচ্ছায় কাজ করলে কষ্ট ও বোঝা মনে হয়।
(অবসর থাকতে থাকতে) যারা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, অধিকাংশই কাজকে বোঝা ও কষ্টদায়ক মনে করার কারণে এমন হয়েছে। তাই অবসরতা শরীরের ওপর যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনই মানসিকতার ওপরও অনেক খারাপ প্রভাব ফেলে। তবে মানসিকতায় প্রভাবের মাত্রাটাই বেশি হয়ে থাকে।
কর্মের দ্বারা মানুষের সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায়, যদি না কর্মকে কেবলই অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে পরিণত করে। কিন্তু যদি অর্থই তার লক্ষ্য হয়, তবে নিজেকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিল এবং সময়ের সাথে সাথে সম্পদের গোলামে পরিণত হলো! সুতরাং সম্পদের আধিক্য বা স্বল্পতার বিবেচনা করে সৌভাগ্য লাভ করা যায় না; বরং সম্পদ দ্বারা কী ধরনের কাজ করা হয়, তদনুযায়ী সৌভাগ্য অর্জিত হয়ে থাকে।
সুখী হতে হলে সম্পদ থাকা জরুরি নয়; বরং সম্পদ জমা করার দ্বারা তুমি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারো, এগুলো খরচ করতে কষ্ট সহ্য করতে হবে, রক্ষণাবেক্ষণ ও বৃদ্ধি করার চিন্তায় সংকীর্ণতায় পড়ে যাবে। সুতরাং সম্পদ জমা করতে হবে জীবন বাঁচানোর জন্য এবং জীবন বাঁচাতে হবে সুখ উপভোগ করার জন্য। অতএব, সম্পদের লালসায় জীবনের প্রকৃত স্বাদ হারিয়ে ফেলো না।
দার্শনিকদের গবেষণা অনুযায়ী দুঃখ-দুর্দশার মূল কারণ হচ্ছে অবসরতা। এর ব্যাধি থেকে উত্তরণের মাধ্যম হচ্ছে পরিশ্রম বা ব্যস্ততা। শুধু তা-ই নয়; বরং কঠিন পরিশ্রম করতে করতে যেন ক্লান্তি পেয়ে বসে। কেননা, সৌভাগ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে ক্লান্তি।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 পেশার দাসে পরিণত হয়ো না

📄 পেশার দাসে পরিণত হয়ো না


ব্যক্তিগত পেশায় আত্মনিয়োগ করার মাঝেই কেবল সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে— এমনটি যেন কেউ না ভাবে। সৌভাগ্য লাভের অন্য কিছু মাধ্যম রয়েছে। সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। নচেৎ তার দৃষ্টান্ত এমন অবিবাহিত ব্যক্তির মতো হবে, যে জীবনভর পেশার গোলামি করেছে, দোকানে বসে বসে ব্যবসা করা ছাড়া জীবনের আর কোনো অর্থই তার বুঝে আসেনি। প্রতিদিন সকালে দোকানে গমন করে, আর গভীর রাতে ঘরে ফিরেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। অতঃপর যখন নতুন করে সকাল আসে, দৈনন্দিনের মতো কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা দোকানের দিকে হাঁটা শুরু করে। এভাবেই জীবনের প্রতিটি দিন সে পার করতে থাকে। অবশেষে যখন (বেশ কিছু সম্পদ জমা করার পর) মৃত্যুর ডাক আসে, তখন প্রতিবেশী কেউ কবরের ওপর একটি স্মারক ফলক ঝুলিয়ে দেয়। যেখানে লেখা থাকে 'জন্মেছিল মানুষ হয়ে... মারা গেল দোকানি হয়ে।'
এমন বহু মানুষ আছে। একেকজন একেক পেশার দাসত্ব বরণ করে মারা যায়। জন্মে মানুষ হয়ে, মারা যায় ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ইত্যাদি পেশাদারিত্বের লকব নিয়ে। খুব কম মানুষই আছে, যারা পেশার দাসত্ব না করে মারা যায়।

📘 সৌভাগ্যের হাতছানি > 📄 তুমি কী করতে চাও, তা জানার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে

📄 তুমি কী করতে চাও, তা জানার মাঝে সৌভাগ্য রয়েছে


বিজ্ঞদের মতে, দুনিয়াতে তুমি কী করতে চাও এবং দুনিয়া থেকে কী কী পেতে চাও, তা জেনে অর্জন করে নেওয়ার মধ্যে সুখ রয়েছে। কেননা, বহু মানুষ জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসীন। জীবনকে কী কাজে ব্যয় করতে চায়, নিজেও জানে না। এ ধরনের মানুষগুলোকে ছোট বাচ্চাদের সাথেই তুলনা করতে হয়। বাচ্চারা খেলনার দোকানে ঢুকার পর হরেক রকম খেলনা দেখে হঠাৎ একটা খেলনা হাতে নিয়ে নেয়। একটু পর হাতের খেলনার চেয়েও উজ্জ্বল ও সুন্দর আরেকটি খেলনা দেখতে পেয়ে হাতেরটি ফেলে সেটি ধরে। এভাবে একের পর এক খেলনা পালটাপালটি করতেই থাকে। অবশেষে কখনো খালি হাতেই বের হতে হয় আবার কখনো খুবই নিম্নমানের কোনো খেলনা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। এমনই বাচ্চাদের অবস্থা।
১৯২৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ইস্কান্দার মাকারিউস বলেন, 'অস্থির ও উৎকণ্ঠ চিত্তের মানুষগুলোর মাঝে এমনই পরিলক্ষিত হয়। প্রবৃত্তির হাজারো চাহিদা এসে তাদের মাথায় ভিড় করে। খেয়ালিপনার তীব্র বাতাসে এবং ভোগবিলাসের গোপনগর্তে তাদের বুদ্ধি হারিয়ে যায়। কখনো এরা গাড়ির নেশায় প্রলুব্ধ হয়। কখনো জুয়ার টেবিলে সময় কাটায়। মাঝে মাঝে কামনাবাসনা আর লালসা মেটাতে দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। এ ধরনের মানুষগুলো রাত জেগে কামনাবাসনা পূরণ ও দিনের বেলায় ঘুমের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
এরা একেকবার একেক পেশা ধরে। আজ এই কাজ কাল ওই কাজ। এভাবেই পালটাপালটি করতে থাকে। অন্য নারীকে বিয়ে করার জন্য স্ত্রীকে তালাক দেয়, আবার কাউকে তালাক দেওয়ার জন্য বিয়ে করে। পুরোনো ভালোবাসা পেছনে ফেলে নতুন ভালোবাসা খোঁজে। তবুও তাদের আরও চাই... আরও চাই...! তাদের ধারণামতে প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানোর মাঝে প্রকৃত স্বাদ এবং সুখ।
অথচ প্রবৃত্তির তাড়নায় বারবার পালটাপালটি খাওয়া এবং অমনোযোগীদের উদাসীনতার মাঝে শান্তি ও সৌভাগ্য নেই। এরা কোনো দিন তুষ্টও হতে পারে না, সুখীও হতে পারে না। কেননা, তারা নিজেরাই জানে না, নিজেরা কী চায়! কোনো কিছু চাইলেও তাতে স্থির থাকতে পারে না।
সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, সর্বপ্রথম তোমাকে নির্ধারণ করতে হবে, তুমি কী চাও। অতঃপর যা চাও, তা গ্রহণ করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে এবং অন্তরে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, অবশ্যই আমি সুখী হব। তবেই তুমি সুখী হতে পারবে। অতএব, দুনিয়ার বিপদাপদকে কিছুতেই তোমার ওপর বিজয়ী হতে দেবে না। তবে কখনো বিপদে পড়ে গেলেও অশ্রুসাগরে ভাসা যাবে না। বরং বিপদ-প্রতিবন্ধকতার সাথে ময়দানে লড়াই করে যাও, যতক্ষণ না বিজয়ীবেশে ফিরে আসো। ১৮

টিকাঃ
১৮. আল-আরুসাহ, ৯/১২/১৯২৮ ইসায়ি। ইস্কান্দার মাকারিউস।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00