📄 ‘আমালকে একমাত্র আল্লাহুর জন্য নির্দিষ্ট করা
যখন সমস্ত পুণ্য কাজে দু'টি বিষয় ছাড়া উপায় নেই, একটা হলো আল্লাহ্র সন্তুষ্টি বিধানের ইচ্ছা করা; দ্বিতীয়তঃ শারী'আত সম্মত হওয়া আর এটাই প্রয়োজন সকল কথা-বার্তা ও কার্যকলাপে। এ সম্পর্কে নাবী ﷺ হতে সহীহ্ হাদীসে পাওয়া গেছে যে, তিনি বলেছেন: “নিশ্চয়ই তিন ব্যক্তি এমন, যাদেরকে দিয়ে সর্বপ্রথম দোযখের আগুন জ্বালানো হবে। তাদের একজন হলো যে ব্যক্তি নিজে জ্ঞান অর্জন করেছে এবং অন্যকেও সেটা শিখিয়েছে... এজন্য যে, লোকে তাকে বলবে সে 'আলিম। দ্বিতীয় ব্যক্তি, যেজন যুদ্ধ করেছে... এজন্য যে, লোকে তাকে বলবে: সে বীর। তৃতীয় ব্যক্তি হলো, যে জন দান-খায়রাত করেছে এজন্য যে, মানুষ তাকে বলবে সে দাতা।”
এই যে তিন ব্যক্তি, যারা লৌকিকতা এবং প্রচারের আকাঙ্ক্ষা করছিল, তারাতো নাবীগণের পরেই তিন ব্যক্তির পাশের মর্যাদার যোগ্য ছিল সিদ্দীকীন, শুহাদা এবং সালিহীন।
১. নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি ঐ জ্ঞান অর্জন করবে- যে জ্ঞান সহকারে আল্লাহ তা'আলা তদীয় রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং সে অন্যকে ঐ জ্ঞান শিক্ষা দিবে, যেন আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, ইনিই হবেন 'সিদ্দীক'।
২. আর যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান করবেন তিনিই হবেন সালিহ্।
এজন্যই সম্পদে অপচয়কারী মৃত্যুক্ষণে পুনঃ পৃথিবীর জীবনে প্রত্যাবর্তনের দরখাস্ত করবে। যাকে সম্পদ দেয়া হয়েছে অথচ হাজ্জও আদায় করেনি, যাকাতও দেয়নি, সে মৃত্যু মুহূর্তে প্রত্যাবর্তন ভিক্ষা করবে। এ সুবাদে আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেছেন: “তোমাদেরকে আমরা যে রিস্ক দিয়েছি সেটা হতে খরচ কর (আল্লাহ্ পথে) তোমাদের কারো নিকট মৃত্যু আসার পূর্বেই, তখন সে বলবে, হে আমার রব! হায় আমাকে যদি একটি নিকটবর্তী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি দান-খায়রাত করতাম এবং নেক্কারদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” (সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩ : ১০)
আর এ সকল বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক বিষয়সমূহ এমন হওয়া প্রয়োজন, যা দ্বারা আল্লাহ ও পরকাল সম্বন্ধে সংবাদ দিবে এবং যা ছিল ও হবে সত্যরূপে নির্ভুলভাবে, আর যার আদেশ দিবে এবং যা হতে নিষেধ করবে।
টিকাঃ
* আন্-নাসায়ী: ৬/২৩, কিতাবুল জিহাদ-বাবু মান কাতালা লি ইউক্বালা ফুলানুন জারিইউ ভিন্ন শব্দে, সে স্থানে এসেছে- “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে সে হলো এক শহীদ... তাকে বলা হবে তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি তো বীরত্বের জন্য যুদ্ধ করেছিলে।”
📄 ইসলাম-এর মর্মকথা
ভাল করে বুঝে নাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ দীন, যা সহ তিনি তদীয় গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন; এসবই একমাত্র আল্লাহ তা'আলা (তার বান্দা হতে) নেক 'আমাল ইচ্ছা করেন বলেই। আর এটাই হলো সাধারণ ইসলাম, যা ব্যতীত আল্লাহ তা'আলা আর কিছুই কারও নিকট হতে গ্রহণ করবেন না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা তা স্পষ্টভাবে বলেছেন: “আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম অন্বেষণ করবে, তবে সেটা তা হতে গৃহীত হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আ-লি-'ইমরান ৩: ৮৫)
“আল-ইসলাম” শব্দটি দু'টি অর্থ প্রকাশ করে। তাদের একটি হলো আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য। অতএব (মুসলিম) অহংকারী হবে না। দ্বিতীয়টি হলো একনিষ্ঠতা; একত্ববাদ, নির্দিষ্টকরণ (ইখলাস)। সুতরাং সে মিলিতভাবে নয়। আর সেটা হলো যে, বান্দা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা- যিনি বিশ্বপ্রতিপালকের নিকটই আত্মসমর্পণ করবে।
যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “ইব্রাহীমের ধর্ম হতে ঐ ব্যক্তিই মুখ ফিরাবে, যে মূলতঃই নির্বোধ আর আমি তাকে দুনিয়ায় নির্বাচিত করেছি... যখন তাকে তার প্রভূ বললেন, 'অনুগত হও', তিনি বললেন: আমি অনুগত হলাম বিশ্বপালকের।” (সূরা আল-বাকারাহ্ ২: ১৩০-১৩২)
আপনি বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামায এবং আমার সকল 'ইবাদাত এবং আমার জীবন এবং আমার মরণ এ সমুদয় একমাত্র আল্লাহ্রই জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের অধিপতি। তাঁর কোন শারীক নেই। “মুতাআদ্দি” সকর্মক ও ব্যবহৃত হয়, তখন ধাতু নির্গত ক্রিয়া যোগ থাকে। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি তার মুখমণ্ডলকে আল্লাহ্র সমীপে সোপর্দ করে এবং সে মুহসিন তথা উচ্চস্তরের নিষ্ঠাবানও; তার জন্য পুরস্কার রয়েছে তার প্রতিপালকের কাছে।”
এ দীন হলো নিষ্ঠার সাথে স্বীয় সত্তাকে আল্লাহ্র সমীপে সোপর্দ করা। আল্লাহ তা'আলা তো ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, নিশ্চয়ই প্রত্যেক ব্যক্তিই যিনি নিজের মস্তক নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তা'আলার সামনে নুইয়ে দিবে, তার প্রতিপালকের নিকট তার জন্য পুরস্কার রয়েছে। আর এমন লোকদের কোন ভয়ও থাকবে না, আর তারা চিন্তান্বিতও হবে না।
📄 আল্লাহুর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ও নিয়্যাতের প্রয়োজন অপরিহার্য
সেটা এরূপ... যে আল্লাহ্ জন্য চেহারা (মস্তক) অবনত করায় উদ্দেশ্য ও নিয়্যাত সংশ্লিষ্ট যে, সেটা আল্লাহ্ জন্য। এ বিষয়ে চারটি শব্দ ব্যবহার করেছেন: মুখমণ্ডল অবনত করা, মুখাবয়ব প্রতিষ্ঠিত করা, সোজা রাখা।
যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “তোমরা প্রত্যেক সাজদাহ্র সময় স্বীয় মুখমণ্ডল সোজা রেখও।” (সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ২৯)
আল্লাহ তা'আলা অনুরূপ আরও বলেছেন: “অতএব তোমরা একনিষ্ঠভাবে স্ব স্ব লক্ষ্য এ ধর্মের প্রতি রাখ; আল্লাহ প্রদত্ত সে যোগ্যতার অনুসরণ করে চল, যার উপর আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছে।” (সূরা আর-রূম ৩০ : ৩০)
মুখমণ্ডল ফিরানো: যেমন ইব্রাহীম ('আ.)-এর কথা : “আমি একাগ্রতার সাথে স্বীয় মুখমণ্ডল তাঁরই দিকে ফিরাচ্ছি, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুর্শিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” নাবী ﷺ অনুরূপই রাত্রে নামায আরম্ভ করার দু'আয় বলতেন। বারা বিন 'আযিব (রাযি.) হতে বর্ণিত আছে যে, নাবী ﷺ তাঁকে শিখিয়েছেন যে, যখন বিছানায় শুতে যাবে তখন যেন সে বলে: “হে আমার আল্লাহ! আমার প্রাণকে তোমারই কাছে সোপর্দ করলাম, এবং আমার মুখমণ্ডলকে তোমারই দিকে ফিরালাম।”
সুতরাং মুখমণ্ডল যিনি ফিরাল এবং যাঁর দিকে ফিরানো হয় উভয়কেই শামিল করে এবং যেদিকে মুখ ফিরানো হয় তাও বুঝায়। বান্দার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং খেয়াল যদি আল্লাহ্রই দিকে হয়, আর এটাই হলো তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সততা। আর এই সাথে সে যদি নিষ্ঠাবান হয়ে থাকে, তবে তো তার জন্য একত্রে মিলিয়ে গেছে যে, তার 'আমাল সৎ হবে, এবং সে তার প্রভুর 'ইবাদাতে আর কাউকেও শরীক করবে না।
টিকাঃ
* (ইবনে হাম্বাল: ৪/২৯৯-৩০০; মুসলিম: ৮/৭৭-৭৮, কিতাবুয যিক্র আদ্ দু'আ-ওয়াত্তাওবাহ্); ইবনে মাজাহ্ ২/১৫, হা: নং- ৩৮৮৬, কিতাবুদ্ দু'আ)
* (বুখারী: ৯/৯২, কিতাবুত্ তাওহীদ এবং মুসলিমে একটু ভিন্ন শব্দে ৮/৭৭-৭৮, কিতাবুদ্ দু'আ)
📄 নাবীর সুন্নাত মুতাবিক অনুসরণ অপরিহার্য
নেক কাজ হলো 'ইহসান' 'নিষ্ঠা' আর সেটা হলো পূর্ণ কাজসমূহ। যার আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ তা'আলা। আর আল্লাহ যার আদেশ দিয়েছেন সেটাই আল্লাহ্ সুন্নাত ও তদীয় রাসূল ﷺ-এর সুন্নাত সম্মত।
আল্লাহ তা'আলা তো সংবাদ দিয়েই দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি নিষ্ঠা অবলম্বন করবে এবং তার কাজে নিষ্ঠাবান হবে, সে তবে নিশ্চয়ই পুরস্কারের যোগ্য হবে, এবং শাস্তি হতে মুক্ত থাকবে।
আর বিশেষতঃ এজন্যই সাল্ফে সালিহীন ইমামগণ এ দু'টি মৌলিক বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতেন, যেমন ফুযাইল বিন ইয়াজ (রহ.) আল্লাহ্র এ কথা: “যেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে কাজে অত্যুত্তম” সম্পর্কে বলেছেন : “নিশ্চয়ই 'আমাল যদি সঠিক হয়, অথচ আল্লাহ্র জন্য 'খালিস' (নির্ধারিত) না হয়, তবে সেটা গৃহীত হবে না। আবার যদি 'আমাল খালিস হয় অথচ সঠিক না হয়, তবুও সেটা গৃহীত হবে না যে পর্যন্ত না তা 'আমাল খালিস হয় এবং সঠিক হয়। খালিস বলতে, কাজটি যেন একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়। আর সঠিক বলতে 'আমালটি যেন সুন্নাত মুতাবিক হয়।"
সা'ঈদ বিন জুবাইর হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন: “শুধু কোন কথা গৃহীত হবে না, যদি তদানুযায়ী 'আমাল না পাওয়া যায়, আবার নিয়্যাত ব্যতীত কোন কথা এবং 'আমালও গৃহীত হবে না আর কোন কথা, কাজ এবং নিয়্যাতও গৃহীত হবে না, যদি সেটা সুন্নাত মুতাবিক না হয়।"
হাসান বাসরী (রহ.) হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে। এ বর্ণনাটি 'মুরজিয়া' সম্প্রদায়ের দাবী খণ্ডন করছে। এ বর্ণনা আমাদেরকে এ সংবাদ দিয়েছে যে, কথা এবং কাজ ছাড়া উপায় নেই। আল-কুরআনে 'সুন্নাত' বলতে 'ইবাদাতে সুন্নাত এবং বিশ্বাস তথা 'আকীদাহমূহে সুন্নাত বুঝিয়ে থাকে। যেমন ইবনে মাস'ঊদ (রাযি.)-এর কথারই ন্যায়: “একটি সুন্নাতের উপর 'আমাল করাকে যথেষ্ট মনে করা, একটি বিদ'আতের উপর ইজতিহাদ করার চাইতে অত্যধিক ভাল।”
আল্লাহ তা'আলা- আমি তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি তিনিই সর্ববিষয়ে অধিক জ্ঞাত। ওয়া সাল্লাল্লাহু ওসাল্লামা ওয়া বা-রাকা 'আলা 'আবদিহি ওয়া রাসূলিহি মুহাম্মাদ, ওয়া মান্ তাবিআহু বিইসানিন ইলা-ইয়াওমিদ্দীন।